হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬১ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-08-07 15:32:03 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬১ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ৮১ সালটা ধলা স্কুলের জন্যে যেমনি খারাপ সাল; পুরো দেশটির জন্যেও। মে মাসে শেষের দিক। স্কুল শুরু হবে হবে করছে। তবে শিক্ষকদের বয়কটের কারণে নিয়মিত ক্লাশ যেহেতু হয় না, তাই পরিবেশ অনেকটাই এলোমেলো। আমরা ছাত্ররা গালগল্পে মশগুল। হঠাৎ করে মাথায় বাজ পড়ার মত খবর এলো। সবাই লাফিয়ে উঠলাম। কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু হয়ে গেল। সবাই রেডিও খুঁজছে।

পাশের কোন বাড়ী থেকে রেডিও একটা আনা হলো। কিন্তু ব্যাটারী ড্যাম। শব্দ তেমন আসে না। আসলেও মাঝে মাঝে ফ্যার ফ্যার করে; ঘ্যার ঘ্যার করে। তবুও ওটা নিয়েই চেষ্টা। রেডিও স্টেশন ঘুরাবার চেষ্টা। চেষ্টা সফল হবার লক্ষণ নেই। ভাগ্যিস একজন রেডিও পন্ডিত পাওয়া গেল। এটা বাংলাদেশে সব সময়ই হয়। যে কোন ক্রাইসিসে একআধজন পন্ডিত জুটেই যায়। তার চেষ্টায় স্টেশন ধরা গেল। কিন্তু পরিস্থিতিকে কোনভাবেই মেনে নেওয়া গেল না। 

রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হয়েছেন। সেনাবাহিনীরই কিছু বিপদগামীদের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। ৩০শে মে ১৯৮১, শুক্রবার। প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টির রাত। জানালার কাছে আছড়ে পড়ছে বড় বড় বৃষ্টির ফোটা। ঐ পাশে আরাম করে ঘুমুচ্ছেন এক ভদ্রলোক; প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সময় ভোর চারটা। বৃষ্টি কমে এসেছে। রাতের সুনসান নীরবতা ভেঙ্গে হঠাৎ একটি সামরিক গাড়ীবহর তড়িঘরি করে ছুঁটে গেল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের দিকে। সার্কিট হাউজের গেট অতিক্রম করে গাড়ী থেকে নেমে রকেট লাঞ্চার থেকে ভবনের দেয়াল উদ্দেশ্য করে একটা রকেট ছুঁড়ে মারলো। ততক্ষণে জিয়াউর রহমানের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তিনি বোঝার চেষ্টা করেছেন বাইরে কি হচ্ছে।

সার্কিট হাউজের ভিতর ঢুকে তারা সবাই খুঁজতে লাগলো সেই মানুষটিকে, যাকে ধরার জন্য আজকের এই অতর্কিত হামলা। মেজর মোজাফ্ফর এবং ক্যাপ্টেন মোসলেহ্ উদ্দিন সর্বপ্রথম তাঁকে খুঁজে পান। মোসলেহ্ উদ্দিন জিয়াকে তাদের সাথে সেনানিবাসে যাওয়ার আদেশ করেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব জিয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই সেখানে প্রবেশ করেন কর্নেল মতিউর রহমান। কোন রকম কালক্ষেপণ না করেই তিনি তার হাতে থাকা এসএমজি দিয়ে গুলি করেন জিয়াউর রহমানকে। অন্তত ২০টি বুলেট জিয়ার শরীরে বিদ্ধ হয় এবং  মূহুর্তেই পুরো শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। শেষ হয় একটি অধ্যায়ের।

পরিস্থিতি হয় খুবই জটিল এবং থমথমে। বিপদগামীদের দখলে পুরো চট্টগ্রাম। সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওটা মেজর জেনারেল মঞ্জুরের কব্জায়। মঞ্জুর চট্টগ্রামের জিওসি। তিনি হত্যাকান্ডের দায়ভার নিয়েছেন। চট্টগ্রাম রেডিওতে বিবৃতিও দিয়েছেন। এদিকে সেনাপ্রধান হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ঢাকায় বসে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ব্যক্ত করেছেন তাঁর পূর্ণ সমর্থন। তিনি বিপ্লবীদের মেনে নিবেন না। রাষ্ট্রপতি নিহত হবার প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিকভাবে শূন্যতা এড়াবার জন্য উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। তাঁদের দু’জনার ঘনঘন বিবৃতি আসছে রেডিওতে। মঞ্জুরকে আত্মসমর্পন করতে বলছেন। সংবিধান চালু রেখেই জরুরী অবস্থা জারী করেছেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। ঘোষণা দিয়েছেন সংসদ বসার।

আমরা এসব খবর পাচ্ছিলাম রেডিও থেকেই। রেডিও ছাড়া আর উপায়ই বা কি? গণমাধ্যম বলতে রেডিওই ছিলো ভরসা। টিভি তো সারা উপজেলায় হাতেগোনা কয়েকটা মাত্র। আর পত্রিকা! ওটা তো ধলা বাজারে পরদিন ছাড়া আসবে না। বাজারও থমথমে। কারো মুখে কথা নেই। সবাই কোন রকমে বাজার ঘাট করে যার যার বাড়ী ফিরে যাবার তাড়ায় ব্যস্ত। ভিড় এবং জটলা কেবল রেডিওর সামনে। যে যে দোকানে রেডিও আছে সেই দোকানগুলোতেই ভীড়। সবাই শোনার চেষ্টা করছে; পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি যে বেজায় ঘোলাটে এটা বুঝতে পারছে। কেবল বুঝতে পারছে না, পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে। 

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিপদগামীরাও যেন দূর্বল হতে লাগলো। নিজ দলের নেতৃত্বদানকারীদের হতাশাই ওদেরকে দূর্বল করতে শুরু করলো। কোন ভাবেই ঢাকাসহ অন্যান্য সেনানিবাসের সমর্থন না পাওয়াতেই হতাশায় আচ্ছন্ন হলো ওরা। ওদের ঐক্যে ফাটল ধরতে শুরু করলো। ঢাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সেনাবাহিনীর মেইনস্ট্রীমের কঠিন একাত্মতা এবং কোন ভাবেই বিপদগামীদের সামান্য সহানুভূতি না দেখানোই এর মূল কারণ। ওরা পালাতে লাগলো। একটা সাধারণ জীপে চড়ে স্বপরিবারে পালালেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর নিজেও। 

রেডিও খবর দিতে লাগলো বিপদগামীরা পালাচ্ছে। যে যার মত করে পিছু হট্ছে। কেউ বা পাহাড়ে, কেউ বা জঙ্গলে। তবে মানুষ বিশ্বাস করতে পারছিল না। ঢাকা রেডিওর প্রতি মানুষের বিশ্বাস খুবই কম ছিল। বলা যায় কোন কালেই তেমন ছিল না। বিশ্বাস ছিল বিবিসি’র প্রতি। প্রচন্ড বিশ্বাস। বিবিসি আর ভয়েস অব আমেরিকা না শুনে একশ্রেণীর মানুষ ঘুমাতে যেত না। রাত পৌঁনে আটটায় বিবিসি’র বাংলা অনুষ্ঠান। আর দশটায় ভয়েস অব আমেরিকা। সবাই উম্মুখ হয়ে থাকত। রেডিও ছোট সাইজের হলে কানের কাছে ধরে শুনতো।

কাজটা আমার আব্বাও করতেন। প্রতিনিয়ত করতেন। দেশে কিছু ঘটুক বা না ঘটুক এটা করবেনই। সকালে রোজকার পত্রিকা পড়া আর রাতে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা শোনা তাঁর রোজনামচা। জীবন যেভাবেই চলুক, রোজনামচার ব্যতিক্রম হতো না। আমি নিজেও সংবাদপত্র পড়ার প্রতি, সারা দুনিয়ার খবরাখবর রাখার প্রতি অভ্যস্ত হয়েছি আব্বার কারণেই। দুনিয়াটাকে হাতের মুঠোয় রাখার জন্যে এরচেয়ে ভাল অভ্যাস তো আর হতে পারে না!

আমার সেই বাবাকে হারিয়ে আজকে এই মধ্যবয়সে এসেও প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে মনে করি। অনুভব করি আমার সকল অনুভূতি দিয়ে। দেখতে দেখতে কিভাবে যে ২৪টি বছর পেরিয়ে গেল! মনে হয় এই তো সবে সপ্তাহ পেরুলো। কত যে ছোট, কত যে ক্ষণস্থায়ী মানুষের এই জীবন! মাত্র ৬৬ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি এই পৃথিবীতে। আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে এখন তার বয়স হতো ৯০ বছর। এই বয়সে কত মানুষই তো বেঁচে আছেন! সামুদ্রিক কাছিম বেঁচে থাকে ৫০০ বছর। চিংড়ি মাছও শত বছর আয়ু পায়! কানাডার সমুদ্র সীমানায় একটি ১০ কেজি ওজনের প্রায় ৯৫ বছরের পুরোনো গলদা চিংড়ি ধরা পড়েছে। অথচ আমরা মানুষেরা এত দিন বাঁচতে পারিনা। আমার আব্বা পারেননি!

ব্রিটিশ আমল; ১৯২৯ সালে কোন এক শবেবরাতের রাতে তাঁর জন্ম। আবার শবেবরাতের রাতেই তাঁর বিয়েও হয়। মা বিশ্বাস করতেন শবেবরাতেই তিনি মারা যাবেন। তাই শবেবরাত এলেই মা ভয়ে ভয়ে রুটি হালুয়া বানাতেন। এক মনে সব বানাচ্ছেন আর অন্য মনে রাজ্যের ভয়। মায়ের ভয় কাজে আসেনি; আব্বা শবেবরাতে মারা যাননি। আম্মার বানানো হালুয়ারুটি পেট ভরে খেয়েছেন সব সময়।

খুব ছোটবেলার কথা। গরমের রাতে আব্বা প্রায়ই আমাকে নিয়ে ঘরের বাইরে লনে কিংবা বাসার ছাদে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন। ধবধবে সাদা তাঁর বিশাল বুকে কিংবা ভারী সুন্দর তাঁর হাতের বাহুতে আমার মাথা রেখে শুইয়ে দিতেন তাঁর কোলের কাছে। পিঠ চুলকিয়ে দিতেন। কখনো ক্লান্তি দেখিনি তাঁর হাতে; একটি হাত পাখা নিয়ে রাতভর বাতাস করে দিতেন। এক সময় রাত শেষ হতো; আব্বার পাখা ঘুরানো শেষ হতো না! যতক্ষণ না ঘুমুতাম ততক্ষণ গল্প করতেন; রাজ্যের সে গল্প। অমাবশ্যার রাতে আকাশ ভর্তি থাকতো তারায়। আব্বা আকাশের দিকে তাকিয়ে আদম সুরত দেখাতেন। বলতেন, মানুষ মরে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। ভাল করে দেখতে পারলে প্রিয় মানুষদেরকে তারার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।

আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে যান সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ দিবাগত রাত ঠিক সাড়ে বারোটায়। তাই ২১ তারিখকেই আমরা তাঁর মৃত্যুদিবস হিসাবে জানি। প্রতিবার খুব করে মন চায়, ২০ তারিখ দিবাগত রাতে সারারাত বাসার ছাদে আমার শোনিমকে নিয়ে শুয়ে থাকি। রাতভর আকাশের যত চাঁদ যত তারা আছে, একটি একটি করে গুণি; একটি একটি করে সব দেখি। চাঁদতারা জোসনায় খুঁজে বেড়াই বাবাকে। এই আশায়, এই কামনায় যেন লক্ষকোটি তারার মাঝে আমার জীবনের সবচেয়ে দামী তারাটিকে অন্তত আর একটিবার দেখতে পাই!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com