হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৫ তম পর্ব)

ধলা স্কুল এন্ড কলেজ রীতিমত আমার নেশার আইটেমে পরিণত হলো। মরণ নেশা না হলেও নাওয়া খাওয়া ছাড়ার মত অবস্থা হলো। মনে হতে লাগলো জীবনে এর চেয়ে ভাল কাজ, কাজের কাজ আর কিছুই হতে পারে না। নেশার ঘোর আর কাটে না। যৌবনের প্রথম প্রেমে যেমন ঘোরমাখা নেশা কাজ করে আমার ভিতরও তেমন নেশামাখা ঘোর কাজ করতে লাগলো। সারাদিন এটা নিয়ে পড়ে না থাকলে যেন হয় না। দিনমান কেবল কলেজ আর কলেজ। নেশার কলেজ।

নেশা আমার রক্তেই আছে। ছবি দেখায়ও সে নেশা কম ছিল না। ছবি দেখায় মারাত্নক নেশা ছিল! তখনকার দিনে দৈনিক পত্রিকা ছিল মোটে দু’টি; একটি ‘ইত্তেফাক’ আর অন্যটি ‘দৈনিক বাংলা’। আমি মাসিক হিসেবে রোজকার দৈনিক ইত্তেফাক রাখতাম। পড়তে পড়তে আর কিছুই বাদ রাখতাম না। এর সপ্তম পৃষ্ঠায় থাকতো সিনেমার বিজ্ঞাপন। এই পৃষ্ঠাটি সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। সারা দেশের কোন্ হলে কোন্ ছবি চলছে কিংবা পরবর্তী সপ্তাহে কোন্ ছবি মুক্তি পাচ্ছে সে সব আমার মুখস্ত ছিল।

সাড়া জাগানো “ছুটির ঘন্টা” ছবিটি তখন ঢাকা দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। কঠিন ভাবে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। রেডিও কাঁপিয়ে একাকার করছে প্রতিনিয়ত। হৃদয় কাঁপানো ট্রেলার রেডিওতে শুনি। হ্যা ভাই! ছুট ছুট ছুটি; ছুটির ঘন্টা!! সবার মুখে মুখে ফিরছে ছবির গল্প আর গান। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি দেখার জন্যে আমার মনও খুবই হিস পিস করছে। কবে আমার ছুটির ঘন্টা বাজবে, আমি ছুটি পাবো; আর কবে ঢাকা যেয়ে ছবিটি দেখবো এই ভাবনায় মন আমার অস্থির!

আমি ঢাকা আসতে আসতে ছবিটা ঢাকা ছেড়ে আশে পাশের শহরগুলোতে ঢুকে পড়েছে। ছুটির ঘণ্টা চলছে গাজীপুরের কালিগঞ্জের আলোঘর সিনেমায়। পূবাইলে আমাদের বাড়ী থেকে রেল লাইন ধরে হেঁটে ৫ মাইলের পথ। যেমন করেই হোক ১২টার শো ধরতে হবে। তাই কঠিন রৌদ্দুরের মাঝেও সকাল দশটায় দু’ভাই হাঁটা দিয়ে ১২টার মধ্যে সিনেমা হলের সামনে গিয়ে পৌঁছালাম।

মনে পড়ে, খুবই কেঁদেছিলাম ছবিটি দেখে। আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, সাথী মোদের ফুল পরী! উহ্! কী দারুণ সে গান! অত্যন্ত জনপ্রিয় গানটি এই ছবির। ছবিতে সব শিক্ষার্থীরা গ্রীষ্মের ছুটি শুরুর আগের দিন দলবেঁধে গান গেয়ে খুবই মজা করে। মজার আরো একটি গান ছিল; একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবো; নীল আকাশের সবুজ ঘাসে খুশীতে হারাবো! গানটি সুপার ডুপার হিট। সবার মুখে মুখে।

ছবিতে গান গেয়ে সব ছেলেমেয়েরা বাড়ী ফিরে যায়। কিন্তু ছবির মূল চরিত্র ছোট্ট স্কুল ছাত্রটি স্কুলের লম্বা ছুটির আগের দিন ভুলক্রমে বাথরুমে আটকা পড়ে। এরপর আর বের হতে পারে না এবং সেখানেই তার করুণ মৃত্যু হয়। করুণ গল্পের করুণ মৃত্যু কাহিনী। সত্যি সত্যি নারায়ণগঞ্জে ঘটা করুণ কাহিনীর করুণ চিত্ররূপ ছিল ছুটির ঘন্টা ছবিটি। তবে হেঁটে ছবি দেখতে যাবার ঘটনাটি আমার জন্যে বেশ সাহসী ঘটনাই  ছিল।

এমনি কঠিন সাহসী কাজ আমি আরো বেশ ক’বার করেছিলাম। বাবা-মা পূবাইলে থাকেন। আমি ধলা থেকে ঈদের ছুটিতে পূবাইলে বেড়িয়ে আবার ধলা ফিরে যাচ্ছি। টঙ্গী জংশন থেকে সন্ধ্যা ৬টার ৫৫ আপ ট্রেন ধরে রাত ৯টার মধ্যে ধলা পৌঁছাবো। টঙ্গী পৌঁছেছি তিনটার একটু আগে আগে। মোক্ষম সুযোগ আমার ছবি দেখার। সোজা চলে এলাম আনারকলি সিনেমায়। কাজী জহিরের “কথা দিলাম” ছবিটি চলছে। দারুণ ছবি। ছবি দেখা শেষে রিক্সা নিয়ে টঙ্গী ষ্টেশনে আসতে না আসতেই ধলাগামী শেষ ট্রেনটা ছেড়ে দিল। আমি দৌঁড়েও উঠতে পারলাম না। মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল। এই রাতে কোথায় থাকবো, কী করবো?

রিক্সা নিয়ে আবার চলে এলাম বাসস্ট্যান্ডে। বাসে চড়ে বসলাম। বাস চলছে জয়দেবপুরের দিকে। খুবই জোর গতিতে। আর আমি সুরা ইউনুস পড়ে যাচ্ছি মন দিয়ে। শুধু ইউনুস নয়, সুরা আর দোয়া যত মনে আসে সবই পড়ে যাচ্ছি। তখনকার দিনে রাস্তায় জ্যাম ছিল না বিধায় টঙ্গী থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি আমার আগে জয়দেবপুর পৌঁছাতে পারেনি। এর আগেই আমি জয়দেবপুর ষ্টেশনে পৌঁছালাম। গা থেকে ঘাম ছেড়ে দিল।

এই জাতীয় অতি সাহসী কিংবা অন্যায় কর্মকান্ডে ধরা পড়লে বাবা-মা গালমন্দ করতেন; মাঝে মধ্যে উত্তম মধ্যমও দিতেন। তবে সাধারণত খুব বেশী বিপত্তি হতো না। ঘন্টা খানেক কান্নাকাটি করে সব ভুলে যেতাম। তবে একবার খুবই বাজে একটি কাজ করে ফেলেছিলাম। এতে যে বিপত্তি হয়েছিল তা পত্রিকায় প্রকাশের আগে কেউই জানতো না। খুবই গোপন করে রেখেছিলাম এতদিন। সামনে এসএসসির প্রস্তুতিমূলক টেস্ট পরীক্ষা। রমজানের পরপর হবে বলে ধারণা দিয়েছেন স্যারেরা। তাই রমজানে কোচিং এর চরম ব্যস্ততা। মাথায় পড়াশুনা ছাড়া কিচ্ছু নেই। শুধু অপেক্ষা ছাড়া। ঈদের অপেক্ষা। অপেক্ষা, বাবা মায়ের কাছে ঢাকা যাবো। এক সময় যাবার দিন আসলো। শেষ রোজায় ধলা থেকে খুব সকালের ট্রেনে রওনা দিলাম। মনের আনন্দটাই অন্যরকম। ঈদ করতে বাবা-মায়ের কাছে যাচ্ছি। পরদিন ঈদ হলেও হতে পারে।

২৯ শে রমজানের দুপুরের আগে আগে পূবাইলে এসে পৌঁছেছি। কথা ছিল সেবার ঢাকা নয়, পূবাইলে আমরা ঈদ করবো। বাসায় পৌঁছে দেখি আব্বা খুবই বিষন্ন মনে বসে আছেন। আমাকে  দেখা মাত্র বললেন, এক্ষুনি ঢাকা মেডিক্যালে চলে যাও; তোমার নানাজান খুবই মূমুর্ষ। বলা যায় না কী হয়! অবস্থা মোটেই ভাল নয়। তোমরা দুইভাই কোনভাবে চলে যাও, আমি সন্ধ্যার ট্রেনেই আসছি। বাবার কথায় আদিষ্ট হয়ে রিক্সায় করে প্রথমে টঙ্গী এলাম। দু’ভাই মিলে ঢাকার বাস ধরতে যাবো; অমনি চোখ গেল সেই আনারকলির দিকে।

রমজানে তখন সারা দেশের হলে বিদেশী ছবি চলতো। দেশী ছবি মুক্তি পেত না। আনারকলিতেও বিদেশী ছবি চলছে। “আজ কি আওয়াজ” একটি পাকিন্তানী উর্দূ ছবি; প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করেই চলছে আনারকলিতে। লোভ সামাল দিতে পারলাম না; ইবলিশ মাথায় ভর করলো। নানাজানের কথা ভুলে, বাসে ওঠা বাদ দিয়ে দু’ভাই টিকেট কেটে ছবি দেখতে ঢুকে পড়লাম।  বেলা তিনটায় হল থেকে বেরিয়ে দৌঁড়াতে শুরু করলাম। মাথায় তখন নানাজান ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। একটা বাস পেয়ে সোজা ঢাকা মেডিক্যাল। নির্ধারিত নাম্বারের রোগীর বেড খুঁজে ফিরছি। বেড খালি; রোগীর হদিস নেই। একে ওকে জিজ্ঞেস করে গলা শুকিয়ে আসলো। যা জানলাম তা সাংঘাতিক ভয়াবহ। ঘন্টা কয়েক আগে নানাজান ইন্তেকাল করেছেন! আমরা ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লাম।

শুনলাম ঢাকা মেডিকেল চত্বরে গোসল জানাজা দিয়ে গাড়ীতে করে লাশ নিয়ে গেছে কল্যাণপুরে আমার মেঝখালার বাসায়। দিলাম ছুট। সন্ধ্যার আগে আগে পৌঁছালাম খালাম্মার বাসায়। কিন্তু কোন কাজ হয়নি; আমাদের পৌঁছাবার ঠিক মিনিট দশেক আগে নানাজানের লাশ নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে গাড়ী রওনা দিয়ে চলে যায়! তখনও পশ্চিমাকাশে গোধুলীর লাল রং শেষ হয়ে যায়নি!

হা হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের দু’ভাইয়ের আর কিছুই করণীয় ছিল না। কেউ জানে না আজকে কী ভয়ংকর অপরাধই না আমরা দু’ভাই করে এসেছি। কিন্তু আমরা জানি, জানে আমাদের আল্লাহ্। মনকে কিছুতেই বোঝাতে পারছিলাম না। ধিক্কার দিচ্ছিলাম নিজেকেই নিজে। বান্দা অপরাধ করতে করতে মাত্রা যখন ছাড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ্পাক সহ্য করতে পারেন না। কোন না কোন শাস্তি তখন পাওনা হয়ে যায়।

জানি না আল্লাহ আমাকে সেই শাস্তি দিয়েছেন কি না! নাকি জমিয়ে রেখেছেন সামনের দিনগুলোর জন্যে! আমি আসলে তেমন কিছুই জানি না! তেমন কিছুই বুঝি না! কেবল এটুকু বুঝি, সেদিন থেকে যে মানসিক শাস্তি আমি ভোগ করে চলেছি, এর থেকে মুক্তি মেলেনি আজো। আর আদৌ কোনদিন মেলবে বলেও মনে হয় না!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com