স্কুলগুলো কেন কারাগারের মতো?

প্রকাশের সময় : 2019-02-28 14:59:14 | প্রকাশক : Admin

ইংরেজিতে অদক্ষ হলেও আমি বাংলায় বেশ কথা বলতে পারি এমনটা অনেকেই বলে থাকেন। কিন্তু ইংরেজিতে কেন কথা বলতে পারি না আমি? অনেক খুঁজে বের করেছি এটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গাফিলতির ফল। আমাদের দেশে ভাষাকে ভাষার মত না শিখিয়ে আগেই এর ব্যাকরণ ধরিয়ে দেওয়া হয়। আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়ে তুবা ভাষাকে ভাষা হিসেবে শিখেছে বলে এখনই অনর্গল বাংলায় কথা বলে চলে। তুবাকে যদি ভাষা না শিখিয়ে ব্যাকরণ ধরিয়ে দিতাম তাহলে হয়তো নিজের ভাষাটাই ও আর শিখতে পারত না।

ঠিক এভাবেই আমরা যখন স্কুলে ইংরেজি শিখতে যাই আমাদের কাছে ইংরেজিকে ভাষা হিসেবে তুলেই ধরা হয়না। ইংরেজিও যে বাংলার মতই একটা ভাষা এবং কথা বলার ভাষা তা আমরা ভুলে যাই এই ব্যাকরণের পাল্ল−ায় পড়ে। ফলাফল আমাদের আর ইংরেজি শেখা হয়ে ওঠে না।

আমার ব্যক্তিগত ধারণা সারা পৃথিবীর মধ্যে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সব থেকে খারাপ। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভুল শুধরে দেবার বদলে ভুল নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে থাকে। চাপ দেয় শিক্ষার্থীর উপর, চাপ দেয় অভিভাবকের উপর। ফলে এখন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবক সবাই স্কুলের সময়টায় হালকা থাকার বদলে মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। স্কুলের শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে এভাবে ছেদ দেখা দিলে সেখানে ভাল কিছু আশা করা বোকামি নয় কি?

নিজের কথাই বলি। যখন ক্লাস সিক্সে নতুন স্কুলে ভর্তি হই তখন স্কুল আমার কাছে একটা ভয়ের জায়গায় রূপ নেয়। ইংরেজি না পারলে বেতের মার, কান ধরে বারান্দায় সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, ডিটেনশন ক্লাস থেকে শুরু করে অনবরত কান ধরে ওঠবস করার মত শাস্তিগুলো এক সময় আমার স্কুলের সব আনন্দই কেড়ে নিয়েছিল। একটা সময় এমন হয়েছিল যে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই আগে কান পেতে শোনার চেষ্টা করতাম রাস্তায় গাড়ির শব্দ শোনা যায় কি না। কোনো কারণে গাড়ি  বন্ধ থাকা মানে স্কুল বন্ধ হওয়ার সুযোগ।

পরিস্থিতি বদলে যায় ঠিক ক্লাস এইটে ওঠার পর। কীভাবে যেন স্কুলের শারীরিক শিক্ষা স্যারসহ আরও দুইজন স্যারের সাথে একটা প্রাণের সম্পর্ক হয়ে যায় আমার। তখন থেকেই প্রথম স্কুলের প্রতি টান অনুভব করা শুরু  আমার। ধীরে ধীরে আমি হয়ে উঠি স্কুলের ভলান্টিয়ার টিমের লিডার। দাপট বেড়ে যায় অনেক। মনের থেকে ভয় সরে গিয়ে আমি হয়ে উঠি স্কুলের অনেকের স্নেহের ছাত্র। তাই বলে যে আমি ইংরেজিতে ভাল হয়ে গিয়েছিলাম তা নয়। কিন্তু আমি যে বিষয়গুলো ভাল পারতাম তাতে দক্ষতা অন্য সকলের থেকে অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আমার মনে আছে, দশম শ্রেণিতে থাকতেই ক্লাসের অন্যদের হিসাব-বিজ্ঞানের ক্লাস নিতাম আমি।

স্কুল জীবনের ঠিক দুটি বিপরীত চিত্র আমার জীবনের অংশ। প্রথম দিকে যখন স্কুল আমার কাছে শুধু শাস্তির জায়গা ছিল তখন স্কুল বন্ধ থাকা মানে আমার কাছে দারুণ এক আনন্দের দিন। এর সঙ্গে পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হওয়া তো চলছিলই। পরে সেই স্কুলেই যখন কয়েকজন শিক্ষককে বন্ধুর মত পেলাম তখন স্কুল ঈদের সময় বন্ধ দিলেও মন খারাপ হতো।

মাঝে লন্ডন প্রবাসী এক আইনজ্ঞ বন্ধুর সাথে সে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলাম সেখানে স্কুলে শিক্ষার্থীদের পেটানোর কথা ভাবাও অপরাধ। শুধু তাই নয়, বাবা-মায়েরাও নাকি শাসন করতে গিয়ে সন্তানের গায়ে হাত তুলতে পারে না। এমন কোনো ঘটনা ঘটলে স্কুল থেকে অভিভাবকদের যেমন ডেকে নেওয়া হয় তেমনি একই ঘটনা বারবার ঘটলে এক সময় সেই সন্তান বাবা-মায়ের কাছে অনিরাপদ ধরে নিয়ে সন্তানকে সরকারি হেফাজতে নিয়ে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে সেদিন কিন্ডারগার্ডেনে চাকরিরত এক বোনের কাছ থেকে শুনতে পেলাম, একটি শিশু শিক্ষার্থী ক্লাসের মধ্যে মলত্যাগ করে কাউকে কিছু না বলার কারণে ঐ শিশুর মাকে খুব অপমানিত করেছে স্কুলের অন্য শিক্ষিকারা। এসব শুনে উপলব্ধি হয়, বাবা-মায়ের পরে স্কুল, স্কুলের পরিবেশ এবং স্কুলের শিক্ষকেরা যে একটি শিশুকে সুস্থ-সুন্দর ভাবে গড়ে তোলার কারিগর সেখান থেকে  আমরা বহু দূরে সরে এসেছি।

মোবাইল সাথে নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া অথবা মোবাইল ফোন থেকে নকল করে পরীক্ষা দেওয়া খারাপ। তবে সেই খারাপকে কেন্দ্রে করে বাবা-মায়ের সামনে, স্কুলের শিক্ষকদের সামনে, সম্পূর্ণ ক্লাসের সামনে একজন শিক্ষার্থীকে অপমানিত করার মধ্যে দিয়ে কী ভাল প্রত্যাশা করি আমরা? যখন আমি স্কুলে গিয়ে ভয়ে থাকতাম, তখন আমি পরীক্ষায় অনবরত খারাপ করতাম। আর যখন ভয় কেটে গেল, তখন ক্লাসের সেরা ছাত্র হতে কেউ আটকাতে পারেনি আমাকে।

এখন অসুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সাথে অভিভাবকদেরও আমি অসুস্থ হয়ে যেতে দেখছি। যেখানে ইংরেজির শিক্ষক হিসাব বিজ্ঞান পারেন না,  হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক বীজগণিত পারেন না, সেখানে আমাদের সন্তানদের সকল বিষয়ে ‘গোল্ডেন’ জিপিএ পেতে হবে। এ কেমন শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি আমরা? এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভুল পথে নিয়ে যাবে ক্রমশ।

কিছুদিনের মধ্যে আমার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে।  স্কুলে ভর্তি হবার পরে হয়ত কোনো ভুলের কারণে অথবা পড়া না পারার কারণে আমাকে বা তুবার মাকে স্কুলের শিক্ষিকারা ডেকে অপমান করবেন অথবা নোংরা প্রতিযোগিতার মানদন্ডে ফেলে তুবার মান যাচাই করা হবে। এসব ভেবে  শংকিত হই আমি। আমি জানিনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কবে আনন্দের হবে; আপনি জানেন কি? - সংগৃহীত

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com