বিশ্বকে খাওয়াতে পারে যে দেশটি

প্রকাশের সময় : 2019-08-07 15:36:52 | প্রকাশক : Administration
বিশ্বকে খাওয়াতে পারে যে দেশটি

সিমেক ডেস্কঃ নেদারল্যান্ডস ইউরোপের ছোট্ট একটা দেশ। আয়তন ১৬ হাজার বর্গমাইলের কিছু বেশি। লোকসংখ্যা প্রায় পৌনে দুই কোটি। প্রতি বর্গমাইলে ১৩শ’রও বেশি লোকের বাস। এই ছোট্ট দেশটাই দুনিয়াকে খাদ্য যোগাচ্ছে বলা যেতে পারে। কারণ অর্থমূল্যের দিক দিয়ে নেদারল্যান্ডস হলো যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য রফতানিকারক দেশ। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের স্থলভাগ নেদারল্যান্ডসের চেয়ে ২৭০ গুণ বেশি। কিভাবে এটা সম্ভব হলো? ডাচরা কিভাবে পারল?

সেটা সম্ভব হলো চাষাবাদের ধরন বদলে দিয়ে এবং সবচেয়ে দক্ষ কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বৃহদায়তন - কৃষির জন্য যে সব সম্পদ প্রয়োজন তার প্রায় প্রতিটিরই অভাব রয়েছে হল্যান্ডের। তারপরও ডাচরা কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবনে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বুভুক্ষা মোকাবেলায় নতুন নতুন পথের পথিকৃৎ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই দশক আগে ডাচরা অঙ্গীকার করেছিল সম্পদ যা আছে তার অর্ধেক কাজে লাগিয়ে দ্বিগুণ খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। দেশের জমির অর্ধেকেরও বেশি তারা কৃষি ও হর্টিকালচারে ব্যবহার করছে। তারা  প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতিতে না গিয়ে অসাধারণ সব গ্রীন হাউস কমপ্লে−ক্স বানিয়েছে। কোন কোনটি ১৭৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা। জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত এই গ্রীন হাউস খামারগুলোর বদৌলতে সুমেরু বৃত্ত থেকে মাত্র হাজার মাইল দূরে অবস্থিত হল্যান্ড আজ সকল আবহাওয়ায় টমেটো উৎপাদন করে বিশ্বের শীর্ষ রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।

তারা অর্থমূল্যের দিক দিয়ে বিশ্বের এক নম্বরের আলু ও পেঁয়াজ রফতানিকারক দেশ এবং শাক-সবজির দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক। বিশ্বে সবজি বীজ বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি উৎপত্তি হল্যান্ডে। ডাচরা এখন খাদ্যের ক্ষেত্রে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তৈরি হচ্ছে। তারা মনে করে গত ৮ হাজার বছরের ইতিহাসে সারা বিশ্বের চাষীরা মিলে যত খাদ্য ফলিয়েছে আগামী চার দশক তার চেয়েও বেশি খাদ্য ফলাতেই হবে। কারণ ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর লোকসংখ্যা হবে এক হাজার কোটি, যা আজকে হচ্ছে ৭৫০ কোটি। কৃষির ফলন যদি ব্যাপকভাবে বাড়ানো না যায় এবং তার পাশাপাশি পানি ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমানো না যায় তা হলে এক শ’ কোটি কি আরও বেশি লোক বুভুক্ষার সম্মুখীন হবে। ক্ষুধাই হতে পারে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জরুরী সমস্যা।

সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ডাচরা ব্যাপক খাদ্য উৎপাদনে ঝুঁকছে। ২০০০ সাল থেকে আধুনিক গ্রীন হাউসে খাদ্য উৎপাদনে নিয়োজিত হল্যান্ডের অনেক কৃষক প্রধান প্রধান ফসল উৎপাদনে পানির ওপর নির্ভরশীলতা ৯০ শতাংশ কমিয়ে নিয়েছে। গ্রীন হাউস রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার তারা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে সেখানে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু উৎপাদকরা এ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ৬০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

কৃষিতে নেদারল্যান্ডসের এই বিস্ময়কর বিপ্লবের পেছনে মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করছে আমস্টারডামের ৫০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ওয়াজেনিনজেন ইউনিভার্সিটি এ্যান্ড রিসার্চ বা সংক্ষেপে ডব্লিউইউআর। এটি বিশ্বের শীর্ষ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই উদ্ভাবিত হচ্ছে কৃষির নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল। এখানকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন আফ্রিকায় খরা আছে। পানির সঙ্কট আছে। এটা কোন সমস্যা নয়। পানি সঙ্কট মৌলিক সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে নিম্নমানের বা অনুর্বর মাটি, যেটা মাটির পুষ্টিকর উপাদানের অভাবে হয়।

এই সমস্যাও কাটিয়ে ওঠা কোন ব্যাপার নয়। এমন উদ্ভিদ চাষ করুন যেগুলো কিছু ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করে মাটির নিজস্ব সার তৈরি করে দেবে। গবাদিপশুর খাবার দানাদার শস্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। কোন সমস্যা নেই। ওদের ঘাসফড়িং কি গঙ্গাফড়িং খাওয়ান। এক হেক্টর জমিতে এক মেট্রিক টন সম প্রোটিন মেলে। একই পরিমাণ জমি থেকে ১৫০ টন ইনসেক্ট প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে। এই হলো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। নেদারল্যান্ডসের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে আছে ভবিষ্যতের টেকসই কৃষি কি রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে তারই চেহারা। হাজার হাজার সাধারণ পারিবারিক খামার গড়ে উঠেছে সেখানে, আছে স্বয়ংসম্পূর্ণ খাদ্যের ব্যবস্থা। মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও প্রকৃতির সম্ভাবনাময় শক্তির মধ্যে প্রায় নিখুঁত ভারসাম্য বিরাজ করে সেখানে।

ডাচরা যে গ্রীন হাউস টমেটো বাগান গড়ে তুলেছে সেগুলো বড়ই বিচিত্র ও বিস্ময়কর। কোন কোনটি একরের পর একর জুড়ে বিস্তৃত। গাড় সবুজ এই বাগানগুলো ২০ ফুট উঁচু। টমেটো গাছগুলোর শিকড় মাটিতে নেই, বরং ব্যাসাল্ট ও চকের আঁশের মধ্যে।

গাছগুলো টমেটোর ভারে নুয়ে আছে। নানা জাতের টমেটো একটা বাগানে। ১৫ রকম পর্যন্ত আছে। যার যেমন পছন্দ সেদিকে দৃষ্টি রেখে এগুলোর চাষ হচ্ছে। খামারগুলো সর্বক্ষেত্রে সম্পদের দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

গত তিন দশক ধরে ডাচ টমেটো শিল্প উৎপাদনের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানে আছে। অন্য যে কোন দেশের তুলনায় সেখানে প্রতি বর্গমাইলে অধিক টমেটো উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ফলন ৫০৫৬২ মেট্রিক টন। অথচ টমেটো চাষের এলাকার দিক দিয়ে বিশ্বে দেশটির স্থান ৯৫ নম্বরে। মাত্র ১৭.৮ বর্গকিলোমিটার জায়গায় টমেটোর আবাদ হয়।

পশ্চিম ইউরোপের শেষ যে দেশটি দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে পড়েছিল সেটি নেদারল্যান্ডস। সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছরে জার্মান দখলদারির সময়। সেই দুর্ভিক্ষে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার লোক মারা গিয়েছিল। তারপর থেকে ডাচরা দুর্ভিক্ষকে বিদায় দিয়েছে। তারা বরং এখন বিশ্ববাসীকে খাওয়াচ্ছে।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com