হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫৬ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-05-23 19:53:58 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫৬ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ অনন্তকাল অবিরত আমার সেই সেরা মায়ের সেরা দোয়া আর মহান রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে পরীক্ষায় মহা ভাল ফল করলাম। রোজার পুরো মাসব্যাপী করা মূসা স্যারের পরিশ্রম সার্থক হলো। বজলুল হক স্যার তো মহা খুশী। তিনি বলেছিলেন, “শুধু প্রথম হলেই চলবে না। ২য় যে হবে তার চেয়ে তোকে কমছে কম ৩০ নম্বর বেশী পাওয়া লাগবে। গড়ে প্রতি সাবজেক্টে ৩ নম্বর করে বেশী। এইডা একটা বিষয় হইলো! সারা খাতা জুড়ে হাতের লেখা সমভাবে সুন্দর হলে এমনিতেই গড়ে ৫% বেশী মার্কস আসে।”

খাতাগুলো কতটা সুন্দর করে লিখেছিলাম বা লিখতে পেরেছিলাম, ঠিক মনে নেই। তবে এখনো পরিষ্কার মনে আছে, মল্লিকার পাওয়া টোটাল নাম্বারের চেয়ে ২৯ বেশী পেয়ে আবার প্রথম হয়েছিলাম। আর পেরেছিলাম বজলুল হক স্যারকে খুশী করতে। প্রচন্ড খুশী। টিচার রুমে ডেকে কোলের কাছে নিয়ে  স্যারের সে কী আদর! সাদা ধবধবে পাঞ্জাবী পড়া লম্বা মানুষটির একেবারে গায়ের কাছে মিশে পাওয়া আদর। স্যার কানে কানে বললেন, বাসায় আসিস্। শেমাই আছে; হাতে বানানো শেমাই পিডা। 

ধলা বাজারে তাঁর নিজের বাসায় মাত্র কিছুদিনের জন্যে ফ্যামিলি নিয়ে থেকেছিলেন। পেছনে সরকারী পুকুর লাগোয়া মনোয়ার হোমিও হলের পশ্চিম পাশের বাসাটাই বজলু স্যারের বাসা। বছরখানেক থেকেছিলেন স্যার। আর এই বছরখানেক সময়টাই ছিল আমার শেমাই খাওয়ার সময়। শুধু শেমাই নয়। বাসায় ভালমন্দ একটু রান্না হলেই আমার ডাক পড়তো। বিশেষ করে কালিজিরা চালের পোলাও আর মুরগীর ঝোল! জুইন দিয়ে রান্না করা কঠিন মজার ঝোল!!

তবে সমস্যাও ছিল। সমস্যা ছিল ভিন্ন জায়গায়। মাগরেবের আগে আগে তাঁর বাসায় পৌঁছা লাগতো। আপাত সহজ শর্ত কিন্তু জটিল তার বাস্তবায়ন! কিচ্ছু করার নেই! মাওলানা সাহেবের কড়া আদেশ। নড়চড় হবার উপায় নেই। বেতাল হলেই কানমলা। দুই হাত দিয়ে দুই কান ধরে একসাথে কঠিন মলা। মলা মানে, ডলা; রাম ডলা। ডলার চোটে শেমাইয়ের নাম ভুলিয়ে দেয়া। বাসায় ঢোকার সাথে সাথেই সোজা পেছনে পুকুরের ঘাটে। বাঁশের বেড়ায় চারপাশ ঢাকা ঘাট। ওখানে হাতমুখ ধোয়া, পারফেক্টলি ওজু করা; এরপর নামাজ।

স্যারের সাথে জামাতে মাগরেবের নামাজ। বিষয়টি এমন নয় যে, ওজু করলাম আর নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। কোনমতে তিন রাকাত ফরজ পড়ে তরতর করে আরো দুই রাকাত সুন্নত শেষ করে উঠে পড়লাম। এটা হবার জোঁ নেই একেবারেই। উঠোন কোণে দাঁড়িয়ে দুইকানে দুইহাত রেখে চমৎকার সুরে প্রথমে আজান দিতে হবে। ভুল হলে রক্ষে নেই। স্যারের কান পাতা। তারপর পশ্চিম আকাশপানে চারহাত পেতে দু’জনার মোনাজাত। আকুল মোনাজাত। মোনাজাতে স্যার বলতে বাদ দিতেন না কিছুই। আমার মাথায় থাকতো শুধুই হাতে বানানো শেমাই।

মাথায় তো আরো কত কিছুই থাকতো। কেবল থাকতো না ইতিমধ্যেই আমাকে নিয়ে শুরু হয়ে যাওয়া গভীর ষড়যন্ত্রের কথা। ষড়যন্ত্রের পুরোটাই স্কুলকেন্দ্রিক। কবুতর জোড়ার মত জোড়া শিক্ষক দু’জন এই ষড়যন্ত্রের হোতা। তাঁদের ষড়যন্ত্র মূলত আমাকে নিয়ে নয়। তাদের টার্গেটও আমি না। টার্গেট হেডমাষ্টার তৈয়ব স্যার। টার্গেট ঘায়েল করার জন্যে আমাকে অবজেক্ট বানিয়েছেন মাত্র।

হেড স্যার আমাকে দিয়ে ভাল রেজাল্ট করাবেন বলে জোর করে ঢাকা থেকে ফেরত এনেছেন। তিনি সফল হলে ষড়যন্ত্র সফল হবে না। তাই, আমাকে ডুবাতে পারলে হেড স্যারও ডোবেন। লক্ষ্য একটাই; হেড স্যারকে ডোবানো। কোন না কোন ভাবে তৈয়ব স্যারকে অপদস্ত করে স্কুল ছাড়া করা। স্কুলের পুরো কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করার জন্যে এর কোনো বিকল্পও ছিল না। এলাকার মাতব্বর হয়ে স্কুলে মাতব্বরী করা যাবে না; মাতব্বরী করবে ভিনদেশী হেডমাষ্টার! এটা ইজ্জতের প্রশ্ন।

তারা বেশ জোড়েসোরেই নামলেন। তৈয়ব স্যারের সব কাজেই বাঁধা দিতে লাগলেন। স্যারকে যারা পছন্দ করে, এক এক করে তাদের সবাইকে একঘরে করতে লাগলেন। শুরু করলেন স্যারের পায়ে পা দিয়ে লাগালাগি করা। স্কুলে দলবাজি বা গ্র“পিং করা। বেশ ভালভাবেই শুরু করলেন। মনে চাইলে স্কুলে আসবেন, ক্লাশ নেবেন। মনে না চাইলে নেবেন না। কিন্তু কিচ্ছু বলা যাবে না তাদের। বললেই তৈয়্যইব্বা খারাপ। তৈয়্যইব্বার গোষ্টিশুদ্ধ খারাপ।

একজন সম্মানী মানুষকে বিকৃত নামে ডাকলে তাঁর যে অসম্মান হয় সেটা তারা বুঝেও ডাকতেন। দাঁত  ভেঙচিয়ে ডাকতেন। ইচ্ছে করেই ডাকতেন। ধলা বাজারে কোন না কোন দোকানে বসে ইচ্ছেমত মুখ বাঁকিয়ে গালিগালাজ করতেন। চায়ের পর চা খেতেন আর গালিগালাজ করতেন। এবং বিকৃত নামটি শিক্ষার্থীদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। মুখ ভেঙচিয়ে করতেন। শুধু হেড স্যার নয়, তাদের জ্বালায় ভাল ভাল শিক্ষকও ধলা ছেড়ে একজন একজন করে ঢাকামুখী হবার চেষ্টা করতে লাগলেন। প্রথম চেষ্টায় সফল হলেন শফিকুল বিএসসি স্যার। প্রথমে তিনি গেলেন, পরে আকতার স্যার। গেলেন জামাল মাওলানা স্যারও। অসম্ভব মিতভাষী জামাল মাওলানা স্যার। জব্বার স্যারও বাদ থাকেননি; গিয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকায় মন টেকেনি বলে এক সময় আবারও ফিরে আসেন। ফিরে আসতে বাধ্য হন।

হেডমাস্টার আনম তৈয়ব উদ্দিন স্যারও জনমের তরে স্কুল ছাড়ার আগ পর্যন্ত ইচ্ছের বিরুদ্ধে অনেক কিছু মানতে বাধ্য হন। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে বিজ্ঞান, বানিজ্য এবং মানবিক শাখাকে এক করে সম্মিলিত মেধা তালিকা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। জোড়া শিক্ষক দু’জনই বাধ্য করেন। প্রতিটি  শাখার বিষয় বস্তুর ৬০%ই আলদা। আবার মার্কিং এ অটোমেটিক্যালি অনেক বেশী নাম্বার আসে বিজ্ঞান শাখায়। এদের সবাইকে নিয়ে মেধা তালিকা সম্মিলিত হয় কিভাবে? প্রশ্নটা বার বার আসলেও ক্ষমতাধরদের সামনে চুপসে যায়।

ক্ষমতাধররা ব্যস্ত তখন তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। তারা আগাচ্ছেন বানিজ্য শাখার আমাদের ক্লাশেরই যথেষ্ঠ মেধাবী একজনকে নিয়ে। খাতায় যাই লিখে, দশে দশ পেয়ে যায়। বোর্ডের পরীক্ষায় যেখানে সর্বোচ্চ সাত পাবার কথা নয়, সেখানেও দশ পায়। মাঠে গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়, শাহীন নয়; এই ছেলেটি বোর্ডে স্ট্যান্ড করবে। না করে উপায়ই বা কি। হাতের লেখাও তো সুন্দর। গোটা গোটা পরিস্কার অক্ষর। ভারী সুন্দর। 

এতসব ষড়যন্ত্রে বিজ্ঞানের স্যারদের মাথা ব্যথা নেই মোটেও। তাঁরা সবাই আমার পারফরমেন্সে খুশি। বার্ষিক পরীক্ষার খাতার মুল্যায়নেও কাঙ্খিত রকমের খুশি। খুবই খুশি। আমি যে ঘুরে দাঁড়িয়েছি; কিংবা প্রথম সাময়িক পরীক্ষার মত আর নষ্ট হয়ে যাইনি এতেই খুশি। খুশি আমিও। মনে কোন ধুক ধুক নেই। চিন্তাহীন মনেই সকাল সকাল স্কুলে গেলাম রেজাল্ট দিবে বলে।

রেজাল্ট আর দেয় না। কিছুক্ষণ পরপর দফতরী মইজ উদ্দিন ভাই হালকা পাতলা ইশারা দেয়। ভিতর থেকে বাইরে এসে ইশারা দেয়। তেমন কিছুই বলে না। শুধু বলে, প্যাঁচ লাগছে; প্যাঁচ। ভিতরে সব স্যাররা। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই কী হচ্ছে আসলে। আমরা তেমন চিন্তিত না। প্যাঁচ লাগলেই কি, আর খুললেই বা কি! ডিসেম্বরের শীতে স্কুল কম্পাউন্ডে সময় কাটাচ্ছি ভলিবল খেলে। নতুন নেটে নতুন বল। ছেলেমেয়ে সবার নজর ভলিবলের দিকে।

একদিন পিছিয়ে গেল ফলাফল প্রকাশ। পরদিন বিকেলের আগে আগে প্রকাশ হলো। হেডস্যার ভীষন রেগে গেছেন। রাগ করে ক্লাশে ক্লাশে যেয়ে ফলাফল ঘোষনা বাতিল করেছেন। সব ফলাফল নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দিয়েছেন মইজ উদ্দিন ভাই। সিক্স থেকে টানানো শুরু। এভাবে সেভেন, এইট করে নাইন। আমরা হুমরে পড়লাম। দিনশেষে হাঁসের দল কুড়ামাখা খাবার পেলে যেভাবে হুমরি খেয়ে পড়ে, ঠিক সেভাবে।

জীবনে প্রথম এই আমি বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হতে পারলাম না। প্রায় সবগুলো পেপারে যথেষ্ঠ ভাল নম্বর পেয়েও পারলাম না। সর্বমোট ৬৮১ পেয়েও হেরে গেলাম। ৬৮২ পেয়ে প্রথম হলো বানিজ্য শাখার উদীয়মান বন্ধুটি। বিজ্ঞানে প্রথম হলেও সম্মিলিত তালিকায় আমি দ্বিতীয় হলাম। বলা যায় স্তব্দ হয়ে গেলাম। কার্তিক স্যার একটু দূরে ডেকে নিয়ে বললেন, মুখটা ভোঁতা করে রেখেছিস ক্যান্? আমরা তোকে একটুও কম দেইনি। কিন্তু ওরা তাকে পাওনার চেয়েও অনেক বেশী দিয়েছে। ওরা ছেলেটার সর্বনাশ করেছে।

রাতে মইজ উদ্দিন ভাই ডেকে নিলেন হেডস্যারের বাসায়। স্যার বারান্দায় বসা। অন্ধকারে মুখটা ভাল করে দেখাও যায়না। স্যার বসতেও বললেন না আমায়। বলতে চাওয়া কথা কয়টা একটানে বলে ভিতরে চলে গেলেন; “সমাজের প্রভাবশালীরা যখন স্কুলেও প্রভাব খাটায়, জোর দেখায়; তখন স্কুল আর স্কুল থাকে না। খেয়াঘাট হয়ে যায়। ধলা স্কুলও খেয়াঘাট হবার পথে। আমি ঠেকাতে পারলামনা রে সরদার! স্কুলের পতনটা আর ঠেকাতে পারলাম না!!” চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com