আবারো করোনা! আবারো লকডাউন!!

আবারো করোনা! আবারো লকডাউন!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

একটি বছর! পুরো একটি বছর!! এই এক বছরে দেশ থেকে করোনা না গেলেও লকডাউন কথাটি চলে গেছে বলেই সবাই বিশ্বাস করতো। বিশ্বাস করতাম আমিও। বেশ ভাল করেই করতাম। যদিও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে লকডাউন কখনোই দেয়নি সরকার। দিয়েছিল সাধার­ণ ছুটি। শুধু কিছু কিছু ছোট্ট এলাকায় লকডাউন দিতে হয়েছিল। তারপরও পুরোনো লকডাউন দিনের কথা উঠলেই অতীত ফরমেটেই বলতাম, লকডাউনের সময়টায় এমনটা করতাম, লকডাউনের সময়টায় তেমনটা করতাম। সেই লকডাউনের মধ্যে আবারো ঢুকে পড়লো পুরো দেশ, পুরো জাতি! ঢুকে পড়লাম আমিও!

কর্মহীন অতীব সাধারণ জীবনে ব্যস্ততাহীন একজন মানুষের যতটুকু দূরাবস্থা হতে পারে, এবারের লকডাউনে আমার তেমনটাই হয়েছে। মাথা আউলা পাতাইল্লা হয়ে গেছে। কীভাবে সময় কাটাবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। ব্যবসা বানিজ্য আমারও প্রায় বন্ধ। তবে মেনে নিয়েছি। হায় হুতাশ করছি না। ‘যা আছে কপালে’ মার্কা ভাব নিয়ে টিভি খুলে বসেছিলাম লকডাউনের প্রথমদিনে। টিভি খুলে বসা মানে, শুধু চ্যানেল টিপা। রিমোটের বাটনে চাপ দিয়ে একের পর এক চ্যানেল পাল্টানো।

কোন এক চ্যানেলে দেখলাম গার্মেন্টস সেক্টরের পরিচিত এক নেতার পটরপটর কথাবার্তা। লকডাউন আসলেই এদের পটরপটর বেড়ে যায়। বেড়ে যায় সরকারের উপর মহলেও ঘোরাঘুরি। লক্ষ্য আর কিছু না। ব্যবসায়িক স্বার্থ আদায় করে রাজস্বভান্ডার খালি করা। কেবল বড়বড় জায়গাতেই এরা ঘোরে না। টিভিপাড়ায়ও ঘোরাঘুরি বেড়ে যায়। বেড়ে যায় পর্দায় মুখ দেখানোও। মুখে যদিও সামান্য টেনশানের ছাপ থাকে না। থাকে ছলে-বলে কলে-কৌশলে ফাও প্রাপ্তির নেশা।

স্বীকার করছি এরা বড়ই পাকনা ব্যবসায়ী। মাথাভরা বুদ্ধি আর মুখভরা যুক্তি। মুখে যুক্তির শেষ নেই। অনেক কিছু করতে পারে। কিছু একটা হলেই সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনাও আদায় করতে পারে। কেবল পারে না সব মালিক মিলে প্রতিটা গার্মেন্টস সিটিতে একটা করে হাসপাতাল বানাতে। প্রতি সিটিতে একটি করে না হোক, সবাই মিলে গত এক বছরে কেবল গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য একটি করোনা হাসপাতালও করতে পারেনি।

পারেনি এই কারণে হয়ত হতে পারে যে, এরা করোনাকে গোণায়ই ধরে না। যেমনি ধরে নাই মামুনুল হক। করোনাকে গোণায় ধরার সময় তাদের ছিল না। তারা নিজেরাই বরং ধরা খাওয়ার ভয়তে ছিল। আতঙ্কে ছিল। মহা আতঙ্ক। মামুনুলের তথা তার কর্মীসমর্থকদের কাছে করোনার চেয়ে ‘ঝরোণা’ আতঙ্ক অনেক বেশি ছিল। এক ‘ঝরোণা’ মানে ঝর্ণা যেভাবে এদের নাস্তানাবুদ করেছে, বাকী ঝর্ণাকে এরা সামাল দেবে কিভাবে! এত্তএত্ত ফোনালাপ ফাঁস অন্তত তাই বলে।

নিশ্চিত করে বলা যায়, প্রথমদিকে হেফাজত বেসামাল ছিল। আর তাই হয়ত মামুনুলের অন্যায় কর্মকান্ডের ভয়াবহতা অনুমান না করেই তার পক্ষ নিয়েছিল নেতৃবৃন্দ। কিন্তু ইসলামের হেফাজতের নামে হেফাজতে ইসলাম জেনাকারী, ব্যভিচারীকে হেফাজত করবে; দেশের মুসলমানরা এটা মেনে নেয়নি। কেন নেবে? ইসলাম আমাদের প্রিয় ধর্ম। নির্ভুল এবং সর্বকালের সেরা ধর্ম। ইসলাম আমাদের গর্বের; আমাদের সবার। হেফাজতের একক সম্পত্তি নয়।

আর ইসলাম এখনও এত অরক্ষিত হয়নি যে, তাঁর হেফাজত করার দায়িত্ব সবাই মিলে তাদেরকে দিয়েছে। গায়ে পড়ে মাতব্বরী করার একটা সীমা থাকা দরকার। দরকার নোংরামী করারও একটা সীমা থাকার। বড় দুঃখ হয়, লজ্জাও লাগে। এই সীমা লংঘনকারীরা আবার মাঠে ময়দানে ইসলামের সবক দেয়! তাদের সবকে আর হেফাজতে যেমনি ইসলামের কোন উপকার হবে না, তেমনি তাদের নোংরামীতেও ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না। ইসলাম টিকে থাকবে অনন্তকাল ইসলামেরই নিজস্ব মহিমায় ইনশাল্লাহ্!

আলহামদুলিল্লাহ্! আল্লাহ্র অশেষ রহমতে করোনা সংক্রমণ বেশ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সাত হাজারের উপরে উঠে যাওয়া সংক্রমণের হার কমতে কমতে হাজারের ঘরে এসে ঠেকেছে। এটা বেশ উদ্দীপক। আল্লাহ্পাক বাংলা তথা বাঙালীর প্রতি সহায় হয়েছেন। এবারের বাংলার করোনার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কাউকে ধরলে কাবু করে তাড়াতাড়ি। চুপচাপ নীরবে আক্রমণ করে ঘাপটি মেরে বসে শরীরকে ধ্বংস করা শুরু করে। মেরে ফেলতেও সময় নেয় না। আবার কারো দেহে বেশিদিন থাকতেও পারেনা। প্রতিদিন সংক্রমণ যেমনি বেশি, তেমনি নেগেটিভ হবার হারও অনেক বেশি।

তাই চলুন করোনা নিয়ে হুরোহুরিটা না করি। আজাইরা কথামালা আর গুজবের ডালপালা না ছড়িয়ে একটু রিয়েলিস্টিক হই। করোনাকে করোনা ভেবেই মোকাবেলা করি। অতি আঁতলামি না করি। গেলবারও আঁতলামি কম করিনি। ধৈর্যহারা হয়েছিলাম। করোনার আক্রমণ শুরু হবার পর স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয়ার জন্য সরকারের ওপর চোটপাট শুরু করলাম। মুখে যা আসে তাই বললাম; জাষ্ট বাপের জন্মদিন পালন করার জন্যে প্রধানমন্ত্রী করোনার সংক্রমণ গোপন করছেন। স্কুল কলেজ খোলা রেখেছেন।

এই নভেম্বরে আবার উল্টো ঘ্যাতর ঘ্যাতর; সরকার স্কুল-কলেজ খুলে দিচ্ছে না কেনো? লেখাপড়ার তো সর্বনাশ হয়ে গেলো। বাচ্চারা শেষ হয়ে গেলো। সব দোষ সরকারের। চালু রাখলেও দোষ, বন্ধ রাখলেও দোষ। কিন্তু আমাদের কোন দোষ না। স্বাস্থ্যবিধি মানি না; এটা মোটেও দোষের না। সবার জীবনযাপনে এটাতো পরিস্কার ছিল। হাত ধোঁয়ার অভ্যাসটা সবাই প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। তবে মাস্ক ব্যবহার ভুলিনি। দুইকানে সুতো বেঁধে মুখে মাস্ক ঝুলাতাম। জাস্ট ঝুলাবার নামে ঝুলাতাম। মুখ এবং নাক খোলা রেখে থুতনীর নীচে ঝুলাতাম।

আর দোলাতাম মন। ইচ্ছেমত দোলাতাম। মনে ছিল বেজায় দোলা। অনেক হলো; আর ঘরে থাকা যায় না। এবার বেরুতে হবে। সাগর, পাহাড়, বন, জংগল সব দেখতে হবে। পুরো দেশটাই ঘুরে দেখে ফেলতে হবে। বলা যায় দেশব্যাপী ঘুরবার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লাম। করোনার কথা বেমালুম ভুলে কক্সবাজার, সিলেট, জাফলং, সুনামগঞ্জ ঘুরতে যাবার হিড়িক পড়ে গেলো। বাদ গেল না রিসোর্টও।

আর ছিল ক্ষমতায় যাবার চান্স। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকানোর নামে মূলত ক্ষমতায় যাবার পথ তৈরী করছিলাম। প্লানিংটা মন্দ ছিল না। একঢিলে কয়েকটা পাখি মারার প্লান। প্রথমত ভারতীয় মালাউনকে (!) ঠেকানো গেল, অন্যদিকে স্বাধীনতার ৫০ বছরের সূবর্ণজয়ন্তীকেও পন্ড করা হলো। আর দূর্বল করা হলো হাসিনার গদি। এক মোদির উছিলায় হাসিনার গদির বারোটা বাজাতে পারলে মন্দ কি!

কিন্তু সমস্যা বেঁধেছে ঘড়ি দেখায়। ভুল করে হাসিনার বারোটা বেজে গেছে মনে করে ‘মোদিতে গেল হাসিনার গদি’ উদযাপনের নামে সোনারগাঁ মিউজিয়াম ভ্রমণে বের হয়ে গেলেন নেতা। যে মিউজিয়ামের খ্যাতি ঈশা খাঁ আমলের নানান ভাস্কর্য্যরে কারণে, পরস্ত্রীকে নিয়ে সেই মিউজিয়াম দেখতে গেলেন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয়ার হুংকারদাতা। ততক্ষণে হুশ ফিরলো নেতার। ভাস্কর্য্যের বিরুদ্ধে এত এত লাফালাফি করে পরস্ত্রীকে নিয়ে নিজেই ভাস্কর্য দেখতে আসাটা ঠিক হয়নি ভেবে লুকোবার চেষ্টা করলেন। এবং লুকোবার নামে রিসোর্টের এক্সক্লুসিভ রুমকেই উত্তম মনে করলেন।

ফেঁসে তিনি এখানেই গেলেন। মুখোশধারী আলেমের মত ভন্ডরাই এমন করেন। প্রকৃত আলেমগণ কখনোই এমনটা করেন না। না দেশীয় আলেম, না ভিনদেশী। ওয়াজ মাহফিলে নীতিবাক্য আওড়ালেও, বাস্তবে হক সাহেব সাচ্চা একজন ভন্ড। বর্ণচোরা যুবকের কাম এবং ক্রোধের কাছে আর সব নস্যি। হেফাজতের তান্ডবে গোটা দেশ যখন স্তম্ভিত তখন মূল উস্কানিদাতা রিসোর্টে মৌজ করছিলেন।

আল্লাহ্র কসম কেটে সীমিত পরিসরে মিথ্যা বলার ফতোয়া দেয়া বহুগামী এই ব্যক্তির জীবনে আসলে সত্য বলে কিছু নেই। তার গত কিছুদিনের কর্মকান্ড, ফোনালাপ, স্বীকারোক্তি ও পুলিশের দেয়া তথ্য থেকে এমন ধারণাই পাওয়া যাচ্ছে। প্রকাশ অযোগ্য তথ্যও আসছে। ইথারে ভাসছে, হাবিজাবি আরো নানা কথা। কে জানে সে সব সত্যি, নাকি মিথ্যে।

সত্যমিথ্যে জানি না। এটুকু জানি, এ নিয়ে মামুনুলের পরিবারের কেউ এখনও প্রতিবাদ করেননি। আমি চাই প্রতিবাদ করুক। দাবীটা মিথ্যে প্রমাণিত হোক। আমার মত লক্ষ লক্ষ মুসলিম খুশী হতো, যদি গত কিছুদিন ধরে ঘটে যাওয়া সবগুলো ঘটনাই মিথ্যে প্রমাণিত হতো। যদিও ইসলামের শান্তি, স্নিগ্ধতা আর পবিত্রতা প্রমাণের জন্যে কারও কোন প্রমাণ হাজিরের অপেক্ষায় নেই বিশ্বমুসলিম জাহান। আমাদের জন্যে আল্লাহ্পাকের পবিত্র কোরআন এবং নবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর সহি হাদিসই প্রমাণ হিসাবে যথেষ্ঠ।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com