হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৭ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ টেস্ট পরীক্ষার নোটিশ পড়েছে। পড়েছে টেস্ট পেপার কেনার ধুমও। স্যারদের আন্দোলন ধর্মঘটও শেষ। শেষ মানে, জোড়াতালি দিয়ে কোনমতে শেষ। শেষ না করে উপায়ই বা কি! খুব সাধাসাধি করে, হাতেপায়ে ধরে মোটামুটি একটা সমঝোতা হয়েছে দুইপক্ষের মাঝে। সমঝোতা এখনও না হলে ধলা স্কুলের অস্তিত্বই বিলীন হবে। আর সর্বনাশ হবে মূলত আমাদের ব্যাচের। এমনিতেই চারমাস পড়াশুনা শুণ্য স্কুল চলেছে। বেশী ক্ষতি যা হবার তা কেবল আমাদেরই হয়েছে। 

তারপরও আমরা খুশী। ভীষণ খুশী। হাফ ছেড়ে বাঁচার মত খুশী। স্কুলে নতুন শিক্ষকও জয়েন করেছেন। তৈয়ব স্যার বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে বাচ্চু স্যারকে জয়েন দিয়েছেন। তিনি সদ্য বিএসসি করা; একেবারেই তরুণ। শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা নেই। তাই আমাদের নয়, জুনিয়রদের ক্লাশ নেবেন। এদিকে আমাদের কোচিং এর আয়োজনও হয়েছে। স্কুলের আঙিনায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোচিং দেবেন সব সিনিয়র স্যারেরা। হালকা শীতের মিষ্টি কিরণে বাইরের ঘাসের কম্পাউন্ডে বেঞ্চ পেতে কোচিং।

স্কুল কতৃপক্ষের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই কোচিং বিষয়টি ছিল ধলা হাইস্কুলের উল্লেখ করার মত এক বিশেষ সৌন্দর্য্য; বিউটি অব ধলা হাইস্কুল। আর এর জন্যেই আমরা সেই ক্লাশ নাইন থেকে অপেক্ষায় থাকতাম। অপেক্ষায় থাকতাম কবে আমরা কোচিং করবো। কী চমৎকার কোচিং এর দৃশ্য। শ্রেণিকক্ষের ভিতরে নয়, বড় ভাইরা শীতের সকালের হালকা রোদে স্কুল কম্পাউন্ডের ভিতরের মাঠের ঘাসে বসে কোচিং নিচ্ছেন। মাথা নীচু করে বইখাতার দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে নিচ্ছেন। স্যারেরাও খুব মনোযোগ দিয়ে তাদেরকে পড়াচ্ছেন। পরীক্ষার উপযোগী করে গড়ে তুলছেন। হাতে কলমে সব শিখিয়ে দিচ্ছেন। টেস্ট পেপার ধরে ধরে শেখাচ্ছেন।

স্কুল আঙিনায় মনোরম পরিবেশে মাত্র কয়েক মাসের এই কোচিং বিষয়টিই ছিল আমাদেরকে চমৎকারভাবে এসএসসি পরীক্ষায় প্রস্তুত করার সর্বোত্তম ব্যবস্থা। সব শিক্ষকগণ হরিহর আত্মা হয়ে দলমিলে পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতেন। কোন শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে কোচিং করাতেন না। সবাই মিলে স্কুলের পাঠদানের অংশ হিসেবেই করাতেন। কোচিং বাবদ স্যারদেরকে সামান্য কিছু অর্থ শিক্ষার্থীরা দিত বটে। তবে শিক্ষকরা নিতে খুব বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন না; বিব্রত হতেন। আবার যে শিক্ষার্থী পারতো না, তাকে দিতে হতো না। তার জন্যে বিষয়টি পুরোপুরি শিথিলযোগ্য ছিল।

কিন্তু কোচিং এ তাকে থাকতেই হতো। এখন দিন বদলেছে। স্কুল আঙিনায় আর কোচিং হয় না। না বাইরের কম্পাউন্ডে, না ক্লাশ রুমে। শুধু কোচিং নয়, পড়াশুনাও হয় না। যা কিছু হয় সব কম্পাউন্ডের বাইরে। বাইরে একেকজন শিক্ষক আলাদা আলাদা কোচিং বানিজ্যকেন্দ্র খুলে বসেছেন। তবে তাদের বানিজ্য কেন্দ্রে কতটুকু পড়াশুনা হয় তা স্কুলও জানে না; নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না। যা হয়, একেবারে প্রাইভেটলি হয়। ব্যাপারটি একটি স্কুলের জন্যে কতটা অসম্মানের কিংবা বিপদজনক বিষয় তা স্কুল আদৌ ভাবে বলেও মনে হয় না।

আমার প্রাণপ্রিয় স্কুলটির রেজাল্ট দেখলে তাই মনে হয়। বিশেষ করে এ বছর, মানে ২০১৯ সালের রেজাল্ট। ধলা হাইস্কুল এন্ড কলেজের এবারের এসএসসির রেজাল্টে বিপর্যয় হয়েছে। মহা বিপর্যয় যাকে বলে। ভয়াবহ রকমের খারাপ ফল হয়েছে। হয়েছে পাশ আর ফেলের মধ্যে হাড্ডা হাড্ডি লড়াই। এবং লড়াইয়ে জিতেছে ফেল। পাশ যেমনি শতাধিক; ফেলও শতাধিক। অর্ধেকের বেশী ফেল। পাশের গফরগাঁও উপজেলার গড় পাশের হার যেখানে নিম্নে ৮২%, সেখানে ১২৮ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্কুলটির পাশের হার ৪৮% মাত্র। এরচেয়ে লজ্জাস্কর খারাপ ফলাফল আর কীইবা হতে পারে।

হবে না কেন? হবার মত কারণের কি অভাব? তবে একদিনে এই অবস্থা হয়নি। দিনে দিনে হয়েছে। স্কুল ম্যানেজমেন্টের প্রতিটি স্তরে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার অভাবেই এমনটা হয়েছে। গেল অনেকগুলো বছরে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে খুব বাজে ভাবে। স্কুলে শিক্ষক প্রয়োজন, তাই দেখেশুনে বাছবিচার করে কাউকে নিয়েছে এমনটি নয়। এলাকায় কেউ একজন বেকার আছে, জোড়াতালি দিয়ে পাশ করা গ্র্যাজুয়েট বেকার। মেলা দিন ধরে কর্মহীন। সারাদেশে কোথায়ও তার কোন গতি হয়নি।

গতিহীন এমন মানুষটির গতি করে দেয়ার দায়িত্ব নেয় পরিচালনা পরিষদ। দায়িত্ব বলতে কথা! আফটার অল সামাজিক দায়িত্ব। তাই শুরু হয় কুচুর কুচুর, ফুচুর ফুচুর। শুরু হয় দৌঁড়ঝাঁপ; ঘুরঘুর। এতে সুবিধে হয় কর্মহীন মানুষটির। স্কুলে ঢোকার জন্যে সে তো আগে থেকেই ঘুরঘুর করছে। এবার তার দাবী জোরালো হয়। গোপন চুক্তি হয়। কথা হয় ফাইনাল। তাকে নিতেই হবে। যোগ্যতা থাক বা না থাক, কায়দা করে শেষমেষ তাকেই নিয়েছে।

আইনের ফাঁকফোকর দিয়েই নিয়েছে। আর ভাবখানা এমন করেছে যেন এখানে কারো কোন হাত নেই। ডান হাতও নেই; বাম হাতও নেই। সবাই নিরপেক্ষ। এমনি চতুরতায় যা হবার তাই হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটার বারোটা বেজেছে। স্কুলের কোয়ালিটির সাথে যায় না এমন শিক্ষকই নিয়োগ পেয়েছে একের পর এক। এতে করে যারা নিয়োগ পেয়েছে কিংবা দিয়েছে, সবাই সন্তুষ্ট হয়েছে। ভীষন সন্তুষ্ট হয়েছে। শুধুমাত্র বঞ্চিত হয়েছে শিক্ষার্থীরা; বঞ্চিত হয়েছে এলাকাবাসী। 

বঞ্চিত না হবার কোন কারণও নেই। গলদ তো ব্যবস্থাপনা পরিষদ নির্বাচনেই। স্কুলের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার নামে যে ব্যবস্থাপনা পরিষদ আছে তার নির্বাচনেই আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। এই পরিষদে ভোটে নির্বাচিত অভিভাবক সদস্যদের সামান্যতমও ভূমিকা থাকে না। কমিটিতে মূল ক্ষমতা যাদের হাতে, তারা একজনও নির্বাচিত নয়। শুভঙ্করের ফাঁকিকে কাজে লাগিয়ে তারা গদিনসীন হয়। কেবল আমার স্কুলে নয়, সারাদেশেই হয়। সরকারের করা আইনের মারাত্মক দূর্বলতাতেই হয়।

আইনের এই দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এবং সামাজিক প্রতিপত্তির মূরোদ খাটিয়ে গদিতে যে কেউ আসীন হতে পারছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন তোয়াক্কা করতে হচ্ছে না। যিনি কোনদিন কলেজে ভর্তিও হননি, তিনিও অবলীলায় কমিটিতে ঠাঁই পাচ্ছেন। ঠাঁই পাচ্ছেন স্কুলের গন্ডি পেরুতে না পারা মানুষও। ধলা স্কুল এন্ড কলেজের গর্ভনিং বডি। তারা কলেজ পরিচালনা করবেন। অথচ তাদের অনেকেরই কলেজে পড়ার রেকর্ডও নেই। এরচেয়ে দুঃখজনক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে!

সব কাজ যেমনি সব জায়গায় করা যায় না, তেমনি সব কথা সব জায়গায় বলাও যায় না। আজকে এত কথা এখানে বলাটা ঠিক হলো কিনা সেটাও বুঝতে পারছি না। কী করবো! ধলা স্কুলের নেগেটিভ সংবাদ পেলে কষ্ট লাগে। এই জায়গাটি তো আমার শৈশবের পুরোটা জুড়ে আছে। হারানো শৈশব কুড়াতে গেলে এই নামটি চলে আসে। বলতে না চাইলেও আসে। ইচ্ছায় আসে, অনিচ্ছায় আসে। বারবার আসে।

কয়েক বছর আগের কথা। আমার সব কাজের ফাঁকে একটি বিশেষ কাজ ছিল ধলা স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র কিংবা শিক্ষক কাউকে না কাউকে ফোন দিয়ে কথা বলা। দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই থাকতাম ফোন দিতাম। আমার বাচাল স্বভাবের কারণে কথা একবার শুরু করলে আর থামতে পারতাম না। কখন যে সময় পেরিয়ে যেত টের পেতাম না। কলেজটিকে নিয়ে কঠিন স্বপ্ন দেখতাম। জেগেও দেখতাম; ঘুমিয়েও দেখতাম।

আসলেই ব্যাপারটা ঠিক হয়নি তখন। কোন কিছুকে এত ভালবাসতে নেই কখনো! এটি এখন বুঝি। অথচ এটা বোঝার পরেও এখনো আমার ইচ্ছে করে দেশে এলেই কিংবা সময় পেলেই আমার শৈশব কৈশোরের স্মৃতিমাখা প্রাণের আঙিনায় চলে যেতে; সব শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে জম্পেস আড্ডা দিতে। ইচ্ছে করে ওদের সাথে সারাদিন বসে গল্প করে কাটিয়ে দিতে। ইচ্ছে করে সমাজের সবাইকে নিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে।

ইচ্ছে করে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে কলেজটিকে গড়তে। আর খুব ইচ্ছে করে বলতে, আসুন না সবাই মিলে কলেজটিকে একটু ভালবাসি; সার্বিকভাবে এর উন্নতি করি; বদলে দেই আমাদের মাতৃরূপী কলেজের পুরোনো আঙিনা নতুন করে! কারণ একমাত্র ভালবাসাই পারে সব কিছু সুন্দর করে বদলে দিতে!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com