হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫১ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-03-13 12:13:34 | প্রকাশক : Admin
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫১ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ এত এত ভাল স্যারদের আদর, শাসন আর আনকুল্য থাকার পরও তালগোল পাকিয়ে ফেললাম। মানে, ঠিক থাকতে পারলাম না। তাল হারিয়ে বেতাল হওয়া শুরু করলাম। নিজেকে ধরে রাখতে অনেকটাই ব্যর্থ হলাম। খুব ছোট বয়সে অভিভাবকহীন হলে যা হয়। নিজেকে ধরে রাখা যায় না। লাইনচ্যুত হতে হয়; নিশ্চিত বেলাইনে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। ক্লাশ নাইনে ওঠার পর আমিও বেলাইনে যেতে শুরু করলাম।

বলা নেই, কওয়া নেই; কোন এক শীতের সকালে এস এস সি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে ভেজাল বাঁধিয়ে দিলাম। বড় আবেগী অনুষ্ঠান। দুই ক্লাশের সিনিয়র ভাইবোন তারা। একেবারে বিদায় নেবেন। সারা স্কুলে বিদায়ী আমেজ। দুঃখমাখা কষ্টেভরা মিষ্টি রোদের মায়াবী পরিবেশ। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। মাইকে বাজছে বিদায়ী সংগীত। তখনকার সময়ে সারা বাংলা জুড়ে সব জায়গায় গাওয়া একই সংগীত; বিদায় দাওগো বন্ধু তোমরা এবার দাও বিদায়!

কিন্তু আমরা নাইনের এই নিষ্ঠুর শিক্ষার্থীরা বিদায় দিতে যাচ্ছি না। ভীষন জেদের মুডে আছি। ভাবখানা এমন করছি যেন যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কেন যাবো? এত বড় অনুষ্ঠান; এত্ত এত্ত আয়োজন! অথচ কোন কিছুতেই আমরা নেই! এটা একটা কথা হলো! আমরা নাইনের শিক্ষার্থী; আমরাই এসবের দাবীদার। মাতব্বরী বলতে যা আছে সব কেবল আমাদের এখ্তিয়ার। আমরাই সব করবো।

অবশ্য সব করা বলতে, একটা মাত্র মাইক ভাড়া করা আর ধলা বাজারের দোকান থেকে দুই ড্রাম ভর্তি গজা এবং রসগোল্লা কেনা। এটাই মূল; এর বাইরে আর কিচ্ছু না। মূখ্য বিষয় একটাই; রসগোল্লা কিনতে যেয়ে দোকানে বসে দু’চার পিস ফ্রিতে খাওয়া। খাওয়ার এই পরম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি কোনভাবেই মানতে পারছিলাম না। তাই ভাবতে দেরী; করতে দেরী হয়নি। সবাই মিলে ধর্মঘট আর বয়কট করে বসলাম।

স্যারদের এত সাধাসাধি, এত অনুরোধ। কে শোনে কার কথা। স্কুলের আঙিনা পেরিয়ে বাইরের মাঠে। স্যাররা যত এগিয়ে আসেন আমাদের কাছে, আমরা তত পিছিয়ে যাই; দূরে বহু দূরে। এক পর্যায়ে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বটতলায় চলে গেলাম। প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী আমরা। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে সবাইকে গোল করিয়ে একটা ভাষন দিয়ে ফেললাম; “বঞ্চিত ভাই ও বোনেরা আমার! আমাদের প্রতি এটা চরম অবহেলা! কোনমতেই এই বঞ্চিত হওয়া মেনে নেয়া যায় না; মেনে নেবো না।”

কার্তিক স্যারের পীড়াপীড়িতে শেষমেষ মেনে নিয়েছি। ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু       ডিসিপ্লিন্ড লাইফে আর ফিরে আসতে পারিনি। একদিন নিয়মের ব্যাঘাত ঘটিয়ে হুট করে ঢাকা চলে গেলাম। সাধারণত দুই ঈদের ছুটি ছাড়া বাবা মায়ের কাছে বেড়াতে যেতাম না। এবার নিয়ম ভাঙলাম। বলা যায় নিয়ম ভাঙার খেলায় আমি তখন মাতোয়ারা খেলোয়ার।

আগে ঢাকা আসলে প্রথম কাজই ছিল বাসার কাউকে না বলে গোপনে সিনেমা দেখা। এবার ভাবলাম শুধু সিনেমা দেখা নয়, কিভাবে সিনেমা বানায় তাও দেখবো। সোজা চলে এলাম এফডিসিতে। সেই পরিচিত মুছুয়া দারোয়ানের কড়া পাহারা; গেট দিয়ে ঢুকতে দেবে না। এই ব্যাটাকে ছবিতে আমি অনেক দেখেছি। চোখের সামনে চলচ্চিত্রের এই অভিনেতাকে দেখে আমি সেই রকমের রোমাঞ্চিত। এফডিসির দেয়াল জেলখানার মত উঁচু। তারপরও পেছনের দেয়াল অনেক কষ্টে বেয়ে বেয়ে টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ততক্ষণে শরীরে কাঁদা মেখে একাকার।

দুটো সিনেমার সেট পড়েছে এফডিসির লনে; দুটো ছবিতেই বাইরের লোক দরকার। একটিতে মারামারি, কাটাকাটি আর অন্যটিতে গানের জলসার দর্শক হয়ে আমাদেরকে থাকতে হবে। প্রথমে তো আমাদের সাংঘাতিক কদর। লুংগী কাছা দিয়ে সবাই হাতে মুলি বাঁশ নিলাম; মনের মধ্যে অভিনেতা অভিনেতা ভাব। কঠিন নির্দেশনা যেন শুটিং চলাকালীন ভুলেও ক্যামেরার দিকে না তাকাই।

তিনবারেও শট ওকে হলো না; তাই বিরতি। আমরা সবাই ক্ষুধার্থ; বেয়ারার দল বড়বড় সাইজের সিংগারা নিয়ে এলো। আমাদেরকে সামনে বসিয়ে জসিম, এটিএম শামছুজ্জামান সাহেবরা মুখ বড় বড় করে সিংগারা খাচ্ছে।

আমাদেরকে কেউ সিংগারা খেতে দিল না; তবে কষে গালি দিল। লেখার অযোগ্য বিশ্রী গালি দিয়ে বললো, এইহানে বইয়া, চাইয়া চাইয়া দেহস্ কী? যা ভাগ ফকিন্নি কোনহানকার!!!

ভাগি নাই, কাছাকাছিই ছিলাম। সিনেমার অভিনেতার ভাগতে নেই! আবার শুটিং শুরু হলো। টেলিসামাদ গানের সাথে মুখ নাড়াচ্ছে আর চকিদারের পোশাকে এটিএম শামছুজ্জামান ভীড়ের মাঝে সেটা চুপি চুপি দেখছে। আমি ঠিক তার পাশে দর্শক হিসেবে দাঁড়ানো। হঠাৎ ক্যামেরাম্যান বললো, কাট! আর চোখ বড় করে আমার দিকে একজনকে দেখিয়ে বললো, .... পুতেরে ঘাড়টা ধইরা বাইর কর! কইত্যে এইসব ক্ষেত ধইরা আনছোস্!!

এবার আর অভিনয়ে থাকা হলো না আমার। মোটামুটি সাইজের একটি ধমক আর সাথে ছোট সাইজের একটা টমক (মানে চটকানা) খেয়ে গেটের দিকে পা বাড়ালাম। গেটের কাছে এসে পড়লাম মহা বিপত্তিতে। মুছুয়া দারোয়ান বলে, আগে ক তুই ভিত্রে ঢুকলি কেম্নে! গেইট পাশ দেহা! পাস দেখাতে পারি নাই বলে দু’হাত দিয়ে দু’কান ধরে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখলো অনেকক্ষণ!!

কান ধরাটা এখানেই শেষ না। ঢাকা থেকে ফেরার পথে খুব ভোরে ঝটিকা এক্সপ্রেসে চড়েছি। উদ্দেশ্য গফরগাঁও যাবো। বিনা টিকিটের ট্রেনযাত্রী বলে এমনিতেই একটা চোর চোর ভাব মনের মধ্যে। সিট পেলেও কোথায়ও তেমন আরাম করে বসি না; আবার বসলেও তটস্থ থাকি কখন টিটি চলে আসে। তাই এদিক ওদিক তাকাই আর শুকনো গলায় ঢেকুর তুলি। অবশ্য অপরাধীদের গলা সব সময় এমনিতেই শুকনো থাকে। এভাবেই সব সময় বিনা ভাড়ায় এই রুটে যাওয়া আসা করি।

আজকে বিপদ হয়ে গেল। ট্রেন চলছে, হঠাৎ চোখের সামনে একটু দূরে টিটিবাবুকে দেখলাম।

বিপদ সন্নিকটে বুঝে আমি খুব কৌশলে সিট থেকে উঠে পড়লাম। ভাবখানা এমন যেন আমার টয়লেট চেপেছে। বগির একেবারে শেষ মাথায় যেয়ে টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভান করছি যেন ভিতর থেকে কেউ বের হলেই আমি ঢুকবো। আসলে ভেতরে কেউই নেই। আমি কিছুক্ষণ এমন করছি আর আড়চোখে টিটিকে দেখছি যেন তিনি আমায় না দেখেন।

টিটিও তেদর কম না; তিনিও আমায় আড়চোখে দেখছেন আর ভাব দেখাচ্ছেন যেন তিনি দেখছেন না আমায়। এরপরেও আমি টয়লেটের ভিতরে ঢুকছি না। এর পেছনে কারণ আছে। ঢুকে বসে থাকার মত জায়গা তো টয়লেট না। এক কঠিন জায়গা। কোনমতে ঢুকতে পারলেও কেবল মাথা নয়, সারা শরীর ঘোরে। তবে খারাপ বলবো না, ভেতর সব আছে; কেবল নেই নির্গমন পথের নীচে তলা বা ঢাকনা।

আপনি শরীর থেকে যা বের করবেন তা সরাসরি নীচে গিয়ে পড়বে। নীচে তাকানো যায় না। টয়লেটের পা’দানীতে পা দু’খানা রেখে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। না হলে মাথা ঘোরে। কেউ একজন শ্রীপুর থেকে বর্জ্য বের করা শুরু করলে শেষ হবে গফরগাঁয়ের আগে আগে। পানীয় বর্জ্য সারা পথ মাখতে মাখতে যাবে। কঠিন অবস্থা। ময়লা পরা এক জেলায় শুরু হয়ে শেষ হয় অন্য জেলায়। এভাবে জেলায় জেলায়, মানে বাংলাদেশের এক প্রান্তের মানুষের গায়ের ভাইরাস অন্যপ্রান্তে বিনাখরচে এবং বিনাশ্রমে ছড়াবার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো বাংলাদেশ রেলওয়ে।

এসব ভাবনা রেখে মনে মনে উপর ওয়ালাকে যপে যাচ্ছি আর ভাবছি পরের ষ্টেশন, মানে ইজ্জতপুর কখন আসবে। কী মুশকিল! আমার ইজ্জত যায় যায়, সারা শরীরে ঘাম আসে, কিন্তু ইজ্জতপুর ষ্টেশন আর আসে না! ষ্টেশন না আসলেও এক সময় টিটিবাবু আমার কাছে এসে পড়লেন। কিছুটা টিটকারী মেরে বললেন, ফার্স্ট কেলাশের প্যসেনজার সেকেন্ড কেলাশে কেন?

কোন উপায় নেই, পালাবার আর পথ নেই; একেবারে হাতে নাতে ধরা খেয়ে গেলাম! এ যাত্রায় কানে ধরলো না, তবে জরিমানা ধরলো ১৩ টাকা। আমার পকেটে আছে মোটে আট কি নয় টাকা। ব্যাটা একটা খবিশ; কিছুতেই মাফ করবে না। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। যা আছে তা তো নিলোই; বাকীটা না দিতে পারার কারণে টয়লেটে ভরে রাখলো ততক্ষণ, যতক্ষণ পরের ষ্টেশন না আসে! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com