বহুদিন পরে, প্রশান্তের পাড়ে!!! (পর্ব-২)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

খুবই ধীরস্থিরভাবে এবং মৃদু হেলেদুলে ধীরে ধীরে নীচে নামছে আমাদের বহনকারী বিমানটি। এমনিতে নারিতা পোর্টে নামার সময় মাঝেমধ্যে এক আধটু জার্কিং হয়। কেঁপে কেঁপে ওঠে। আজ সেটিও হচ্ছে না। কোন ঝাকিঝুকি নেই। কোনরূপ অস্বাভাবিকতা ছাড়াই নেমে আসছে নীচে। তবে যাত্রাপথের মাঝামাঝি সময়ে এমনটা ছিল না। যথেষ্ঠ টারবুলেন্স ছিল। এয়ার টারবুলেন্স। টারবুলেন্সের স্থায়িত্ব স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় নিচ্ছিল বলে ভয়ও পাচ্ছিলাম। ঘুমের ঘোরে পরিস্কার মনে নেই ঠিক কোন জায়গাটিতে এমনটা হয়েছিল।

তবে কোরিয়ার উপরেই হবে হয়ত। ওখানে সব সময়ই টারবুলেন্স হয়। বাতাসের একেকটা ঝাপটায় প্লেনটা এতটাই নড়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি গেল; প্লেনের ডানা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কুচুরমুচুর শব্দে গভীর ঘুমেও জেগে উঠছিলাম। ভয় যে মোটেও পাচ্ছিলাম না, তা নয়। পাশে থাকা শোনিমের আম্মুও ভয় পাচ্ছিল। তার অবস্থা গুরুচরণ। যায় যায় করছে। মুখের দিকে তাকানো যায় না। হাত শক্ত করে চেপে ধরে আছে আমায়। আর সূরা পড়ছে। বিড়বিড় করে পড়ছে। মাঝে মাঝে ওমা, ওমা বলে উঠছে। ধপ্পাস করে একেকটা ঝাকি খায় আর বলে, ওমা।

ওমা বলা আর থামছেই না। নারিতা এয়ারপোর্টে নেমেও ওমা! একেবারেই লোকজনহীন নিশ্চুপ এবং নীরব এয়ারপোর্ট দেখে ওমা শব্দটি এমনিতেই মুখ থেকে বেড়িয়ে এসেছে। আজ মোটামুটি ভূতুরে এয়ারপোর্ট বলে মনে হচ্ছে নারিতাকে। টারমিনাল ২ এ আমাদের ফ্লাইটের যাত্রী ছাড়া আর একটি লোককেও দেখতে পাচ্ছি না। সুনসান নিরবতা। যে পোর্টে একদিন মিনিটে তিনটি ফ্লাইট নামতো, সেই পোর্টে এখন তিন ঘন্টায়ও একটি নামে কিনা সন্দেহ।

বোর্ডিং ব্রীজ ধরে হেঁটে কিছুটা পথ এগুলাম মাত্র। অমনি আটকে দিল দুটো মেয়ে। সবাইকে একসাথে যেতে দেবে না। দেশভিত্তিক লাইন আলাদা করে হাঁটাবে। শুরু হলো বিভাজন। করোনা বিভাজন। আসলে এটা একটা খেলা। মূল লক্ষ্য ৩য় বিশ্বকে আলাদা করা। করোনায় সারা বিশ্ব আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্থ। বেশি আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ১ম বিশ্ব। ওরাই রোগটির জন্ম এবং বিশ্বে ছড়ানোকারী। অথচ আজ অচ্ছুত হচ্ছি আমরা ৩য় বিশ্বের নাগরিক। শিকার হচ্ছি বর্ণবৈষম্য এবং শ্রেণী বৈষম্যের। এসব যে কী পরিমান হয়রানীর তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বুঝবে।

তবে হয়রানী এখনো পুরোদস্তুর শুরু হয়নি। এখনো ইজ্জত আছে আমাদের। ওটা পাংচার হবে সামনে। ডাবল ডোজ টিকা নেয়া আছে, একদিন আগের পিসিআর টেস্টের নেগেটিভ সনদও নিয়ে এসেছি দেশ থেকে। অথচ এসব এখানে মূল্যহীন। কেউ কানে তোলে না। আবারও পিসিআর টেস্ট করাতে হবে এয়ারপোর্টেই। লাগবে নেগেটিভ রেজাল্ট। সাথে আনুসাঙ্গিক আরো অনেক কিছু। তারপরই ইমিগ্রেশানে যাওয়া যাবে। নচেৎ নয়। রেজাল্ট পজিটিভ আসলে খবর আছে। সোজা করোনা ডিটেনশান সেন্টার।

মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি আর নেগেটিভ রেজাল্টের আশায় বসে আছি। বসার ফাঁকে প্রত্যেকের মোবাইলে করোনা অ্যাপ্স ডাউনলোড করে দিল যেন কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে এদের কথামত ঠিকঠাক ভাবে আছি কিনা সেটা পরখ করতে পারে। পরখ করবে দিনে কয়েকবার মেসেজ পাঠিয়ে এবং মিনিমাম দুইবার ভিডিও কল করে। কঠিন শর্ত, মোবাইল হাতছাড়া করা চলবে না। এমনকি হাগু করতে গেলেও না।

হাগু নিয়ন্ত্রক এই কোয়ারেন্টাইন দুইভাগে বিভক্ত; কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে প্রথম তিনদিন। পরে বাসায় যেয়ে বাকী এগারো দিন। মোট ১৪ দিন। বাসা আর কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের পার্থক্য হবে জেলে বন্দি আর গৃহবন্দির মত। দুটোই নিয়ন্ত্রিত জীবন। কঠিন মনিটরিং এর জীবন। কিন্তু কেন এত আয়োজন সেটাই বুঝতেছিলাম না। আমরা তো করোনা রোগী নই। জেলেই যদি থাকবো, তাহলে দুই ডোজ টিকা দিয়ে আসলাম কেন?

কে শোনে কার কথা! অপরাধ একটাই; জন্মেছি বঙ্গেতে। আর কিচ্ছু না। মাইকেল মধুসূধনের কষ্টটা হাড়ে হাড়ে ফিল করছি। প্রচন্ড ক্লান্ত দেহখানা নিয়ে লিমোজিনে বসতেও কষ্ট হচ্ছিল। এয়ারপোর্ট থেকে ৭০ কিমিঃ দূরে টোকিও শহরে নিয়ে যাচ্ছে। টোকিওতে আমার বাসার খুব কাছেই করোনা কোয়ারেন্টাইন সেন্টার। অথচ ওখান থেকে তিনদিন পরে বাসায় যেতে দেবে না। আবার এতদূরের এয়ারপোর্টে নিয়ে আসবে।

থ্রিস্টার মানের হোটেলকেই ওরা কোয়ারেন্টাইন সেন্টার বানিয়েছে। ভাবলাম, সময় খারাপ কাটবে না। বাপবেটা মিলে দিনভর অনলাইনে থেকে সময় কাটিয়ে দিবো। নো খাবার, নো দাবার। ওর মা তো সাথে আছেই। দুই জনের যা কিছু দেখভাল, তা সে নিজেই করবে। হলো না। ভাবনার সব আশায় গুড়েবালি দিয়ে আমাদের আলাদা কক্ষে রাখলো ওরা। দুটো রুমে তিনজন। একই ফ্লোরে। খুব কাছাকাছি। আমার তিনটা কক্ষের পরেই ওদের কক্ষ।

তবুও উপায় নেই। কেউ কারো রুমে যেতে পারবো না। বিশেষ কোন প্রয়োজনেও না। নো মাখামাখি, নো দেখাদেখি। একবার দেখা করলাম তো আইন ভাঙলাম। আইন ভাঙলেই জরিমানা। বড় অংকের আর্থিক জরিমানা। কোয়ারেন্টাইন বলতে কথা। কাজের মধ্যে দুটি কাজ। কক্ষের দরজা বন্ধ করে কেবল শুয়ে অথবা বসে থেকে সারাক্ষণ জ্বর মাপো। জ¦র থাকলেও মাপো, না থাকলেও মাপো। আর অ্যাপ্স এ একটু পর পর রিপোর্ট করো।     

বিশাল এক যন্ত্রণার নাম এই অ্যাপ্স। বন্দি জেলেও অ্যাপ্স এ একটু পর পর মেসেজ; ‘কোথায় আছো ইনফরম করো। আর রিসিভ করো ভিডিও কল।’ রোবটিক কল, মানুষেরও কল। এসব করে ওরা দেখতে চায়, সত্যি সত্যি রুমেই আছি নাকি বাইরে ঘুরতে গেছি। মোদ্দা কথা, ওদের অনুমতি ছাড়া কিচ্ছু করা যাবে না। একা একা থাকতে থাকতে আর টেনশানে টেনশানে পেটের এসিড সিক্রেশান বেড়ে যাচ্ছে। গ্যাসে পেট ভরে যাচ্ছে। কিন্তু ছাড়া যাচ্ছে না।

ছাড়ছি না এই ভয়ে যে, বেশি বেশি ছাড়লে আবার কি না ভিডিও কল দিয়ে বলে, এই মিয়া এত পাদো কেন? আসলে আমার কপালটাও খারাপ। কে জানে ওরা কিছু বুঝতে পারে কিনা। হতে পারে কোইনসিডেন্ট। আমি টয়লেটে থাকাকালীন সময়েই কেন যেন ওরা কল দেয়। ভিডিও ওপেন করেই বলে, কোথায় আছো? কী করো? বলি, টয়লেটে আছি; হাগু করি। কষা হাগু। ক্যামেরা কি ঘুরিয়ে দেখাবো? হালকা হেসে দিয়ে বলে, নো, নো। ইটস ওকে; ইটস ওকে।

এ তো গেল ক্যামেরার যন্ত্রণা। মাইকের যন্ত্রনাও আছে। একটু পর পর কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে ঘরের মাইক চালু হয়। আর শব্দ করে আসে এনাউন্সমেন্ট। আসা শুরু হয় সকাল ছয়টা থেকেই। তেমন সিরিয়াস কিছু বলে না। বলে, কক্ষের দরজার ঠিক সামনে পলিথিন পেপারে খাবার রেখে গেছে। আমরা যেন মুখে মাস্ক পড়ে আস্তে করে দরজা কিছুটা আলগা করে খাবারের প্যাকেটটা রুমে ঢুকিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে দেই। প্রতিদিন প্রতিবেলায় মোটামুটি একই খাবার। এক বক্স খাবার আর এক বোতল পানি।

এরূপ এক খাবার প্রতিবেলায় আর কত খাওয়া যায়। খেতে খেতে হাঁপিয়ে উঠেছি। বেশি হাঁপিয়ে উঠছি আমার শোনিমকে না দেখতে পেয়ে। ছোট্ট মুখখানির অবয়ব বড় কষ্ট দিচ্ছে আমায়। ভিডিও কলে দেখে আর মন ভরে না। খুব কাছাকাছি থেকেও কলিজার টুকরাকে ভিডিও কলে দেখতে হবে এরচেয়ে কষ্টের কিছু জীবনে থাকতে পারে কি? অগত্যা কুবুদ্ধি আসে মাথায়। বুদ্ধি করলাম রাত গভীরে দরজা হালকা খুলে মাথা বের করে ওদেরকে দেখবো। আগে থেকেই বলে রাখবো ওরাও যেন একই সময়ে দরজা খুলে মাথা বের করে।

যেই ভাবা সেই কাজ। রাত তখন দু’টা হবে হবে। করিডোরে লোকজনের আনাগোনা আর শোনা যাচ্ছে না। ওদেরকে কল দিয়ে বের হতে বলে আমি চুপিসারে দরজা আধা খুললাম। মাথা ঘুরাতেই দেখলাম আমার আগেই ওরা দুজনায় মাথা বের করে দাঁড়িয়ে আছে। আধা আফছা আলোছায়ার হালকা অন্ধকারে দুটো মুখ দেখা যাচ্ছে। হুম সত্যি দেখা যাচ্ছে। ঐ তো আমার শোনিম প্রচন্ড হাসিমুখ নিয়ে তাকিয়ে দেখছে আমায়। দেখছে ওর আম্মুও। এমনভাবে দেখছে, যেন কতদিন কতবছর দেখেনি আমায়!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com