ঘাম ঝরানো দুপুর বেলার আমজনতার গল্প!!

প্রকাশের সময় : 2021-02-03 16:21:24 | প্রকাশক : Administration
ঘাম ঝরানো দুপুর বেলার আমজনতার গল্প!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

সেদিন ভিসার জন্যে গিয়েছিলাম গুলশানের কোন এক দূতাবাসে। মোটামুটি বড় কোন দেশের দূতাবাসই। যেনতেন বড় নয়; উল্লেখ করার মতই বড়। অবশ্য ঢাকায় বড় দূতাবাস বলতে এখন কেবল একটি দুটি নয়, বেশ কয়েকটিই আছে। তারা সবাই বড়সড় দূতাবাস এবং আচরণও করে বড়দের মতই। সেক্ষেত্রে ছোটদের আচরণ কিংবা হাবভাব তেমন নয়। ছোট ছোট। দূতাবাস ছোট; হাবভাবও ছোটদের মত। এটা বোঝার জন্যে দূতাবাসের ভেতরে যাবার দরকার নেই। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দেশী দারোয়ানদের হাবভাব দেখলেই বোঝা যায়।

মোড়ল বাড়ীর দারোয়ান দেখতে মোড়লের মতই হয়। তা সে নিজে যে বাড়িরই হোক। চেহারা এবং ব্যবহার দুটোতেই মোড়ল মোড়ল। ভাবখানা লাট সাহেবের মত। গায়ে নিরাপত্তারক্ষীর পোশাক চড়িয়ে হামভরা ভাব। বেসরকারি পোশাক পড়েই এই অবস্থা। সরকারি পোশাক পেলে কি করতো আল্লাহই জানেন। মূলত এই লাট সাহেবরা এসেছে অতি সাধারণ ঘর থেকেই। এমনি সাধারণ ঘরের লোক হয়েও কখন নিজেকে অসাধারণ ভাবতে শুরু করে তা নিজেও জানে না। জানার চেষ্টাও করেনা। সারাক্ষণই সাধারণের সাথে নিম্নমাত্রার প্রজাসুলভ আচরণ করে।

এমন আচরণ খুবই স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত জেনেই সকালে রওনা দিয়েছি। নানাজনের কাছ থেকে নানা তথ্যউপাত্ত জেনে রওনা দিয়েছি। মোটামুটি প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়েছি। অনেকটা বিসিএস প্রস্তুতির মত। সাতদিন আগ থেকে সকাল সন্ধ্যা প্রস্তুতি নিতে বসি। এটা পড়ি, ওটা পড়ি। খুবই সতর্কতার সাথে পড়ি। বলা তো যায় না কোথা থেকে কোন প্রশ্ন করে বসে। বাসা থেকে বের হবার সময়ও সঙ্গে নেয়া সব ডকুমেন্টস আগাগোড়া চেক করেছি। ঠিকঠাক মত একটার পর একটা সাজিয়ে নিয়েছি। বিয়ের কাবিননামা নিতেও ভুলিনি। যেন ভিসাপ্রার্থী নই। চাকুরী প্রার্থী। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী বেতনের চাকুরী।

আগে থেকেই জানা ছিল ভিসাপ্রার্থীদের সেই রকম জেরা করে। ডিপ্লোমেটিক জেরা। যে জেরার উত্তর দিতে ব্যারিষ্টার হওয়া লাগে। সাধারণ যারা এমনি জেরার মুখোমুখি হয়েছে তারা গায়ে পড়েই জানান দিচ্ছিল। কে কিভাবে চুবানী খেয়েছে, কাকে কিভাবে পেঁচিয়েছে সব জানিয়েছে। বিশেষ করে ভিসা না দিয়ে সকলের সামনে কিভাবে বিদায় করেছে সেটাও বলেছে। জেরা যেমন তেমন; বিদায়ক্ষণটা খুব লজ্জার হয়। ভিসা না পেয়ে মাথা নীচু করে কোনদিকে না তাকিয়ে সবাই বেরিয়ে যায়। বিষয়টি আসলেই লজ্জার। বিশেষ করে সাথে থাকা স্ত্রীসন্তানদের সামনে। ঘরের কর্তাকে এভাবে লজ্জায় পড়তে দেখে স্ত্রী সন্তানরাই বরং লজ্জা পায়। অবশ্য এ নিয়ে আমার টেনশন নেই। এ যাত্রায় আমার শোনিম সাথে নেই।

নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বের হয়েছিলাম বলে পৌঁছেও গিয়েছিলাম বেশ আগেভাগে। অন্যদিনের মত যানজট না থাকায় নির্ঝঞ্জাট যাত্রা। তবে আগেভাগে পৌঁছলেও বিপদ। কোথায়ও দাঁড়িয়ে বা বসে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু দূতাবাসের ত্রিসীমানায় বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকার জোঁ নেই। তাই ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন রাস্তার কোথায়ও অপেক্ষা করা ছাড়া গতি থাকে না। শুধুই অপেক্ষা; ইন্টারভিউয়ের সময় হবার অপেক্ষা। অপেক্ষা আর টেনশান বড় খারাপ জিনিস।

বড় বিপত্তি হয় এতে। একটু পরপর হিশু চাপে। টেনশানের হিশু। কোন রকমে ৩০ মিনিট পার হলেই চাপে। আমারো চেপেছে। কিন্তু উপায় নেই। ডিপ্লোমেটিক জোন। চাইলেই কি আর রাস্তার ধারের চিপাচাপায় ধপ্পাশ করে বসে পড়া যায়! যায় না। তাই আশেপাশে মসজিদ খুঁজছি। ঢাকা শহরে মসজিদ হলো আমাদের মত মুসাফিরদের জন্যে আল্লাহর বিশেষ রহমত। কঠিন সময়ের বিপদের সাথী। লক্ষ্য করে দেখেছি, যারা নামাজের সময় মসজিদে যায় না, প্রকৃতি ডাকলে তারাও যায়। না যেয়ে পারে? পারে না। আশেপাশে জায়গা না পেয়ে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে সবাই ওখানেই যায়।

দূতাবাসের ভিতর যেতে না যেতেই আমার আরো একবার চাপলো। গেটে দাঁড়ানো মোড়ল সাহেবকে ওয়াশরুম দেখিয়ে বললাম, যদি অনুমতি দেন তাহলে একবারে সেরেই বসি। বেচারা কঠিন মানুষ। মুখে হাসিও নেই। হ্যাঁ বলতেও শিখেননি। মাথা নাড়িয়ে ডাইরেক্ট না করে দিলেন। মাত্র এলেন, এখনই যাবেন? এইটা একটা কথা হইলো? আগে বসেন, পরে দেখা যাবে। বুঝলাম, কয়েক ঘণ্টার জন্যে ওরা আমার বর্জ্যত্যাগের অধিকারও সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে।

তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশের দূতাবাস আমার মানবাধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করলো। অথচ আমার দেশের মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র নিয়ে তাদের সারাক্ষণ মায়াকান্না। বছর জুড়ে আমার সরকারকে আকারে ইঙ্গিতে গণতন্ত্রের সবক দেয়। মানবাধিকারের বুলি শুনায়। কখনো সরাসরি নিজেরা শোনায়; কখনো তাদের পছন্দের এ দেশীয় সুহৃদরা শোনায়। ভাল ভাষায় শোনায়; আবার কম ভাল ভাষায়ও শোনায়।

কম ভাল মানুষ কম ভাল ভাষায় শোনালেও মানায়। কিন্তু বেশি ভাল মানুষ যখন কম ভাল ভাষায় শোনায় তখন বিব্রত লাগে। ডঃ কামাল হোসেন। কেবল ভাল মানুষ নয়; যথেষ্ঠ পন্ডিত মানুষ বলেই পুরো জাতি জানে। কিন্তু তিনি যখন শব্দ চয়নে সঠিক জায়গায় থাকতে পারেন না, তখন কষ্ট লাগে। বিব্রত হতে হয়। দু’বছর আগে প্রধান বিচারপতির এজলাসে এটর্নী জেনারেলকে বেতাল শব্দ প্রয়োগে খুবই বিব্রত করেছিলেন। কাজটি তিনি আবারো করলেন। কিছুদিন আগে সরকারকে লাথি মেরে নামিয়ে ফেলার হুংকার দিলেন। সরকারকে ফেলে দেয়ার কথা তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু সেটা কি লাথি মেরে?

কেন জানি না জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা হিসেবে বহিঃপ্রকাশের পর থেকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে তিনি বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। বক্তব্যের তো আরও ভাষা আছে। কিন্তু উনার পায়ে কি আদৌ সেই জোর আছে? না কোন সরকারকে লাথি মেরে নামানোর মতো জোর কোনকালে ছিল? হয়ত এ জন্যেই ডঃ কামাল হোসেনের পায়ের জোরের প্রশংসা করতে পারছেন না কেউ। তবে সমালোচনা করছেন। সমালোচনা করছেন তাঁর ভাবের।

তাঁর ভাবখানা এমন যে মুখে যা আসে তিনি তাই বলবেন। আর যাই বলবেন তাই দেশের সব মানুষকে মেনে নিতে হবে। কিন্তু কেন? তিনি নিজে সিষ্টেম মানেন তো? গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে সারাদিন এত কথা বলেন। কিন্তু তাঁর নিজের আচরণে কি আদৌ গণতন্ত্রের ছাপ আছে? না আছে আচরণে, না আছে কথায়। লাথি মারা তো গণতান্ত্রিক শব্দ না। তারপরও যদি লাথির জোরে সরকার নেমে যায় ডঃ কামাল হোসেন কি দেশটা চালাতে পারবেন? যে লোক ভয়ে ভোটেই দাঁড়ায় না সে কি করে দেশ চালাবে!

দেশ না চালাতে পারুক, মুখটা তো ঠিকভাবে চালানো দরকার। একজন পন্ডিততুল্য জ্যেষ্ঠ নাগরিকের মুখের ভাষা শুনে অন্যরা কথা বলা শিখবেন সেটিই সবাই আশা করেন। কেবল দেশের মানুষ নয়, বিদেশীরাও শিখবেন। কেননা বিদেশীরা তো তাঁদের সাথেই ওঠাবসা করেন। দিনে রাতে সব সময়ই করেন। চলাফেরা এবং খাওয়া দাওয়াও তাঁদের সাথেই করেন। আমজনতার সাথে তো আর করেন না!

কিন্তু এই আমজনতাই দূতাবাসে গিয়ে বিদেশীদের বাঁকামুখ দেখে। আমি দেখছিলাম সেই প্রথম থেকেই। শুধু আমি নই, আমার মত আরো অনেকেই। এক পর্যায়ে লাইনে ডাক পড়লো আমার। একদস্তা কাগজপত্র নিয়ে আমি লাইনে দাঁড়ানো। আমার সামনের জন সাক্ষাতকার দিচ্ছেন। ভিসাপ্রার্থী মানুষটিকে কাউন্টারে থাকা বাঁকামুখের বিদেশী জেরা করছেন। জেরা করে ল্যাবরাছ্যাবরা করে ফেলছেন। পোশাকে এবং কথাবার্তায় দারুন স্মার্ট ভদ্রলোক। অথচ হিমশিম খেয়ে ঘামছেন। ফর্সা গন্ডদেশ বেয়ে ঘামের জলকনা চিকচিক করছে।

আমি মোটেও ভদ্রলোকের মত স্মার্ট না। দেখতেও না, কথায়ও না। আমি ঘামছি সাক্ষাতকার শুরুর আগ থেকেই। বেশি ঘামছে আমার হাত। দোয়া এবং সূরা যে কয়টা জানা ছিল সব বিড়বিড় করে পড়ছি। আয়াতুল কুরসি কয়েকবার পড়া শেষ। দোয়া ইউনুস শেষ হলেও আবার রিপিট করছি। বারবার করছি। মাঝে মাঝে দু’এক লাইন ইংরেজী প্র্যাকটিসের চেষ্টাও করছি। আসছে না। একেবারেই আসছে না। মনে হচ্ছে জীবনেও কোনদিন ইংরেজী বলিনি! আমি বলিনি, আমার বাবাও বলেনি!! 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com