মিলন-হুমায়ূন: সূচনা এবং বিস্তার

প্রকাশের সময় : 2021-03-18 12:28:31 | প্রকাশক : Administration
মিলন-হুমায়ূন: সূচনা এবং বিস্তার

দাউদ হোসাইন রনি: স্বাধীনতার আগে জনপ্রিয় ধারার লেখা বা জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারণাটা পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। সে সময় যাঁরা লিখতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী ও আল মাহমুদ। কথা সাহিত্যিক ছিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, রশীদ করিম, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান, শওকত আলী, রাবেয়া খাতুন, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত।

তাঁদের লেখা বই নিয়মিত বের হতো না, মাঝেমধ্যে হতো। সেই বইয়ের বিক্রি খুব কম ছিল। হয়তো বছরে দুই-তিনশো বই বিক্রি হয়েছে। পাঁচশো বই চলেছে এমন রেকর্ডও নেই। তবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসিমউদ্দীন এঁদের বইগুলো চলত। সব থেকে বেশি চলত মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’।

এ ছাড়া অন্য লেখক যাঁরা চল্লিশ, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছেন তাঁদের অনেকেই বড় লেখক, অনেক ভালো লেখক কিন্তু বইয়ের বিক্রিতে তাঁরা পিছিয়ে ছিলেন। সেই সময় অনেকের সঙ্গে ইমদাদুল হক মিলন নামের একজন তরুণও লিখতে শুরু করলেন। দুই ধরনের লেখা তিনি লিখতে লাগলেন। সেই সময়কার, তাঁর প্রজন্মের তরুণ-তরুণীর প্রেম-ভালোবাসা, স্বপ্ন আর দিনযাপনের ছবি সরল আকর্ষণীয় ভাষায় লিখতে লাগলেন। এই করে করে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন তরুণদের কাছে, গৃহবধূদের কাছে। অন্যদিকে গ্রাম জীবন নির্ভর গল্প লিখে বোদ্ধা পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে লাগলেন। এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীর প্রেম-ভালোবাসা, স্বপ্ন আর দিনযাপনের ছবি সরল আকর্ষণীয় ভাষায় লিখতে লাগলেন। সব ক্ষেত্রের দরজাগুলো খুলে দিল। দেশ স্বাধীনের আগে-পরে অনেক বছর পর্যন্ত আমাদের বইয়ের বাজার ছিল পশ্চিমবঙ্গের কিছু জনপ্রিয় লেখকের দখলে।

স্বাধীনতা যেমন আমাদের একটা দেশ দিল, তেমনি শিল্প-সাহিত্যসহ লেখক লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৭৩ সালে। পত্রিকায় লেখেন, পত্রিকায় লিখতে লিখতে তাঁর একটা নাম হয়েছে। তাঁর প্রথম বই ‘ভালোবাসার গল্প’ প্রকাশিত হলো ১৯৭৭ সালে। এক বছরে ২২৫০ কপি বিক্রি হয়ে গেল।

লেখকের পরের বইটা আবার বিক্রি হলো না। বইয়ের গল্পগুলো গ্রামীণ হতদরিদ্র মানুষের জীবনযাপন নিয়ে। আমরা যেটাকে বলি ‘সিরিয়াস সাহিত্য’, ‘নিরন্নের কাল’ তাই। এদিকে মিলন লিখতে শুরু করেছেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’। ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায়।

কয়েক বছর পর এই লেখকের ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’ ব্যাপক বিক্রি হলো। পাঠক গ্রহণ করছেন মিলনের সব ধরনের লেখা। ‘দুঃখকষ্ট’, ‘কালোঘোড়া’ আর তুমুল আলোড়ন তোলা উপন্যাস ‘পরাধীনতা’। তিনিই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশে প্রথম জনপ্রিয় লেখক। ১৯৯৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন। সে বছর বইমেলায় তাঁর ‘ভালোবাসার সুখদুঃখ’ বইটা ৮৭ হাজার কপি বিক্রি হলো যা বাংলাদেশে রেকর্ড। তার আগে হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে কথা আছে। তাঁর প্রথম বই বের হলো ১৯৭০ সালে ‘নন্দিত নরকে’। এরপর বের হলো ‘শঙ্খনীল কারাগার’।

এই দুটো বই সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক, সাহিত্য বিষয়ক গুণীজন বা আমরা যাঁদের সাহিত্যের বিচারক বলি তাঁদের মনোযোগ আকর্ষণ করল। যেমন আহমদ শরীফ, শওকত আলী এঁরা ‘নন্দিত নরকে’ নিয়ে লিখলেন। তারপর হুমায়ূন আহমেদ লিখলেন সায়েন্স ফিকশন ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’, বাচ্চাদের বই ‘নীল হাতি’।

তিনি চলে গেলেন আমেরিকায়, পিএইচডি করতে। আমেরিকায় থাকার সময়ই ১৯৮২ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন। আমেরিকায় বসে তিনি শুনলেন, বাংলাদেশে একজন লেখক জনপ্রিয় হয়েছেন। তাঁর নাম ইমদাদুল হক মিলন।

১৯৮৪ সালে দেশে ফিরে বইমেলায় ইমদাদুল হক মিলনের ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’ বইটা নিয়ে লেখকের অটোগ্রাফ নিতে গিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এইভাবে দুই লেখকের ঘনিষ্ঠতা হলো। ইমদাদুল হক মিলনের ‘পরাধীনতা’ বইটা নিয়ে দৈনিক বাংলায় একটা লেখা লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ, সেখানে তিনি এই তথ্যগুলো দিয়েছেন। ১৯৮৫ সালে হুমায়ূন আহমেদ টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটক লিখলেন ‘এইসব দিনরাত্রি’।

জনপ্রিয়তার নতুন জগৎ তৈরি করলেন। যেমন নাটকে তাঁর জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে নাটকের কারণে তাঁর বই বিক্রি হু হু করে বাড়তে লাগল। তিনি বহু ধরনের লেখা শুরু করলেন। যা লেখেন তা-ই জনপ্রিয় হয়।

নব্বইয়ের গোড়ার দিকে ইমদাদুল হক মিলন ও হুমায়ূন আহমেদ দুজন প্যারালালি জনপ্রিয় লেখক। যেমন তাঁদের নাটক জনপ্রিয়, তেমনি তাঁদের বই। মিলন বই লিখে বই জনপ্রিয় করলেন, হুমায়ূন নাটক লিখে তাঁর বইও জনপ্রিয় করলেন। ধীরে ধীরে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে উঠলেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় লেখক, বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক।

মোট কথা, এই দুজন লেখক বাংলাদেশের সাহিত্যকে একটা বিশাল জায়গায় নিয়ে গেলেন। ইমদাদুল হক মিলন জনপ্রিয় ধারাটা তৈরি করলেন। আমেরিকা থেকে ফিরে এসে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ম্যাজিক দিয়ে সেই ধারাটা তুঙ্গে নিয়ে গেলেন। বাংলাদেশের সাহিত্যে এ দুই লেখকের অবদান স্বাধীনতার ৫০ বছরের এক বড় অর্জন । - কালের কণ্ঠ

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com