হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৩ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-09-12 23:42:02 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৩ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আওয়াজটি আজও কোথায়ও না কোথায়ও, কারো না কারো কাছে পরিচিত। কেউ না কেউ গলা ছেড়ে ডেকে উঠে। যেখানেই দলবেঁধে রাতজেগে পাহারা থাকে, সেখানেই এই আওয়াজ। মধ্যবাজারের বটতলা থেকে লাঠি উঁচিয়ে জনাপাঁচেক লোকের আমাদের দলটিও ‘বস্তিওয়ালা জাগোরে’বলতে বলতে এগুতে লাগলাম। যেমন তেমন বিষয়! ধলা বাজার পাহারা! নিজেকে বড় বড় লাগছে। একটা হামভরা ভাব। যেন  সাক্ষাত চকিদারের দল। কুচ পরোয়া নেহী। একটা একটা ডাকাত ধরবো; আর একটা একটাকে কাঁচা খাবো। শুধু একবার হাতের কাছে পেলে হয়।

ভীষণ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমা। এমনি  ভঙ্গিমায় খালি পায়ে লুঙ্গিকাছা  দিয়ে এগুচ্ছি। মারাত্মক বিপদজনক ডাকাতদের মোকাবেলায় এগুচ্ছি। কাছা দেয়া ছাড়া উপায়ও নেই; ঠিকভাবে মুভ করা যায় না। দলনেতার ডাইরেক্ট অর্ডার। লুঙ্গি পড়ে দৌঁড়ানো যায় না। আমরা আপাতত দৌঁড়াচ্ছি না; হাঁটছি। তিনটি দল তিন দিকে চলে গেছে। তারা তিনদিক পাহারা দেবে। আমরা চতুর্থ দল যাচ্ছি বাজার থেকে সোজা পূর্বদিকে; ধলা হাইস্কুলের মাঠের দিকে। ঐ দিকটার দেখভাল আমরা করবো।

ধলা স্কুলের মাঠের কাছে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের সামনে পৌঁছে আবার একটা বড় আওয়াজ দিলাম। গভীর রাতে হুংকার মার্কা কঠিন দলীয় আওয়াজ। গভীর রাত মানে কুটকুটে অন্ধকার রাত। অন্ধকার হচ্ছে মানুষের সাহস কমার কিংবা বাড়ার সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ। মহসিনও পরিবেশের সুযোগ নিল। ওরটা কমলো না; বাড়লো। গলাও বেশ চড়া। তবে কাইয়ুমের মতো না; কাইয়ুমের আওয়াজ ভিন্ন। সাইজে ছোট কিন্তু আচরণে খুবই এগ্রেসিভ। হাম্বিতাম্বি ছাড়া কথাই নেই। কথার ধরণও মারাত্মক; ডাকাইতের ঘরের ডাকাইত! খালি সামনে আয়; কিলাইয়া ভুতা বানাইয়া ফালামু। সামান্য অন্ধকারে দুইহাত একা যাবার মুরোদ নাই যার, সে বানাবে ভুতা!

শুনে রম্মোভাই হাসেন। দলনেতা রম্মোভাই। হাবভাবেও দলনেতা; ভাবসাবেও সিরিয়াস। পাহারার ব্যাপারে খুবই একটিভ। নিজের কতটুকু সাহস আছে বোঝা না গেলেও আমাদেরকে সাহস দেন খুব। কিন্তু কথায় জড়তা আছে বলে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ তার নিজের সাহস নিয়ে। তবে বিষয়টি কাউকে বুঝতে দেন না; কেবল নির্দেশ দেন। তার নির্দেশেই এখানে কিছ্ক্ষুণ লম্ফঝম্ফ দিয়ে স্কুলের পূর্ব-উত্তর কোণা ঘুরে কালিবাড়ীর পুকুর ঘাটে বিশ্রাম নিতে গেলাম।

কালিবাড়ীর মন্দির বরাবর কংকালসার ভাঙ্গা পুকুরঘাট। দেখে বোঝার উপায় নেই এটা বহুকাল আগে জমিদারের বানানো। বেশ চমৎকার করেই বানানো। তবে এখন সেই জৌলস আর নেই। এখানে সেখানে ভেঙ্গে এবরো থেবরো হয়ে আছে। কোনমতে একবার নামলে উপরে উঠা যায় না। আবার উঠলে নামাও যায় না। তবুও এলাকার মানুষের গোসলের একমাত্র ভরসা এই পুকুর এবং পুকুর ঘাট। আড্ডাবাজদেরও আড্ডার জন্যে তীর্থ জায়গা। এখানে জম্পেস আড্ডাও হয়; বিশ্রামও হয়।

আজকের পাহারায় বিশ্রাম রম্মো ভাইয়েরই বেশী দরকার। একটু হাঁটলেই হাঁফিয়ে ওঠেন। কোমরে হাত দিয়ে বলেন, ইস! ব্যথা!! রম্মোভাই ইউনিয়নের নির্বাচিত মেম্বার। বড় জনপ্রিয় মেম্বার। নির্বাচনে দাঁড়ালেই পাশ। এলাকাশুদ্ধ মানুষ তাকে ভোট দেয়। তার নামটাও চমৎকার এবং রহমতের; রহমত আলি মেম্বার। কিন্তু এত চমৎকার নামের উপরও মানুষের কী ভীষন অবিচার! সঠিকভাবে নামটাও উচ্চারণ করে না। করে রম্মো মেম্বার বলে। বিকৃত করে। একটু বিকৃত না করলেই যেন নয়।

এটা অবশ্য সারা বাংলার মানুষেরই স¦ভাব। যে দেশের মানুষ স্বাধীনতার ইতিহাসকেই বিকৃত করতে পারে, তারা সামান্য একটা নাম বিকৃত করতে পারবে না! এটা একটা কথা হলো! এটাই তো আমাদের স¦ভাব। আর রহমত ভাইয়ের স¦ভাব ছিল হাত খুলে টাকা খরচের। টাকাও ছিল, খরচও করতেন। আয় রোজগার মন্দ ছিল না। বাজারে ব্যবসাও ছিল। লুঙ্গির গাটে টাকা ভাঁজ করে ঘুরতেন; কচকচা কাঁচা টাকা। দশটাকা, পাঁচটাকার নোটে গাট ভরা থাকতো। দেখলেই চোখ চক চক করে উঠতো আমাদের। ফন্দি করতাম টাকা খসানোর।

খসাবার কাজটা আমিই করতাম। রহমত ভাইকে একটু পটালেই খসাতে পারতাম। মিষ্টি তাঁর প্রিয় খাবার। বিশেষ করে অমূল্য মোদকের বাদামী রঙের চমচম। ধলা বাজারে তখন এই একটি দোকানেই চমচম বানাতো। চিনির সিরার উপর চকচক করে ভাসতো। দূর থেকে দেখেই স্বাদ মিটাতাম। চাইলেই সচরাচর খেতে পারতাম না। খাবার জন্যে কঠিন কসরত করা লাগতো। রহমত ভাইয়ের সাথে ততটা লাগতো না। একটু পটানিতে ফেলতে পারলেই রাজী হয়ে যেতেন। তবে শর্ত থাকতো। আগে পাহারা;

 ঠিকঠাক মত পাহারা। শেষে চমচম।

রম্মো ভাইয়ের মত কাজ শেষে কোনদিনই কিছু খাওয়াতে পারতেন না আমাদের হেডমাষ্টার তৈয়্যব স্যার। সামর্থ্য থাকলে তো খাওয়াবেন! স্কুলের তখন কঠিন দূর্দিন। আয় নাই বললেই চলে। ছাত্রদের মাসিক বেতন দিয়ে শিক্ষকদের বেতন কোনভাবেই দেয়া যায় না। আজকের মত তখনকার দিনে এমপিওভুক্ত স্কুলের বিষয়টিও ছিল না। সরকার শিক্ষকদের কোন বেতনই দিত না।

তাই হেডস্যার চাইলেন স্কুলের সম্পত্তি কাজে লাগিয়ে কিংবা ভাড়া দিয়ে শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করবেন। স্যার পাগলের মত পরিশ্রম করতে লাগলেন। দখলদারদের দখলে থাকা কালিবাড়ী পুকুরের আশেপাশের স্কুলের বিশাল সম্পত্তি উদ্ধার করে আমাদেরকে নামিয়ে দিলেন। বিশাল দীঘি কাটায় নামিয়ে দিলেন। ধর্মঘটের কারণে স্যাররা ক্লাশ নেন না। আমরাও ফ্রি, তাই প্রতিদিন নিয়ম করেই সব শিক্ষার্থীর দল দীঘি কাটি।

কোঁদাল, কুড়াল, শাবল; হাতের কাছে যা পাই তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যাকে বলে। এতো মাটি কাটায় ঝাঁপিয়ে পড়া নয়; একটা স্বপ্নের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়া। স্বপ্ন ধলা হাই স্কুলকে নিয়ে। হাই স্কুলের স্বপ্নের দীঘি। তাই কেউ কোঁদাল ধরি, কেউ শাবল। কেউ বড় বড় মাটির টুকরা তুলে এনে পাড়ে ফেলি। কেউ বা টুকরিতে ভরে মাথায় করে মাটি এনে পাড়ে ফেলি। আমি মাথায় করে মাটি টানার দলে। কোঁদাল ধরা বেশ কঠিন কাজ। শক্তির দরকার হয়। হাতে ফোঁসকাও পড়ে। তাই মাথায় টানি। ওটা বরং অধিকতর সহজ। কাজ শেষে মাথা ঝারা দিলেই ময়লা পরিস্কার। ময়লা মেয়েদের দলও অনেক মেখেছে। ওরাও বাদ থাকেনি। ওরা হাতে হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে মাটি টেনেছে। একটা পবিত্র কাজ; পবিত্র দায়িত্ব। তাই মনপ্রাণ দিয়ে টানতে পেরেছে। ঘটনাটা ১৯৮১ সালের। অনেক আগের কথা। তাই আজকের প্রজন্ম যেমন কিছুই জানে না; তখনকার প্রজন্মও মনে রাখতে পারেনি। নিজেদের স্কুলটাকে গড়ার কাজে এই ভূমিকাটাকে কেউ মনে রাখেনি।

কেউ মনে রাখবে এই আশায় আমরা কাজে নামিনি। হেডস্যার স¦প্ন দেখিয়েছেন। আমরা সেই স¦প্নে লাফিয়ে পড়েছি মাত্র। একটা উৎসবের আমেজেই লাফিয়ে পড়েছি। সত্যি উৎসব ছিল। একটা উৎসব উৎসব ভাব। প্রতিদিন দু’ঘন্টা করে টানা দু’মাস মাটি কেটে কেটে এরূপ উৎসব উদ্যাপন করলাম। কাজ প্রায় শেষের দিকে। পুরোনো কালিবাড়ীর ছোট্ট পুকুরসহ নতুন করে কাটা পুকুরটি মিলে একটা বিশাল দীঘির রূপ নিতে যাচ্ছে।

অন্তত ঐ ছোট্ট বয়সে তেমনটাই মনে হতো। ছোট বয়সে সব কিছুকেই বড় বড় মনে হয়। ছোটখাট ভয়কেও বড় বড় ভয় মনে হতো। একদিন এমন ভয়   পেয়েও ছিলাম। কোঁদাল দিয়ে মাটি কাটছে কবির; আমাদের লুৎফুল কবির। এক মনে কেটেই চলেছে। ঘামে মাথা এবং গায়ের শার্ট ভিজে একাকার। আমি ততটা না। টুকরি নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছি। আবার মাটিতে কোপ কবিরের। হঠাৎ মাটির ভিতর কী যেন ফোঁসফোঁস করে উঠলো!

বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই মাটি ফুরে মাথা বের করলো সাপ! বিষধর গোখরা সাপ মাথা বের করে ফণা তুলে কেবলই ফোঁসফোঁস করছে। আমরা ছিটকে সরে পড়লাম। যে যেভাবে পারছি, সেভাবেই পালালাম। বিশাল সাপটি গর্ত থেকে বেরিয়ে এল। কেবল একটি নয়, দুটি নয়, পর পর চারটি সাপ বেরিয়ে এল। ভয়াবহ অবস্থা তৈরী হলো সারা পুকুরে। আতংক আর ভয়ে সবাই অস্থির।

এগিয়ে এল কেবল রফিজ আর মোখলেস। হাতে থাকা লাঠি দিয়েই পিটিয়ে চারটা সাপকেই ঠান্ডা করে দেয়া হল। নিভিয়ে দেয়া হলো ওদের জীবন প্রদীপ। কিন্তু নির্মূল হলো না সন্দেহ। সন্দেহ হলো ওই গর্তে আরো সাপ থাকার। এবার ওখানে খুব সাবধানে গর্ত খোড়া শুরু হলো। কোঁদালের একেকটা কোপ যেন জীবনের এক একটা হুংকার। আর প্রতিটি কোপে বেরিয়ে আসতে লাগলো একের পর এক গোখরার ডিম। একেকটা ডিম ভাঙ্গে আর বেরিয়ে আসে ছোট্ট কিন্তু ফণা তোলা জীবন্ত গোখরার ভয়ংকর বাচ্চা। চলবে......

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com