অভাবকে জয় করে বিসিএস ক্যাডার

প্রকাশের সময় : 2019-08-28 17:53:10 | প্রকাশক : Administration
অভাবকে জয় করে বিসিএস ক্যাডার

আমার ছেলেবেলা, স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে মাথাভাঙা তীরবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরের পলাশ পাড়ায়। অভাবকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। অভাবের কারণে বাড়ির পাশের কিন্ডারগার্টেন স্কুল থাকলেও পড়তে হয়েছে দূরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমি যখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি; তখন খাতা কেনার অভাবে মা আমাকে ক্যালেন্ডার দিয়ে খাতা বানিয়ে দিতেন। আমি তার পেছনের পাতায় লিখতাম। এমনকি পরিচিতজন ও আত্মীয়ের পুরনো বই পড়ে স্কুল জীবন শেষ করেছি।

জীবনে প্রথম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি নবম শ্রেণিতে ওঠার সময়। বাবা ও শিক্ষকরা চেয়েছিলেন আমি যেন বিজ্ঞানে পড়ালেখা করি। কিন্তু আমার একমনে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অন্যমন আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় অর্থনৈতিক চিন্তার কথা। বিজ্ঞানে বেশি প্রাইভেট পড়তে হবে বলে আমি মানবিকে ভর্তি হই। আর তখনই আমি সিদ্ধান্ত নেই- মানবিক থেকে জীবনে ভালো কিছু করবো এবং স্বপ্ন দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ার। পরবর্তীতে চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে মানবিক বিভাগে আমার নিজ স্কুল এবং জেলা সদর থেকে আমিই প্রথম জিপিএ ৫ পেয়ে পত্রিকায় নাম উঠাতে সক্ষম হয়েছিলাম।

এরপর আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমি বোর্ড বৃত্তি, জেলা পরিষদ বৃত্তি, জেলা প্রশাসকের অনুদান এবং আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় ২০০৮ সালে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন; যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উদ্দেশে ঢাকা শহরে কোচিংয়ের জন্য আসি। ঢাকায় কোচিংয়ে ভর্তি করানোর জন্য পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ ছিল না। কিন্তু জেদ ধরাতে বাবা জমি বন্ধক রেখে টাকা দেন কোচিংয়ে ভর্তি হতে।

এরপর ঢাকা শহরে প্রথম আসাতে এখানকার আবহাওয়া মানিয়ে নিতে না পারায় টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হই। বাড়িতে ফিরে যখন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছিলাম; তখন আমার এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। আমি জিপিএ ৪.৯০ পেয়ে চরমভাবে ভেঙে পড়ি। ফলাফল কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। তবে এ ভাঙামন আমাকে নতুনভাবে তাড়না দেয় এবং মনে দৃঢ়তা এনে দেয়। আমি তিনদিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরি, তখন কেবল কোন রকম দাঁড়াতে পারি। পরদিনই ঢাকা ফিরে আসি। আমার শিক্ষা জীবনে রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, অসুস্থতা কখনও আমার উপস্থিতিকে দমাতে পারেনি। এরপর আমি প্রথমবারেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকেই কঠিনতম সংগ্রামে প্রবেশ করি। ভর্তির পর হলের বাইরে থেকে লেখাপড়া নিয়মিত করা বেশ কঠিন ছিল। তবে এ যাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকার বড় ভাইয়ের সাহায্যে শুরুতেই রোকেয়া হলে উঠি। কিন্তু প্রথম বর্ষে কোন টিউশন না পাওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের শিক্ষা ঋণের শরণাপন্ন হই। কিছুদিনের মধ্যেই একটি টিউশনের ব্যবস্থা হয় মালিবাগে। একটা টিউশনে বই কেনা, লেখাপড়া, খাওয়া খরচসহ অন্যান্য খরচ চালানো কষ্টকর ছিল। এজন্য আমি পায়ে হেঁটে রোকেয়া হল থেকে মালিবাগ আসা-যাওয়া করতাম। তবে এ কষ্ট আমার তেমন কষ্টকর মনে হতো না। কষ্ট হয়েছিল তখন; যখন নভেম্বর-ডিসেম্বরে বাচ্চাদের পরীক্ষা শেষ হলে টিউশন বন্ধ থাকতো।

একবার বছর শেষে টিউশন না থাকায় শীতের ছুটিতে বাড়ি যাই। কিন্তু ছুটি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে পারছিলাম না। ছিল না বাস ভাড়ার টাকা। তখন টিউশন মিডিয়ার বাবু ভাইয়ের কাছে ফোন করে খুব কেঁদেছিলাম। তিনি তখন ২টি টিউশনের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর থেকে আমার আর কখনো টিউশনির অভাব হয়নি। আমি একজন মেয়ে হয়ে ঢাকার বুকে দুপুর ২টা থেকে একটানা রাত ৮টা পর্যন্ত মিরপুর, মালিবাগ, মগবাজার, জাহাঙ্গীর গেট টিউশনি করেছি। অন্যদেরকেও টিউশন দিয়ে সাহায্য করেছি।

জীবনের সাথে সংগ্রাম করতে করতে সিদ্ধান্ত নিলাম কারো ওপর নির্ভরশীল হওয়ার। জীবনের বাকি স্বপ্নগুলো একসঙ্গে পূরণ করার। সুন্দর মনের একজনকে পেয়েও গেলাম। নিজের ইচ্ছা ও পরিবারের সম্মতিতে আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলাম। এরপর এমএ ভর্তির পর আমার শরীরে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব টের পেলাম। তারপর অর্থনৈতিক সংগ্রামকে পেছনে ফেলে শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। আমার তখন একমাত্র লক্ষ্য- যেভাবেই হোক এমএ শেষ করবো এবং একটি সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেবো।

কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তখনই; যখন শুনলাম আমার ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ ও ডেলিভারির তারিখ একই সময়ে। ইতোমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আমি পরীক্ষা দিচ্ছি আর ধানমন্ডিতে ডিএমসির কনসালটেন্টের পরামর্শে প্রতিটি পরীক্ষার শেষে হাসপাতাল থেকে হয় ব্লাড নতুবা হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর ইঞ্জেকশন নিয়ে বাসায় ফিরতাম রাত ৯-১০টার সময়। পরীক্ষার হলে আমি কখনও বসে, কখনও দাঁড়িয়ে, কখনও বা হেঁটে পরীক্ষা শেষ করেছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে ভাইভার পরদিন আমার একটি মেয়ে হলো।

এরপর শুরু হয় স্বপ্নকে ছোঁয়ার লড়াই। যখন প্রথম ৩৫তম বিসিএস পাই, তখন মেয়ের বয়স মাত্র ৪ মাস। আবেদন করেও প্রস্তুতি না থাকায় পরীক্ষা দেইনি। ৩৬তম বিসিএসের সময়ও মেয়েকে সময় দিতে গিয়ে পড়ার সুযোগ মেলেনি। অবশেষে স্বামী মোঃ নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা, পরামর্শ ও সহযোগিতায় আমার মা-বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে আসলাম।

এরপর শুরু হলো ৩৭তম বিসিএস প্রস্তুতি। এমনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম যে, সুযোগ পেয়েছি একটাই। সুতরাং কোন ত্রুটি রাখা যাবে না। দিন-রাত পড়াশোনা করতাম। মেয়েকে মায়ের কাছে নিশ্চিন্তে রেখে সকাল ১১টায় কোচিংয়ের লাইব্রেরিতে চলে যেতাম। ফিরতাম রাত ৯টায়। এরপরের সময়টুকু মেয়ের জন্য বরাদ্দ রেখে আবার রাত ১২টা থেকে ৩-৪টা পর্যন্ত পড়তাম। বলা যায়, লেখাপড়ার প্রতি একপ্রকার আসক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। এমন সময় পার করছিলাম যে, স্বামীর সাথে একই বাসায় থেকেও সপ্তাহে দু’একদিন দেখা হতো শুধু সময়ের অভাবে।

মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগতো! তখন স্বামী বোঝাতো, ‘আর কিছুদিন কষ্ট করো। এরপর তো শুধু তুমি আর আমি আর আমাদের বাস্তবায়িত স্বপ্ন।’ এ সময়ে মায়ের সহায়তার কথা কী-ই বা বলবো! মা ছাড়া আমার সব অর্জন নস্যি। অবশেষে স্রষ্টার অশেষ কৃপায় প্রথম প্রস্তুতিতেই প্রথম চাকরির প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা উত্তীর্ণ হয়ে ৩৭তম বিসিএস এ প্রশাসনে ৫৭তম অবস্থান নিয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। -রওশনা জাহান লিজা, জাগো নিউজ

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com