অপরাজনীতির ‘কবর’ হলো কি?

প্রকাশের সময় : 2019-08-07 15:19:49 | প্রকাশক : Administration
অপরাজনীতির ‘কবর’ হলো কি?

বিভুরঞ্জন সরকারঃ সাবেক সেনাশাসক, ক্ষমতা জবরদখলকারী অবৈধ রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ জীবিত থাকতে শোনা গিয়েছিলো মৃত্যুর পর তিনি রংপুরে তার নিজ বাসভবনে সমাহিত হতে চান। কিন্তু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণার পর জানা গেলো, তিনি আসলে সেনানিবাসের কবরস্থানে শেষ শয্যা গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এরশাদের ক্ষমতার শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠেছিলো বৃহত্তর রংপুর। ‘রংপুরের ছাওয়াল’কে সেখানকার মানুষ উজাড় করা ভালোবাসা দিয়েছে। ভোটে জিতিয়ে তাকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এরশাদের কবর তাই রংপুরে হওয়াই স্বাভাবিক ছিলো।

তাছাড়া ‘সেনা’ পরিচয় ছাপিয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয়ই তার মৃত্যুকালে প্রধান ছিলো। তিনি ছিলেন সংসদের বিরোধী দলের নেতা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। সেনানিবাসে তার কবর হলে সেখানে তার ভক্ত এবং অনুসারীদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ থাকতো না। সেটা নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত হতো। রংপুরবাসীর দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত রংপুরের পল্লী নিবাসেই নিজের লোকজনদের কাছে ‘পল্লীবন্ধু’ বলে পরিচিত এরশাদের কবর হয়েছে। এরশাদের কবর জিয়ারতের জন্য এখন কেউ যেতে চাইলে অবাধেই যেতে পারবেন।

প্রশ্ন সামনে আসছে, এরশাদের মৃত্যুর পর তার ভক্ত, সমর্থক এবং অনুসারী আসলে কতো জন, কতো দিন থাকবে? এরশাদ রাজনীতিতে টিকে ছিলেন, তার দল সংসদে কিছু আসন পায়, এটা যতোটা না এরশাদের নিজের গুণে তারচেয়ে বেশি এর পেছনে কাজ করেছে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা। এরশাদ এবং তার আগে জিয়াউর রহমান অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা অপকৌশল অবলম্বন করেছেন। চরম সুবিধাবাদী, দলছুট, সুযোগ সন্ধানী রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের রাজনীতিতে ভিড়িয়েছেন। দেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছেন। জিয়া প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে, দেশের রাজনীতিকে তিনি রাজনীতিবিদদের জন্য ‘ডিফিকাল্ট’ করে দেবেন। তিনি কথা রেখেছিলেন। তার আমলেই রাজনীতি কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়। জিয়ার কাছে টাকা কোনো সমস্যা ছিলো না (মানি ইজ নো প্রব্লেম)। টাকা ছিটিয়ে তিনি রাজনীতির ‘কাক’ সংগ্রহ করতেন।

জিয়ার আলখাল্লা গায়ে চাপিয়েই এরশাদও ক্ষমতা দখল করেন এবং একইভাবে ব্যারাকে না ফিরে রাজনীতিতে নামেন। একই ধারার, একই রাজনীতি করে জিয়ার চেয়ে এরশাদ যে বেশি সমালোচিত এবং নিন্দিত তারও কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত জিয়ার গায়ে মুক্তিযুদ্ধের ছাপ্পা ছিলো, এরশাদের তা ছিলো না। দ্বিতীয়ত জিয়ার বিরুদ্ধে অর্থ এবং নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছিলো না, এরশাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ছিলো। এরশাদ রাজনীতিকে যতোটা কলুষিত করেছেন, জিয়া তার চেয়ে কম করেননি। তারপরও জিয়া এবং এরশাদকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পাল্লায় মাপা হবে না।

জিয়ার মৃত্যুর পর তার হাতে গড়া দল বিএনপি শক্তিহীন হয়নি বরং বলা যায় জিয়াপত্নী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটির পুণর্জীবন লাভ হয়েছে। বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতির যে শূন্যস্থান পূরণ করেছে সেটা হলো মোটা দাগে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা। এর সঙ্গে আছে সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত বিরোধিতা। এরশাদের জাতীয় পার্টির পুঁজিও ওই একই। ফলে একই রাজনৈতিক পুঁজি নিয়ে দুইটি দল এক সমান শক্তির অধিকারী হতে পারে না। বিএনপি শক্তিশালী হলে জাতীয় পার্টি দুর্বল হবে। আর জাতীয় পার্টি বলবান হলে বিএনপি হবে হীনবল।

এরশাদ তার দলকে কৌশলে একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রতিযোগী ও  সহযোগী করতে পেরেছেন। যেখানে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী এরশাদ এবং তার দল থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শতহাত দূরে থাকার কথা, সেখানে দুই দলই এরশাদকে নিয়ে টানাটানি করেছে। বিএনপি যদি এরশাদকে ছয় বছর জেলে না রাখতো তাহলে এরশাদ হয়তো বিএনপির পক্ষে থেকে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার পথকে কঠিন করে তুলতে পারতো।

কিন্তু যা হয়নি, সেটা নিয়ে আলোচনা না করে যা হয়েছে তা নিয়েই আলোচনা করা উচিত। আওয়ামী লীগের সহযোগী হয়ে পতিত স্বৈরাচার এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন করেছেন। তাই তিনি অপশাসন ও অপরাজনীতির গোড়ায় পানি ঢাললেও তাকে নিয়ে আলোচনা আরো কিছু দিন চলতে থাকবে। এরশাদকে গাল দেওয়া যায়, তার বিরুদ্ধে যা খুশি তা বলা যায় কিন্তু তাকে অস্বীকার করা যাবে না!

এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির পুনর্জীবন লাভের সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বেঁচে থাকতেই জাতীয় পার্টি সারা দেশে সমান সংগঠিত ও জনপ্রিয় দল হিসেবে গড়ে উঠেনি। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে জাতীয় পার্টি, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন এরশাদ।

এরশাদ মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যু নিয়েও কেচ্ছাকাহিনী কম নয়। তিনি বেঁচে থাকতেও আলোচিত ছিলেন, এখন মরার পরও আলেচনার শীর্ষে। তবে জাতীয় পার্টি তাকে ছাড়া রাজনীতিতে কতোটুকু প্রাসঙ্গিক থাকবে সেটা শুধু জাতীয় পার্টির ওপরই নির্ভর করবে না। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিও জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখবে। এরশাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেশে অপরাজনীতির ধারার অবসান ঘটবে বলে মনে করার কারণ নেই। লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com