দেশ ছাড়ার গল্প...

প্রকাশের সময় : 2020-12-09 15:38:50 | প্রকাশক : Administration
দেশ ছাড়ার গল্প...

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

ঘুমের ঘোরে দেখা স্বপ্ন আমার শোনিম কখনোই মনে রাখতে পারে না। কিন্তু মনে রাখতে চায়। প্রতিনিয়ত চায়। প্রতিরাতে ঘুমুতে যাবার আগে পণ করে, আজকেরটা মনে রাখবেই। কিন্তু পারে না। সকালে ওঠার পরেই সব আফছা আফছা লাগে। এ নিয়ে ওর আক্ষেপের শেষ নেই। সবার স্বপ্নের গল্প আছে। অথচ ওরটা নেই। তবে শোনিমের স্বপ্নের ঝুড়ি একেবারে শুণ্য নয়। ঝুড়িতে অনেক দিবাস্বপ্ন আছে। নানান কিছু নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে ছেলেটি।

দিবাস্বপ্ন কমবেশী সব মানুষই দেখে। তবে সাধারণত জীবনের কোন বেলায় মানুষ বেশী দেখে, জানি না। জানি না, সেটা ছেলেবেলায়, না যৌবনে। আমার কাছে এখনো এটা বিরাট একটা প্রশ্ন। মাঝে মাঝে আমি নিজেও আমার দিবাস্বপ্ন দেখার সময় বা কাল খুঁজে বেড়াই। স্মৃতির পাতা হাতরাই। তবে খুব একটা কাজ হয় না। বের করতে পারি না। তাই অনুমান করার চেষ্টা করি এবং শুধু এটুকু আন্দাজ করতে পারি যে, কৈশোরকাল থেকে যৌবনের শুরু পর্যন্ত দিবাস্বপ্ন সবচেয়ে বেশী দেখেছি।

প্রথম দিকে দিবাস্বপ্ন দেখতাম নানাজনের বুদ্ধিতে পড়ে। নানাজনের বুদ্ধিও হতো নানা ধরণের। নানাজন বলতে সংগে থাকা কাছের নানা মানুষের। ক্লাশ সিক্স কিংবা সেভেন এ পড়ি। বাজারের অংকরদা বুদ্ধি দিলেন বড় হয়ে ডাক্তার হবার। তার কাছে এরচেয়ে মজার পেশা, পয়সা কামানোর পেশা আর হয় না। তখনও অংকর দা অংকর ডাক্তার হয়ে ওঠেননি। বাজারের ফার্মেসীতে মালিকের সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। মালিক এলএমএফ ডাক্তার।

দারুণ নামডাক। রোগী গিজগিজ করে তার ফার্মেসীতে। অংকরদাও সদা ব্যস্ত। একের পর এক ইনজেকশন পুশ করে যান রোগীদের। আর সবার জন্যে মিকচার বানান। এক মিকচারে শরীরের পিকচার চেইঞ্জ। মানে, সব রোগ সেরে যায়। আর সাথে কয়েকটা ভিটামিনের ফাইল। কেল্লা ফতে। তার আশা, এমনি গুণীজনের সান্নিধ্যে থেকে বড় ডাক্তার হতে সময় লাগবে না। আর ভগবানের কৃপায় একবার হয়ে গেলে, তাকে আর পায় কে!

স্বপ্ন তার খুবই বাস্তবমুখী। জীবনে বাঁচার জন্যে টাকার দরকার। আর চিকিৎসা পেশায় আছে টাকার ছড়াছড়ি। টাকা কামানোর ফন্দিফিকির অংকরদা ভালই জানতেন। কেবল জানতেন না কী করলে এমবিবিএস ডাক্তার হওয়া যায়। এ জন্যে তার মহা আক্ষেপ। আর সুযোগ পেলেই আক্ষেপের কান্না, তুমি ভালা ছাত্র। হইলে এমবিবিএস ডাক্তার হইবা। কিচ্ছু করা লাগবো না। তোমার চেয়ারে লাইন ধইরা মানুষ আইবো মেডিক্যাল সার্টিফিকের লাইগ্যা। তুমি খালি লেইখ্যা দিবা, রোগীর শরীলডা খুবই খারাপ। বিশ্রাম লাগবো। দেখবা টেহার কাড়ি পড়বো।’’

সেদিনের পর থেকে টাকার কাড়ি পড়ার চিন্তাটা মাথা থেকে নামাতে পারিনি। সারাক্ষণ ভাবনা একটাই। কবে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করবো আর কবে এমবিবিএস এ ভর্তি হবো। রোজকার পত্রিকা পড়ার উছিলায় বিকেলে ফার্মেসীতে গেলেও কান খাড়া রাখতাম মেডিসিনের নামের দিকে। ফার্মেসীর সামনে পাতা বেঞ্চে বসে গভীর মগ্নে দৈনিক ইত্তেফাক পড়তাম আর ঔষধের নাম মুখস্থ করতাম। ঔষধ কি আর একটা দুইটা! কঠিন বিষয়!

কঠিন বিষয়ের কঠিন ভাবনাতে আউলা লাগালেন আমার মেঝোভাই। এসএসসি দিয়ে কেবল ঢাকায় এসেছি। বাসায় ভাইয়াভাবীর দাপটে টেকা দায়। ভাবীর চেয়ে ভাইয়ার দাপট বেশী। দাপটের সুত্র তার সুমুন্ধি। সুমুন্ধির জোরে বোনজামাইয়ের দাপট আমি জীবনে প্রথম ভাইয়ার কাছ থেকে দেখেছি। দাপট দেখাবেন না কেন? সুমুন্ধি তাঁর বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। যেনতেন দফতর না, খোদ সরকারী দফতর গণপূর্তের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।

ভাইয়ার ইচ্ছে, ডাক্তারী ফাক্তারী না; আমাকে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। আবার যেনতেন ইঞ্জিনিয়ার না; সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। শর্টকাটে সম্মান পাওয়ার আর বড়লোক হবার জন্যে এরচেয়ে ভাল ক্যারিয়ার আর নেই। অফিসের জীপ নিয়ে দূপুরের আগেআগে সাইটে যাবো। বিশাল খানাপিনার ব্যবস্থা থাকবে সাইটে। আমি ইঞ্জিনিয়ার। বড় ইঞ্জিনিয়ারের মত ভাব দেখিয়ে হাঁটবো। আর অফিস সহকারী আমার ব্রিফকেস নিয়ে পিছে পিছে হাঁটবে। হাঁটবে কন্ট্রাকটরের দলও। জী স্যার, জী স্যার ভঙিতে হাঁটবে।

আমি ইঞ্জিনিয়ারদের মত হাঁটার প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছি অলরেডি। ডাক্তার হবার চিন্তা বাদ দিয়ে নতুন চিন্তা, নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। ইঞ্জিনিয়ার হবার দিবাস্বপ্ন। দেরী হবে না তেমন। ভাইয়া বলেছেন, পোষ্টিং পেতে না পেতেই মোটা উপরি হাতে আসতে থাকবে। ব্যাগভর্তি উপরি। ভাইয়া উপরিকে ঘুষ বলতে নারাজ। তার সোজা কথা, ঘুষ খাওয়া ঠিক না। তবে উপরি ওকে। ইঞ্জিনিয়ার হয়েই প্রজেক্টে যাবি, কাজকর্ম চেক করবি। কাজ তেমন জটিল না। শুধু বলবি, হবে না, হবে না। ইট দুনম্বর, সিমেন্ট দুনম্বর। সব বাতিল। এতেই কাজ হবে। কন্ট্রাকটররা হন্তদন্ত হয়ে পিছে পিছে ঘোরাঘুরি শুরু করবে।

ঘোরাঘুরি আমিও শুরু করলাম। এলাকায় আন্ডার কন্সট্রাকশন নতুন সরকারী ভবন খোঁজা শুরু করলাম। তবে এমনি দিবাস্বপ্ন দেখার দিনগুলো বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। কলেজ শেষ করার আগেই বুঝে ফেলি উপরি বলি আর যাই বলি সবই ঘুষ। সবই অন্যায়। তখন এরশাদ সাহেব মাত্র ক্ষমতায় এসেছেন। তাঁর প্রতিদিনকার কথা একটাই। দূর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়বেন। একটা একটা করে দূর্নীতির প্রতিটা শিকড় উপড়ে ফেলবেন বাংলাদেশের মাটি থেকে। আমি খুব  উদ্ভুদ্ধ হলাম তাঁর কথায়। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম ইঞ্জিনিয়ার হবো। তবে ঘুষ খাবো না। আবার অল্প বেতনে দেশেও জব করবো না। উচ্চশিক্ষার্থে দেশের বাইরে যাবো। এবং পড়াশুনা শেষে বাইরের দেশেই সেটেল করবো।

শেষমেষ আমি দেশের বাইরেই এলাম। খুব বিষন্ন মনেই এলাম। ঘুষ খাবো না, কিংবা দূর্নীতি করবো না বলে যার কথায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে দেশ ছাড়লাম, সেই এরশাদ সাহেবের তখন বড়ই করুণ অবস্থা। আদালতের হাজিরার দিন সিসিটিভির সামনে তাঁকে আধা নেংটু হয়ে দেহ চেক করাতে হয়। পাঁচ বছর ধরে তিনি জেলে। আরো খাটতে হবে। দূর্নীতির দায়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ১০ বছরের জেল হয়েছে। মানতে পারছিলাম না। দূর্নীতি নিঃশেষ করার ব্রত নিয়ে ক্ষমতায় আসা মানুষটি দূর্নীতির দায়েই ক্ষমতাচ্যুত হলেন।

নিজেকে বড় ছোট মনে হলো; অভাগা মনে হলো। অভাগা মনে হলো এই বাংলায় জন্ম নিয়ে। বড় দূর্ভাগা মাটি মনে হলো বাংলাকে। যে মাটিতে দূর্নীতিগ্রস্ত রাজাবাদশাহ্ জন্ম নেন, সে মাটি দূর্ভাগা নয়ত কি! হয়ত এজন্যেই বাংলায় জন্ম নেয়া বাঙ্গালীর দল দলবেঁধে বাংলা ছাড়ে। যে যেভাবে পারে, ছাড়ে। কেউ আমার মত স্টুডেন্ট ভিসায় ছাড়ে। কেউ বা ওয়ার্কিং ভিসায়, কেউ ফ্রি ভিসায়। আবার কেউ বা ট্যুরিস্ট কিংবা টারজান ভিসায়।

ট্যুরিস্ট ভিসার বিষয়টা আমি কেন, সবাই জানি। এ ভিসার দুই ধরণের ব্যবহার আছে। এক, সত্যি সত্যি পর্যটকের দল পর্যটনে যায়। সময় মত যেয়ে সময় মত ফিরেও আসে। দুই, এরা তথাকথিত পর্যটক। পর্যটনের নামে যায় বটে, তবে আর ফিরে আসে না। থেকে যায় দিনের পর দিন। কিন্তু টারজান ভিসার বিষয়টা আগে আমি জানতামই না। ইদানীং পত্রিকায় দেখতে পেয়ে মোটামুটি ভালই আন্দাজ করতে পারি।

যে ভিসায় পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই একদেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়া যায়, তাকে বলে টারজান ভিসা। তবে এই ভিসা কিনতে অনেক টাকা লাগে। আর লাগে সময় ও শারিরীক সামর্থ। টারজানের মত মারাত্মক রকমের শারিরীক সামর্থ না থাকলে এই ভিসায় কামিয়াবী হওয়া যায় না। সাপ, বিচ্ছু, কিংবা বাঘ ভাল্লুককে ফেস করা জানতে হয়। পাহাড় বাওয়া, সমুদ্রে সাঁতার জানা কিংবা বনেবাদারে রাত কাটানোর মত কর্মগুলোও জানতে হয়। বেশী জানতে হয় দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে পারার কৌশলও।

এমনি ভিসায় হাজারো বাঙালী সন্তান মায়ের কোল ছেড়ে জীবিকার তাগিদে দেশ ছাড়ে। দেশ ছাড়ে সোনার হরিণের সন্ধানে। এতে কেউ কামিয়াবী হয়, কেউ বা হয় না। বাংলাদেশ যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর কর্মেসমৃদ্ধ একটি চমৎকার দেশ হতো, তাহলে আর যাই হোক, টারজান ভিসায় কেউ মাতৃভূমি ছাড়ার চিন্তা করতো না। মাতৃভূমি ছাড়ে, অনিশ্চিত গন্তব্যে, মৃত্যু বিভীষিকায়। তাতে কিচ্ছু যায় আসে না যারা দেশ চালায়। কেননা জেলে যাবার আগে তারা তো মহাভাল থাকেই; আর গেলেও খারাপ থাকে না। খারাপ থাকি আমরা। জেলে গেলেও থাকি। জেলের বাইরেও থাকি।

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com