হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বিজ্ঞান বিষয়ক সবগুলো প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা শেষ করে প্রিয় ধলা থেকে বিদায় নিতে আরো কয়েকটা দিন লেগে গেল। এমনিতে টুকটাক বিদায় অনেকবার নিয়েছি। স্কুল ছুটিতে ঢাকার বাসায় গেছি; ছুটি শেষে আবার ফিরেও এসেছি। সবই সাময়িক বিদায়। তবে এবারেরটা একেবারেই অন্যরকম। স্থায়ী বিদায়। বিশেষ কোন কারণ না ঘটলে হয়ত আর ফিরে আসা হবে না। নেয়া হবে না এ মাটি ও বাতাসের ঘ্রাণ। তাই এ বিদায়টা ভিন্ন স্বাদের; ভিন্ন আঙ্গিকের।

ঠিক করেছি খুব ভোরের ট্রেনে নয়, ফোরটি ফোর ডাউনেই রওনা দেবো। ময়মনসিংহ-ঢাকা লোকাল ট্রেন। দূপুরের পরপরই আসে। লোকজনে খুব গাদাগাদি করে আসে। তারপরও মজা আছে। টিকিট না কাটার মজা। ধলা থেকে কাটা লাগে না। কেউ কাটে না। ট্রেনে উঠে বসে পরলেই হয়। যাত্রাপথের একেবারে শেষে ধীরাশ্রম থেকে টংগীর টিকিট কাটলেই কেল্লা ফতে। মোটে একটা ষ্টেশন। বলা যায় ফ্রি জার্নি। বুদ্ধির জার্নি।

বুদ্ধি থাকলে বাংলাদেশে টাকা লাগে না। পৃথিবীর সব দেশে লাগে। বিদেশে বুদ্ধিও লাগে; টাকাও লাগে। আবার ট্রেনের সঠিক সময়ও থাকা লাগে। বাংলাদেশে ট্রেনের সঠিক সময়ও থাকা লাগে না। যখন মন চায় তখন ট্রেন আসে। তবে ভাল দিক হলো, দেরীতে হলেও আসে; নিশ্চিত আসে। আর মানুষ তাতেই খুশী। ফোরটি ফোর ডাউন রোজ লেট করে আসলেও মানুষ খুশী। মানুষের সয়ে গেছে। ফোরটি ফোর ডাউনের আসার কথা সকাল দশটায়। কিন্তু আসতে আসতে দূপুর একটা বাজিয়ে দেয়।

সকালে ওঠার তাড়া নেই বলে এপিঠওপিঠ করে একটু দেরীতেই উঠলাম। মাসীমাও ডাকেননি। পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে মাসীমা আমায় ডাকেন না; ঘুমুতে দেন। গেল প্রায় একটা বছর মাসীমা আমাকে নিয়ম করে ঘুম থেকে জাগিয়ে পড়তে বসিয়েছেন। কখনো আগেভাগে ঘুমিয়ে পরেছি তো মাসীমার ডাক। পড়ার শব্দ থেমে গেলেই মাসীমা বুঝতেন। শাহীন, শাহীন বলে ডেকে তুলতেন। পাশের ঘর থেকে বলতেন, ঘুমায় না বাবা! উইট্টা পর তাড়াতাড়ি।

মাসীমা কখনো আমার ঘরে আসতেন না। কাল রাতে এলেন। কাশার প্লেটে করে আনা লাড়ু হাতে দিয়ে বললেন, খাও বাবা! আমি নিজে বানাইছি। মাসীমাকে চেয়ারে বসিয়ে আমি চুকচুক করে লাড়ু খাওয়া শুরু করলাম। আমার খুব পছন্দের লাড়ু! মাসীমা গভীর আনমনে আমার খাওয়া দেখছেন। কিন্তু চোখের জল সামলাতে পারেননি। আমি না দেখার ভান করছি। কিন্তু লাভ হয়নি। চেয়ার থেকে উঠে আমায় জড়িয়ে ধরে হাঁউমাঁউ করে কেঁদে ফেললেন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলো। মাসীমা তাঁর ছেলে শংকরের মতই আমায় স্নেহ করতেন। সব সময় খোঁজ খবর রাখতেন। অনেক সময় কাটিয়েছি তাঁর সাথে। অনেক গল্প। এলোমেলো সেসব গল্প ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ি।

ঘরের বাইরে কড়া রৌদ্রের আভা। বেলা হয়েছে বেশ। আড়মোড় ভেঙে দরজা মেলতেই দেখলাম আমছরকে। দরজা বরাবর বারান্দার মাটিতে মাথা নীচু করে চুপ হয়ে বসে আছে। আমছর; আমার সকল কাজের নিত্যদিনের সঙ্গী। টুকটাক ফুটফরমায়েশ খাটা ছোট্ট মানুষ। আমার তিন বছরের ছায়াসঙ্গী; সেবাসঙ্গী। মাবাবা আর ছোট ভাইকে নিয়ে ৭৪ সালের দূর্ভিক্ষে জামালপুর থেকে স্বপরিবারে ধলায় এসে স্থায়ী হয়েছে।

আজ মুখে কোন হাসি নেই আমছরের। মলিন মুখে মাটিতে লেপটি মেরে বসেই আছে। দুটো টাকা দিলাম পুরি আনতে। ধলা বাজারের বিখ্যাত নসোমুন্সীর পুরি। টাকায় তিনটি করে মোট ছয়টি পুরি এনে দু’জনে খাবো। সাথে এক্সট্রা ডালের মশল্লা। স্বাদের ধরণই আলাদা। সকালের নাস্তার জন্যে এর চেয়ে মহাস্বাদের আর কিচ্ছু হয় না। কাগজে মোড়ানো পুরি এনে টেবিলে রাখলো আমছর। তবে ছয়টি নয়; তিনটি পুরি আনলো।

আমছর খাবে না। ওর খিদে নেই। তাই ওর জন্যে পুরি আনেনি। ঢাহা মিথ্যে কথা। সত্যিটা আমি জানি। ভাল করেই জানি। নিশ্চিত ও কিচ্ছু খায়নি। গত তিনদিন ধরেই ও এমন করছে। আচরণে বেশ পরিবর্তন ওর। মনমরা হয়ে গেছে। আমার বিদায়টা মানতে পারছে না। একা একা কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু বুঝতে দিচ্ছে না। ছোট মানুষ; কোন ভনিতা নেই। অনুভূতি লুকাবার ক্ষমতা নেই।

ক্ষমতা আমারও নেই। খারাপ লাগার বিষয়টি আমিও চাপা দিয়ে রাখতে পারছি না। আজ স্থায়ীভাবে চলে যাবার সময় অনেকের জন্যেই খারাপ লাগছে। কিন্তু আমছরের ব্যাপারটি ভিন্ন। না আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছি; না আমছর পারছে আমার মুখের দিকে তাকাতে। ঘরে দু’জন মানুষ। কিন্তু কারো মুখে কোন কথা নেই। আমি পটাপট একটা পুরি কোনমতে শেষ করে বাকী দুটো পুরি এক এক করে আমছরের মুখে তুলে দিলাম। আমছর বাঁধা দিল না। চুকচুক করে খেয়ে নিল।

আমার কাছ থেকে জীবনে প্রথম পাওয়া এমনি আদর আমছরও সামাল দিতে পারেনি। মুখে তুলে দেয়া পুরি খেয়েছে বটে তবে খেতে খেতে নিজ হাত দিয়ে বারবার মুছেছে চোখের জল। হেসকি দিয়ে কাঁদেনি বটে। তবে গাল বেয়ে ঝরেছে কষ্টের অশ্র“ধারা। সামাল আমিও দিতে পারিনি। কৈশোরের বাঁধভাঙা চোখের জল সামলাতে আমারও কষ্ট হয়েছে। বারবার সরিয়ে নিয়েছি চোখের চাহনি কিংবা ঘুরিয়ে নিয়েছি মুখ। যেন আমছর না দেখে।

ধলা রেলস্টেশন। আমছরসহ স্টেশনে প্রায় সবাই এসেছে। বাদ থাকেনি কেউই। আনোয়ার, মহসিন, হুমায়ুন, কাইউম, মিরাজ, গোবিন্দ; সবাই এসেছে। আমার তিন বছরের ছোট্ট সংসারে মালামাল বলতে তেমন কিছুই নেই। গাট্টিবোস্কা তেমন হয়নি। তবুও সবাই ভাগাভাগি করেই টেনে এনেছে। ট্রেনের খবরও হয়ে গেছে। লাইন্সম্যান ইতিমধ্যেই প্রথম ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছেন। ট্রেন ফাতেমা নগর ছাড়বে ছাড়বে করছে। কিন্তু একজনের দেখা নেই।

মোটামুটি সবাই এসেছে। খোকা, মোখলেস এসেছে। রফিজ কেন আসছে না বুঝতে পারছি না। ওরাও খুঁজছে রফিজকে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। অবশেষে দেখা মিললো। হাতে ছোট্ট পোটলা নিয়ে রফিজ আসছে। জীতেন্দ্রদার দোকানের ছানার পোটলা। নিজে  দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়ে এনেছে। আমাকে খাওয়াবে বলে এনেছে। ছানা আমার খুব প্রিয়; রফিজ জানতো। হাতে দিয়ে বললো, সরদার! তাড়াতাড়ি খাও! তাজা ছানা। তাজা জিনিস তাজা তাজা খাউন লাগে।

হাসিমুখে কথাগুলো বললেও চোখের কোণায় চিকিমিকি জলের রাশি লুকোতে পারেনি রফিজ। বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিলাম ওকে। বন্ধু আমার! একে একে জড়িয়ে নিলাম সবাইকে। ট্রেন এসে পড়াতে সবাই মিলে হুরমুর করে মালামাল উঠিয়ে দিল ট্রেনে। জানালার পাশে একটা সিটও ম্যানেজ করে দিল। এবার ছাড়ার পালা। টং টং টং ঘন্টা বাজছে স্টেশনে। পেছনের বগী থেকে রেলগার্ড বাঁশী বাজিয়ে সবুজ পতাকা উড়াচ্ছেন। এবার ছাড়বেই। আমার তেমন বোধশক্তি নেই। জানালায় মাথা রেখে মলিন মুখে শুধু চেয়ে আছি ওদের দিকে।

ওরাও চেয়ে আছে আমার দিকে। করুণ সব চোখের চাহনি। হুইসেল বাজিয়ে ড্রাইভার ট্রেন ছাড়লেন। আগাচ্ছে ট্রেন। আস্তে আস্তে ঝিকঝিক করে আগাচ্ছে। এখনো প্লাটফরমের সীমানা পার হয়নি। আমি জানালায় মাথা বের করে পেছন ফিরে ওদের সবাইকে দেখছি। যতক্ষণ দেখা যায় দেখছি। এলএসডি গোডাউন ছেড়ে আরো এগিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। আর দেখা যায় না ওদেরকে। রেলগেট ক্রস করছে ট্রেন। আবার হুইসেল। পলক না ফেলা চোখে আমি তাকিয়েই আছি। ধলা বাজারের শেষ অংশটুকুর দিকেই তাকিয়ে আছি।

শেষ দেখা দেখছি। আমার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিমাখা প্রাণের ধলা। ধলা বাজার। শনি ও মঙ্গলবারের হাটের বাজার। নিয়মিতই দূর এলাকার লোকেরা আসবে। গমগম করে উঠবে বাজার। প্রতি সপ্তাহে হাট বসবে। কেবল আমার বসা হবে না। আসা হবে না কোনদিন এই হাটে। ছোটা হবে না হাটের এ মাথা থেকে ও মাথায়। আর কোনদিন পরবে না আমার পায়ের চিহ্ন ধূলোমাখা এই হাটে। মাখবে না হাটের ধূলো সারা গায়ে।

মাথা ঘোরছে আমার! ভোঁ ভোঁ করে ঘোরছে। গায়ের সব শক্তিও নিঃশেষ হয়ে আসছে। আর পারছি না! কিচ্ছু ভাবতে পারছি না! কিছু দেখছিও না। দু’চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। বারবার পলক ফেলেও ঝাপসা কাটাতে পারছি না। যেন বাঁধভাঙা জলের স্রোত নেমেছে। ভরা বর্ষার জল। জল ছলছল চোখে ট্রেনের ভিতর কিংবা বাইরের কিচ্ছু দেখছি না। কিচ্ছু না!! (সমাপ্ত)

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com