অভূতপূর্ব জাগরণ বৈশাখে

প্রকাশের সময় : 2019-04-11 17:31:52 | প্রকাশক : Administration
অভূতপূর্ব জাগরণ বৈশাখে

মোরসালিন মিজানঃ রাজধানী শহর ঢাকা। এখানে জৌলুস বেশি। আভিজাত্যের খোঁজে অনেকেই হন্যে। প্রতিদিনের জীবন ও আচার ঠিক নিজের থাকছে না। নতুন প্রজন্ম ধার করা সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। এরপরও যন্ত্রনগরে পহেলা বৈশাখ আসে বিপুলভাবে। কেন? কারণ আর কিছু নয়, এ কথা জানাতে যে, আত্মভোলা নয় বাঙালী। দিন শেষে তারা শেকড়ের কাছেই ফিরতে চায়। বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে শহর ঘুরে বার বার বার্তাটির দেখা মেলে।

বাঙালী মন নিয়ে ঘর থেকে বের হতে থাকেন নারী-পুরুষ ও শিশুরা। দেশজ ভাবটি প্রথমেই দৃশ্যমান হয় পোশাকে। কেউ এদিন ভুল করেও ওয়েস্টার্ন সাজতে যায় না। পাকিস্তান থেকে আসা হাল ফ্যাশনের জামা হয়ে যায় লজ্জার কারণ! নারীরা দেশীয় কাপড়ের থ্রিপিস, তাঁতে বুনা শাড়ি পড়ে দিব্যি শহর ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ তো গ্রাম্য বালিকার মতো বাড়তি কুঁচি দেয়া জামা পড়ে। হাতভর্তি কাঁচের চুরিতে। চুলে রঙিন ফিতা। গলায় যে মালা, এখন গ্রামেও তা দেখা যায় না। গাঁয়ের মেয়েদের পোশাকে সাজে যে সারল্য থাকে, সেটিও নিজেদের মধ্যে ধারণ করে শহুরে বালিকারা।

দেখে সত্যি মন ভরে যায়। পুরুষের পোশাকেও বাড়াবাড়ি রকমের কিছু না। জিন্স টি-শার্ট ছেড়ে তারাও দেশীয় বাটিক-বুটিক হাউসের পোশাক পড়ে। সবারই গায়ে লাল সাদা পাঞ্জাবি। আরিফুর রহমান নামের এক চাকরিজীবী। গোটা পরিবার সঙ্গে নিয়ে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যান তিনি। পোশাক প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, ঢাকা শহরে আছি ৩০ বছরের মতো। ছাত্রজীবনে আসা। এখন চাকরি করি। স্ত্রী-সন্তান সংসার হয়েছে। তবু গ্রামে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। ওখানেই তো নাড়ি পোতা আসলে। তার মতে, মনে মনে শহরের অধিকাংশ মানুষই বাঙালী। পহেলা বৈশাখে সেটা দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে পোশাকে সবাই নিজের মনের ভাবটি প্রকাশ করেন। একই চিন্তা থেকে দেশীয় পোশাক পরেন বলে জানান তিনি।

গত বছরের নববর্ষের দিন। চারুকলার সামনের রাস্তায় যুবকদের দল। সবাই লুঙ্গি পরা কৃষক! কোমরে গামছা প্যাঁচানো। গায়ে হাফহাতা পাতলা সাদা গেঞ্জি। মাথায় বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশেষ সেই হ্যাট। গলায় মস্তবড় তাবিজ! একজনের সঙ্গে সামান্য কথার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ তো কৃষক। আমরা শহরে থাকি বটে, কৃষকেরই সন্তান। আজকের দিনে তাদের প্রতি সম্মান জানাতে, কৃতজ্ঞতা জানাতে আমাদের কৃষক সেজে আসা।

গ্রামের যেকোন উৎসবে একতারা, দুতারা, ঢোল ইত্যাদি থাকা চাই। লোকজ এসব বাদ্যযন্ত্রও সারাদিন বেজেছে। বিভিন্ন দলে ছিল একাধিক লোকজ বাদ্যযন্ত্র। উজ্জ্বল তরুণরা যে যার মতো করে বাজিয়েছেন। বাংলার লোককবি ও সাধকদের গানে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন তারা। বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই একটি বাঁশি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে গেছেন। কেউ একহাতে অবিরাম বাজিয়ে গেছেন বাউল মনের একতারাটি। কখনও সেই সুর কানে এসেছে। কখনও জনসমুদ্রের গর্জনে হারিয়েছে। তবু বেশ লেগেছে। গানের পাশাপাশি ছিল নাচও। লোকগানের সঙ্গে চমৎকার নেচেছেন শহরবাসী। ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে নেচে গেয়ে বরণ করেছে বৈশাখ।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলাও বসেছিল এখানে ওখানে। শুধু শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত জায়গার মেলা গুনে শেষ করা যাচ্ছিল না। শাহবাগ থেকে এলিফ্যান্ট রোডের দিকে যেতে যে রাস্তা, দুই ধারে বসেছিল হস্তশিল্প সামগ্রীর মেলা। বাঁশ ও বেতের তৈরি বর-কনে, পাখি, কাগজের ফুল, কাঠের খেলনাÑকী নেই! ছিল দেশীয় খাবার দাবার। বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, নারিকেলের নাড়ু, কদমা, বাতাসাসহ হরেক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন দোকানিরা।

লোকশিল্পের বিশেষ প্রকাশ বলা চলে বাংলা একাডেমির মেলাটিকে। একাডেমির সহায়তায় বিসিক এখানে দশ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। মেলায় মৃৎ শিল্প, তাঁত শিল্প, বাঁশ বেত শিল্পসহ হরেক রকমের পণ্যের পসরা।

এভাবে শহরজুড়েই গত বছর ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিদর্শন। যেদিকে চোখ গেছে, লোকশিল্পের নানা রূপ দৃশ্যমান হয়েছে। সমস্ত উৎসব অনুষ্ঠান থেকে শেকড়ে ফেরার তাগিদ দেয়া হয়েছে। সর্বোপরি, সর্ববৃহৎ অসাম্প্রদায়িক উৎসবে অংশ নিয়ে বাঙালীত্বের বিজয় ঘোষণা করেছে মানুষ। বাঙালীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি অনুগত থাকার আহ্বানে কেটেছে দিন। নিশ্চয়ই এ বছরও এর প্রভাব পড়বে।  - জনকণ্ঠ

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com