হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫৭ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-06-13 17:58:53 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৫৭ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ধলা হাইস্কুলের পতনটা আর ঠেকাতে পারলাম না বলে ভীষন কষ্ট প্রকাশ করেছিলেন হেড মাস্টার আনম তৈয়ব স্যার সেই ১৯৮০ সালে। স্যার সত্যি সত্যি পতন ঠেকাতে পারেননি। পতন ঠেকাবার জন্যে যারপরনাই চেষ্টা করেও পারেননি। পারবার কথাও না। কারণ এই ঠেকাবার কাজে পাশে তিনি কাউকেই পাননি। আর শুধু তৈয়ব স্যার কেন? পরবর্তীতে অন্য কেউও পারেনি। অবশ্য অন্য কেউ পারবার চেষ্টা করেছে বলেও শুনিনি। সবাই শুধু দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখেছে আর বিড়বিড় করেছে। বিড়ালের মত বিড়বিড় করে মিউমিউ করার চেষ্টা করেছে।

আমি অবশ্য অতটুকুও করিনি। অতটুকুন বয়সে মিউমিউ করার সাহসও ছিল না। পরবর্তীতে বয়সকালে সাহস হলেও তৈয়ব সারের মতই ভিনদেশী বলে সামান্যটুকুন মিউমিউ করার উপায়ও ছিল না। ছিলাম দেশবিদেশের নানা সীমানায়। স্কুলটির খবর রাখারও সুযোগ ছিল না। সুযোগ খুঁজবোই বা কখন? নিজের খবর রাখতে রাখতেই তো জীবন শেষ। কিন্তু ভুলে যাইনি; অপেক্ষায় ছিলাম। বলা যায় সুযোগের অপেক্ষায়। ঠিক ৩৩ বছর পরে যেদিনই সুযোগটি পেয়েছি, একটুও বসে থাকিনি। কাজে লাগিয়েছি। কোমরে গামছা বেঁধে লাগিয়েছি। গামছা কোমরে বেঁধেছি; বেঁধেছি মাথায়। স্কুলটিকে একটানে কলেজে উন্নীত করে দিয়েছি ২০১৩ সালে।

২০১২ তে কলেজ শাখার ক্লাশ শুরু করে ২০১৩ তেই অনুমোদন বের করেছি। কারো কিছু বোঝার আগেই করেছি। বুঝলে সমস্যা ছিল। আবার মিউমিউ শুরু হতো। বাঁধাবিপত্তির পাঁয়তারা করতো। তবে হালকা পাতলা বাঁধা এবং অসহযোগীতা যে পাইনি সেটাও নয়। পেয়েছিলাম। মূল অসহযোগীতা পেয়েছিলাম মূল ব্যক্তির কাছ থেকেই। মানে একাডেমিক প্রধানের কাছ থেকে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল হলেন প্রধান শিক্ষক। তিনি সহযোগীতায় ঢিলেমীপনা দেখালে কাঙ্খিত লক্ষ্য হাসিল করতে বেগ পেতে হয়।

আমারও হয়েছিল। যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক মহোদয় কেবল ঝিমুতেন। এমনিতে সতেজ এবং তরতাজা মুসা স্যার। কিন্তু প্রসঙ্গটা আসলেই ঝিমুতেন। এই সেই বলে গাইগুই করতেন। করি, করছি বলে কেবলই সময় ক্ষেপন করতেন। আর বেশী চেপে ধরলে “আজকে শরীলডা খুবই খারাপ। কেমুন কেমুন জানি লাগতেছে” বলে বেঁকে বসতেন। এতে বিপদ হতো। খুব টেকনিক্যালি সে সব বিপদ মোকাবেলা করেছি। রণে ভঙ্গ দেইনি। দিলে আজকের ধলা স্কুল এন্ড কলেজের জন্ম হতো না।

কোনভাবেই হতো না। তবে জন্ম না হলে ভালই হতো। ইংরেজীতে কলেজ বানানটাও ঠিকমত করতে না পারা মানুষগুলোর কলেজের গভর্নিং বডির নেতৃত্বে ঢোকার জন্যে এত দৌঁড়ঝাপ দেয়া লাগতো না। রাতদিন গোপনেগাপনে এত পুনুর পুনুর করা লাগতো না। লাগতো না হাইকোর্ট সুপ্রীম কোর্টের বারান্দায় দৌঁড়াদৌঁড়ি করাও। এসব দেখে কেবলই দুঃখ লাগে। দুঃখ এই কারণে লাগে যে, গভর্নিং বডিতে ঢোকার জন্যে যারা এত চেষ্টা করেন, একটিবারও কলেজটিকে ভাল করে চালাবার চেষ্টা তারা করেন না। করার লক্ষণও তারা দেখান না।

আমাদের আমলে দায়িত্বশীলরা সেটা করতেন। গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি নামে কোন ব্যবস্থাপনা পরিষদ আদৌ ছিল কিনা মনে পড়ে না। হয়ত ছিল; হয়ত ছিল না। কিন্তু যারাই ছিলেন তাঁরা মার্জিত রুচীর দায়িত্ববান মানুষ ছিলেন। আজকে হারানো শৈশব কুড়াতে যেয়ে কত অপ্রয়োজনীয় কথা, অপ্রয়োজনীয় ঘটনাও মনের পর্দায় ভেসে উঠে। অথচ শত চেষ্টা করেও আমার পাঁচ বছরের হাইস্কুল জীবনের একজন সদস্য কিংবা সভাপতির নামও আমি মনে করতে পারছি না।

মনে পড়ছে না এই কারণে যে হেডস্যার না ডাকলে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া পরিষদের লোকজন পারতপক্ষে স্কুলে আসতেন না। আসার দরকার পড়তো না। তাঁরা সবাই আলংকারীক পদে থেকে স্কুলের সেবা করতেন। শুধু সেবা। প্রকৃত শিক্ষানুরাগীর মত সেবা। মূল্যবান পরামর্শ দিতেন। কথায় কথায় স্কুল আঙিনা কাঁপিয়ে বেড়াতেন না। তাই তাঁদের কথা মনেও পড়ে না। মনের পর্দায় কেবলই ভাসে আমার সব শিক্ষকদের কথা। তাদের আদর, স্নেহ, শাসন আর ভালবাসার কথা।

এত্ত সব কথার মাঝে কার কথা রেখে কার কথা বলবো! সবাই একই রকমের মানুষ ছিলেন না। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে প্রত্যেকের ভেতর কমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা তাঁদেরকে আমাদের কাছে অমর করে রেখেছে। তাঁদের অধিকাংশই আজ দুনিয়াতে নেই। কিন্তু যে দু’একজন আজও আছেন তাঁরাও প্রচন্ড শ্রদ্ধার আসনেই আছেন। আর আছে তাঁদের সব স্মৃতিসমূহ অমলিন হয়ে। কত স্মৃতি, কত কথা!

কথায় কথায় হিউমার করতে পারতেন কার্তিক স্যার। মারাত্মক হিউমার। পড়ার মাঝখানেই মজার মজার জোকস্ শোনাতেন। পড়ার সংগে সম্পর্কিতই ছিল সে সব জোকস্। কখনো অপ্রাসংগিক মনে হয়নি।  শুনে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়তাম। স্যার হাসতেন কম, হাসাতেন বেশী। কিন্তু চোরা হাসিটা লুকাতে পারতেন না। ঠোঁটের কোণে বের হয়েই আসতো। অসম্ভব ট্যালেন্টদের এমনই হয়। 

ট্যালেন্ট বলেই সব সময় আলাদা কিছু করে তাক লাগিয়ে দিতেন। এসব কাজে লাগাতেন তাঁরই শিক্ষার্থীদের। ক্লাস টেন এ ওঠার পরপরই বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান। যেমন খুশী তেমন সাজো তে আমাকে বিজ্ঞানী বানিয়ে মাঠে নামিয়ে দিলেন। সে এক হুলস্থুল কান্ড। পুরো প্ল্যানটি তাঁর; মহাবিজ্ঞানী আমি একটি রোবট বানিয়ে রিক্সায় বসিয়ে মাঠটি চক্কর দিয়ে প্যান্ডেলে ঢুকলাম। ওখানে বসে আছেন প্রধান অতিথি সহ সকল আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।

রোবটটিতে নানা ধরনের সুইচ বসানো। একটি জ্ঞানের, একটি ধ্যানের, একটি ধর্মের; এমন করে আরো কত্ত সব। রোবটের কথাগুলো স্যার সাজিয়ে দিয়েছিলেন ছন্দে ছন্দে। রোবটটি বানিয়েছি সহপাঠী শিবানী কালামকে দিয়ে। কালামের সারা গায়ে মাটি মেখে রোবট সাজিয়েছি আর পেটে এঁকে রেখেছি সুইচ সমূহ। ও ঠিকঠাক মতই সবকিছু করে যাচ্ছিল। আমি একেকটি সুইচ টিপ দেই আর রোবট কথা বলে উঠে। সব জ্ঞানের কথা।

তবে সমস্যা হলো শীতের সকালে ওর পেশাবের বেগ নিয়ে। সারা গায়ে কাঁদা মেখে ওকে বসিয়ে রেখিছি সাত সকালে। কাঁপতে কাঁপতে কালামের শরীর জড়োসড়ো হয়ে গেছে। কথা যাই শিখিয়ে দেই, বলার সময় জড়িয়ে যায়। দাঁতে দাঁত লেগে কথা আটকে যায়। তেমন বেরুতে পারে না। তবুও প্যান্ডেলে ঢোকার পর কালাম পারফর্ম করছিল বেশ ভালই। একবার সুইচ টিপলাম; বলার কথা, খাল কাটা হলে সারা; দূর হবে বন্যা খরা! কিন্তু কালাম বলে উঠলো, বেশী দিলে পেটে গুতা, শুরু হবে শুধু মুতা!!

এই হলো আমাদের কার্তিক স্যার। না হলে কি আর এমনি রসবোধ থাকে তার সৃষ্টিতে! এমনি মজার পরিবেশ আর মজার স্যারের সান্নিধ্য ছেড়ে চলে আসতে মন চায়নি; তবুও চলে আসতে হয়েছে। এসএসসি পাশ করে চলে আসার বছর দুই পরেই স্যার ব্যাংকার হয়ে কৃষিব্যাংকে যোগ দিলেন। স্যারের প্রতিভার মূল্যায়ন হলো; কিন্তু অপূরণীয় ক্ষতি হলো স্কুলের। এলাকার নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত হলো তাঁর মত প্রচন্ড প্রতিভাবান শিক্ষকের সান্নিধ্য থেকে। আজ তাঁর মত একজন মানুষের নেতৃত্ব আমাদের এই বিদ্যালয়টি হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে।

দুই ছেলে, এক মেয়ে আর ওদের মাকে নিয়ে স্যারের সুখের সংসার। ব্যাংক থেকে অবসর নিয়েছেন ক’বছর হলো। বৌদি আর সন্তানেরা ভেবেছিল এবার তাঁরা মানুষটিকে বেশী করে পাবে। কিন্তু তিনি তো ঘরে থাকার মানুষ নন। ময়মনসিংহ শহরের শিল্পসংস্কৃতি, আর নাট্যচর্চায় স্যারের সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। সন্ধ্যে হলেই তাঁকে আর পায় কে! শহরের কোথায়ও না পাওয়া গেলেও রিহার্সালে ঠিকই পাওয়া যায়। সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকারে তিনি নাট্য আন্দোলন করেন। সমাজকে অবিরত সচেতন করে চলছেন দিনের পর দিন।

একবার ঠিক করলাম স্যারকে নিয়ে একটা লেখা লিখবো। লেখাটা শুরুর আগে ফোন দিয়ে অনুমতি চাইলাম; স্যার হ্যাঁ বলেন না। আমিও নাছোড়বান্দা। অবশেষে আধা সম্মতি দিলেন কেবল এইটুকু বলে, কিন্তু দেইখ্যো; বেশী লেইখ্যো না!! আমি বেশী লিখিনি। লিখতে পারিনি। সামান্য একটু জায়গায় চাইলেও কি বেশী লেখা যায়? কার্তিক স্যারের মত একজন পাহাড়সম পন্ডিত ব্যক্তিকে নিয়ে লিখতে গেলে বড়সড় সাইজের একখানা বই লেখা দরকার; দরকার একজন ভাল লেখকেরও। যে কি না চমৎকার করে গুছিয়ে বড় চমৎকার ব্যাখা দিতে পারবে আমার চারণ দুটির; শত্রু তুমি, বন্ধু তুমি; তুমিই শিক্ষা গুরু/জীবন প্রাতে প্রেরণা পাওয়া তোমার কাছেই শুরু!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com