‘সালাম সালাম হাজার সালাম’

প্রকাশের সময় : 2021-03-03 13:46:55 | প্রকাশক : Administration
‘সালাম সালাম হাজার সালাম’

মোরসালিন মিজান: একটি ডায়েরি। অনেক পুরনো। সেই ১৯৬৭ সালের। কিন্তু শুধু ডায়েরি এটি নয়, বাঙালীর আন্দোলন সংগ্রামের স্মারক। এ ডায়েরিতেই ফজল-এ-খোদা লিখেছিলেন তার অমর সঙ্গীত ‘সালাম সালাম হাজার সালাম/সকল শহীদ স্মরণে,/আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই/তাঁদের স্মৃতির চরণে...।’ শহীদদের প্রতি অতল শ্রদ্ধা জানিয়ে গাওয়া গান বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হৃদয়াবেগকে ধারণ করে আছে। স্পর্শ করে আছে।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে কত মানুষ যে শহীদ হয়েছে! তাদের প্রতি জীবিতরা যা বলতে চায়, যেভাবে বলতে চায়, যেন সেভাবেই গানে গানে তা তুলে ধরেছিলেন ফজল-এ-খোদা। একই কারণে ডায়েরিটি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘকাল ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংরক্ষিত হওয়ার পর সম্প্রতি এটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহে এসেছে। এতকাল পর সামনে আসা স্মৃতি নিদর্শন সমুহকে এ সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী করে।

ফজল-এ-খোদা দেশের স্বনামধন্য কবি ও গীতিকার। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত হন। সিনেমার জন্যও গান লিখেছিলেন। তার লেখা ভালবাসার মূল্য কত আমি কিছু জানি না’, ‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে’ ইত্যাদি গান বেশ জনপ্রিয় হয়।

তবে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি অন্য সব গানকে ছাপিয়ে যায়। এর আবেদন একেবারেই আলাদা। স্বতন্ত্র। ১৯৬৯ সালে রচিত গান ১৯৭১ সালে বেতারে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে নিয়মিতভাবে প্রচারিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এবং এখনও গানটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের অবদানের কথা স্মরণ করে। বিবিসি বাংলা বিভাগ শ্রোতা জরিপে নির্বাচিত সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের মধ্যে এটি অন্যতম। সবমিলিয়ে গানটি গানের অধিক।

ডায়েরিটি লক্ষ্য করে দেখা যায়, পাতাগুলো কিছুটা বাদামি রং ধারণ করেছে। তবে প্রথম পাতা ছাড়া বাকিগুলো এখনও অক্ষত। গীতিকার ডায়েরির দিন তারিখ মিলিয়ে গান লিখেননি। একটির পর একটি পাতা ব্যবহার করেছেন তিনি। ডায়েরিতে অনেক গান। ২০ ও ২১ ফেব্র“য়ারির পাতা দুটিতে ‘সালাম সালাম’ গানটি খুঁজে পাওয়া যায়। সুন্দর হস্তাক্ষর। স্পষ্ট পড়া যায়। তেমন কোন কাটাছেঁড়া ছাড়াই এমন একটি গীতি কবিতা লিখে ফেলেছেন দেখে অবাক হতে হয়।

কালজয়ী গানের গীতিকার, হ্যাঁ, এখনও জীবিত। ৮০ বছর বয়স। কিন্তু সেভাবে কথা বলতে পারেন না। স্মৃতি লোপ পেয়েছে। তবে গানটির জন্মের কথা একাধিক লেখা ও সাক্ষাতকারে প্রকাশ করেছেন তিনি। সে অনুযায়ী ১৯৬৯ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি গানটি লেখা হয়। গীতিকার উল্লে−খ করেন, তার ডায়েরি থেকে গানটি লিখে নেন কণ্ঠশিল্পী বশির আহমদ। সুরও করেন তিনি। কিন্তু রেকর্ড আর করা হচ্ছিল না।

একই বিষয়ের বিস্তারিত বাবার মুখে শুনেছেন গীতিকারের সন্তান ওয়াসিফ-এ-খোদা। তিনি জানান, ততদিনে আসাদ ও মতিউরকে হত্যা করা হয়েছে। সার্জেন্ট জহুরুল হককে, ডঃ জোহাকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনা তার বাবার মনোজগতে ছিল। সেখান থেকেই গানটির কথা মাথায় আসে। ডায়েরি ব্যবহার করতেন তিনি। ডায়েরিতেই গানটি লিখেন। মূল গানটি বেশ বড় বলেও জানান তিনি।

বলেন, বশির আহমদ উর্দুতে গানটি লিখে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আমাকে সেই লেখাটি দেখিয়েছেন। গানের প্রথম সুরও করেন তিনি। কিন্তু রেকর্ড করেননি। এ অবস্থায় চলে আসে ১৯৭১ সাল। মার্চে আরও উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। এমন সময় একদিন শিল্পী আবদুল জব্বারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ফজল-এ-খোদার। আবদুল জব্বার তাকে জানান, বঙ্গবন্ধু শহীদদের নিয়ে গান করতে বলেছেন। এত এত শহীদ হলো, তাদের নিয়ে গান করা উচিত। তখন আগে লিখে রাখা গানটি আবদুল জব্বারকে দেখান তিনি।

গান হাতে পেয়ে আবারও সুর করেন আবদুল জব্বার। নিজের সুরেই গানটি কণ্ঠে তুলে নেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে সে গান শোনান। এ ঘটনা আনুমানিক ৯ মার্চের বলে জানান ওয়াসিফ। বলেন, বাঙালীর নেতা গান শুনে বেতারে গিয়ে প্রচারের ব্যবস্থা করতে বলেন। বেতারের কেউ কেউ বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন বটে। কাজ হয় না। পরে দুটি শব্দ পরিবর্তন করে গান প্রচার করা হয়। ১৪ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বারবার গানটি বাজানো হয় বলে জানান তিনি।

এদিকে যুদ্ধ শুরু হলে এ গান আলাদা আবেদন নিয়ে সামনে আসে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে গানটির রেকর্ড বের করা হয়। হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে বের হওয়া রেকর্ডে আরও দুটি গানের সঙ্গে ছিল এটিও। রেকর্ডের এক পীঠে ছিল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ ও ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা’ গান দুটি। অপর পীঠে ছিল ‘সালাম সালাম হাজার সালাম।’ গানটি সবার কাছে পৌঁছে যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বদৌলতে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত প্রচার করা হতো। সে সময়ের অনুভূতি জাগানিয়া বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে এটি ছিল একটি। গান শুনে শ্রোতারা এমনকি বীর মুক্তিযোদ্ধারা আপ্লুত ও উজ্জীবিত হতেন বলে জানা যায়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এ গান। কারণ ততদিনে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে! তাদের স্মরণে গানটি গাওয়া হতো। বর্তমানেও অভিন্ন আবেগ নিয়ে বহু শিল্পী এ গান করেন। গান করে চলেছেন। ওয়াসিফ-এ-খোদা বলেন, বাবা ডায়েরির খুব যত্ন করতেন। বইয়ের মতো সাজিয়ে রাখতেন। আমরাও সেভাবেই নিজেদের কাছে এতকাল ধরে রেখেছি। ফলে এর তেমন ক্ষতি হয়নি। আমরা মনেকরি স্মৃতি নিদর্শনটি শুধু আমাদের নয়। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই সবার করে দিতে জাদুঘরে প্রদান করেছি। - জনকন্ঠ

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com