ধাঁধায় পড়ে মাঝে মধ্যে এমনি এমনি হাসি! বোঝা কঠিন কোন কাজটির গুরুত্বটা বেশী!!

প্রকাশের সময় : 2019-06-26 20:18:57 | প্রকাশক : Administration
ধাঁধায় পড়ে মাঝে মধ্যে এমনি এমনি হাসি!  বোঝা কঠিন কোন কাজটির গুরুত্বটা বেশী!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ গেল সংখ্যায় ঈদ নিয়ে লিখেছিলাম। অবশ্য ঠিক ঈদ নয়; ঈদের কোলাকুলি নিয়ে লিখেছিলাম। এবং কোলাকুলিকে শেষ পর্যন্ত গোলাগুলিতে নিয়ে ঠেকিয়েছিলাম। তেমন জটিল কোন উদ্দেশ্য ছিলো না; উদ্দেশ্য ছিলো জাষ্ট ফান করা। আনন্দ আর মজা করা। ঈদ মানেই তো আনন্দ। কিন্তু জাষ্ট মজা করে লিখতে যেয়ে শেষ পর্যন্ত লেখায় ঈদের আনন্দ আর মজা ধরে রাখতে পারিনি। মজা বিষয়টি যেমন তেমন কোন বিষয় নয়। মজা শুরু করা যেমনি কঠিন; ধরে রাখা আরো কঠিন।

আমার লেখাটি কেমন করে যেন একটু কঠিন হয়ে গিয়েছিলো। আমি বেশ বুঝতে পারছি কাজটি ঠিক হয়নি এবং মজাটা ধরে রাখা দরকার ছিলো। বক্তব্যধর্মী এবং ভারী লেখা না লিখলেও চলতো। হয়তো এ কারণেই লেখাটি কোন কোন পাঠকের ভালো লাগেনি এবং কিছু কিছু পাঠক ক্ষোভ প্রকাশ করতেও ছাড়েনি। ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ক্ষেপে যাবার কারণে। আমার শোনিমও ক্ষেপেছে। “আব্বু তুমি ঈদের মজাটাই শেষ কইরা দিলা” বলেই তার ক্ষোভ প্রকাশ।

ক্ষোভ প্রকাশের বিষয়টা বাংলাদেশে হরহামেশাই হয়। এখানে সেখানে হতে দেখি। গেল রমজানেও দেখেছি। ইফতার সামনে নিয়ে পার্টিতে সবাই বসে আছে। মাগ্রেবের আযান দিবে দিবে করছে। অথচ তখনও কয়েকজন বক্তা অপেক্ষমান। তারা বক্তব্য দিবে। তাই বার বার উপস্থাপকের দিকে আকারে ইঙ্গিতে তাকাচ্ছে। উপস্থাপকও চলমান বক্তাকে কানে কানে ফিসফিসিয়ে তাগাদা দিচ্ছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এদেশে মাইক একবার কেউ পেলে আর ছাড়ে না। অগত্যা দু’চারজনার বক্তব্য ছাড়াই প্রধান অতিথির ডাক পড়ে। 

আর এতেই শুরু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের। বক্তব্য না দিতে পারা তালিকাভুক্ত বক্তাদের ক্ষোভ। বিড় বিড় করে ক্ষোভ ঝাড়ে। যা ঝাড়ে তার কিছু বোঝা যায়, কিছু বোঝা যায় না। বোঝা যায় না তারা ইফতারে এসেছেন; নাকি বক্তৃতা দিতে এসেছেন। ইফতার নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। আমরা ইফতার সামনে নিয়ে বসে আছি। অধীর আগ্রহে আছি আযানের অপেক্ষায়। শুধু প্রধান অতিথিসহ বক্তব্য দিতে না পারা দু’চারজন বক্তা আযানের অপেক্ষায় ছিলেন না। তারা চাচ্ছিলেন আযান আরো পরে হোক।   

এতো গেলো দাওয়াতীদের কথা। আবার ইফতারের আয়োজন নিয়েও কথা আছে। রমজানের ইফতার পার্টি তথা এর আয়োজকদের দেখে আমার বার বার মনে হয়েছে, রোজা আমাদের উপর ফরজ নয়; ফরজ হলো ইফতার! এমন কি নামাজও নয়, শুধু ইফতারই যেন ফরজ! সন্ধ্যাবেলা সব জায়গায় দেখা যায় ইফতার পার্টির আয়োজন। কয়েকটি আয়োজনে অংশ নিয়ে লক্ষ্য করলাম আয়োজক এবং উপস্থিতদের মধ্যে বেরোজদারও থাকেন। তারা সংখ্যায় যথেষ্ট। আবার ইফতার শেষে নামাজ পড়ে না এদের সংখ্যা আরো আরো বেশী ।

কিন্তু ইফতারের আয়োজনে কোনো কমতি নেই। প্রায় ১০ থেকে ২০টি আইটেম না হলে যেন ইফতার হয় না। অথচ ইফতার করা এবং করানো হলো সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়ার আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না থাকত তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে। যদি শুকনো খেজুরও না থাকতো, তাহলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে ইফতারের আয়োজন নিয়ে এক একজন এতো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, ইফতারের আগে দোয়া করার সময়টুকুও তারা পান না। অথচ এ সময়টিই হলো দোয়া কবুলের সময়।

ইফতারের সময় দোয়া করার সময় কই? ইফতারের বিশাল আয়োজন করতে হবে! বক্তৃতা দিতে হবে। উপস্থাপনা করতে হবে! নিজেকে দেখাতে হবে! ছবি তুলতে হবে! এত সব করে দোয়ার সময় বের করা তো আসলেই কঠিন। অথচ এত্তবড় আয়োজনের চেয়ে দোয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। আবার দোয়ার চেয়ে রোজা রাখার গুরুত্ব আরো বেশি। রোজা আমাদের উপর ফরজ, মানে অবশ্যই পালনীয়; পালন করতেই হবে। আমরা ইফতার অবশ্যই করবো। তবে রোজাকে ইফতার আড্ডা, বিনোদনের বস্তু না বানিয়ে আমাদের যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটিকে তো বেশী মূল্যায়ন করতে হবে।

মূল্যায়ন  করতে হবে নামাজকে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে। ইফতারের বিরাট আয়োজন করবো। কিন্তু রোজা রাখবো না, নামাজ পড়বো না। এটা তো হবার নয়। রমজানের কথা বাদ দিলাম। নামাজ তো শুধু রমজান মাসের নয়। সারা বছরের জন্যই নামাজ। সেই নামাজই ঠিকমত পড়িনা। গুরুত্বও ঠিকমত দেই না। নামাজের চেয়ে আযানের গুরুত্ব বেশী দেই। আযান শুরু হলে আমরা নড়ে চড়ে বসি। হৈহুল্লোর বন্ধ করে দেই। সমাবেশের বক্তা কথা বলা থামিয়ে দেয়। আর মেয়েরা তো আরো সচেতন। আযানের ধ্বনিতে মেয়েরা মাথায় কাপড় টেনে দেয়। কী দরদ আযানের প্রতি! উপচে পড়া দরদ!

কিন্তু আযান শেষ তো দরদ শেষ। আযান শুরু হলেই বক্তার বক্তৃতা বন্ধ, অনুষ্ঠানের মাইক বন্ধ। শেষ হলে আবার মাইক চালু। কিছুক্ষণ পর নামাজের জামাতের জন্যেও মাইক বন্ধ। কি ভক্তিরে বাবা! আমজনতাও বেজায় কঠোর। মাইক বন্ধ করে অনুষ্ঠানে বিরতি দিলে খবর করে ছাড়বে আমজনতা। কিন্তু নামাজে যাবে না। খুব পাশের মসজিদের জামাতেও আমজনতাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সবাই আশে পাশেই থাকে। কিংবা থাকে অনুষ্ঠান প্যান্ডেলেই। কেবল বসেই থাকে না। মোবাইল চালায়; কথা বলে। দুনিয়ার সব কথা বলে। 

বাঙ্গালীর মন বড়; তাই দুনিয়ার কথা বলে। দুনিয়ার সাথে বলে। আর ভাবে পুরো দুনিয়া নিয়েই। কখনো নিজকে শুধু বাংলার সীমানায় আবদ্ধ রাখেনা। বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশ না খেলুক। বাঙ্গালী তো আর বসে থাকতে পারে না। বিশ্বকাপ বলতে কথা। তাই টুর্নামেন্টের সাথে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যায়। বেছে বেছে বাঘা বাঘা দলকে সাপোর্ট দেয়। দেয় লম্ফঝম্ফ। পছন্দের দেশগুলোর জার্সি কিংবা পতাকায় ছাপিয়ে ফেলে নিজের পুরো দেশ। রীতিমত পতাকা বড় করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

নিঃসন্দেহে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার এ এক নিখাদ উপাখ্যান। এসবে দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ফুটবলপ্রেম নিয়ে কখনো প্রশ্ন উঠেনি। কিন্তু অতীব বাড়াবাড়ি রকমের এই ফুটবল প্রেমের কাছে তুচ্ছতাচ্ছিল্যে ভরা এহেন ক্রিকেট প্রেম নিয়ে তো প্রশ্ন তোলা যায়। ক্রিকেটে বিশ্ব র‌্যাংকিং এ বাংলাদেশ এতটা ভাল অবস্থানে থেকে এবং প্রতিটা বিশ্বকাপে খেলেও এবারের বিশ্বকাপে বাঙ্গালী নীরব। একদম চুপ। না ক্রিকেট প্রেমীরা নিজেরা দোলছে, না দেশ বাসীকে দোলাতে পারছে। 

দোলাবে দূরের কথা; চলমান বাংলাদেশকে দেখে বোঝারই উপায় নেই, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলছে কি না। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলার পরও কোথাও একটা পতাকা উড়েনি। বাড়ীর ছাদগুলো পতিত পড়ে আছে। হাহাকার করছে। কিন্তু কেউ আসেনি ওর আঙ্গিনায় পতাকা ঝুলাতে। শহরে কিংবা গ্রামে কোথাও বড় পতাকা বানাবার প্রতিযোগিতা নেই। খেলা উপলক্ষে জার্মানীর জন্য যে দেশের মানুষ পাঁচ কিলো লম্বা পতাকা বানাতে পারে; নিজের দেশের জন্য সে জাতি পাঁচ হাত লম্বা পতাকা বানাবার আগ্রহও দেখাতে পারেনা।  

হায়রে অভাগা জাতি! হায়রে মোদের বোঝার ক্ষমতা! বোঝার ক্ষমতা নেই বলেই আজও কোন বিষয়ের প্রকৃত গুরুত্বটা বুঝতে পারিনি; এবং অনুভব করতেও শিখিনি। শিখলে নিশ্চয়ই ইফতারের চেয়ে রোজার মূল্য আর আযানের চেয়ে নামাজের গুরুত্বই বেশী দিতাম। ধর্মকে লেবাসে না নিয়ে অন্তরে ধারণ করতাম। আর দেশপ্রেমকে প্রকাশ করতাম জাতীয়তাবোধের ধারায়। ব্রাজিল আর্জেন্টিনার পতাকা না উড়িয়ে দেশের পতাকা উড়াতাম ।

এসব পারিনা বলেই সব সময় একটা ভিন্ন রকমের অস্বস্তিতে থাকি। সামাজিক কিংবা ধর্মীয়; সবকিছুতেই হীনমন্যতায় ভুগি। মন খারাপ করি; এবং কষ্ট পাই। কিন্তু সমাধান পাই না। অবশ্য আমার মত চুনোপুটির এমনই হবার কথা। সমাধান পাওয়ার কথা না এবং কথায় কথায় ধাঁধায় পড়ে যাবার কথা। আসলে জীবনটাই তো একটা গোলক ধাঁধা। এই ধাঁধায় পড়ে মাঝে মধ্যে আমি এমনি এমনি হাসি! কেননা আসলেই বোঝা কঠিন; কোন কাজটির গুরুত্ব কতটা বেশি!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com