সরদার ফজলুল করিম; আদর্শের প্রতীক

প্রকাশের সময় : 2019-07-11 18:09:23 | প্রকাশক : Administration
সরদার ফজলুল করিম; আদর্শের প্রতীক

মিল্টন বিশ্বাসঃ সরদার ফজলুল করিম! বাংলাদেশের বিশিষ্ট দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, আরও অনেক কিছু। আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর জন্ম বিশ্বের মেহনতি মানুষের বিজয় দিবসে; অধিকার আদায়ের রক্তস্মৃতি ধন্য দিনে। অর্থাৎ ১ মে তাঁর জন্ম ব্রিটিশ বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে; বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার আটিপাড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় তাঁর শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো বর্ণময় হয়ে উঠেছিল।

তিনি ছিলেন কৃষক পরিবারের সন্তান। বাবা খবিরউদ্দিন সরদার কৃষিকাজ করতেন, মা সফুরা বেগম ছিলেন গৃহিণী; তাঁরা দুই ভাই, তিন বোন। বাল্যকাল থেকেই জ্ঞান-পিপাসু ও পড়ুয়া সরদার ফজলুল করিম নিজের জীবনকে আর দশটা মানুষ থেকে ভিন্ন করে ভাবতে শুরু করেছিলেন। বিপ্লবী চেতনা সেই সময়ই জাগ্রত হয় তাঁর মধ্যে। শৈশব-কৈশোর অতিক্রান্ত সরদার ফজলুল করিম যৌবনের প্রথম মুহূর্তেই স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পান।

বড় ভাই ও পিতা-মাতার শাসনের বাইরে চলে এলেন ১৯৪০ সালে; বরিশাল জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় চলে আসার মধ্য দিয়ে। ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে, থাকতেন কলেজের হোস্টেলে। এই পড়ুয়া সন্তানটিকে নিয়ে গ্রামের সাধারণ অভিভাবকদের কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে হয়নি। তিনি উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হবার পর ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে বিএ অনার্সে ভর্তি হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন তিনি ইংরেজী বিভাগে থাকলেও তাঁর জ্ঞানের তৃষ্ণা নিবারিত হলো দর্শনের ক্লাসে এসে। ইংরেজী থেকে দর্শনের ক্লাসে আসার ঘটনা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন তাঁর স্মৃতি সমগ্রতে। তিনি ঘুরে ঘুরে শিক্ষকদের বক্তৃতা শুনতেন। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন। করিডোর দিয়ে যাবার সময় এপাশে-ওপাশের বিভিন্ন ক্লাস দেখতেন।

দর্শনের অধ্যাপক হরিদাস ভট্টাচার্যের বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হন। সেই শিক্ষক ‘সত্য’ এবং ‘মিথ্যা’ কি, এ নিয়ে একদিন আলোচনা করছিলেন। সরদার ফজলুল করিম কাছে গিয়ে বললেন, ‘স্যার, আমি দর্শনে ভর্তি হব।’ ভর্তি হলেন দর্শন বিভাগে। জ্ঞান অনুসন্ধিৎসু সরদার ফজলুল করিম দর্শনের বাইরে অন্য ক্লাসও করতেন। ১৯৪৫ সালে তিনি দর্শনশাস্ত্রে বিএ অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং ১৯৪৬ সালে এম.এ ডিগ্রীতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন।

বামপন্থি রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে তিনি লন্ডনের স্কলারশীপ প্রত্যাখ্যান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ১৯৪৬ সালে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে রাজনীতির কারণে স্বেচ্ছায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ইস্তফা দেন। তবে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির অনুবাদ শাখায় যোগ দেন। ১৯৭১ সালে তিনি বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি শাখার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা এসে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের দরজা খুলে দেয়। ওইদিন অন্য সব কয়েদির সঙ্গে তিনি মুক্তি পান এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বহু স্মৃতি-বিজড়িত গেটটি পার হয়ে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখেন। ১৯৭২ সালে তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ পর্যন্ত শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা দান করেন।

ছাত্র জীবন থেকেই সরদার ফজলুল করিমের বাম-রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ১৯৩৯-৪০ সালের দিকে বরিশাল জেলা স্কুলের নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় সহপাঠী মোজাম্মেল হক তাঁকে পড়তে দিলেন ‘প্রেসক্রাইবড’, ‘পথের দাবি’। এরপর দিলেন লাল অক্ষরে মুদ্রিত বিপ্লবী ইশতেহার, স্বাধীনতা এবং সমাজতন্ত্রের ইশতেহার। তিনি গোপনে তাঁকে জানান যে, তিনি যোগ দিয়েছেন বেআইনী গুপ্তদলে। সে দলের নাম বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল আর.এস.পি।

শরৎচন্দ্রের লেখা ‘পথের দাবী’ বইটি তাঁর ভাবনার জগৎ পুরোপুরি পাল্টে দেয়। পরবর্তী জীবনে তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্ষীয়ান বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মতো তিনিও রাজনীতিতে এসেছিলেন এই বইটি পড়ে। এখান থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বিপ্লবী চেতনায়।

পূর্বেই বলা হয়েছে ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে স্বেচ্ছায় তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়েছিলেন। ফলে আত্মগোপনরত কমিউনিস্ট পার্টির কাজে মনোনিবেশ করতে তাঁর সুবিধা হয়েছিল। সংগ্রামী আদর্শে অনুপ্রাণিত সরদার ফজলুল করিম ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে জিন্নাহ’র ঢাকা আগমন এবং রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তাঁর উক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

তবে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা শহরের তাঁতিবাজার থেকে সরদার ফজলুল করিম তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি যখন কারাগারে যান তখন রাজবন্দী হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে রাজবন্দীদের অনশন ধর্মঘট চলছিল পুরোদমে এবং কারাগারে ঢুকে সাথীদের সঙ্গে তিনিও অনশনে যোগ দেন রাজবন্দী হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে। তিনি ত্রিশ দিন একটানা অনশন ব্রত পালন করেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী জান্তা তাঁদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে দীর্ঘ পাঁচ বছর বন্দী জীবনের পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর তিনি আরও তিনবার কারাবরণ করেন। অর্থাৎ সাম্যবাদী বামপন্থী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক তিনি নিগৃহীত হয়েছেন বারবার। রাজবন্দী হিসেবে দীর্ঘ ১১ বছর বিভিন্ন পর্যায়ে কারাজীবন যাপন করেছেন। জেলে থাকা অবস্থাতেই ১৯৫৪ সালে তিনি পাকিস্তান সংবিধান সভার সদস্য হিসেবে কাজ করেন। এভাবেই এক জীবনে বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের উদ্ভাস ঘটেছিল সরদার ফজলুল করিমের ব্যক্তিত্বে।

সরদার ফজলুল করিম ছাত্রাবস্থায়ই প্রগতি লেখক সংঘের কাজে সম্পৃক্ত হন। ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা মিলে হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন। গত পাঁচ দশক তিনি বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনচর্চার গতিধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি করেছেন এই ‘জাতীয় অধ্যাপক’।

স্বাধীনতা ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সরদার ফজলুল করিম ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলেন দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, আপোসহীন ও নির্লোভী। তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজের মঙ্গলাঙ্খার উজ্জীবন দেখলে যে কোন ব্যক্তি আবেগসিক্ত হতেন। এদেশের সমাজ-রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁর অবদান অসামান্য। একজন সাদাসিধে, নিরহংকার ও বাঙালী জাতির গর্বিত সন্তান সরদার ফজলুল করিমের সৃষ্টিকর্ম আজ ও আগামী দিনে বাঙালীর পাথেয় হয়ে থাকবে। লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com