নয়নাভিরাম দুর্গাসাগর দীঘি

প্রকাশের সময় : 2019-08-28 17:54:05 | প্রকাশক : Administration
নয়নাভিরাম দুর্গাসাগর দীঘি

বাপ্পী মজুমদারঃ চারিদিকে বনবিহার। বিভিন্ন বৃক্ষের সমাহার। ভিতর দিয়ে সরু পথ। বনবিহারের মাঝখানে বিশাল জলরাশি। তারমধ্যে দ্বীপ। সবুজ গাছপালায় পাখিদের কিচিরমিচির। পুকুরের পশ্চিম ও উত্তর তীরে বিরাট সানবাঁধানো ঘাটলা। আরো পাকা ঘাটলা ছিল পূর্ব-দক্ষিণ পাড়ে। যা বিলীন। পুকুর এলাকার প্রবেশ দ্বারে রয়েছে ছাতার মত বটবৃক্ষ। যার চতুর্দিকে গোলাকৃতি বাঁধানো। রয়েছে মিনি পার্ক। যেখানে বিচরণ করে হরিণ, বানর।

নয়নাভিরাম এই দুর্গাসাগর দীঘি যেকোন ভ্রমন পিপাসুর মন কেড়ে নেবে সহজেই। অঘোষিত পর্যটন কেন্দ্র দুর্গাসাগরের সৌন্দর্য অবলোকন করতে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য লোক আসেন এখানে। চোখ জুড়ানো  দুর্গাসাগর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে তীর্থ স্থান। প্রতিবছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথীতে এই সম্প্রদায়ের মানুষ পাপ মোচনার্থে  দুর্গাসাগরে গঙ্গা স্নান করে পুন্য অর্জন করেন। এই সময়ে ওখানে  গ্রাম্য মেলা বসে। সমাগম ঘটে হাজার হাজার পুণ্যার্থীর।

বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নে অবস্থিত দুর্গাসাগর। দুর্গাসাগরের রয়েছে নানা ইতিকথা। রাণী দুর্গাবতী ছিলেন রাজা শিব নারায়নের স্ত্রী। তার দুই পুত্র লক্ষী নারায়ন ও  জয় নারায়ন। স্বামী শিব নারায়নের মৃত্যুর পরে পুত্র জয় নারায়ন বালক রাজা হন। ওই সময়ে রাণী দুর্গাবতী রাজ্য পরিচালনা করতেন। তিনি ছিলেন প্রজা হিতৈষী। প্রজাদের সুপিয় জল পানের সুবিধার্থে  তৎসময়ের ৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দীঘিটি খনন করান। রাণী দুর্গাবতীর নামানুসারে দীঘিটি দুর্গাসাগর বলে খ্যাত। জনশ্রুতি আছে, পেছন ফিরে না তাকানোর শ্রুতি অনুযায়ী রাজমাতা দুর্গাবতী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যতদূর হেঁটে যেতে পারবেন, সেই পর্যন্ত দীর্ঘি খনন করা হবে। রাজমাতা ৬১ কানি জমি অতিক্রম করার পর রাজ কর্মচারীদের ঘোড়ার ডাকের শব্দের’ কেউ-বা বলেন, পেছনে থাকা রাজকর্মচারীদের ঢোলের আওয়াজে দুর্গাবতী পেছন ফিরে তাকান। অমনি সেই স্থানে নিশান গেড়ে দীঘি খননের কাজ শুরু হয়। দীঘিটি খনন করার পর হিমালয় পর্বতের মানস সরোবরের পবিত্র জল এনে দুর্গা পূজার মাধ্যমে সেই জল ঢেলে দীঘি উদ্বোধন করা হয় চৈত্রের চতুর্দশী তিথিতে। তার পর থেকেই এই স্থান পবিত্র স্থান বলে পরিণত হয় এবং ঐ তিথিতে মানুষ এই স্থানে আসে পুন্য অর্জন করতে।

ইতিহাস মতে, বরিশালের আদি নাম চন্দ্রদ্বীপ। চর্তুদশ শতকে রাজা দনুজ মর্দন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ বংশের পঞ্চম রাজা জয়দেব। তার কোন পুত্র সন্তান ছিল না। একমাত্র কন্যা রাজকুমারী কমলাদেবী। কমলাদেবীকে বিয়ে করেন বর্তমান বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ থানার অর্ন্তগত দেহেরগতি গ্রামের উষাপতির পুত্র বলভদ্র বসু। রাজা জয়দেবের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় জামাতা বলভদ্র বসু চন্দ্রদ্বীপের এ রাজ্য লাভ করেন। তখন চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী ছিল বাকলা (বর্তমান পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার প্রাচীন নাম)। বলভদ্র বসুর প্রপৌত্র রাজা কন্দর্পনারায়ন ১৫৮৪ সনে বরিশাল জেলার বর্তমান বাবুগঞ্জ উপজেলা সদর সন্নিকটে ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামে রাজধানী স্থানান্তর করেন।

১৫৮৪ সনে নতুন রাজধানী নির্মানের মাত্র পনের বছর পরই রাজা কন্দর্পনারায়ন কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বিদ্রোহ ঘোষনা করলে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লীর মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর চন্দ্রদ্বীপের বিদ্রোহ দমনের জন্য এ রাজ্য আক্রমন করেন এবং রাজধানীর সন্নিকটে কথিত গাজীর দিঘীর পাড়ে মোঘল বাহিনীর সাথে কন্দর্পনারায়ন বাহিনীর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে রাজা কন্দর্পনারায়ন ও তার বাহিনীর পরাজয় হয়। রাজা কন্দর্পনারায়ন যুদ্ধে আহত ও পরবর্তীতে মৃত্যুবরন করেন।

তখন রাজ্যের শাসনভার চলে যায় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। চার বছর পর রাজা কন্দর্পনারায়নের পুত্র রাজা রামচন্দ্র কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সন্ধি করেন এবং পুনরায় রাজ্য লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৬০২ সনে মাধবপাশায় রাজধানী স্থাপন করেন। রাজা রামচন্দ্র যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের কন্যা বিমলা সুন্দরীকে বিয়ে করেন। অত:পর চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ন ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দে তার স্ত্রী দুর্গারানীর প্রতি অগাধ ভালবাসার গভীরতা প্রমানের জন্য এবং এলাকাবাসীর পানি সংকট নিরসনের জন্য মাধবপাশায় ঐতিহাসিক এ দিঘীটি খনন করান। তার স্ত্রী দুর্গারানীর নামানুসারে এ দিঘীটির নামকরন করেন দুর্গাসাগর।

ব্রিটিশ সরকারের খাজনা / করের দায়ে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের জমিদারীর একাংশ নিলাম হয়। তৎকালে একজন বিখ্যাত বনিক জনৈক রাম মানিক্যমোদি নিলাম ক্রয় সূত্রে জমিদারীর মালিক হন। বর্তমান মাধবপাশা বাজারের উত্তর দিকে সামান্য দূরে কথিত জমিদার বাড়িটির ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। ১৭৯৯ সনে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বরিশাল বিভাগের প্রাচীন নাম ছিল চন্দ্রদ্বীপ। প্রাচীন বাকলার সর্বশেষ রাজধানী মাধবপাশার উপকন্ঠে ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর বিদ্যমান।

দুর্গাসাগর দীঘির আয়তন ৪৫.৪২ একর। এর মধ্যে ২৭.৩৮ একর জলাশয় এবং ১৮.৪ একর পাড়। ওয়াকিং ট্রাকের দৈর্ঘ্য ১.৬ কি:মি:। বছরের বারো মাসেই বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সমাগম ঘটে এখানে। কয়েক বছর আগেও শীত মৌসুমে বিদেশী পাখির আগমন ছিল। দিনের বেলায় দীঘির জলে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার বিদেশী পাখি ভেসে থাকতো। তবে এখন আর শীতকালীন পাখির সমাগম হ্রাস ঘটে না।  ঘোর সন্ধ্যার সময় খাদ্য সংগ্রহের পর ঝাঁকে ঝাঁকে ঘরে ফেরা  পাখিদের  দৃশ্য সত্যিই মনোরম।

জলরাশির চারপাশে টিলার মত উঁচু পাড়ে বন বিভাগের তদারকিতে ফলজসহ নানাবিধ বৃক্ষের মাঝ পথ দিয়ে চলতে খুব ভাল লাগবে। আর চলতে চলতে ক্লান্ত হলে একটু জিরিয়ে নিতে পারবেন খানিক দূরে দূরে নির্মাণ করা দর্শনার্থী বিশ্রামালয়ে। নয়নাভিরাম দুর্গাসাগরে বিশাল জলরাশি, ছায়া ঢাকা বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ বৃক্ষের সমাহার, পাখিদের কলকাকলী সত্যিই আপনার চিত্তকে আরো উৎফুল্লিত করে তুলবে। এছাড়াও মাধবপাশায় আরো দেখা যাবে চন্দ্রদ্বীপ রাজবংশের ধ্বংসাবশেষ স্থাপত্য শিল্প। প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখানে আসে শিক্ষা সফরে। শীত মৌসুমে পিকনিক করতে আসা অগনিত মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মাধবপাশা।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com