পরীক্ষা না থাকলে কী হয়?

প্রকাশের সময় : 2019-04-25 16:48:23 | প্রকাশক : Admin

মুহম্মদ জাফর ইকবাল: আমি জানি আমার এই লেখার শিরোনাম দেখে সবাই চমকে উঠবে। অনেকে ভাববে আমি মনে হয় পাগল হয়ে গেছি। যারা আমাকে চেনেন তারা ভাববেন এটি নিশ্চয়ই এক ধরনের কৌতুক কিংবা স্যাটায়ার। আমাদের লেখাপড়ার পুরো ব্যাপারটিই হচ্ছে পরীক্ষানির্ভর। সারা বছর ছেলেমেয়েরা পরীক্ষা দেয়, যে স্কুল যত ‘ভাল’ তাদের পরীক্ষা তত বেশি। বারো বছর লেখাপড়া করার সময় তারা একবার কিংবা দুইবার নয় চার চারবার পাবলিক পরীক্ষা দেয়।

স্কুলের লেখাপড়ার (কিংবা পরীক্ষার) ওপর অভিভাবকদের ভরসা নেই তাই তাদের ছেলেমেয়েদের কোচিংয়ে ঢুকিয়ে দেন, সেখানেও তারা পরীক্ষার পর পরীক্ষা দেয়। নানা নামে গাইড বই বিক্রি হয়। সেখানে প্রশ্ন এবং উত্তর লেখা থাকে, ছেলেমেয়েরা সেগুলো মুখস্থ করে পরীক্ষা দেবার জন্য। দেশের নামী-দামী পত্রিকা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আহাজারী করে কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন করে।

কিন্তু তারা নিজেরা নিয়মিত গাইড বই ছাপিয়ে যায়, ছেলেমেয়েরা যেন ঘরে বসে পরীক্ষা দিতে পারে।

দেশের অভিভাবকদের বেশির ভাগই মনে করেন লেখাপড়ার মানে হচ্ছে পরীক্ষা দেয়া। ভাল লেখাপড়া মানে পরীক্ষায় ভাল গ্রেড পাওয়া। কাজেই আমি যদি বলি ‘পরীক্ষা না থাকলে কী হয়’ তাহলে দেশের সকল মানুষ যদি আমাকে উন্মাদ ভাবেন তাহলে তাদের দোষ দেয়া যায় না। কিংবা তারা যদি মনে করেন আমি একটা রসিকতা করছি এবং এই লেখার মাঝে সেই রসিকতাটি খুঁজতে থাকেন তাহলেও তাদের মোটেও দোষ দেয়া যায় না।

আমি কিন্তু উন্মাদ হয়ে যাইনি কিংবা রসিকতা করার জন্য এই লেখাটি লিখছি না, আমি যথেষ্ট সিরিয়াসলি এটা বলছি। বর্তমান যে শিক্ষা নীতিটি আছে সেটি তৈরি করার জন্য যে কমিটি তৈরি করা হয়েছিল আমি তার একজন সদস্য ছিলাম এবং আমার স্পষ্ট মনে আছে আমরা সেখানে বলেছিলাম, প্রাইমারী স্কুলের প্রথম তিন বছর কোন পরীক্ষা থাকবে না।

আমরা যে খসড়াটি জমা দিয়েছিলাম তার অনেক পরিবর্তন করে সেটা পাস করানো হয়েছিল, কারণ আমরা মাত্র দুটি পাবলিক পরীক্ষার কথা বলেছিলাম কিন্তু এখন আমরা সবাই জানি এই দেশের বাচ্চাদের অনেক কষ্ট দিয়ে চারটি পাবলিক পরীক্ষা নেয়া হয়। কাজেই লেখাপড়ার প্রথম তিন বছর কোন পরীক্ষাই থাকবে না এই সিদ্ধান্তটি শিক্ষানীতিতে আদৌ আছে কিনা আমি জানি না। কিন্তু যেহেতু মনে করা হয় লেখাপড়া মানেই হচ্ছে পরীক্ষা কাজেই আমরা সবাই জানি এই দেশের একেবারে দুধের বাচ্চাটিকেও পরীক্ষা দিতে হয় এবং সেই পরীক্ষা একটু উনিশ বিশ হলে অভিভাবকরা বাচ্চাদের জীবনটিকে ওলটপালট করে ফেলেন।

কিন্তু অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি পৃথিবীর অনেক দেশে বাচ্চাদের জীবন থেকে পরীক্ষা নামক অভিশাপটি দূর করে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর কোন দেশে সবচেয়ে ভাল লেখাপড়া হয় জিজ্ঞেস করা হলে সাধারণত ফিনল্যান্ডের নামটি বলা হয়। সেই দেশের বাচ্চারা তাদের জীবনের প্রথম পরীক্ষাটি দেয় ষোলো বছর বয়সে। কোন পরীক্ষা না দিয়েই তারা যেটুকু শেখার কথা সেটুকু শিখে যাচ্ছে। তাহলে আমরা কেন আমাদের দেশের লেখাপড়া এবং পরীক্ষা সমার্থক করে ফেলেছি?

এ ব্যাপারে কিছুদিন আগে আমার একটি চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছে। একদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সে কোন একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনা করে। যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া জানেন তারা সবাই অনুমান করতে পারবেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি প্রায় হঠাৎ করে জানতে পারলাম সে পিতৃমাতৃহীন একজন পথশিশু হয়ে বড় হয়েছে। তার বয়স যখন তেরো কিংবা চৌদ্দ তখন তার হঠাৎ লেখাপড়া করার শখ হয়েছে। নিজে নিজে বর্ণ পরিচয় করে প্রথম ভর্তি হয়েছে অষ্টম শ্রেণীতে অর্থাৎ প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত তার কোন লেখাপড়া নেই। পড়াশোনায় যথেষ্ট মনোযোগী ছিল বলে সে স্কুল শেষ করে কলেজ এবং কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। শুধু তাই নয়, সে জীবনেও কোন কোচিং বা প্রাইভেট পড়েনি এবং পথে-ঘাটে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে বলে এখনও বালিশ ছাড়া ঘুমায়!

নিঃসন্দেহে এই ছেলেটি মোটেও আর দশজন সাধারণ ছেলেমেয়ের মতো নয় কিন্তু তার জীবন থেকে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি। একজন ছাত্র বা ছাত্রী যদি অষ্টম শ্রেণী থেকে তার লেখাপড়া শুরু করে সে যদি চায় তাহলে সে স্কুল কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করে দিতে পারবে। সেই থেকে আমি ভাবছি তাই যদি সত্যি হয় তাহলে কেন আমরা প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষার পর পরীক্ষা নিয়ে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জীবনটিকে বিষময় করে তুলি? কেন তাকে আনন্দময় একটা পরিবেশে বড় হতে দিই না, কোন চাপ না দিয়ে তাকে নিজের মতো করে পরবর্তী জীবনে লেখাপড়া করার জন্য প্রস্তুত হতে দিই না?

এমন নয় যে, এটি খুবই আজগুবি একটা কথা, পৃথিবীতে এই মুহূর্তে অনেক দেশে এমনটি করা হয়। পরীক্ষা নেই বলে সবাই ফাঁকি দিয়ে চূড়ান্ত একটি করে গবেট তৈরি হচ্ছে না, বরং উল্টো ব্যাপারটি ঘটছে। তাদের শৈশবটি হচ্ছে আনন্দময় এবং অন্য দেশের ছেলেমেয়েদের থেকে তারা ভাল শিখছে কারণ তারা শিখছে নিজের ইচ্ছায়, নিজের আনন্দে!

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com