করোনা দিনের ডায়েরি...

প্রকাশের সময় : 2020-10-28 12:00:53 | প্রকাশক : Administration
করোনা দিনের ডায়েরি...

৫ম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ

করোনা কেবল মরণযুদ্ধ নয়, সামাজিক মিডিয়াতেও কথার যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে। জাতে জাতে, গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ লেগেছে। এখন ঘরে বাইরে যুদ্ধ। বাইরে করোনার আর ঘরে কথার। ডাক্তারদের তুলোধূনো করায় তারা ক্ষেপেছেন। ক্ষেপার তো কথাই। হাতেগোণা কয়েকজন ডাক্তারের কথায় সব ডাক্তারকে তুলোধূনো করবেন আর তারা বসে থাকবেন তাতো হয় না। এবার তারাও বলছেন। বলে বলে মিডিয়া সয়লাব করে ফেলছেন।

কেবল ডাক্তার নয়, সবাই বলছেন। বলবেন না কেন? হাজারো ব্যস্ততায়ও যারা বলেন, তারা চুপ করে থাকবেন লকডাউনের এই সময়ে! এটাতো হতেই পারে না। তাই বলছেন। সুযোগ পেলেই বলছেন। কেউ পাবলিকলি বলছেন, কেউ বা ঘরোয়া আড্ডায়। সবাই যে অযৌক্তিক বলছেন, সেটাও নয়। আজকের ম্যাসেজে মিন্টুও অযৌক্তিক বলেনি। গভীর রাতে অনুজ মতিউর রহমান মিন্টুর মেসেজ।

মিন্টু শিক্ষকতা করে। পড়াশুনা শেষ করে শহরমুখী হয়নি। গ্রামেই থাকে। গ্রাম থেকেই জানালো; “এই বিপদ থেকে আমরা কি রক্ষা পাব? আমি তো ভবিষ্যত ভাল দেখছিনা। মানুষের ভিতর কোন সচেতনতা নাই। গ্রামের চায়ের স্টলে লোক গিজগিজ করছে। ভিতরে আড্ডা; মিলেমিশে পরচর্চা খুব ভাল চলছে। মসজিদে নামাজ কেন বন্ধ হইল এই নিয়া খুব আক্ষেপ। এক ওয়াক্ত নামাজও পড়ে না, তাকেও খুব দুঃখ করতে দেখলাম। একজোড়া জুতা আল্লাহর উপর ভরসা করে মসজিদের বাইরে রেখে আসতে রাজী না; কিন্তু জানটার ভার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

সত্যিই তো! মিন্টু সত্যি চমৎকার বলেছে। মেধাসম্পন্ন ছেলে মেধাবীর মতই বলেছে। অজ্ঞতা, মূর্খতা আমাদেরকে কতটা বিপদগ্রস্ত করতে পারে সে এটা চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। মক্কা মদিনার হেরেম শরীফ পর্যন্ত সকল মসজিদে নামাজ বন্ধ করে দিল। দেওবন্দ, আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ফতোয়া আসলো ঘরে বসে নামাজ পড়ার। অধিকাংশ আলেমগণ প্রথমে কিছুটা অমত করলেও দেরী না করেই মেনে নিলেন। কেবল মানতে পারলো না বেনামাজীর একটা বড় অংশ।

আজকে মিন্টুকে কেবল মেধাবী নয়, বেশ ক্ষ্যাপাও মনে হচ্ছে। ক্ষোভ তার বিজিএমইএর উপরও। মিন্টু লিখেছে, “বিজিএমইএ’র সভাপতি হিসেবে রুবানা যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিলেন, লাখ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকদের হাঁটিয়ে ঢাকা নিয়ে আবার রাত এগারটায় ফিরে যাবার ঘোষণা দিলেন। উন্নত বিশ্বে তার এই আচরণের জন্য কি শাস্তি হতো বলে আপনি মনে করেন? এটা তো এক ধরনের গুজব সন্ত্রাস। আর এই গুজবের বলি হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক। ফটোগ্রাফির কল্যাণে তাদের ফোস্কা পড়া পায়ের ছবিগুলা দেখা হয়েছে আমাদের। এই নির্মমতার কোন জবাব হয়না।”

আসলেই জবাব হয় না। বড় কষ্টভরা তার কথাগুলো। আমরা বিবেকহারা। বিবেক সবার হারাতে বসেছে। আজগুবি কান্ড এবং কথায় ভেসে যাচ্ছে তাবৎ বাংলা। কোথায়ও থেকে মৃত্যুর একটা সংবাদ এলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বলাবলি করছে এটা করোনায় মৃত্যু। ভাবখানা এমন, এই দেশে আগে কোনো মানুষ মারা যায়নি। দেশে কারও অন্য কোনো রোগ বালাই হয়নি কখনো। এখন যারাই যেখানে মারা যাচ্ছেন তাদের ইনিয়ে বিনিয়ে করোনা রোগী বানানোর একটা অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

বলেছেন আশরাফুল আলম খোকনও। তিনি লিখেছেন, দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা কেন এখনো এতো কম এটা অনেকেরই সহ্য হচ্ছে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি মূলধারার অনেক মিডিয়ার মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ লিখছেন, করোনা টেস্ট করার আগেই অমুক জায়গায় দুইজন মারা গেলেন। কেউ লিখছেন আরও আফসোসের কথা; মৃত্যুর আগে তার করোনা টেস্ট করা হলো না। কর্মহীন জীবনে ঘরে বসে আরামে থাকতে থাকতে সবার মনের মধ্যে একটা ফুর্তি বিরাজ করছে। লেখাগুলো ফুর্তি প্রকাশের অনুভূতি মাত্র।

অনুভূতি একেকজনের একেক রকম। কেউ কেউ করোনাকে ধর্মীয় আবরণে ঢাকার চেষ্টা করছেন। একজন তো স্বপ্নেও করোনাকে দেখে ফেলেছেন; ইন্টারভিউও নিয়েছেন। করোনার সাথে ইন্টারভিউ! হাজারো মানুষের জমায়েত করে জাতিকে প্রকাশ্যে গ্যারান্টি দিয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশের মুসলিমদের করোনায় ধরবে না বলে গ্যারান্টি দিয়েছেন। কঠিন গ্যারান্টি। বিফলে মূল্য ফেরত প্যাটার্নের গ্যারান্টি।

তাদের অনুসারীও অনেক। চরম বিশ্বাসী টাইপের অনুসারী। সরলপ্রাণ মানুষেরাই সাধারণত কঠিন বিশ্বাসী টাইপের অনুসারী হয়। আমার খুব কাছাকাছিও এমন একজন অনুসারী আছেন। সদা চুপচাপ ধরানার লোক। কিন্তু বলার সময় কোন ছাড় নেই। যা বিশ্বাস করেন একদমে বলে ফেলেন। প্রাসঙ্গিকও বলেন। অপ্রাসঙ্গিকও বলেন। তবে দলিলবিহীন কথা বলেন না। দলিল নিয়েই বলেন। তার দলিল হলো ফেসবুক।

আজ বিকেলে তার সঙ্গে আলাপ। খুবই উৎফুল্ল মনে হলো। মহা ইন্টারেস্টিং তথ্য পেয়েছেন ফেসবুকে। আমি খোঁচা দেয়াতে শুরু করলেন। তবে আজকের পাওয়া তথ্যে উৎফুল্লতা থাকলেও ততটা বিশ্বাসী মনে হলো না মানুষটাকে। বিশ্বাসী না হবার মূল কারণ দলিল। দূর্বল দলিলকে পুরোটা বিশ্বাস করতে নেই। এটাও তার বিশ্বাস। তার বিশ্বাস, দলিল যেমনি সবল হয়, তেমনি দূর্বলও হয়।

দূর্বল দলিলের স্ক্রীনশটও তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন। দুজন লোকের কথোপকথন;

- গজবরে ভাই গজব। সব গজব। করোনা ফরোনা আসলে কিছুই না। সবই গজব। চাইনীজ মুসলমানদের উপর করা জুলুমের গজব। কী জুলুমটাই না করলো চাইনীজ সরকার চায়নার মুসলমানদের উপর। তাই গজব নেমে এসেছে ওদের ওপর।

- তাহলে ইরানের মুসলমানরা কেন করোনায় মারা যাচ্ছে?

ধমক দিয়ে বললেন, খবর কিছু রাখেন! শিয়া আর কাফেরদের ভেতর কোনো তফাৎ নেই। করোনা শিয়াদের প্রাপ্য।

- আর দিল্লীর নিজামুদ্দিনে যারা মারা গেল, ওদের কী অপরাধ?

- ওরা সাদপন্থী। সাদপন্থীদের সাইজ করার জন্য করোনার দরকার আছে।

জানিনা এসব কারা ছড়ায়। তাদের উদ্দেশ্যই বা কি! তবে আর যাই হোক তাদের উদ্দেশ্য সৎ নয়। তারা অন্যের মধ্যে নানা মতের এবং পথের পন্থী খোঁজে বটে। তবে নিজেরা বর্ণচোরাপন্থী। ভয়ানক রকমের ফেৎনা সৃষ্টিকারী। সুযোগ সন্ধানী। করোনার মহাদূর্যোগেও সুযোগের সন্ধানে নেমেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধর্মের নামে মূলত ধর্মহীনতার পথে টানছে। এরা ইসলামের শত্রু। বন্ধুরূপী শত্রু সেজে শান্তির পরম ধর্ম ইসলামকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।

যুগেযুগে নানা হাতিয়ার দিয়ে অপচেষ্টা করেছে। ডিজিটাল যুগে করছে ফেসবুক দিয়ে। কেবল এই আমলেই নয়, পাকিস্তান আমলেও এরা ছিল। পাকিস্তান আমলে কিছু শিক্ষিত লোক বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকেই অসম্ভব ভেবেছিলো। তারা ভাবতেই পারেননি সত্যি সত্যি দেশের মানুষ এভাবে মুক্তিযুদ্ধ করে রাষ্ট্র স্বাধীন করে ফেলবে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ দেশের স্বাপ্নিক, আত্মবিশ্বাসী মানুষগুলো অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলবে।

শেষমেষ অসম্ভবই সম্ভব হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আর প্রমাণিত হয় ওদের সকল ভাবনা ভুল ছিল। ভুল ছিল আদর্শ। ইসলামের নামে আদর্শিক কথাবার্তা যাই বলেছিল প্রকৃত অর্থে ওসব ছিল বাস্তবতা বিবর্জিত। পাকিস্তান নামক দেশ ভাগ হলেই ইসলাম ভাগ হয়ে যায় না। ইসলামিক দেশ ভাঙা মানে ইসলামকে ভাঙা নয়। যদি তাই হতো তাহলে ৬৩০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে থাকা একটি মাত্র ইসলামিক আরব রাষ্ট্র ভেঙে আজকের পৃথিবীতে এত্ত এত্ত আলাদা আরবরাষ্ট্র জন্ম নিতে পারতো না।

আজকের পৃথিবীতেও এমনি ভুল ভাবনা সম্পন্ন শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই। করোনার এই দিনেও শিক্ষিত একদল ‘মানুষ’ বিশ্বাসই করতে চাইছে না যে, বাংলাদেশে এখনো মহামারীর রূপ নেয়নি করোনা। উদ্দেশ্যমূলকভাবে সমাজে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তারা। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এই আত্মঘাতী অংশটি বলে বেড়াচ্ছেন, লাখ লাখ মানুষ এ দেশে করোনায় আক্রান্ত। তারা প্রতিনিয়ত মায়াকান্না করছেন বটে; কিন্তু আজ পর্যন্ত একজন মানুষকেও এক কেজি চাল কিনে দিয়েছেন বলে শোনা যায়নি।

অন্যদিকে যারা করোনা যুদ্ধকে বেঁচে থাকার যুদ্ধ তথা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ মনে করে শামিল হয়েছেন তারা ঠিকই জানবাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, আর্মি, জনপ্রশাসনের সদস্য, নির্দলীয় বিত্তবান, বিবেকবান মানুষ এই যুদ্ধে শামিল হয়েছেন। বড় শান্তি লাগে এসব দেখে। দুঃখ ভুলে যাই। কিসের দুঃখ! বরং মনে অনেক সাহস পাই। সাহসভরা মনে ডায়েরী লিখতে বসি। আল্লাহ্ ভরসা! বাংলাদেশ ঠিকই টিকে থাকবে!! আর আমরাও বেঁচে থাকবো ইনশাআল্লাহ্। চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com