কিছু কথা প্রজাপতি

মোঃ সাইফুল ইসলাম (সজীব): এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছি তাই পাত্রপক্ষ আমার বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছে। ছেলের মামা এসে এনগেজমেন্টের আংটি খুলে নিয়ে গেল। সারারাত আমি কান্না করেছি, নিজেকে এতটা অসহায় আর কোনদিন অনুভব করিনি। বছর তিনেক আগে যখন মা মারা গেলেন তখনও কেঁদেছিলাম ঠিকই কিন্তু এভাবে ভেঙ্গে পড়িনি।

রাতে খাবার সময় বাবা বললো,

“মন খারাপ করিস না মা, এরচেয়ে ভালো ছেলের সঙ্গে তোকে বিয়ে দেবো। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে জানিস না? শুধু শুধু মন খারাপ করে নিজেকে কষ্ট দিস না।”

বাবার কথা আমি রাখতে পারিনি, রাতে নিজের রুমে শুয়ে শুয়ে একা অনেক কেঁদেছি। মানুষটার চেহারা বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। একটা পরীক্ষায় পাশ করতে পারিনি বলে এভাবে কেউ বিয়ে ভেঙ্গে দেয়? নিজেকে বাবার মতো বলে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলাম। নিজেই নিজের মনকে বললাম ‘হয়তো বিয়েটা ভাগ্যে নেই, পরীক্ষায় পাশ না করা তো শুধু অছিলা মাত্র।’

সেদিন ছিল মঙ্গলবার!

আগেরদিন রাতেই বাবা বলেছিলেন পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে আসবে। ভাবির মোবাইলে পাত্রের ছবি দেখেছি। সিলেটের চা বাগানের মধ্যে সবুজ চা-পাতার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবিটি তোলা।

প্রথম দেখাতেই মনের কোণে একটা ভালো লাগার সৃষ্টি হয়েছিল। ছেলের মামা ভাবির কেমন যেন দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। বিকাল চারটায় পাত্রপক্ষ আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়।

আমি সেদিন আমার পছন্দের কালো রঙের শাড়ি পরেছিলাম। হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি নিয়ে সেদিন পাত্রপক্ষের সামনে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ কথা বলার পরে আমাকে ছেলের সঙ্গে আলাদা কথা বলার জন্য পাঠানো হয়।

সাইফ বলল “আমার কোনো প্রশ্ন নেই! আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে, এবার আমাকে যদি আপনার পছন্দ হয় তাহলে সবাইকে জানিয়ে দিন।”

আমি চোখ তুলে তার দিকে তাকালাম! আমার দিকে সেও তাকিয়ে রইল চোখে চোখ রেখে। সে খানিকটা হাসি দিয়ে বললো,

“ভেবেছিলাম কোনো প্রশ্নই করবো না। কিন্তু এখন তো দেখছি একটা প্রশ্ন অন্তত করা দরকার। পছন্দ হয়েছে তো আমাকে?”

আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ ইঙ্গিত করলাম।

আমাদের দুজনের সম্মতি নিয়ে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হলো। সাইফের মা আমার হাতে একটা আংটি পরিয়ে দিয়ে গেল। বিয়ে ঠিক হলো যেদিন দেখতে এসেছিল তার সতেরো দিন পরে। কল্পনার একটা নীল আকাশ মনের জানালায় ঠকঠক করে শব্দ করছে।

বিয়ে ঠিক হবার আটদিন পরে আমার এইচএসসি রেজাল্ট বের হলো। যে সাবজেক্ট নিয়ে ভয়ে ভয়ে ছিলাম সেই সাবজেক্টেই অকৃতকার্য হলাম। আমি রেজাল্ট পাবার পর থেকে খানিকটা মনমরা হয়ে গেলেও কল্পনা করিনি যে বিয়ে ভেঙ্গে যাবে।

রেজাল্ট বের হবার পরদিন সাইফের মামা বাবার কাছে কল দিয়ে বিয়ে ভাঙ্গার কথা কনফার্ম করেন। মেয়ের ব্যর্থতার জন্য বাবার এমন বারবার অনুরোধ করা একদমই সহ্য হচ্ছিল না।

অবশেষে চূড়ান্তভাবে বিয়েটা ভেঙ্গে গেল। আমার হাতের আংটি খুলে নিয়ে গেল।

রাতে আমার ঘুম হয় না ঠিকমতো। নিজের চেয়ে বেশি কষ্ট লাগে বাবার জন্য। ভালো ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে বলে বাবা আমাদের গ্রামের অনেক মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। আত্মীয় স্বজন যে যেখানে আছে সবার কাছে মেয়ের বিয়ের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন। অথচ এখন আবার সবাইকে নিষেধ করা হচ্ছে, যখনই তারা প্রশ্ন করে তখন বাবা ঘুরিয়ে পেচিয়ে উত্তর দেয়। কিন্তু সবকিছু শুনেই তাদের একটাই কথা,

“মেয়ে ফেল করেছে বলে বিয়ে ভেঙ্গে গেল।”

বিয়ে ভেঙ্গে যাবার মাস খানিক পরে আমি ঢাকায় ফুফুর বাসায় চলে গেলাম। গ্রামে ভালো লাগে    না, মন চাইলে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে আসতাম। বেশ ভালোই কাটছিল দিনগুলো।

পাঁচ মাস পার হয়েছে।

ঢাকা থেকে “ইমাদ পরিবহনে” বাগেরহাট রওনা দিলাম। ইমাদ বাস কোম্পানির সবগুলো বাস একটা নির্দিষ্ট ফিলিং স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিয়ে থাকে। তাই আমিও ওয়াশরুমে যাবার জন্য বাস থেকে নিচে নামলাম। বাসে ওঠার আগেই কেউ একজন পিছন থেকে বললো,

“বৃষ্টি শুনুন!”

পিছনে ফিরে তাকালাম, বহুদিন পর আবারও অবাক হয়ে রইলাম। আমি কিছু বলার আগেই সাইফ বললো,

“কেমন আছেন? একটু কথা বলতে পারি?”

“জ্বি বলেন। একটু তাড়াতাড়ি বলবেন কারণ বাস এখনই ছেড়ে দিবে।”

“শুধু একটা প্রশ্ন করতে চাই। বিয়ের সবকিছু ঠিকঠাক হবার পরও আপনি কেন বিয়েটা ভেঙ্গে দিলেন?”

সাইফের প্রশ্ন শুনে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলাম। লোকটা বলে কি? আমি নাকি বিয়ে ভেঙ্গেছি।

বললাম,

“হাস্যকর প্রশ্ন করছেন কেন? বিয়ে তো আমি ভাঙ্গিনি, বিয়ে ভেঙ্গেছেন আপনি। এইচএসসিতে একটা পরীক্ষায় পাশ করতে পারিনি বলে আমাকে বিয়ে করতে আপনার হয়তো লজ্জা করছিল। তাই তো নিজে না এসে সেদিন নিজের মামাকে দিয়ে আমার হাত থেকে আংটি খুলে নিলেন।”

সাইফও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে সে এমন অদ্ভুত কথা কোনদিন শোনেনি। সাইফ বললো,

“আমি তো মামাকে বলিনি বিয়ে ভেঙ্গে দিতে। বরং মামা নিজেই বললো যে আপনার বাবা নাকি আমার সঙ্গে সম্বন্ধ করতে রাজি না। কেন রাজি নয় সেরকম কিছু বলে নাই তবে মামার কাছে আপনার বাবা লোক দিয়ে এনগেজমেন্টের আংটি পাঠিয়ে দিয়েছেন।”বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল। সাইফ ও ইমাদ পরিবহনের যাত্রী। আমি বিয়ে ভেঙ্গে যাবার ইতিহাস তাকে বললাম। সাইফ বুঝতে পারলো এগুলো সব মামার কারসাজি। এদিকে আমার অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়েছে। বাড়ি এসে সব বলার পর বাবা রেগে আগুন।

হঠাৎ বাবা জিজ্ঞেস করল

“একটা সত্যি কথা বলবি?”

“আমি তো তোমাকে কখনো মিথ্যা বলি না বাবা।

আজও যেটা বলবো সেটা সত্যিই বলবো।”

“তোর ভাবি বলছিল সাইফ ছেলেটার সঙ্গে আবারও দেখা হবার পর থেকে তুই অন্যরকম হয়ে আছিস। এখন যেখানে বিয়ে ঠিক হয়েছে সেখানে বিয়ে হলে তোর নাকি কষ্ট হবে। এটা কি সত্যি?”

বাবার প্রশ্ন শুনে চুপ করে রইলাম। বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“জীবন তো একটাই মা তাই না? সাইফের মা আমাকে কল দিয়েছিল। সন্ধ্যা বেলা ওর মামা এসেছিল আমাদের বাজারে। তাদের একটাই অনুরোধ যে তারা সাইফের সঙ্গে তোর বিয়ে দিতে চায়। এদিকে তুইও হয়তো সাইফের প্রতি দুর্বল। এখন আমি কি করি বল তো মা? আমি তো চাই না তোর কষ্ট হোক।”

“বাবা তোমার মতো আমিও তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আমার জন্য তোমার কোনো সমস্যা হোক সম্মান নষ্ট হোক সেটাও চাই না। তুমি আমার জন্য যা সিদ্ধান্ত নেবে আমি সেটাই করবো।”

“আমি তো ভাবছি সাইফের সঙ্গেই তোর বিয়ে দিয়ে দেবো। একটু আগে মেহেদীর বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে, তাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে বললাম। একটু রাগারাগি করছে তবে আমার মনে হয় বিয়েটা বন্ধ করা যাবে।”

বাবার দিকে তাকালাম, বাবা খানিকটা খুশির হাসি দিয়ে বললো,

“আমার তো পাঁচটা সাতটা মেয়ে নয় যে যেমন তেমন বিয়ে দেবো। বিয়ের পরে তুই যদি ভালো থাকতে না পারিস তাহলে আমি শান্তি পাবো কিভাবে বল তো? তুই চিন্তা করিস না মা, আমার যা করা লাগে আমি করবো। কিন্তু তোকে আমি ওই সাইফের হাতেই তুলে দেবো।”

আমাদের বিয়েটা হলো সোমবারে।

যেহেতু এই তারিখেই আমার অন্য বিয়ের তারিখ ঠিক করা ছিল তাই সেই তারিখ আর পরিবর্তন হয়নি। বহু নাটকীয় ঘটনার সমাপ্তি শেষে আমার আর সাইফের বিয়েটা হয়ে গেল।

লাল শাড়ি পরে আমি যখন সাইফের সামনে দাঁড়ালাম তখন সাইফ আমার হাত দুটি ধরে বললো,

“কিছু কথা প্রজাপতি,

সারাজীবন সঙ্গের সাথী।

যদি ভাগ্যে থাকে লেখা ,

থাকবো কেন একা?

খুঁজে নেব পৃথিবী জুড়ে

মনের কোণে গহীন নীড়ে।” - সংগৃহিত

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৮৯৬০৫৭৯৯৯
Email: simecnews@gmail.com