এরা শক্ত তেদর। সহজে দমে না।

প্রকাশের সময় : 2020-10-01 11:36:25 | প্রকাশক : Administration
এরা শক্ত তেদর। সহজে দমে না।

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমার প্রবাসী জীবনের বয়স পুরো বয়সের প্রায় অর্ধেক। প্রবাসে আছি বলে সবাই ভাবে ভাল আছি। কেবল ভাল নয়; বেশ ভাল আছি এবং মহা শান্তিতে আছি। ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। আগে যাও ছিলাম। শান্তির ছিটেফোঁটা কমবেশী ছিল। করোনাকালে সেটাও এখন শুণ্যের কোঠায়। যদিও এখানে করোনা এখন খুবই নিয়ন্ত্রিত। দৈনিক শ’পাঁচেক আক্রান্ত হয় বটে। কিন্তু মানুষজন এসব নিয়ে ভাবে না। ভাবে, করোনা শেষ। করোনার দিনও শেষ।

তাই আড্ডার শুরু। প্রবাসী বাঙালীদের দেখাসাক্ষাত কিংবা চায়ের আড্ডা আবার শুরু। অনেকটা আগের মতই। আড্ডার টেবিলে চা আসতে দেরী। কিংবা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দেরী। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে মুখে যা আসে তা বলতে একটুও দেরী করে না কেউ। মুখটা একটু বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে শুরু করে, আর কইয়্যেন না ভাই। এইডা একটা দেশ হইল! অবস্থা খুবই করুণ। বড়ই বেগতিক। পরীক্ষা নাই, চিকিৎসা নাই। কিচ্ছু নাই। যাচ্ছে তাই অবস্থা। বেড়াছ্যাড়া লাইগ্যা গেছে। দিন দিন অবস্থা খালি খারাপের দিকে যাইতাছে।”

শুধু যে এমন করে বলে তাও নয়। মুখে বিদ্রুপাত্মক বাঁকা হাসি দিয়ে মজাও পায়। বেশ মজা। টেবিলে সদ্য রাখা ঘন দুধের চায়ে চুমুক দিয়ে যে মজা না পায়, দেশের বদনাম করে তার চেয়ে বেশী মজা পায়। প্রবাসে বসে নিজ দেশের বদনাম করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা জাতির মাঝে বাঙালি জাতি প্রথম হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। এত্তএত্ত সাবজেক্ট থাকতে যখনই বাংলাদেশ হয় আলোচনার সাবজেক্ট, তখন আর কিচ্ছু লাগে না। জীবনে যত দেশে গেছি, কোথায়ও এর ব্যতিক্রম দেখিনি। কেন জানি না, বাংলাদেশের কোন ভাল খবরে তারা মজা পায় না। আলোচনায়ও আনে না ভাল খবর। আশাও করে না।

আশা করে কেবলই খারাপ খবর। কদিন আগে বন্যায় প্রমত্তা পদ্মা উত্তাল। দুপাড় উপচে থৈ থৈ করছে বানের পানি। স্রোতস্বিনী পদ্মা! অবিশ্বাস্য রকমের ভাঙন শুরু হয়েছে দুপাড়ে। পদ্মা সেতু সংশ্লিষ্ট লোকজন আতঙ্কিত। আতঙ্কিত দেশবাসীও। হঠাৎ করে একদিন সেতু নির্মাণ সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনা পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ঝুকির মুখে পড়ে পদ্মা সেতুও। অমনি শুরু হয় ওদের মাতম। আনন্দের মাতম। কী যে আনন্দ! আর তার প্রকাশ; আরে ধুর! ওরা করবো সেতু! আগেই তো কইছি, সেতুটেতু হইবনা। পদ্মায় সেতু করা কি এত্ত সোজা। এইডা কি বুড়িগঙ্গা পাইছে!”

এটা আসলে ফোবিয়া। মানসিক রোগ। তবে এসবে প্রবাসীরা ততটা দোষী নয়। তাদেরকে এমনটা বানিয়েছে দেশী মিডিয়া। টিভি মিডিয়ার কিছু আতেল এবং স্যোসাল মিডিয়ার সত্যমিথ্যে বানানো হাজারো প্রপোগান্ডা বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রবাসীদের কঠিন রকমের ভুল ধারণা দিয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে পরিস্থিতি এখন করোনা মহামারীর চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। দেখে মনে হয়, বহু বছর পর মিডিয়া মোক্ষম একটি বিষয় পেয়েছে। মিডিয়ার এমন বিশ্রী ভূমিকা নিয়ে কম তো লিখিনি। লাভ হয়নি। কে পড়ে আমার লেখা!

আর পড়লেই বা কি? দোষ তো আমাদেরও আছে। জাতি হিসেবে আমরা নিজেরাই তো নেগেটিভিটি প্রিয় জাতি। পজেটিভ কথায় আমাদের মন ভরে না। পজেটিভের মাঝেও নেগেটিভ খুঁজি সর্বদা। প্রধানমন্ত্রীর সাহসী সিদ্ধান্তে গার্মেন্টস খুলে দেবার পর মিডিয়া সারাবিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলেছিল। অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং পজেটিভ সিদ্ধান্তকে নেগেটিভ বানিয়ে ভয় ছড়িয়ে দিয়েছিল দেশবাসীকে। ধারণা দিয়েছিল পোশাক খাতের লাখ লাখ কর্মী আর বস্তিবাসী এবার শেষ।

সাথে শেষ পুরো বাংলাদেশ। আশঙ্কা ছড়িয়েছিল গার্মেন্টস খুলে দেয়ায় কর্মীদের মধ্যে সংক্রমণের তীব্রতা এবং মৃত্যু অনেক বেশি হবে। শত শত লোক মরবে কাতারে কাতার। তবে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের পর প্রমাণ হয়েছে, সবই ফালতু আশঙ্কা। বরং পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে সংক্রমণের মাত্রা তুলনামূলক খুবই কম হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও একেবারে ‘নগন্য’। এসব দেখে ওরা এখন একদম চুপ। যেন মুখে গোবর পড়েছে। ভুলেও এসব নিয়ে একটি কথাও বলে না।

বলবে কিভাবে? অন্য কমিউনিটির চেয়েও গার্মেন্টসকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণের মাত্রাও খুবই কম। এক গাজীপুরে সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ পোশাককর্মীর মধ্যে মাত্র ৪০০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আর মারা গেছেন মাত্র একজন। এটা অভাবনীয়, অকল্পনীয়। আতেলরা ভেবেছিল মৃতলাশে ভরে উঠবে গার্মেন্টসের আঙিনা। ভেতর বাহির লাশের গন্ধে ভারী হবে। হয়নি। আতেলদের শঙ্কা আর ভবিষ্যতবাণী শতভাগ মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রমাণিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই সময়োপযোগী। ওদের কানঝালা করা বকবকানীর পরও প্রধানমন্ত্রী আতেলদের কথা শোনেননি। বোঝার চেষ্টাও করেননি। যা বোঝার নিজে বুঝে, যা করার নিজে নিজে করেছেন। সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এককভাবে। একমাস বন্ধ রাখার পর গার্মেন্টস খুলে দিয়েছেন। জীবন এবং জীবিকার প্রয়োজনে এর যে বিকল্প নেই তা তিনি হাঁড়ে হাঁড়ে উপলব্ধি করেছেন। এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রমাণ করেছেন তার সিদ্ধান্তই সঠিক। তিনি জাতিকে নিশ্চিত দূর্ভিক্ষ আর অরাজকতার মহাসংকট থেকে বাঁচিয়েছেন।

তবে বাঁচাতে পারেননি কিছু সংখ্যক করোনা রুগীকে। এটা সত্যি। সেই সংখ্যা খুব যে বেশী তাও নয়। এখন পর্যন্ত ৫,০৭২ জন। আক্রান্তের শতাংশের বিচারে তা নেহায়তই নগন্য; ১.৪ শতাংশ। আমি কোনভাবেই মৃত্যুকে ছোট করে নগন্য শব্দটি ব্যবহার করিনি। কিন্তু মহামারীর তুলনায় সংখ্যাটি যে বড়ই নগন্য সেটা বোঝাতে চাচ্ছি। মহামারীতে রক্ষা পেয়েছেন অধিকাংশই। আক্রান্তের ৯৮.৬ শতাংশ। আক্রান্ত হয় বটে। কিন্তু কিছুদিন রোগ ভোগের পর সবাই সুস্থও হচ্ছেন।

আক্রান্তের হার এক সময়ে ২৪ শতাংশে উঠেছিল। সেটাও মাসখানেক হলো কমতির দিকে। প্রতিদিনই কমছে। কমতে কমতে এখন ১০ শতাংশে নেমেছে। আস্তে আস্তে আরো নেমে আসবে। এ পর্যন্ত সারাদেশে মোট আক্রান্ত ৩.৫ লক্ষ। যদি দেশের মোট শহর-গ্রাম মিলে গড়ে ধরি সত্তর হাজার। তাহলে গড়ে বাংলাদেশের প্রতিগ্রামে ৪ থেকে ৫ জন আক্রান্ত হচ্ছে করোনায়। এটা একটা সংখ্যা হলো? মহামারীর নামে সবকিছু বন্ধ করে দেবার মত অবস্থা হলো?

এসবই তো মৃত্যু ভীতি থেকে হয়েছে? মানলাম। কিন্তু প্রতি ১৭টি গ্রামে ১ জন করে মানুষের মৃত্যু কি আসলেই ভীতিকর? আসলেই কি বাংলাদেশের অবস্থা খুব খারাপ! দেশে সবকিছু ছ্যাড়াব্যাড়া লেগে গেছে! ছ্যাড়াব্যাড়াটা নতুন করে লাগলো কোথায়? যে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সারাবছর জুড়েই ছ্যাড়াব্যাড়া মার্কা, তাকে নতুন করে বিশেষন লাগাবার কি আছে। পুরো দেশজুড়ে ৯৮টি ল্যাব এ টেস্ট হচ্ছে। একেকটা ল্যাবে দিনে একশ থেকে দেড়শ করোনা উপসর্গ নিয়ে রুগী আসছে। এ সংখ্যা তো খুবই কম। পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে আরো কম।

আর কমছে। দিনদিনই কমছে। এরচেয়ে ভাল সংবাদ আর কী হতে পারে! তারপরও প্রবাসে বসে দেশ নিয়ে হাহুতাশ করতে হবে? মুখে যা আসে তাই বলে দেশের বদনাম করতে হবে? বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে করোনা মহামারীতে তেমন কিছুই হয়নি বলা চলে। বরং মহা বাঁচা বেঁচে গেছে আমার দেশ। অথচ পরিস্থিতি উল্টো হতে পারতো। খুবই খারাপ হতে পারতো। হয়নি। এটা খুবই আনন্দের। এটা সফলতার; এটা গৌরবের। নিন্দার নয় মোটেও। নিন্দুকদের উচিত কিছু বলার আগে আরো সাবধান হওয়া।

অসাবধানী হয়ে মুখে যা আসে তাই বলা যায়। বাইরে কাজ না করে বদ্ধ ঘরে বসে মজার মজার খাবার খেয়ে এমন প্যানপেনানি চাইলে সবাই করতে পারে। ওরাও ঠিক এভাবেই করছে। এটা সহজ। মাঠে নেমে কাজ করা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী কাজ করছে দিন রাত। কাজ করাচ্ছেনও দিন রাত। সব নিজের বুদ্ধিতে। চলছেনও নিজের ফর্মূলায়। আতেলদের ফর্মূলায় চলেননি। চললে সর্বনাশ হতো। দেশ মহা বিপদে পড়তো।

দেশকে বিপদে ফেলে, পুরোপুরি অচল করে রোগ নির্মূলের এই ফর্মূলা আর যারাই দিক না কেন তারা সুস্থ মস্তিস্কের না মোটেও। নিঃসন্দেহে তারা অসুস্থ; দূরভিসন্ধিমূলক ভাবনায় লিপ্ত। তারা নষ্ট মানুষ। কঠিন নষ্ট এবং মহা দুষ্ট প্রকৃতির; সর্বদা সুযোগ সন্ধানী। সুযোগ পেলেই নষ্টামির ধান্দায় মেতে ওঠে। এবারও উঠেছিল। সদলবলে আটঘাট বেঁধে উঠেছিল। তবে এখনো পারেনি। শত চেষ্টার পরেও এখনো দেশটাকে একটুও নষ্ট করতে পারেনি। যদিও এরা শক্ত তেদর। সহজে দমে না।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com