আমার বেরোবার আর কোন পথ নেই! (পর্ব-২)

আমার বেরোবার আর কোন পথ নেই! (পর্ব-২)

সরদার মোঃ শাহীন

 

মহা মুশকিলের ব্যাপার হয়ে গেল। সাইকেল উপহার দেয়া আমার সেই বসের সাথে কোন ভাবেই আর যোগাযোগ করতে পারছি না। যতবারই কল দেই, তার ফোন কেবলই বন্ধ পাই। কেবলই ওই প্রান্ত থেকে পোঁ-পোঁ, পোঁ-পোঁ আওয়াজ আসে। এক অসহ্য রকমের যন্ত্রণা। ভাগ্যিস মশার কামড়ের কোন যন্ত্রণা নেই। এই দেশে এই এক শান্তি। ঘরে বাইরে কোথায়ও মশার যন্ত্রণা নেই; পুলিশ ফাঁড়ির হাজতেও নেই।

মশা আছে ঢাকার এয়ারপোর্টে। কোটি কোটি মশা। মুখের সামনেই ঘোরে। হা করলেই বিপদ। কথা বলার জন্যে হা করলেন তো, গোটা তিনেক মশা মুখের ভিতরে ঢুকে পড়বে। এটা তো কমই। মাঝে মাঝে আরো বেশি ঢোকে। সাংঘাতিক ক্রিয়াশীল এইসব মশা। যথাযথ কর্তৃপক্ষ ওদেরকে নিয়োগ দিয়েছে। বিদেশগামী অথবা বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের মহাসম্মানে রিসেপশান দেয়ার জন্যেই নিয়োগ দিয়েছে।

জাপানে এসব নিয়োগের বালাই নেই। তাই শোনিমের মা বাইরে থাকলেও মশামুক্ত। ভিতরে মশামুক্ত আমিও। একা বসে আছি আমি। কিন্তু ওরা বসে নেই। পাশের রুমে দুই পুলিশ ফিস ফিস করছে। আধা আধা শুনি। একজন বলছে, খানদানী চোর। চেহারার মধ্যেই চোর চোর ভাব। এলাকার সব চুরির সাথে এর হাত আছে। একটা বড় চোরচক্রের কেউ সে। লিডারও হতে পারে। ভাগ্যিস ওরা আমার নামের মধ্যে থাকা সরদারের অর্থ বোঝেনি। বুঝলে খবর ছিল।

অবশেষে খবর এলো থানা থেকে। রাত দশটার পর থানা হাজতে ঢোকানো যাবে না। আবার পুলিশ ফাঁড়িতেও রাখা যাবে না। ফাঁড়ির মেঝেতে ঘুমানোর মত মোটা কম্বলও নেই। মহামুশকিল হয়ে গেল। আমাকে নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেল দুই পুলিশ। উপরে ফোনটোন করে শেষমেষ আমার কাছে এলো। এত্তএত্ত কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে বললো, আজ রাতটা নিজের বাসায় থাকো। তবে কাল দেরী করো না। সকাল ১০টা বাজার আগেই চলে এসো। তোমাকে থানায় চালান করবো।

চালান শব্দটায় বুকটা আবারো কচৎ করে উঠলো। বাইরে বেরোবার অনুমতি পেলাম বটে, কিন্তু মজা পেলাম না। শোনিমের মাকে আড়চোখে দেখার চেষ্টা করলাম। আমি তার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। সেও পারছে না তাকাতে। কথাও নেই দু’জনার কারো মুখে কোন। দু’জন চুপচাপ বাসার দিকে হাঁটছি। বরাবরের মত পাশাপাশি নয়। সে সামনে আর আমি পিছনে পিছনে। অন্য সময় এমনটা ভুলেও হয় না। ফুটপাত যত ছোটই থাকুক, সদ্য বিবাহিত দম্পতি। একসাথে হাঁটবো। হাত ধরাধরি করে হাঁটবো।

আজ কোন সুযোগই সে আমাকে দেয়নি। আমিও নেবার সাহস করিনি। চুরির অপরাধে ঘন্টা চারেক হাজতখেটে সদ্য প্যারোলে মুক্ত স্বামীর এত সাহস থাকার কথা না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই মূহুর্তে পুলিশ আর শোনিমের মায়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তারা দু’পক্ষই আমাকে সাইকেল চোর ভাবছে। পুলিশের ভাবনার তাও সীমা পরিসীমা আছে। আমার বৌয়ের সেটাও নেই। তার ভাবনার সাথে দুঃখও আছে। প্রথম দুঃখ, তার “স্বামী চোর”; তার চেয়েও বড় দুঃখ “সে চোরের বউ”!

হয়তো এ জন্যেই সে হাঁটছে জোরে জোরে। মনে হচ্ছে এক হাঁটাতেই বাসায় নয়, সোজা ঢাকায় ফিরে যাবে। বাসায় ঢুকেই এক কাপড়ে বের হয়ে যাবার মত করে ব্যাগ গুছাবে। রিটার্ন টিকিট তো কাটাই থাকে। শুধু লাগবে পাসপোর্ট। আর লাগবে চিরকুট লেখা। মাথার পাশে ছোট্ট চিরকুটে ‘আমি চলে গেলাম’ জাতীয় কিছু লিখে রেখে যাবে। আমাকে ঘুমে রেখেই বেরিয়ে যাবে।

ফাঁড়ির কাছেই বাসা। বাসায় ফিরে গোসল করা হলো না। হলো না দু’জনার খাওয়া দাওয়াও। কোনমতে নামাজ সেরে না খেয়ে শুয়ে পড়লাম। দু’জন দু’দিকে ফিরে শুয়ে পড়লাম। আমার ঘুম আসে না। অপেক্ষায় আছি বসের ফোনের। বসকে পেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়। হয় সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান। কিন্তু অবসানের ছিটেফোঁটা লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

হঠাৎ বসের ফোন। কী ব্যাপার, শাহীন! কোন প্রবলেম! এত্ত এত্ত মিস কল তোমার! খুব কাঁতর কন্ঠে বললাম, এ....

 

পূর্বে প্রকাশিত