হাসিনা যুগের বৈশিষ্ট্য

প্রকাশের সময় : 2020-10-14 16:11:02 | প্রকাশক : Administration
হাসিনা যুগের বৈশিষ্ট্য

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীঃ বাংলাদেশের ইতিহাস বহুবার বিকৃত করা হয়েছে। সেই প্রাচীন সেন রাজাদের আমল থেকে পাঠান, মোগল যুগ, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী যুগ, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও। সেন রাজারা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন অনার্য্য বাঙালীরা অসভ্য, তাদের ভাষা রৌরব নরকের ভাষা। পাঠান ও মোগল আমলে বাঙালীর মিথ্যা ইতিহাস তৈরি করে বলা হয়েছিল, তারা ভীরু, কাপুরুষের জাত। তাদের রাজা লক্ষণ সেন মাত্র ১৭ জন সৈন্য নিয়ে আরব সেনাপতির আক্রমণের ভয়ে তার রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে লক্ষণ সেন ভীরু ছিলেন না। আমাদের পূর্ব পুরুষ লক্ষণ সেন রাজধানী ছেড়ে পালিয়েও যাননি।

এরপর ইংরেজ আমলের কথা। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে ইংরেজ ইতিহাসবিদেরা মিথ্যা প্রচার করলেন, তিনি এমনই নিষ্ঠুর ছিলেন যে, কলকাতায় ইংরেজদের কুঠি আক্রমণের পর বন্দী ২০০ ইংরেজ সৈন্যকে অন্ধকূপে বন্দী রেখে হত্যা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে আরও রটানো হয়েছিল, ৫৬ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

দুটিই ছিল ডাহা মিথ্যা। পরবর্তীকালে বিখ্যাত বাঙালী ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় প্রমাণ করেন, সিরাজের বিরুদ্ধে অন্ধকূপ-হত্যার অপবাদ ছিল ইংরেজদের উদ্দেশ্যমূলক রটনা আর পলাশীর যুদ্ধে নবাব পরাজিত হননি, বরং তার সেনাপতি মীরজাফর তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। পলাশীর যুদ্ধের আগে সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে যুদ্ধে ইংরেজরা পরাজিত হয়ে সেনাপতি ক্লাইভসহ মাদ্রাজে পলায়ন করেছিল। পাকিস্তান আমলে বাঙালীর ইতিহাস বিকৃতির একই ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। বাঙালী মুসলমানদের বলা হলো তারা প্রকৃত মুসলমান নয়। তারা হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত। তাদের চাল চলন, আচার আচরণ সব হিন্দুয়ানি। তাদের ভাষা-সংস্কৃতি হিন্দুয়ানি। পাকিস্তানের অবাঙালী শাসকদের এই প্রচারণা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য ১৯৫২ সালে বাঙালী তরুণদের রক্ত ঝরাতে হয়েছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় মোশতাক-জিয়াউর রহমান চক্রের ষড়যন্ত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ শহীদ হন এবং স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ ক্ষমতা দখল করে। তাদের একুশ বছরের শাসনামলে শুরু হয় আবার ইতিহাস বিকৃতি। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলে শুরু হয় সেখানে ঘাতক চক্রের নায়ক জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানী ‘তাহজিব-তমদ্দুন’ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

সম্ভবত এই ষড়যন্ত্র সফল হতে পারত যদি শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগকে আবার সংগঠিত না করতেন এবং দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসতে না পারতেন। মাঝখানে অবশ্য একটা বিরতি আছে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল। তারপর জনতার সংগ্রাম স্থায়ীভাবে বিজয়ী হয় ২০০৮ সালে। শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হন ও দীর্ঘ তিন দফা ক্ষমতায় আছেন এবং ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন।

এই যে তিন মেয়াদের শাসনকাল, আমার আশা তা আগামী নির্বাচনের পরেও সম্প্রসারিত হবে। এই সময়টাকে আমি নাম দিয়েছি ‘ইরা অব হাসিনা’ বা হাসিনার যুগ। দিল্লীতে পাঠান সম্রাট শের শাহ্ মাত্র সাড়ে তিন বছর সিংহাসনে ছিলেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড তৈরি করেন। ডাক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। সাম্রাজ্য জুড়ে রাস্তার পাশে পান্থশালা প্রতিষ্ঠা করেন। এ জন্য ইতিহাসে শের শাহ্ শাসনামল চিহ্নিত হয়েছে ‘শের শাহী যুগ’ হিসেবে। মোগল আমলের শেষ দিকে সুবে বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন শায়েস্তা খান। তিনি বাংলার মানুষকে এক টাকায় পাঁচ মণ চাল খাইয়ে তার আমলকে শায়েস্তা খানের যুগ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত করে গেছেন।

বর্তমানের শেখ হাসিনার শাসনকালও যে ভবিষ্যতের ইতিহাসে ‘হাসিনা যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত হবে, তাতে আমার সন্দেহ নেই। তার শাসনকালকে স্বৈরাচারী শাসন, অবৈধ শাসন, অগণতান্ত্রিক শাসন রূপে চিহ্নিত করার যে অপচেষ্টা স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ করেছে, দেশের একটি সুশীল সমাজও রয়েছে, তা ব্যর্থ হয়েছে। দেশে এবং বিদেশে শেখ হাসিনা এখন নন্দিত নারী। তার নেতৃত্বে সারা দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের ‘মডেল কান্ট্রি।’

শেখ হাসিনার আমলে দেশে একটি রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা স্থিতিশীল হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অকল্পনীয়। বন্যা, মহামারী, দুর্ভিক্ষের দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত, স্বনির্ভর অর্থনীতির দেশ, যে দেশটি শীঘ্রই মধ্যম আয়ের দেশে দ্রুত পরিণত হতে চলেছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিপন্মুক্ত হয়েছে। তার দ্রুত উন্নয়ন চলেছে। বাংলার ইতিহাস-বিকৃতি বন্ধ হয়েছে। স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানছে নতুন প্রজন্ম। জাতির পিতা তাঁর মর্যাদার আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

হাসিনার সব চাইতে বড় কৃতিত্ব তিনি তলাবিহীন ঝুড়ির একটি দেশকে বিশ্বের বুকে আবার মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শেখ হাসিনার শাসনামল অবশ্যই ভবিষ্যতের ইতিহাসে ‘হাসিনা যুগ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। শায়েস্তা খানকে যেমন আজ দু’শ’ বছর পরেও স্মরণ করা হয় তেমনি কয়েক শ’ বছর পরেও বাংলাদেশের এই সময়টা হাসিনা যুগ হিসেবে ভবিষ্যতের মানুষ স্মরণ করবে।

হাসিনা যুগের আরও একটি বড় বৈশিষ্ট্য, দেশটির উন্নয়নের গতি ভালই চলছিল। বিশ্বগ্রাসী কোভিড-১৯ এসে বাংলাদেশকেও আঘাত করেছে। হাসিনা করোনা এবং সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্লাবনের সমস্যা থেকেও দেশকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। বিদেশী পর্যবেক্ষকরাও তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করছেন এবং বলেছেন, করোনা-উদ্ভূত অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ খুব তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে পারবে।

বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা দুর্নীতি। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। বহু রাঘব-বোয়াল ধরা পড়েছে। আরও ধরা পড়বে আশা করা যায়। দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে হাসিনা যদি সফল হন তাহলে শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, উপমহাদেশের ইতিহাসেই এক স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত হবেন তিনি। (সংকলিত)

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com