হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬০তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-07-25 18:21:42 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬০তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ‘আলোর মিছিল’ খুব ভাল করে আলো ছড়াতে পারেনি; মিছিলও করতে পারেনি। ভাল করে জমে উঠবার আগেই মাত্র তিনবার প্রকাশিত হয়ে মুখ থুবরে পড়ে। না পড়ে উপায়ই বা কি! পত্রিকা প্রকাশিত হবার মতো কোন পরিবেশই তো স্কুলে ছিলো না। স্কুল তো একরকম বন্ধের মতই ছিল। শিক্ষার্থীরা যৎ সামান্য আসতো বটে তবে ক্লাশ হতো না। শিক্ষকদের ধর্মঘট আর ক্লাশ বয়কটের কারণেই হতো না। হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া সব শিক্ষকই একদল। অন্যদলে প্রধান শিক্ষক তৈয়ব স্যার। বড় দাপুটে মানুষটির বড় অসহায় দল।

আর আমরা ছাত্ররাও অসহায়। বড় অসহায় আমরা, ক্লাশ টেনের শিক্ষার্থীরা। কয়েক মাস বাদেই আমাদের এসএসসির প্রিটেস্ট এবং টেস্ট পরীক্ষা। অথচ ক্লাশ, পড়াশুনা কিচ্ছু নেই। একটানা দু’মাস আমরা ক্লাশ এবং পড়াশুনা বাদ দিয়ে থিতু হয়ে বসে আছি। স্কুলে কোন শান্তি নেই। আছে দলাদলি। স্যারদের মাঝে যে হারে দলাদলি আর গ্রুপিং তাতে করে আমাদের অসহায় হয়ে পড়া ছাড়া গতিও ছিল না। সব দলাদলির মূল হেডমাস্টার স্যারকে ঘিরে। তাঁকে হটাতে হবে। যেমন করেই হোক তাঁকে স্কুল ছাড়া করতে হবে।

কৈশোর মন আমার বুঝে উঠতে পারতো না হেডস্যারের দোষটা কোথায়। গফুর স্যারের পরে এতটা নিবেদিত প্রাণ এবং যোগ্য প্রধান শিক্ষক ধলা হাই স্কুল পায়নি। তাঁর সারাক্ষণের ভাবনা স্কুল নিয়ে। ফান্ডে টাকা নেই। অথচ স্কুলের শিক্ষকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধের জন্য তৈয়্যব স্যার সায়েন্স ভবনটা ভাড়া দিলেন গোডাউন কর্তৃপক্ষকে। ভবনটি অব্যবহৃত ছিল বলেই ভাড়া দিলেন। জমিজমা যা আছে প্রতিষ্ঠানের, সে সব ভাড়া দিয়ে আয় বাড়াবার চেষ্টা করলেন। 

সাপের লেজে পারা পড়লে যা হয়, এক্ষেত্রে তাই হলো। স্বার্থান্বেষীরা তার বিরুদ্ধে ফোঁস করে উঠলেন। স্যারের সকল চেষ্টার বিরুদ্ধে উঠেপরে লাগলেন। স্যারের বিরুদ্ধে এরূপ লাগতে দেখে কৈশোরের সেই ছোট্ট মনেও নীরব প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কিন্তু ঝড় উঠলেই তো হবে না। সমাজের সকল কিছু যখন নষ্টদের দলে চলে যায় তখন ঝড় উঠেও লাভ নেই। মনের ঝড় মনেই রাখতে হয়। আর দেখতে হয় স্বপ্ন। ভবিষ্যতে ভাল কিছু করার স্বপ্ন।

স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েও ছিলাম। তৈয়ব স্যারকে হেনস্থা করার ঠিক ২৭ বছর পর ২০০৮ সালে পেয়েছিলাম। বলা বাহুল্য, এই সুযোগটি কেউ আমাকে তৈরি করে দেয়নি। আমি নিজেই বের করে নিয়েছি। কেউ যেমনি ডেকে ওখানে আমাকে নিয়ে যায়নি, তেমনি কারো ডাকের জন্যও আমি বসে থাকিনি। আমার বিবেক এবং দায়িত্ববোধ আমাকে ইশারা করেছে, তাই গিয়েছি। এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য যা কিছু করতে পেরেছি নিজের ইচ্ছা এবং ভাবনা দিয়েই করেছি। তবে বেশি দিন পারিনি। একটানা ছয় বছর পেরেছিলাম মাত্র।

ক্লাশরুমে সিলিং ফ্যান দেবার মধ্য দিয়ে আমার কাজের শুরু। শুরুতে শারীরিকভাবে দেখা দেইনি। দেখা দেয়ার প্রয়োজনও বোধ করিনি। কেবল ফোনে ফোনে যোগাযোগ। প্রধান শিক্ষক মুসা স্যার ফোনেই জানালেন তার মোট ১৩টি ফ্যান হলেই চলবে। পাঠিয়ে দিলাম। সাথে শুরু করলাম ২০ জন স্টুডেন্টকে নিয়মিতভাবে মাসিক বৃত্তি দেয়া। বাবা মায়ের নামে প্রবর্তিত সাহিয়া-মজিদ শিক্ষাবৃত্তি প্রকল্পটি আমি চালু করি ১৯৯৮ সন থেকে। এ যাবৎ ২১ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হয়েছে।

হয়ত এ কারণেই দু’বছর খুব সাধাসাধি করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলে যাওয়ার জন্যে। অন্তত আমার মুখটা যেন শিক্ষার্থীদের দেখাতে পারে। আমি না যেয়ে পেরেছি। কিন্তু ২০১০ এ আর পারিনি। জব্বার স্যার আর মুসা স্যারের কথা ফেলতে পারিনি। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে যাবার পর তো লজ্জা পাবার মত অবস্থা। হাজার দু’য়েক দর্শকদের সামনে যতটুকু না আমার যোগ্যতা, তার চেয়ে ঢের বেশী সম্মান জানাল। ছাত্রাবস্থায় ডানপিটে স্বভাবের জন্য যে স্কুলে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, সেদিন সে স্কুলের সবাই দাঁড়িয়ে ছিল ফুলের পাপড়ি নিয়ে আমাকে বরণ করার জন্য।

আমার মত একজন অতীব সামান্য মানুষের জীবনে এর চেয়ে অসামান্য সম্মান, অসামান্য প্রাপ্তি আর কি হতে পারে! খেয়াল করলাম মানপত্র পাঠের সময় আমার কাছে মোটে একখানা কম্পিউটার প্রত্যাশা করলো শিক্ষার্থীরা। মঞ্চে বসে আমার খুব লজ্জা হচ্ছিল তাদের বিনয় দেখে। ভাবছিলাম, একটি মাত্র কম্পিউটার দিয়ে কী করবে ওরা! তাই একটি নয়, দুটিও নয়; দশটি কম্পিউটার এবং প্রয়োজনীয় চেয়ার টেবিল দিয়ে নতুন একটি কম্পিউটার সেন্টার বানিয়ে দিলাম। নাম দিলাম “আবুল কালাম মেমোরিয়াল কম্পিউটার সেন্টার”।  যেদিন সেন্টারটি সবাইকে নিয়ে ঘটা করে উদ্বোধন করি, সেদিন খুব করে তৈয়্যব স্যারের কথা মনে পড়ছিল। মানুষটির কত আশা ছিল স্কুলটিকে ঘিরে। সাদা পাজামার উপর বাদামী রংয়ের পাঞ্জাবী ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। চেহারায় সাংঘাতিক রকমের ব্যক্তিত্ব ছিল। রাগও ছিল মেলা। ছাত্রদের উপর রাগলে খুব করে চুলের মুঠি ধরতেন। একবার ধরলে আর রক্ষা নেই। মুঠি ভরে চুল ছিঁড়ে নিয়ে তবে ছাড়তেন।

একবার আমাকে ধরলেন। এসেম্বলিতে ফাঁকি দিয়ে দূরে দাঁড়িয়েছিলাম বলে ধরলেন। সকালের এসেম্বলিতে শপথ নেয়া ও গান করার জন্য আমরা তিনজন ছিলাম। এক ক্লাশ জুনিয়র তৌফিক, আমি এবং আরো একজন। নামটা মনে করতে পারছি না। চমৎকার কন্ঠের কারণে তৌফিক লিড দিত। পাশে আমি এবং সেই ছেলেটা সহযোগীর ভূমিকায় থাকতাম। কোন কারণে তৌফিক না থাকলে আমাকে লিড দিতে হতো।

ওইদিন তৌফিকও নেই; আমিও লুকিয়েছি। স্যার তো আমাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। কী আর করা! কোনভাবে এসেম্বলি সামাল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন টিচারস্ রুমের সামনে। হয়ত কোন কাজেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর ক্লাশ টিচারগন বেরুচ্ছেন যার যার ক্লাশের দিকে। মেয়েরা কমন রুম থেকে হেঁটে হেঁটে নিজেদের ক্লাশের দিকে যাচ্ছে। ভাবলাম পরিস্থিতি অনুকুলে। চট করে ক্লাশে ঢুকে পরা যাবে। আমি ঢুকতে যাবো। অমনি বাঘের বাচ্চার ডাক।

সব মেয়েদের সামনে চুলের মুঠি ধরে কতগুলো চুল ছিঁড়েছিলেন গুনতে পারিনি। কিন্তু ২৭ বছর পরে একটা চমৎকার কম্পিউটার সেন্টার করে দিয়েও গুনে গুনেও মিলাতে পারিনি প্রধান শিক্ষক মূসা স্যারের হিসাব। যতদিন স্কুলের সাথে ছিলাম একজন শিক্ষার্থীকেও কম্পিউটার ধরতে দেননি। রুমেও ঢুকতে দেননি। কম্পিউটার সেন্টারটি করে দেবার আগে একদিন ঢাকায় আমার অফিসে নুরুল ইসলাম মাওলানাসহ মূসা স্যারকে নিয়ে দূপুরের খাবার খেতে বসেছি।

আমি বললাম, কম্পিউটার তো পাঠাচ্ছি; কম্পিউটার জ্ঞানসম্পন্ন ভাল প্রশিক্ষক আছেন তো? স্যার বললেন, আমি নিজে কম্পিউটারের কিছুই বুঝি না। আমাদের প্রশিক্ষক আছে; মানিক মাস্টার। তার পারার কথা। স্যারের কথায় তেমন জোর পেলাম না। তাই বললাম, একটি শর্তে আমি কম্পিউটারগুলো পাঠাতে পারি। আগামী তিনমাস ময়মনসিংহের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে আপনার প্রশিক্ষককে পাঠিয়ে কম্পিউটার শিখিয়ে আনবেন। যদি আমাকে এইটুকু নিশ্চয়তা দেন তাহলে আমি কম্পিউটারগুলো পাঠাবো। স্যার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন আর আমি সরল মনে তা বিশ্বাস করেছিলাম। 

ব্যাস ঐ পর্যন্তই। আমি যে সব ব্যাপারে নাছোড়বান্দা তিনি জানতেন না। জানলে নিশ্চয়তা দিতেন না এত সহজে। একদিন মূসা স্যারের সামনেই ছেলেমেয়েরা বললো, এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে আমরা তো তেমন কিছুই পেলাম না। আছে কেবল একটি কম্পিউটার সেন্টার। অন্তত এখানে আমাদেরকে একটু শেখার ব্যবস্থা করে দেন। সবার সামনেই স্যারকে অনুরোধ করলাম। স্যার সব শুনলেন; এমনভাবে শুনলেন যেন খুব মন দিয়ে সিরিয়াসলি শুনছেন। 

এটা তার খুবই কৌশলী একটি ধরণ। বাস্তবের ধরণটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবে আমি পেঁচাল পারতাম আর স্যার সব শুনতেন। কোন কিছুই বাদ দিতেন না। শোনার প্রচন্ড ধৈর্য্য আছে মানুষটির। তবে মন দিয়ে নয়, দুটো কান দিয়েও নয়; কেবল একটি কান দিয়ে শুনতেন। আর অন্য কানটি উল্টো পাশে ষ্টান্ডবাই রাখতেন যেন আমার বলা সব কথা এক ধাক্কায় বের করে দিতে পারেন ফুশ করে। এমনি করে ফুশ করে করে কবে যে তিনি ধলা হাইস্কুলের এই আজীবন দাতা সদস্যের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও বের করে দিয়েছেন তাঁর আঙিনা থেকে তা তিনি নিজেও জানেন না!! কাউকে জানতেও দেননি!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com