হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫৫ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-05-09 19:19:10 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫৫ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বজলুল হক মাওলানা স্যারই সব ঠিক করে দিলেন। ঠিক হলো পুরো রোজার মাস মূসা স্যার অংকসহ বিজ্ঞানের সব সাবজেক্ট পড়াবেন। গ্রুপে নয়, আমায় একা পড়াবেন। ভর দূপুরে স্কুলে আসবেন আর পড়াবেন যতক্ষণ লাগে ঠিক ততক্ষণ। মূসা স্যার ধলা হাই স্কুলে যোগ দেয়া নতুন বিএসসি শিক্ষক। বয়সে তরুণ; একেবারে টগবগে তরুণ। আমার প্রাইমারীর কোব্বাত স্যারের বড় সন্তান। বাঘবেড় গ্রামের কোব্বাত স্যার।

স্যার রোজামুখে ছাতি মাথায় রোদ ডিঙিয়ে রোজ আমায় পড়াতে আসতেন। ভীষন গরমের রোজার মাস। তবুও কোনদিন বাদ গেছে বলে মনে পড়ে না। কঠিন নিয়ম আর অনুশাসনের মাঝে নিয়ে এলেন আমায়। অংক আর বিজ্ঞানের কঠিন কঠিন সূত্রগুলোকে সহজ ভাবে পরিস্কার করলেন আমাকে। স্যার বললেন, এখানে মুখস্তের ঝামেলা নেই। হিসেব আর যুক্তির সমীকরণ হলো বিজ্ঞান। একবার বুঝতে পারলে আর কঠিন থাকে না। কেবল বোঝার জায়গাটি ধরা জানতে হয়। আর থাকতে হয় নিয়মিত প্র্যাকটিস বা অনুশীলন।

অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করলো। সত্যি সত্যি সবকিছু সহজ হয়ে আসতে লাগলো। দূর্বোধ্য এলজ্যাবরা পানির মত সহজ মনে হলো। সহজ হয়ে এলো ঐচ্ছিক গণিতের উপপাদ্যের সমাধান। আর পদার্থ বিজ্ঞান! এতো পরম মজাদার রহস্যের এক পাহাড়। স্যার বোঝান; আমি বুঝি। আর একটু একটু রহস্য ভেদ করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠি। একদিন পড়াচ্ছিলেন “কাজ, ক্ষমতা আর শক্তি।” এখনো চোখের পর্দায় ভাসে। স্যারের শেখানো শক্তির নিত্যতার ব্যাখ্যা আমার আজীবন মনে থাকবে।

সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় ফিরে ইফতার করি। ঠান্ডা শরবত আর রকমরী আইটেমের ইফতার নয়। আবার ঘটা করে দলবেঁধে ইফতারও নয়। একা ঘরে একা মানুষের ইফতার। একেকদিন একেক রকমের ইফতার। খুব পছন্দ ছিল বুটমুড়ি দিয়ে ইফতারের। রাজকীয় এই আইটেমটি মাঝে মধ্যে জুটতো; প্রতিদিন নয়। এগুলো খেতে হলে আয়োজন করতে হয়। কে করবে এসব আয়োজন! তাই ভরসা ছিল শুকনা মুড়ি আর কাঁচা মরিচ। দুইটা লম্বা সাইজের কাঁচা মরিচ, একমুঠো লবন আর কড়কড়া মুড়ি চিবিয়ে দিনশেষে ইফতার করলেও মন্দ লাগতো না।

ক্লান্ত দেহে সামান্য বিশ্রাম না নিয়ে মাগরিব শেষ করেই পড়তে বসে যেতাম। খুব মন দিয়ে পড়তাম।

স্যারের দেয়া হোমওয়ার্ক শুরু করতাম। শেষ করতে পারতাম না। তারাবীহ্তে দৌঁড় দিতাম। ফিরে এসে আবার পড়া। মাথায় কেবল একটাই ভাবনা। ঘুরে দাঁড়াতে হবে। পড়তে পড়তে ক্লান্তি এসে ভর করে কখন ঘুম পাড়িয়ে দিত টের পেতাম না। এক সময় ধরমরিয়ে উঠতাম। সেহ্রীওয়ালাদের ডাকে না উঠে উপায় ছিল না।

ফজর পড়ে আবার পড়তে বসা। মুখস্ত বিষয়ক বিষয়গুলোর জন্যে ভোরের এই অন্ধকার ছিল আমার জন্যে সবচেয়ে চমৎকার সময়। সূর্য্য ওঠার আগে সব শেষ করতাম। যা পড়তাম, অনায়াসে তাই মুখস্ত হয়ে যেত। জোরে জোরে পড়তাম। সারা বাজার কাঁপিয়ে পড়তাম। কেবল আমি নই। ওই সময়ে ধলা বাজারে আমার মত অনেকেই ভোরের আলো ফোটবার অনেক আগেই বিছানা ছেড়ে পড়তে বসতো।

বিছানা হলো সবচেয়ে মজার জিনিস। পড়ার চাপ থাকলেই বিছানা বেশী বেশী কাছে ডাকে। টেবিলে আর বসে থাকতে ভাল লাগে না। কেবলই ঘুম পায়। যখন মায়ের কাছে ছিলাম তখন এটা খুব বেশী হতো। ইচ্ছে হতো একলাফে মায়ের কোলে ঝাপটে পরি। মায়ের কোল! কী যে আরাম। ঘুমানোর জন্যে পৃথিবীতে এরচেয়ে আরামের জায়গা আর নেই। আমার শোনিমও ব্যাপারটা খুব বোঝে। ঘুমুবার সময়ে বিছানায় তার মাকে চাইই চাই। পৃথিবীর সব ভুলে মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ খেলা না করে ঘুমুতে পারে না শোনিম।

কেবল আমার শোনিম নয়, কারো শোনিমই পারে না। মাকে ছাড়া কোন শোনিমই বড় হতে পারে না। আমিও বড় হয়েছি আমার মাকে নিয়েই। সারাদিন যেমন তেমন, সন্ধ্যের পর মাকে লাগবেই। সারা বিকেল বাইরে খেলা করে মাগরিবের আজানের পরপর ঘরে ফিরে গোধুলীলগ্নের আলোছায়ায় মাকে হন্যে হয়ে খুঁজতাম। এঘর ওঘর খুঁজে কোথায়ও পেলে শান্তি; না পেলে চাপাকান্নায় মা মা বলে ডাকতাম। হয়ত মা পাশের বাড়ীতে গেছেন, এই তো এখনই ফিরবেন; তবুও মেনে নিতে পারতাম না। কান্না চলতেই থাকতো।

অবস্থাটা এমন যে, ঘরে মা নেই তো কিচ্ছু নেই। চোখভর্তি জল ছাড়া কিচ্ছু নেই। মাকে ঘরে না পেলে চোখ ভরে ভরা বর্ষার জল নামতো। চারদিক মনে  হত আফছা অন্ধকার। নিজের হাতে হারিকেনের চিমনি মুছে পরিস্কার করে সন্ধ্যা বাতি জ্বালালেও ঘর অন্ধকার অন্ধকার লাগতো। ঘরে মা থাকলে আলো লাগতো না। মা নিজেই তো আলো। পূর্ণিমার ঝলমলে আলো! চাঁদের মত দেখতে মায়ের মুখভর্তি আলো, আর আঁচলতলায় ঘ্রাণ। সে-কী ঘ্রাণ। সেই স্পেশাল ঘ্রাণের আঁচলে জড়িয়ে অন্ধকারে বসে থাকলেও রাজ্যের শান্তি। শান্তি আর শান্তি!

বেশী শান্তি মাঘ মাসের রাতে জড়াজড়ি করে একসাথে ঘুমুতে। ছোট বেলায় গ্রামের ঘরে কনকনে শীতের বন্যা হতো। ঘর ভাঙা ছিল না, তবে জানালা দরজার ফাঁক গলে সহজেই শীত ঘরে ঢুকে পড়তো। তাই শীত অনুভূত হতো বেশী। আমরা রাত ন’টার মাঝেই খেয়েদেয়ে বিছানায় যেতাম। উত্তরণ নামে রেডিওতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হতো। বিছানায় যেতাম শুয়ে শুয়ে উত্তরণ শোনার জন্যে। মা বিছানায় আসতো আরো পরে। সব গুছগাছ শেষে বিছানায় আসতো। দিনের বেলায় রোদে ছড়ানো ঝরঝরে গরম লেপের নীচে মাকে পেয়েই জড়িয়ে ধরে তার শাড়ী এবং শরীরের ঘ্রাণ নিতাম। পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতাম।

মায়ের কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল। কোন সমস্যা ছিল না। সমস্যা হতো পরে। দু’চোখ বুঁজে ঘুমিয়ে যাবার পরে ভেজালটা লাগতো। ঘন্টা দুয়েক ঘুমের পরে মূল সমস্যার উৎপত্তি হতো। আম্মার কড়া নির্দেশে ঘুমুতে যাবার  আগে বাথরুম করতাম। বাইরে গিয়ে বাথরুম সেরে বিছানায় এলেও কাজ হতো না। রাত বারোটার আগেই ঘুমের ঘোরে একদফা বিছানায় করে ফেলতাম। প্রথমে নিজের হাফপ্যান্ট, পরে বিছানা; শেষমেষ মায়ের গায়ের শাড়ী। সব ভিজিয়ে একাকার করে ফেলতাম।

গা ভেঁজা টের পেলে মায়ের ঘুম ভাঙতো। লাফিয়ে উঠে আমাকে ঠেলে সরিয়ে নিজ হাতে ঠুসঠাস দূ’ঘা পিঠে বসিয়ে দিতেন বটে। তবে একই হাতে সব পরিস্কারও করতেন। শীতের রাতে লেপ ভিজে গেলে কী যে দূরবস্থা হয়, তা ভূক্তভোগীরাই জানে। আমি ভেজা লেপের পাশে চুপ করে বসে থেকে চোখ পিটপিট করে চোরের মত এদিক ওদিক তাকাতাম। মা বকবক করতেন আর টেনেটুনে আমার প্যান্ট পাল্টে দিতেন। ভেজা তোষকের উপর ছোট্ট কাঁথা বিছিয়ে দিয়ে আবার ঘুম পাড়াতেন। শরম লজ্জার মাথা খেয়ে এই আমি ঘুমাতাম। মায়ের কোলের মধ্যে ঢুকে পড়ে গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়তাম। দ্বিতীয় দফা ভেজাবার আগ পর্যন্ত শান্তি মতই ঘুমাতাম।

প্রায় আট বছর আগে মাকে হারিয়ে আমি আজো তাঁর সেই হাসিমাখা মুখখানি খুঁজে বেড়াই। মাকে খুঁজে বেড়াই ঘরে ঝুলানো মায়ের ছবিতে, মায়ের হাজারো স্মৃতিতে। খুঁজে বেড়াই আমার শোনিমের মুখাবয়বে, শোনিমের গায়ের গন্ধে। আমি এখনো অনুভব করি রাতজাগা মা আমার সারা ঘরময় হেঁটে বেড়ান। পড়ার ঘরে উঁকি দিয়ে আমার খবর জানতে চান। এখনো বিশ্বাস করি মা আমার চলে যাননি! মা চলে যেতে পারেন না!

এমন হাসিমাখা সুন্দর মুখটি আমাকে ফেলে কেমন করে চলে যাবেন! বৃষ্টিভেজা মাটিতে শেষ বারের মত শুইয়ে দেবার সময়ও দেখেছি মা আমার হাসছেন। গভীর ঘুমে নিমজ্জিত মা আমার ঘুম চোখেই হাসছেন। এখনও কবর ধারে গেলেই মনে হয়, মা দেখছেন আমায়। সালাম দেবার পরে দিব্বি শুনতে পাই, সেই হাসিমাখা চোখে, হাসিমাখা মুখেই তিনি জবাব দিচ্ছেন। সারা পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যে মুখ আমি কোথাও পাইনা! জ্যোৎস্নার ভরা চাঁদেও পাই না। অগত্যা এদিকওদিক করে জল ছলছল চোখে আমি বিড়বিড় করি। বিড়বিড় করেই চাঁদকে বলি, তুমি সুন্দর নও; তুমি মিষ্টি নও, আমার মায়ের মত!! মা যে আমার সবার সেরা, অনন্তকাল অবিরত!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com