সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বাড়তি তেল চালের দাম

প্রকাশের সময় : 2019-12-02 10:01:46 | প্রকাশক : Administration
সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বাড়তি তেল চালের দাম

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বাড়তি তেল চালের দাম

অসাধু চক্রের (সিন্ডিকেট) কব্জায় দেশের নিত্যপণ্যের বাজার। এ চক্রের কারসাজিতে অতি প্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম একের পর এক বাড়ছে। দু’মাস ধরে পেঁয়াজের বাজার বেসামাল করে রাখার পর চক্রটি এখন হাত দিয়েছে চাল ও ভোজ্যতেলে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম পড়তি। এরপরও দেশের বাজারে লিটারে ৫-১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ক’দিন ধরেই ধানের দাম কমছে স্থানীয় বাজারে। অথচ মিলারদের কারসাজিতে তিন সপ্তাহ ধরে সব ধরনের চাল কেজিতে ৬-১০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। শীতের সবজিতে ঠাসা বাজার। তবু দাম আকাশছোঁয়া। দুই সপ্তাহ ধরে ময়দা কেজিতে ৬ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ডাল, ডিম ও আদা-রসুনের দামও ঊর্ধ্বমুখী।

এ পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্য কিনতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভোক্তারা। নিুবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও আয়ের সব টাকা চলে যাচ্ছে খাওয়া খরচে। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো সেই শক্তিশালী কারসাজি চক্রই এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় অধরাই থেকে গেছে চক্রটি।

চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে রাজধানীর বড় বড় পাইকারি বাজার তদারকি করতে তিনটি কমিটি গঠন করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি চাল সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ জানাতে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সুমন মেহেদীর সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে রোববার বিকালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠক করে। বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ বলেন, উৎপাদন ও আমদানি বাড়লে পেঁয়াজের দাম কমে যাবে। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে হবে। পেঁয়াজের আমদানি শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সেখানে ছিলেন।

রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার ও রামপুরা কাঁচাবাজারে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খোলা সয়াবিন প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ৮৫-৯০ টাকা, যা দাম বাড়ার আগে ছিল ৭৮-৮০ টাকা। পাম অয়েল লিটারে ৫ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিন রাজধানীর বৃহৎ পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের পাইকারি তেল ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তি। এ ছাড়া বুকিং রেট (এলসি মূল্য) বেড়ে যাওয়ায় প্রতি মণ সয়াবিনে ২০০ টাকা এবং পাম অয়েলে ৩৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যার কারণে বাড়তি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।

তবে এ তথ্য সত্য নয় বলছে সরকারি সংস্থা ট্যারিফ কমিশন। তারা বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। আর রোববার ‘বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি প্রাইস ডাটা’ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েলের দাম গত তিন মাসে প্রতি টন ৫৮৫-৫৯১ ডলারে ওঠানামা করছে। আগস্ট মাসে প্রতি টন সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৭৯৩ ডলার। যা অক্টোবরে ৭৩১ ডলারে বিক্রি হয়। এ সময়ে সয়াবিনের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে ৬২ ডলার।

কারওয়ান বাজারের এক খুচরা মুদি বিক্রেতা জানান, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিনে ৭-১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণেই খুচরায় দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে এ সময় দাম বাড়ার কথা না। তারা (সিন্ডিকেট) কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এটি স্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়লে একজন আরেকজনের দোষ দেয়। বিষয়টি নজরদারির দায়িত্ব সরকারের। কোনো কারসাজি হলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

রোববার রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এদিন প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫০ টাকা যা তিন সপ্তাহ আগে ছিল ৪২-৪৪ টাকা। নাজিরশাল বিক্রি হয়েছে ৫৫-৫৮ টাকায় যা তিন সপ্তাহ আগে ছিল ৪৪-৪৮ টাকা। বিআর-২৮ বিক্রি হয়েছে ৩৮-৪০ টাকায়, তিন সপ্তাহ আগে যা ছিল ৩৪-৩৫ টাকা। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা বিক্রি হয়েছে ৩৮ টাকা, তিন সপ্তাহ আগে তা বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৩২-৩৩ টাকা।

দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের পাইকারি আড়ত আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মিলাররা কারসাজি শুরু করেছে। তারা সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের কাছে চালের অর্ডার দিলে তারা বাড়তি রেট (দর) আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে। তাই সে দামেই আমাদের আনতে হচ্ছে। বিক্রিও করতে হচ্ছে বাড়তি দরে।

রোববার কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার ও রামপুরা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৩০-২৪০ টাকা। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ছয় দিন ধরে এ দামে বিক্রি হচ্ছে। এদিন মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০০-২১০ টাকা। মিসরের পেঁয়াজের দাম একটু কমলেও এখনও ১৫০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া চীন থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকা কেজি দরে। দেশি নতুন পেঁয়াজ (মুড়িকাটা) বিক্রি হয়েছে ১১০-১২০ টাকা। আর পেঁয়াজ পাতা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে।

কারওয়ান বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা রকিবুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। এর মধ্যে চাল ও ভোজ্যতেলের দামও বাড়তি। বাড়তি দরের কারণে সবজিতেও হাত দেয়া যাচ্ছে না। আমরা সাধারণ মানুষ কী করে চলব!

নয়াবাজারে আসা বেসরকারি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে জীবনযাপন করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। একটি পণ্য কিনলে আরেকটি কেনার টাকা থাকছে না। মাস শেষে যে বেতন পাই তা দিয়ে সংসারের জরুরি খরচ বাদ দিয়ে খাবারের জন্য যে টাকা রাখা হয়, তা দিয়ে পুরো মাস চালাতে পারছি না।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ড. গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের একাধিক সংস্থা থাকলেও সেগুলো তেমনভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। ফলে ভোক্তাদের নাভিশ্বাস বাড়ছে। তাই দাম নিয়ন্ত্রনে মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, অধিদফতরের পক্ষ থেকে প্রতিদিন বাজার তদারকি করা হচ্ছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, চাল ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন স্তরে তদারকি করা হচ্ছে। এ সময় মোকাম থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোনো অনিয়ম পেলেই কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

চালের বাজার দেখভালে ৩ কমিটি : খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সুমন মেহেদী যুগান্তরকে বলেন, চালের বাজারে ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকসহ দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে বাজার স্থিতিশীল হয়ে এসেছে। এটা যাতে অব্যাহত থাকে এ জন্য তিনটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। যেখানে সাধারণ মানুষ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

সুমন মেহেদী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর বড় বড় পাইকারি বাজার সরেজমিন তদারকি, বাজার দর সংগ্রহ এবং তা খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদফতরে জানানোর জন্য এ মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক কমিটিতে আছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (বৈদেশিক সংগ্রহ) মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, খাদ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (চলাচল) উৎপল কুমার সাহা ও সংগ্রহ বিভাগের উপ-পরিচালক সাইফুল কাবির খান।

আরেক কমিটির সদস্যরা হলেন- খাদ্য অধিদফতরের প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ফারুক হোসেন, উপ-পরিচালক (সাইলো) মো. নাজিম উদ্দীন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব নুরুল ইসলাম শেখ। তৃতীয় কমিটিতে আছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শেখ নুরুল আলম, খাদ্য অধিদফতরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন ও উপ-পরিচালক (উন্নয়ন) মু. রকিবুল হাসান।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জেলা প্রশাসকরা মনিটরিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। খাদ্য অধিদফতরের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও বাজার মনিটরিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. নুরুল ইসলাম শেখকে কন্ট্রোল রুমের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, খাদ্যশস্যের বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রবণতা রোধ, নিুআয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এ বিষয়ে সার্বিক তথ্য এবং যে কোনো মতামত বা অভিযোগ থাকলে তা জানাতে (নম্বর : ০২৯৫৪০০২৭, ০১৬৪২৯৬৭৭২৭) সর্বসাধারণকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

হবিগঞ্জ ঝালকাঠিতে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু : আমাদের হবিগঞ্জ ও ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রোববার দুপুরে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন দুই জেলা প্রশাসক। খবর পেয়ে মুহূর্তেই ভিড় লেগে যায়। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, প্রতিদিন এখানে ৪ টন পেঁয়াজ বিক্রি হবে। ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী জানান, টিসিবির দু’জন ডিলার এখানে পেঁয়াজ বিক্রি করবেন। - সূত্র: অনলাইন

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com