দরজা নাড়ছে মৃত্যু-জরায়; ব্যস্ত আমরা শত্রু ধরায় !!

প্রকাশের সময় : 2021-01-20 14:24:55 | প্রকাশক : Administration
দরজা নাড়ছে মৃত্যু-জরায়; ব্যস্ত আমরা শত্রু ধরায় !!

আমার শোনিম আজকাল খুব বেশী একটা কাছে আসে না। নিজের ঘরে থাকে। সারাদিনই থাকে। ক্লাশ, অনলাইন, গেইম ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কিছু নিয়ে থাকে। আনমনে নিজের ধ্যানে থেকে থেকে কোন একটা কিছু যখন বুঝতে অসুবিধে হয়, তখন হন্তদন্ত হয়ে আমার কাছে আসে। আজ বিকেলেও এসেছিল। শীতের আগমনে কিছুটা শীতশীত অনুভব করায় বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে ছিলাম। ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ নেইও। অমনি হন্তদন্ত আগমনে শোনিমের প্রশ্ন; আব্বু! হুজুগে বাঙালী মানে কি?

বাঙালী শব্দটার মানে শোনিম জানে। সহজে বুঝতেও পারে। এটা যে তার নিজের আত্মপরিচয় তাও বোঝে। কিন্তু, আজকে বুঝতে পারছে না হুজুগে বাঙালী পুরো কথাটার মানে। মূলত সমস্যা হচ্ছে হুজুগ শব্দটা নিয়ে। আজকে শোনিম যেমনি বুঝতে পারছে না শব্দটির মানে, তেমনি ওর মত অনেকেই হয়ত এটা বোঝে না। কিন্তু বুঝুক বা না বুঝুক, এর মধ্যে ডুবে থাকে প্রায় সবাই। হুজুগে মাতে। জাতি হিসেবেই আমরা হুজুগেমাতা জাতি।

তবে মাথা নষ্ট জাতি কি না জানি না! জানি না স্বভাবেও পাগল কি না! তবে এটা জানি এবং মানি, কথাটি আসলেই সত্যি, “হুজুগে বাঙালী”। এমনি হুজুগ নিয়েও যদি মোটামুটি একটা লেখা বিষদভাবে ভাইরাল হয়, তাহলেও সেরেছে। হুজুগ নিয়েও পাবলিক হুজুগে লাফিয়ে পড়বে। যে লিখেছে প্রথমে তার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়বে। পরিচয় দেবার মত আসলেই গুণেগুণে তার ১৪টি গোষ্ঠী আছে কিনা সেটাও বিবেচনায় নেবে না। তারপরে শুরু হবে ধোলাই পর্ব। রাম ধোলাই। যত না ঝাড়ু দিয়ে, তার চেয়ে কথা দিয়ে। কথা দিয়ে ধোলাই। ভাল কথা, মন্দ কথা; আকথা, কুকথা। কোন কথাই বাদ দেবে না।

আগেকার দিনে বাঙালী কথা দিয়ে চিড়া ভিজাতো। এখন ভিজায় না। এখন দেয় ধোলাই। কথার ধোলাই। ক’দিন আগে একটা মেয়ের প্রকাশ্যে সিগারেট পান এবং তাতে বাঁধা দেয়া নিয়ে বেশ ধোলাই দেয়া হলো। ধোলাই মানে, চরম ধোলাই। হাউকাউও হলো। আমাদের কাজই হলো, সুযোগ পেলে সুযোগ হাত ছাড়া না করা। আর হাউকাউয়ের সুযোগ পেলে তো কথাই নেই। এখানে ইস্যুটি প্রধান নয়, হাউকাউটাই প্রধান।

একটা মেয়ের প্রকাশ্যে সিগারেট টানা বন্ধ করলেই কি দেশের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যচিত্র বদলে যাবে? ঢাকার নাম কি কাটা যাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের নগর থেকে? করোনার ভ্যাকসিন কি পাওয়া যাবে সবার আগে? নাকি প্লে−নভর্তি ভ্যাকসিন প্রতিদিন নামবে ঢাকার মাটিতে? এসবের সাথে আদৌ কি কোন সম্পর্ক আছে মেয়েটির প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়ার? নিশ্চিত করে বলতে পারি, নেই। তাহলে কেন এসব হলো?

এই যে মূর্তি-ভাস্কর্য বিষয়ে যা চললো এটাও তাই। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূর্তি বা ভাস্কর্য রয়েছে। এতোদিন কারো মাথায় এতো ব্যথা ওঠেনি। ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে লোক সম্মুখে বৃটিশ আমল থেকে উলঙ্গ নারীর বিশালাকার ভাস্কর্য আছে। কোনদিন এসব নিয়ে কেউ কথা বলেনি। জামায়াতও ক্ষমতায় ছিল ৫ বছর। ক্ষমতায় থেকেও শালীন ভাস্কর্য তো ভাল, অশালীন ভাস্কর্য নিয়েও তারা কথা বলেনি। আজ বলছে। হেফাজতের মুরুব্বী শফি সাহেবের মৃত্যুর পরপরই বলা শুরু হয়েছে। এবং শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে।

জিয়ার ভাস্কর্যও আছে চট্টগ্রামে। ওটাকে টেনেহেঁচরে নামানোর কথা বলছে না। সন্দেহটা এজন্যেই জাগে। বোঝায়ই যায় এখানে রাজনীতি আছে। এসব নিয়ে রাজনীতি না করে ভাস্কর্য বিরোধীতাকারীদের উচিত ছিল অনেক অনেক বছর আগেই সরকারকে নিয়ে, দেশ বিদেশ তথা মুসলিম বিশ্বের ইসলামী পন্ডিতবর্গ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে একটা সুন্দর সিদ্ধান্তে আসার। আসেনি। নিজেরা বছরের পর বছর সরকারে থেকেও আসেনি। বরং তখন চুপ ছিল। এখন ঝোপ বুঝে কোপ মারতে মুখ খুলেছে।

শুধু মুখই খোলেনি। বিড়বিড় করে মুখ নাড়িয়েছেনও। আমাদের প্রাণের নবী মোহাম্মদ (সাঃ) কিভাবে কথা বলতেন সেটাও অভিনয় করে দেখিয়েছেন একজন বিশিষ্ট আলেম। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কিভাবে কথা বলতেন তা জানলেন কোত্থেকে, দেখলেন কিভাবে? এসব করাটাও রাসুল (সাঃ) এর অবমাননা কিনা সেটা নিয়েও তো ইসলামী পন্ডিতবর্গের বসা উচিত। ইসলাম তো আল্ল−াহ রাসুলের ইসলাম। পাকভারতের ইসলাম না। পুরো বিশ্বের ইসলাম। তাই পন্ডিত আনতে হবে পুরো বিশ্ব তথা আরববিশ্ব থেকেই। দেখতে হবে তাঁরাও কী বলেন। মজার ব্যাপার হলো এখানে তাদের কঠিন অনীহা আছে। ভাস্কর্য নিয়ে পুরো পৃথিবীর কোন মুসলিম দেশের উদাহরণ তারা টানতে রাজী না। কাউকে আনতেও রাজী না।

রাজী না কেন? কেইসটা কি আসলে? বিষয়টা কি আসলেই ভাস্কর্য, নাকি অন্য কিছু। দেশে তো আরো সমস্যা আছে। সমস্যার পাহাড় বলা যায়। সে সব রেখে ভাস্কর্য অগ্রাধিকার পেলো কেন? সারাদেশে বেশুমার লুটপাট, খুন-খারাবি, অপহরণ-গুম, ধর্ষণ-বলাৎকার, বেগমপাড়া-চোরপাড়া, এসব বাদ দিয়ে সিগারেট আর ভাস্কর্য নিয়ে পড়লেন কেন? এই যে করোনা মহামারী, বিশ্বের দেশগুলি ভ্যাকসিনপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ছোটাছুটি করছে, তারা কী করছে? কিছুই না। সামান্যতমও কিছু করার নজিরও তারা দেখাতে পারেন নাই। বুঝুন অবস্থা। বাড়ির দরোজায় কড়া নাড়ছে মৃত্যু-জরা। আর তারা আছে সিগারেট-ভাস্কর্য নিয়ে।

তারা হয়ত জানেই না, করোনায় বিদেশ থেকে কর্মীরা চাকুরী হারিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে দেশে ফিরছেন। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় দেশের গার্মেন্টস সেক্টরে কাজের আদেশ কমে যাচ্ছে। শ্রমিকরা আবার শঙ্কিত কাজ হারাবার। অন্যদিকে এখনো ঘুরে দাঁড়ায়নি দেশের পর্যটন ব্যবসা। মার্কেট, রেষ্টুরেন্ট কোনমতে চলে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল প্রায় শূণ্যের কোটায়। বিশ্বের চারিদিকে কেবলই মন্দা আর মন্দার পদধ্বনী।

বিভিন্ন সেক্টরে বেকার হচ্ছে হাজার হাজার লোক। জীবন চালাতে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। ঘরভাড়াটুকু দেবার সামর্থ্য হারিয়ে শহর ছেড়ে পরিবার নিয়ে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছে লক্ষলক্ষ শহরবাসী। তারা অন্ধকার দেখছে। কেবলই অন্ধকার। করোনার আগেআগেও বেশ ভাল থাকা পরিবারটির কর্তাও এখন পরিবারের সকলের দু’মুঠো অন্নের জন্যে গ্রামের বাজারে সবজি বিক্রেতা সেজেছেন।

তিনি সেটা অন্তত পেরেছেন। কিন্তু শহরের বাড়ীওয়ালা নামধারী মানুষদের অবস্থা আরো শোচনীয়। তারা সেটাও পারছেন না। তাদের ঘর বা বাড়ী আছে সত্য, কিন্তু সে ঘরে থাকার ভাড়াটিয়া নেই। সবাই গ্রামে চলে গেছে। তিনি বা তারা না পারছেন শহর ছাড়তে, না পারছেন শহরের রাস্তায় বসতে। ভাড়াটিয়া না থাকায় আয়ের পথ প্রায় রুদ্ধ। অন্যদিকে ব্যাংক তাড়া দিচ্ছে কিস্তি পরিশোধের। তারা বাড়ীওয়ালা বটে। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর কোন শহরের বাড়ীওয়ালাদের এমন অসহায়ত্ব আর কখনো দেখা যায়নি।

অসহায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীগণও। করোনায় বিশেষ কিছু সেক্টরের অবস্থা খুবই শোচনীয়। বিনোদন, ট্রাভেল টুরিজমসহ নানা সেক্টরের অবস্থা অকল্পনীয় রকমের খারাপ। রেষ্টুরেন্টের বয়বেয়ারা ছাঁটাই হয়েছে সবচেয়ে বেশী। এখনো তাদের চাকুরীর জোগাড় হয়নি। তারা শহরের পাড়ামহল্লায় এখানে সেখানে, চিপায় চাপায় টং দোকান খুলে বসেছে কিছু একটা বিক্রি হবে এই আশায়। চুরি কিংবা ছিনতাইয়ের পথও ধরতে পারতো। তা না করে হালাল রুজির পথ ধরেছিল।

কিন্তু তথাকথিত অবৈধতার উছিলায় তারাও থাকতে পারছে না। তাদেরকে নিত্যদিন উচ্ছেদ করা হচ্ছে। উচ্ছেদ অভিযানে নেমেছে নানা সরকারী দপ্তর। দেশের বেতাল অবস্থায় অবৈধতা উচ্ছেদের মহাতালে আছেন তারা। কর্মহীনকে কর্ম দিতে পারছেন না, ব্যবসা দিতে পারছেন না; কিন্তু ব্যবসা কেন্দ্র ভালভাবেই গুড়িয়ে দিতে পারছেন। বুলডোজার নিয়ে রাস্তায় নেমে তারা অবৈধতা খোঁজেন। কেবল খোঁজেন না মানুষের মন। খেটেখাওয়া সেইসব সাধারণ মানুষেরা বুলডোজারকে ভুলডোজার হিসেবে দেখছেন।

প্রাথমিকভাবে দেখলে মনে হবে, ভালই তো করছেন সরকারী লোকজন। রক্ষক সেজে রাষ্ট্রীয় আইনকে সুরক্ষা করছেন। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করছেন। কিন্তু এসব করার জন্যে যে সময়টা বেছে নিলেন, সেটা কি পারফেক্ট সময়? সঠিক সময়? এখন তো তামাম দুনিয়ায়ই যুদ্ধের সময়। যুদ্ধ করে কোনমতে বেঁচে থাকার সময়। যুদ্ধের সময় আবার আইন কি? এখন না হয় হলোই একটু আইনের ব্যত্যয়।

আর এসব ব্যত্যয় তো আর এখন না, সারাবছর জুড়েই কমবেশী হয়। বছর জুড়ে এদেশে কী হয় না, কোথায় হয় না! কেউ কি বলতে পারবেন? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন?? নাকি, হাজারো অবৈধতার ভারে আপনার নিজের বুকই আপনার হাতকে থামিয়ে দেবে???

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com