বিবেক বুদ্ধি কানা অন্ধ; কিছু খোলা, কিছু বন্ধ!!

বিবেক বুদ্ধি কানা অন্ধ;  কিছু খোলা, কিছু বন্ধ!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

জীবনে বহুবার আশেপাশের ছোটবড় অনেককেই অপদার্থ বলে বকা খেতে দেখেছি। মুরুব্বীদের কাছ থেকে এই বকা বিনামূল্যে পাওয়া এবং খাওয়া। জাস্ট কপালগুণে বিনামূল্যের এই খাওয়াটা তেমন জোটেনি আমার কপালে। অপদার্থ বিষয় নিয়ে কোন সাবজেক্টও পড়ার সুযোগ পাইনি কোনকালে। তবে, পদার্থ নামক যে একটা সাবজেক্ট আছে তা পেয়েছিলাম ক্লাস নাইনে উঠে। পদার্থের প্রথম ক্লাসে ঢুকেই স্যার বললেন, ভয়ের কিচ্ছু নাই। পদার্থ এক্কেবারে সোজা একটা বিষয়; কঠিন, তরল আর বায়বীয়। আর যারা এই সোজাডা বুঝবা না, তারা হইলা অপদার্থ।

শেষমেষ শংকর বিএসসি স্যারের বিচারে ক্লাসে একজন অপদার্থ পাওয়া গেল। স্যারের সব রাগের ঝাল ঐ একজনের উপর গিয়েই পড়লো। রোজ অপদার্থ বলে বকা খেত সে। উঠতে বকা, বসতে বকা। শান্ত-শিষ্ট সরল-সোজা টাইপের অতীব নিরীহ ছেলেটি এভাবে বকা খেতে খেতে দিন দশেকের মধ্যেই বায়বীয় হয়ে গেল। মানে, হাওয়া হয়ে গেল। শুধু পদার্থ কেন, বিজ্ঞানের কোন ক্লাসেই তাকে আর পাওয়া গেল না। একদিন, দু’দিন, তিনদিন। এভাবে ত্রিশ দিনও গেল। অবশেষে আশা ছেড়ে স্যার বললেন, ভাগছে।

বহু বছর পরে সেদিনের ভেগে যাওয়া ছেলেটিকে একদিন আবিস্কার করলাম। বৃষ্টিভেজা কোন এক বিকেলে মনের টানে প্রাণের আঙ্গিনায় পা দিয়েই দেখলাম বন্ধু আমার টিচারসরুমে বসা। বসে বসে খাতা মার্কিং করছে। অবাক বিস্ময়ে বুকে জড়িয়ে নিয়েই জানলাম, বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে আমাদের স্কুলেই সুনামের সাথে শিক্ষকতা করছে। এবং শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে। বুকটা ভরে গেল। এবং ভরাবুকটা ছাড়াতে ছাড়াতেই বুঝলাম, কঠিন অধ্যাবসায়ই তাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।

কঠিন অধ্যাবসায়ীদের খনি হলো বুয়েট। এখানে অপদার্থরা নয়, পদার্থরাই পদার্থ নিয়ে পড়াশুনা করে দেশসেরা প্রকৌশলী হয়। বিজ্ঞানী হয়। এইসব বিজ্ঞানীরা যেমনি দেশের জন্যে ভাল কিছু করেন, তেমনি সকল সময় দেশবাসীও তাদের কাছে ভাল কিছুই প্রত্যাশা করে। অথচ ক’দিন আগে প্রকৌশলী বন্ধুদের আড্ডায় যখন জানলাম, অটোরিক্সা নিষিদ্ধ করার সেই সভায় সেই বুয়েটেরই দু’জন প্রফেসরও উপস্থিত ছিলেন; তখন নিমিষেই প্রত্যাশা চুপসে যায়। কষ্টও পেয়েছিলাম বেশ।

তবে কষ্ট পাইনি চায়না থেকে নতুন মডেলের অটোরিক্সা আমদানি করার লাইসেন্স পাওয়া কোম্পানির প্রতিনিধির উপস্থিতির কথা শুনে। কোম্পানির প্রতিনিধি নিয়ে কিছু বলার নেই আমার। তারা ব্যবসায়ী। নিজেরা আমদানি করবে, উপরওয়ালাদের সাথে ‘সুসম্পর্ক’রেখে ব্যবসা করবে। খারাপ লেগেছে কেবল প্রফেসরদের জন্যে। তাঁরা তো বিজ্ঞানী। নতুন কিছু বানানোই তাঁদের কাজ। অথচ ৬০ লাখ মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জরুরি বাহনের সামান্য অটোমেশন বা আধুনিকায়নের কাজটা তাঁরা করবেন না। এটাও মেনে নিতে হবে?

কেন মানবো! শিল্প বিপ্লব তো তাঁদেরই করার কথা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে দুনিয়া চেইঞ্জ করার কথা তাঁরা হরহামেশা বলে বেড়ান। অথচ আমার দেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষটিকে গর্ত থেকে রিক্সা তোলায় সাহায্য করতে একটা সস্তা গিয়ার ডিজাইন করে দিতে পারেন না। এটা কেমন কথা! সারা দেশের টেকসই প্রযুক্তির সার্টিফিকেট দেন তাঁরা, আর রিক্সার বদলে একটা অটোরিক্সা ডিজাইন করতে পারবেন না, এটা বললেই বিশ্বাস করবো?

বরং এটা বিশ্বাস করি, ব্যাটারি চালিত রিক্সা-ভ্যান বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তটি প্রচন্ড রকমের অমানবিক। এবং নির্মম। মূষলধারার বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা প্রখর রোদে পুড়ে একজন অসহায় হতদরিদ্র মানুষ বর্তমান আধুনিক বিশ্বে শারীরিক শ্রমে প্যাডেল মেরে মেরে পেটের খাবার যোগায়, সেটা চেয়ে চেয়ে দেখতে পারে। শুধু মানতে পারে না, তার কষ্ট খানিকটা লাঘবের কোন নতুন ব্যবস্থা। বরং সেটাতে দেয়া হয় বাঁধা।

বিষয়টি নিয়ে ক’দিন আগে প্রিয় কলামিস্ট আরিফ জাবতিক চমৎকার বলেছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাটারি চালিত রিক্সা ও ভ্যান বন্ধ করার পেছনে বড় যুক্তি হচ্ছে এগুলো দ্রুত গতিতে চলে, নিয়ন্ত্রণহীন এবং ব্রেক করলে উল্টে যায়। এটি সত্যি কথা, কিন্তু এর সমাধান কিন্তু এগুলো বন্ধ করে দেয়া নয়। মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে না ফেলে ঔষধ খাওয়াই বাস্তব সম্মত কাজ।

তিনি চাঁছাছোলা ভাষায় আরো বলেছেন, এসব রিক্সা ভ্যান নিয়ে আরেকটা অনুযোগ হচ্ছে এরা ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ অপচয় করছে! আপনি সাহেব কুতুব সকাল থেকে একটা ২টনের এসি ছেড়ে অফিস করছেন, তাতে বিদ্যুৎ নিয়ে কথা উঠে না। কিন্তু জুন মাসের রোদে একজন রিক্সাওয়ালা যদি দুটো প্যাডেল না মেরে ব্যাটারির সাহায্যে গাড়ি চালায়, তাহলে বিদ্যুৎ এর অপচয়নিয়ে কথা উঠে ! কি পরিমাণ ভন্ডামিপূর্ণ এই যুক্তিবিদ্যা, চিন্তা করলে মুখে থুথু জমে যায়।

ভাবনার কি বাহার রে বাবা! ব্যাটারিচালিত রিক্সা নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই। ভাল কথা। ভাবেন। ভেবে ভেবে এর সমাধান করেন। সঠিক সমাধান। পাশাপাশি ভাবনার তো আরো জায়গা আছে। সেগুলো নিয়ে ভাবেন না কেন? স্যোশাল মিডিয়া নিয়ে সামান্য ভাবনা ভেবেছেন কখনো? জাতিকে নোংরামী, নষ্টামি, গুজব আর মিথ্যের চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে এই মিডিয়া। এরপরও এখনও এসব এই দেশে দেদারছে চলছে। এসব বন্ধের ব্যাপারে একটি কথাও কেউ বলে না। বহাল তবিয়তে চলছে ফেসবুক এবং ইউটিউব। কোটি কোটি জনতা চালাচ্ছে এসব। কার আইডি নেই বর্তমান সময়ে! কোটি জনতার কোটি নেতৃত্বে কোটি কোটি ইউটিউব টিভি চলছে। এইসব তথাকথিত টিভির তথাকথিত নিউজ বিশ্বাসও করছে কোটি জনতা। কি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জাতি তথা দেশ, বুঝতে পারছেন কি কেউ?

বোঝা তো দরকার। বুঝতে হবে, হরহামেশাই এসব সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রায়ালের শিকার হতে হয় মানুষদের। তাদের স্বাভাবিক জীবন ফানাফানা করে ফেলে। একটা রমরমা রসাত্মক গল্প চলে কয়েক দিন। বাস্তবে যা ঘটছে ঠিক তার উল্টো কল্প কাহিনীতে ভরা এসব গল্প পাবলিক খায়ও ভাল। ক্ষুধার্ত পাবলিকের জন্যে কোন না কোন ঘটনার ছুঁতোয় তারা সব সময়ই রমরমা মিথ্যে গল্প তৈরী করে।

পদ্মা সেতুতে পরপর পাঁচবার ফেরীর ধাক্কা লাগলো। কে লাগালো বা কেন লাগলো সেটা ভিন্ন বিষয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ এবং গবেষণার বিষয়। কিন্তু লক্ষণীয় ছিল অনলাইন টিভিগুলো। ঝটপট এগুলো সক্রিয় হয়ে উঠলো। প্রচার শুরু করলো ভূয়া ছবি। বাস্তবে যা ঘটেনি, ফটোশপে তাই করে প্রচার শুরু করে দিল। আর দায়িত্বশীলরা ওসব ছবি ‘জাস্ট ফেক' বলে দায়িত্ব শেষ করলো! তাহলে কে দেখবে এসব অনাচার? পরীমনি মার্কা আচারের ভীড়ে অনাচার দেখার কেউ নেই এদেশে। অথচ ভূয়া ভিডিও দেখার দর্শকের অন্ত নেই। তারা শুধু এই মিথ্যে ভিডিও দেখে না। বিশ্বাসও করে।

গুজবে বিশ্বাসকারী এবং গুজব ছড়ানোকারীদের দোষ দিয়ে পার পাবার সময় এখন আর নেই। এসব নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা ওভারলুক করার দিন শেষ। বরং তাদেরকেই এখন ধরার সময় হয়েছে। দায়িত্বশীলরা বেজায়গাতে খুবই একটিভ। তারা ব্যাটারিচালিত রিক্সা বন্ধ করতে পারে। কেবল পারে না ফেসবুক আর ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করতে। জায়গা মত তারা অন্ধ সাজে। ফলাফল যা হবার তাই হয়। ইচ্ছে করে অন্ধের ভান করে বলেই তাদের দ্বারা কোন কিছুই বন্ধ করা সম্ভব হয়ে উঠে না।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com