হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৯ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ শৈশব আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণের এমনি সব হাসিমাখা কষ্ট, দুরন্তপনার আনন্দ, আর দুষ্টামিভরা মজার দিনগুলো আমার খুব বেশীদিন টেকেনি। স্থায়ী হয়নি রাতের অন্ধকারে এর গাছের রস আর ওর গাছের ডাব চুরি করে খাওয়া। এসব কাজ কতটা অন্যায় ছিল তা বিবেচনা করার বোধশক্তিও তখন আমার হয়নি। হবার কথাও না। তারুণ্য তো এমনই। তারুণ্য খুব সাহসী হয়। হয় কিছুটা অন্ধও। ভালমন্দ বিচার করতে পারে না। বুঝতে পারে না।

আমিও বুঝতে পারিনি দিনগুলো কত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। এসএসসি পরীক্ষা যে এসেই গেছে টের পাইনি। ভাবতে ভাবতেই এসে গেল। শুনলাম ঢাকা শিক্ষা বোর্ড রুটিন দিয়ে দিয়েছে। হুরোহুরি করে পত্রিকা খোঁজা শুরু করলাম। বোর্ড কন্ট্রোলার গাজী আবদুস সালাম স্যারের সাইন করা নোটিশ ইত্তেফাকেও ছাপা হয়েছে। গোটা গোটা অক্ষরে ছাপা। মার্চের দুই তারিখ প্রথম পরীক্ষা। শেষ হবে ২৪শে মার্চ।

বুকে ধক করে ওঠা একটা চাপ অনুভব করলাম। আফটার অল পাবলিক পরীক্ষা। যতই হালকা ভাবে নেই না কেন; জীবনের সবচেয়ে দামী পরীক্ষা। আগেও পাবলিক পরীক্ষা দিয়েছি; ফাইভ এবং এইটের বৃত্তি পরীক্ষা। তখনও চাপ ছিল। কিন্তু এখনকার চাপটা আলাদা রকমের। একেবারে হৃদয় থেকে আসা চাপ। কিছুটা হালকা হাহাকার মাখা। সন্ধ্যা পর্যন্ত বিকেলের লম্বা ঘুম ঘুমিয়ে জাগবার পরে যেমন হালকা কষ্টমাখা হাহাকার লাগে, ঠিক তেমন।

হাহাকার যতই লাগুক, প্রস্তুতি নিতে হবে। অনেক প্রস্তুতি। এসএসসির পড়াশুনার প্রস্তুতির পাশাপাশি আরো কিছু প্রস্তুতিও আছে। ঢাকা থেকে আব্বা টাকা পাঠিয়েছেন। অনেক দিনের আশা আর অপেক্ষা। পরীক্ষা উপলক্ষে নতুন প্যান্ট শার্ট বানাতে হবে। ছোটবেলা থেকে অনেক নতুন শার্ট পড়েছি। কিন্তু নতুন প্যান্ট এই প্রথম। ভীষন একসাইটেট আমি। এদিকে আব্বার পাশাপাশি শামীম ভাইয়া ঘড়িও পাঠিয়েছেন। অসম্ভব সুন্দর চকচকে হাতঘড়ি। জীবনে পাওয়া প্রথম ঘড়িটা বারবার হাতে দেই; নেড়েচেড়ে দেখি আর খুলে ফেলি। বিদায় অনুষ্ঠানে প্রথম পড়ে যাবো বলেই খুলে ফেলি। আগেভাগে পড়বো না; পড়লে পুরানো হয়ে যাবে।পুরোনো প্যান্ট নিয়ে আগেও গফরগাঁও গেছি। অলটার করে বানিয়ে পড়বো এই আশায়। তখনও গফরগাঁয়েও ভাল টেইলার্স হয়নি। হবে কিভাবে? নতুন কাপড়ে নতুন প্যান্ট বানাবার কাস্টমার থাকলে না হবে! যে দু’চারটা টেইলার্সে প্যান্ট বানাবার কারিগর থাকতো তাদের ভরসা ছিল পুরানো প্যান্ট কেটে নতুন করে বানানোর অর্ডার। বাবা কিংবা বড়ভাই গোছের কারো কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ বছর ব্যবহার করা পুরানো প্যান্ট নিয়ে আসতো অলটার করে নতুন কারো জন্যে বানাতে।

আমার পুরানো প্যান্টের জোগানদাতা ছিলেন কালাম ভাই। কথায় কথায় জোগান দিতেন না। আমি তাঁর পরনের পুরানো প্যান্টটাকেই বছর দুই আগ থেকে টার্গেট করতাম। টার্গেট করে অপেক্ষায় থাকতাম। কবে তিনি নতুন প্যান্ট বানাবেন সেটার অপেক্ষায়। এভাবে সময় যায়। কেবল মাস নয়, বছরও যায়। তাঁর নতুন প্যান্ট আর বানানো হয় না। আর আমারও হয় না শিশু মনের আশা পূরণ।

আব্বার পাঠানো টাকা নিয়ে তাই ময়মনসিংহ শহরেই গেলাম। খুব আনন্দ নিয়েই গেলাম। তবে আনন্দ ফিকে হতে সময় লাগলো না। মহা মুশকিলে পড়ে গেলাম। এ দোকান ও দোকান ঘুরে ঘুরেও কাপড় পছন্দ হয় না। পছন্দ হয় তো বাজেটে মেলে না। আবার বাজেটে মিলে তো পছন্দ হয় না। মধ্যবিত্তের এই এক সমস্যা। টানাটানি করে জীবন চালানো মধ্যবিত্তকে টানাটানি করেই পছন্দের কাজটাও সারতে হয়।

আমিও সারলাম। অনেকটা তাড়াহুড়া করেই সারলাম। অলকা সিনেমার পাশের টেইলারের দোকানে কোনমতে মাপটা দিয়েই সোজা দৌঁড়। এক দৌঁড়ে পূরবী সিনেমা হলে। দৌঁড় না দিয়েই বা উপায় কি! সময় তো যায় যায় করছে। আমজাদ হোসেনের “জন্ম থেকে জ্বলছি” ছবিটি চলছে। মিস করি কিভাবে? ববিতা এবং বুলবুল আহমেদ জুটির সেরা ছবি, জনপ্রিয় ছবি জন্ম থেকে জ্বলছি। তবুও দেরী হয়ে গেল। এক’দুটা সিন হয়ে যাবার পরে ঢুকেছি। সাদা কালো ছবি। কিন্তু অপরূপ তার নির্মাণশৈলী।

ছবির গানগুলো তখনও এবং এখনও প্রবল জনপ্রিয়। সামিনা নবী আর আবদুল হাদীর গাওয়া তুমুল জনপ্রিয় সে সব গান। মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। আমিও চেষ্টা করেছি গাইতে। গলায় ওঠে না। ফ্যাসফ্যাসে গলায় গান তো ভাল, কথাও ঠিকমত বলা যায় না। বাবা বলে গেল, আর কোনদিন গান করো না। কেন বলে গেল। সেই কথাটি বলে গেল না। কী দারুণ গান! আমায় আজো খুবই নস্টালজিক করে দেয় যখন কোথায়ও শুনি, একবার যদি কেউ ভালবাসতো, আমার নয়ন দুটি জলে ভাসতো আর ভালবাসতো!!! সবার চোখ জলে ভাসিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে বিদায় অনুষ্ঠানের জন্যে স্কুল আঙিনা টোটালি প্রস্তুত। আমাদের বিদায় দেবে। তাই আমরা বিদায়ীরা এসেছি ভিন্ন সাজে, ভিন্ন মুডে। বাকীরা স্বাভাবিক মুডেই আছে। স্বাভাবিক পোশাকে, স্বাভাবিক মুড। মাঝের পার্টিশান খুলে দক্ষিণ দিকের তিনটা টিনশেড ক্লাশরুমকে এক করা হয়েছে। সবাই বসেছে গাদাগাদি করে। শীতের দিন হওয়াতে রক্ষা। বারান্দায় মাইক লাগানো হয়েছে। ওটাতে অবিরত বেজে চলেছে বিদায়ী গান, “বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা এবার দাও বিদায়...!!!”

অনুষ্ঠানের প্রতি সবার যত না আগ্রহ, তার চেয়ে ঢের বেশী আগ্রহ টিচারস্ রুমের দিকে। ভাবনার মূল কেন্দ্র তো ওটাই। ওখানেই এনে রাখা হবে আজকের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষন মিষ্টি আর জিলাপী। ড্রামভর্তি রসগোল্লা আর পাতিভর্তি গুড়ের জিলাপী রাতভর ধলা বাজারে বানানো হয়েছে। সাথে নিমকী আর গজাও থাকবে। আজকে হিসেব ছাড়া সেসব খাওয়ার দিন। বাকীদের থাকলেও বিদায়ীদের খেতে কোনও হিসেব নেই। বিদায়ীরা পেট পুরে গলা পর্যন্ত খাবে।

গলা ছেড়ে বক্তারা বক্তৃতা করে যাচ্ছে। অবশ্য এসবে শিক্ষার্থীদের মন নেই। ওরা এক একজনের বিদায়ী বক্তৃতা শুনছে আর মাঝে মাঝেই তাকিয়ে বাইরে খেয়াল করছে মিষ্টিভর্তি ড্রাম এসে পৌঁছেছে কি না। স্যারদের সেদিকে খেয়াল নেই। তাঁরা বক্তৃতায় মগ্ন। বক্তৃতা করে ফাটিয়ে ফেলতেন সালাম স্যার আর ফিজিক্যাল স্যার। দারুণ বক্তৃতা। বাকী স্যাররাও বলতেন। তবে ফাটাতে পারতেন না। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে গতানুগতিক ধারায় বলতেন। ফিজিক্যাল স্যার কেবলই কাঁদতেন। কাঁদতে কাঁদতে গাল ভেজাতেন, দাঁড়ি ভেজাতেন। এক পর্যায়ে পুরো হলকেও কাঁদিয়ে ছাড়তেন।

ছাত্রছাত্রীদের জন্যে মানুষটির এত মায়া, এত মমতা  ছিল যা আমরা সবাই টের পেয়েছি স্কুল জীবনের পুরো পাঁচটি বছর। কত আদরই না করেছেন। ছোটখাট শাসন যে করতেন না, তা নয়। তবে আদর করতেন বেশী। আদর সবাই করতেন। আদর করতেন বলেই আজ জীবনের এই মধ্য সীমানায় দাঁড়িয়েও তাদের প্রত্যেকের কথা মনে পড়ছে। খুব করে মনে পড়ছে। বাবা-মাকে যেমনি মনে পড়ছে; তাঁদেরকেও ঠিক তেমনি।

অবশেষে মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। স্কুল থেকে বেরুবার সময় হলো। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মূহুর্ত। আজই শেষদিন আমাদের। হয়ত আবারো আসবো এই আঙিনায়। তবে ছাত্র হয়ে নয়। প্রাক্তন হয়ে। মানতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। ভীষন কষ্ট। বুকটা ছিড়ে ছিড়ে যাচ্ছিল। কারো মুখের দিকে কেউ তাকাতে পারছিলাম না। মলিন মুখে এবার কদমবুচি করার পালা। মাঠের মধ্যে মইজ উদ্দিন ভাই, জীতেন দা এবং হালিম ভাইও আছেন। সব স্যাররা লাইন ধরে দাঁড়িয়েছেন। মোজাম্মেল স্যার, জব্বার স্যার, হাই স্যার, বজলুল হক স্যার, ফিজিক্যাল স্যার, আলম স্যার, শংকর স্যার, মুসা স্যার, কার্তিক স্যার, সালাম স্যার, রাজ্জাক স্যার, বাচ্চু স্যার এবং সবশেষে হেডমাস্টার তৈয়্যব স্যার।

একই দিনে এডমিট কার্ডও পেয়েছি করিম কেরানী স্যারের কাছ থেকে। মাঝারি সাইজের সাদা কাগজের কার্ড। রোল নং গফর ৬৬৬৭৫। এখনো চোখে জ্বলজ্বল করে ভাসছে। পরীক্ষার প্রতিটি দিন সকালে কার্ডটা বারবার চেক করে রিক্সায় উঠি। যেন ভুল না হয়ে যায়। ভুল করে ফেলে গেলে পরীক্ষার হলেই ঢুকতে দেবে না। রোজ রিক্সায় করে পরীক্ষা দিতে গফরগাঁয়ে যাই। চুক্তি ভিত্তিক রিক্সা। পুরো পরীক্ষা জুড়েই আনা নেয়া করবে।

সিট পড়েছে ইসলামিয়া সরকারী হাই স্কুলে। গফরগাঁয়ের কেন্দ্রস্থল। আসা যাওয়ায় বেশ সুবিধে। খুব বেশী সময় লাগতো না পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে। দলবেঁধে রিক্সা ছাড়তো ধলা থেকে। একেক রিক্সায় একেকজন শিক্ষার্থী। কোন কোনটায় মেয়েরা, কোনটায় ছেলেরা। বসন্তের সকালের ফুরফুরা আবহাওয়ায় প্রথমে চারিপাড়া বটতলা, পরে মাইজহাটি। মুখভার করে চিন্তিত মনে শিক্ষার্থীদের দল এক এক করে পেরুতাম রৌহা, গফরগাঁও গরুর হাট। কতচেনা, কতজানা সেসব জনপদ! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com