করোনা দিনের ডায়েরি...

১৬তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

স্বস্তির কথা জনগণের কাছে নেই বললেই চলে। প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়া; যাই বলি না কেন, তন্ন তন্ন করে খুঁজেও করোনা নিয়ে স্বস্তির কোন কথা পাই না। বাস্তবে করোনা নিয়ে হালকাপাতলা কিছু কিছু স্বস্তির কথা বিশ্বব্যাপী আলোচনায় থাকলেও দেশের মিডিয়ার কৌশলী খেলায় সে সব ব্লাকআউট থাকে সব সময়। ফলত জনগণ জানতে পারে না। জনগণ জানে শুধু অস্বস্তির সংবাদ।

আমার ঢাকা অফিসের সহকর্র্মী মেয়েটির আজকের হন্তদন্ত ফোনকল অন্তত তাই বলে। কাজের কথা বলবে কি! ফোনটা ধরেই হাউমাউ কান্না। ‘‘এইবার তো স্যার আমরা শেষ! আর হয়ত দেখা হবে না!!, বলেই কান্না। ক’দিন আগে ওর মোটামুটি অল্প বয়সী চাচা করোনায় মারা গেছেন। ভাবলাম আবার ওর কোন নিকটজনের কিছু হলো কি না। বাবাকে নিয়েও বিস্তর টেনশান ছিল মেয়েটির। আমি নিমিষেই হাজারটা ভেবে ফেললাম।

একটাও মিললো না। আমাকে খুব একটা ভাবার সময় না দিয়েই মেয়েটি কান্নার সূত্র তুলে ধরলো। সাংঘাতিক ভয়ার্ত ভাষায় আফ্রিকা থেকে দেশের কক্সবাজার অবধি পৌঁছে যাওয়া পঙ্গপাল নিয়ে মোটামুটি একটা বিভিষীকাময় চিত্র তুলে ধরলো। কক্সবাজার মোটামুটি শেষ। মানুষ পালাচ্ছে এলাকা ছেড়ে। গাছপালাও খেয়ে প্রায় সাবার। এরপর এগুবে চট্রগ্রাম হয়ে ঢাকার দিকে।

আমি হাসবো, না কাঁদবো; বুঝতে পারছিলাম না। কেবল এটুকু বুঝেছিলাম মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে একেবারে কাহিল হয়ে গেছে। ওর ভীষণ ভয় বাবা-মাকে নিয়ে। বাসার বড়দের নিয়ে এই ভয় এখন ঘরে ঘরে। ভয়ে কাহিলও সবাই। করোনা নিয়ে খারাপ সংবাদ দিতে দিতে পুরো জাতিকে কাহিল করে দিয়েছে মিডিয়া। এবার করলো ছোট্ট এই মেয়েটিকে। তবে শেষ করতে পারেনি। বরং দু’মাসে করোনা নিজেই কাহিল হয়ে শেষের পথে।

অবশ্য বাংলাদেশে কাহিল করোনা ঢুকেছে বলেও কেউ কেউ অনুমান করেন। এরও কারণ আছে। চারদিকে যা শুনি তাতে এই অনুমান ফেলে দেবার মত নয়। তবে অনুমান যাই হোক, বাঙালির হাগুমুতু ছুটাতে পারলেও শুরু থেকে এ পর্যন্ত তেমন ধ্বংসলীলা চালাতে পারেনি করোনা। ইউরোপ আমেরিকায় চালালেও বাংলার জমিনে তেমন সুবিধে করতে পারেনি। বস্তির শহর ঢাকার দু’মাসের বাস্তবচিত্র অন্তত তাই বলে।চিত্র বদলের চেষ্টায় করোনা ফেল করলেও মরিয়া হয়েছে মিডিয়া। যেভাবেই হোক, জাতিকে আতঙ্কের মধ্যে রাখতে হবে। তাই নানাভাবে খোঁজাখুঁজি করে আরব মরুভূমি থেকে ধরে এনেছে পঙ্গপালকে। ওয়াও! এবার কেল্লা ফতে। করোনা না পারুক, পঙ্গপাল নিশ্চয়ই পারবে। মানুষকে দুর্ভিক্ষে না খাইয়ে মারবে। অতএব আটঘাট বেঁধেই শুরু করলো প্রচার। আতঙ্কপ্রিয় বাঙালি নড়েচড়ে বসলো। এইবার শেষ! আর রক্ষা নেই। নিশ্চিত নিশ্চিহ্ন করে দেবে বাংলার শস্যভান্ডার। বলে আহাজারী শুরু করলো।

মিডিয়াকে বাড়তে দিল না সরকার। এগিয়ে এলো। পঙ্গপাল নিয়ে তথাকথিত মিডিয়ার উদ্যোগ শুরুতেই গুঁড়িয়ে দিল। সরকার আসলেই বিপদে। নানা ফ্রন্টে যুদ্ধ। শুধু করোনার সাথে নয়, নানা বিষয়ের সাথে। করোনায় বাংলাদেশের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে শিল্প-অর্থ-বাণিজ্য সব কিছুতেই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। যার প্রভাব পড়েছিল কৃষিতে। সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের ফলে কৃষির বড় বিপত্তি কাটিয়ে এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন কৃষকরা।

মিডিয়া এসব দেখে না। তেমন করে দেখায়ও না। পরিস্থিতির শুরুর দিকে যেখানে জমিতে থাকা বোরো ধানের পরিণতি নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন সবাই, সেখানে এখন রীতিমতো বোরোর বাম্পার ফলনের খবর মিলছে দেশজুড়ে। এমনকি করোনার ভেতরই আবার আগাম বন্যার আশঙ্কায় মুষড়ে পড়া হাওরের মানুষের মুখেও এখন হাসি ফুটেছে। সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শ্রমিক নিয়ে হাওরের ধান কাটায় মিলেছে নজিরবিহীন সাফল্য।

এটা চরম খুশির খবর। খুশির আরো খবর হলো, এরই মধ্যে হাওরের ৯০ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়েছে। অন্য এলাকায়ও একইভাবে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশাল এক উৎসবমুখর কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এবার সোনালি ধান ঘরে তুলছেন হাওরবাসী। এবারের মতো এমন উৎসাহ উদ্দীপনায় হাওরে ধান কাটা দেশের ইতিহাসে কখনও দেখা যায়নি।

দেশের ইতিহাসে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুততার সাথে জীবন রক্ষাকারী ঔষধও আগে কখনো বের হতে দেখেনি জাতি। এবার দেখেছে। উৎপাদনে নেমেছে করোনাস্বীকৃত দুটো ঔষধ “আমেরিকার রেমডেসিভির”এবং “জাপানের পিরাভির বা এভিগান”। দেশের চিকিৎসকগণ ইতিমধ্যেই এভিগান প্রেসক্রিপশন দেয়া শুরু করেছেন। আগামী দিন সাতেকের মাঝে রেমডেসিভিরও দেবেন।

অগোছালো পরিস্থিতি কাটিয়ে দেরীতে হলেও করোনাভাইরাস পরীক্ষায় আগ্রহী মানুষের বিড়ম্বনা কাটাতে উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত মান সংরক্ষণেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেশেই করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় বিশ্বব্যাপী আলোচিত এবোলার ঔষধ রেমডেসিভির উৎপাদন শুরু হয়েছে। আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যে এ ঔষধ পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসকে খুঁজে বের করে পাল্টা হানা দিয়ে মেরে ফেলতে পারে এমন এন্টিবডি তৈরি হয়েছে ইসরায়েলে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমনটাই দাবি করছেন। তাঁর দাবি, করোনা চিকিৎসায় এযাবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার এই এন্টিবডি। সোমবার এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেন, এক ক্লোনবিশিষ্ট এই এন্টিবডি তৈরি করেছে ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল রিসার্চ। করোনা ভাইরাসের বাহকের শরীরে এই এন্টিবডি প্রবেশ করালে, তা খুঁজে বের করে প্রতিহত করবে করোনা ভাইরাসকে।

ইতিমধ্যেই এই এন্টিবডি তৈরির ফর্মুলা তাঁরা পেটেন্ট করেছেন। এর পরে আন্তর্জাতিক কোন সংস্থাকে এই এন্টিবডি তৈরি করার জন্য অনুমতি দেওয়া হবে। ইসরায়েলে করোনা গবেষণায় প্রথম থেকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল রিসার্চ। করোনা থেকে আরোগ্য লাভ করা রোগীর শরীরের রক্ত পরীক্ষা, ভ্যাকসিন অনুসন্ধান, পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন সংস্থার গবেষকরা।

বসে নেই যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডের টিকা সেপ্টেম্বরে আসবে বলে ঘোষণা হয়েছে আজ। এতে বিশ্বাস রাখছে প্রায় পুরোবিশ্ব। অক্সফোর্ড বরাবরই টিকা গবেষণায় পৃথিবীখ্যাত। বহু জটিল রোগের টিকা আবিস্কারের রেকর্ড তাদের আছে। টিকা আবিস্কারে অনেকদূর এগিয়েছে আমেরিকার ফাইজার এবং মডার্না। তারাও অক্টোবরে গণহারে টিকা প্রয়োগ করতে পারবে বলে প্রচন্ড আশাবাদী।

আশাবাদী আমিও। যথেষ্টভাবে করোনাকে মোকাবেলা করা যাবে এসব দিয়ে। এটা আমার বিশ্বাস। বিশ্বাস না করেই বা কি করবো? ভয়ে মরবো! দেশে করোনা আছে সত্যি। কিন্তু এসবে এত ভয় দেখিয়ে লাভ কি? করোনা মোকাবেলায় যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে। ঔষধ আসছে, বাম্পার ফসল ঘরে তোলা হয়েছে। যথেষ্ট খাদ্য মজুদ আছে এবং ধ্বংসলীলা বলতে তেমন কিছুই হয়নি। তারপরও আতঙ্ক নিয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হবে? আর কত? এখনো কি অফেন্সিভ খেলার সময় হয়নি? আর কত ডিফেন্সিভ খেলবো? আর কত ঘরে বসে থেকে আতঙ্কে মরবো!

মরবোই যখন, আতঙ্কে মরবো কেন! করোনাকে মাঠে ময়দানে ফেস করেই মরবো। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, করোনা তত আতঙ্কের নাম নয়। আতঙ্কের নাম মিডিয়া। করোনা নিজে যত না আতঙ্ক দিচ্ছে, মিডিয়া দিচ্ছে তার চেয়ে ঢের বেশি। আমি নিশ্চিত, করোনা একদিন থাকবে না। চলে যাবে। কিন্তু মিডিয়া যাবে না। আমাদেরকে কোন না কোন আতঙ্কে রাখার জন্যে মিডিয়া এই বাংলায় অনেক অনেক দিন থাকবে! হয়ত থাকবে চিরদিন!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com