করোনা দিনের ডায়েরি...

প্রকাশের সময় : 2021-05-05 14:33:14 | প্রকাশক : Administration
করোনা দিনের ডায়েরি...

১৮তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

আশির দশকের শেষের দিকের কথা। বিনোদন বলতে বাংলায় তেমন কিছু নেই। হলে গিয়ে সিনেমা দেখা, আর ঘরে বসে টিভি। তখনকার সময় সব ঘরে টিভি না থাকলেও যাদের ঘরে ছিল কেবল তারা নিজেরা নয়, পাড়াশুদ্ধ মানুষ জড়ো হয়ে টিভি দেখতাম। আর থাকতাম মঙ্গলবারের অপেক্ষায়। প্রতি মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটায় টিভিতে ধারাবাহিক নাটক হয়। ওটার অপেক্ষায়।

‘এই সব দিন রাত্রি’ হচ্ছে টিভিতে। ধারাবাহিক নাটক। বিটিভিতে দেখানো সে সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক। এর আগে টিভি পর্দায় মধ্যবিত্তের জীবন ভিত্তিক এমন নাটক কেউ বানায়নি। সবার চেনা মধ্যবিত্তের চরিত্রগুলো হুমায়ুন খুবই সাবলীলভাবে এনেছিলেন। এবং স্বাভাবিক ভাবেই নাটকটি হয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়। তিনিও উঠেছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। 

কিংবদন্তী হুমায়ুন আহমেদের কিংবদন্তীর পথে যাত্রা শুরু তখন থেকেই। তিনি নজর কাড়লেন সবার। তাঁর নাটকটির জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে চাইলো ইউনিসেফ ঢাকা অফিস। ‘এই সব দিন রাত্রির’ চরিত্রগুলো দিয়ে একটা বিজ্ঞাপন বানাতে চাইলো তারা। তাদের চেষ্টা ছিলো ডায়রিয়ার জন্য ‘লবন গুড়’ স্যালাইন জনপ্রিয় করা। তারা হুমায়ুন আহমেদকে রাজী করালো এবং শুটিং শুরু হলো বিটিভির নিজস্ব স্টুডিওতে। নাটকের স্টুডিওতে বিজ্ঞাপনের শুটিং।  

শুটিং চলছে। কিন্তু কোথায় যেন প্রযোজক মুস্তাফিজুর রহমানের মনোপুত হচ্ছিল না। তিনি টেক করছেন। আবার দেখছেন। কিন্তু তৃপ্তি পাচ্ছেন না। বারবার রেকর্ডিং প্যানেল থেকে নীচে নেমে আসছেন। বাইরে গিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন। অস্থির লাগছে তাকে। হঠাৎ তিনি হুমায়ুনকে বললেন, হুমায়ুন! শেষটা জমছে না ভাই। তুমি একটু পাল্টাও। হুমায়ুন কিছুই ভাবলেন না। বসা থেকে উঠে গিয়ে স্ক্রিপটা সামান্য একটু কাটাকাটি করলেন। মাত্র মিনিট কয়েক। এবার মুস্তাফিজ খুশি। বেজায় খুশি। খুশি মনেই শুটিং শেষ করলেন।

শুরু হলো প্রচার। তখনকার সময় এত্ত এত্ত টিভি চ্যানেল ছিল না। আবার ঘরে ঘরে টিভিও ছিল না। কিন্তু দর্শক ছিল। দেশব্যাপী মোটে একটি চ্যানেল। সরকারী চ্যানেল। এই একটি চ্যানেলের দিকেই সবার চোখ ছিল। কী খবর, কী বিজ্ঞাপন! সবই গোগ্রাসে গিলতাম। খারাপও লাগতো না। ভাল ভাল নাটক হতো। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হতো। চোখ বুঝে বলা যায়, এখনকার চেয়ে তখনকার টিভির মান অনেক ভাল ছিল। আকর্ষণীয় ছিল।

আকর্ষণীয় সেই টিভিতে প্রচারের প্রথম দিনেই হিট। ফাটাফাটি রকমের হিট। তুমুল জনপ্রিয় হলো স্যালাইনের বিজ্ঞাপনটি। সুপার ডুপার হিট হলো। ঘরে ঘরে বাজতে লাগলো সুজা খন্দকারের মুখের সংলাপ, দিলাম ঘুটা, ঘুটা, ঘুটা। সেদিন মিনিট কয়েকের ভাবনায় হুমায়ুন আহমেদ স্ক্রিপ্ট কেটে যোগ করেছিলেন ঐ ঘুটা, ঘুটা, ঘুটা শব্দ ক’টি। অথচ পাবলিক বিবেচনায় সে শব্দগুলোই হিট। সুপার ডুপার হিট। মানুষের মুখে মুখে ফিরতে লাগলো ঘুটা, ঘুটা। 

ডায়রিয়া বিদায়ের জন্যে সেদিন এই ঘুটার কোন বিকল্প ছিল না। আজকের করোনার জন্যেও তেমন কোন শব্দ লাগবে। ঝেটিয়ে বিদায়ের জন্যে জুৎসই কোন শব্দ। পুরো জাতি যখন পেট পাতলা রোগে হাগতে হাগতে শেষ হয় হয় করছিল, ঠিক তখন সামান্য লবন গুড়ের মিশ্রণ মৃত্যুঞ্জয়ী সুধার কাজ করেছিল। আজকের করোনার এই বিভীষিকায় পেটকে পাতলা না করে সুধার সন্ধান করতে হবে।

এমন সুধা সবার ঘরেও নিশ্চয়ই আছে যা দিয়ে করোনাকে সমূলে নির্বংশ করা যাবে। এখনও আমরা জানিনা বলেই কাজে লাগাতে পারছিনা। তবে খুব শীঘ্রই এসব আবিস্কার হবে। আমরা জেনে যাবো জনে জনে এবং মুক্তিও মিলবে করোনা থেকে। কিন্তু সে সবে ভরসা না রেখে এবং মাথা না খাটিয়ে সারাদিন হাহুতাশ করছে দেশের একশ্রেণীর মানুষ। নামে এরা সুশীল। তবে এটা সুশীল নামের ভন্ডদের উপার্জনের একটা নোংরা কৌশল।

করোনার ভয় দেখিয়ে এরা মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে চাচ্ছে। মূলত মানুষের কর্মহীনতার সময়কে দীর্ঘ করতে চাচ্ছে। কর্মহীন করে মানুষকে ঘরে রেখে সরকারকে দূর্বল করে এরা আসলে নিজেদের গোপন স্বার্থ হাসিল করতে চায়। স্বার্থের একমাত্র লক্ষ্য সরকারকে বিপদে ফেলা। মানুষের দুর্দশাকে কাজে লাগিয়ে এরা সব সময় এই কৌশলটা করে। সারাক্ষণ দোয়া করে আর আশা করে দেশটি যেন রসাতলে যায়। দেশের যত খারাপ হবে, এদের উদ্দেশ্য তত হাসিল হবে। তাই তারা দোয়ায় মশগুল থাকে। দূর্ভিক্ষের দোয়া।

তবে এটা ৭৪ নয়। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ নয়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। স্বনির্ভর বাংলাদেশ। এই দেশে দুর্ভিক্ষ হবে না ইনশাআল্লাহ্। অসম্মানিত অবস্থায় থাকলেও আমাদের আছে বিশাল কৃষক বাহিনী। আছে কৃষি বিজ্ঞানী, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ পুলিশ বাহিনী, আর্মি। আরও আছে বিশাল তরুণ সমাজ যারা নিজের দেশকে ভালোবাসে মন থেকে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে গেছে। সুশীল নামের এইসব শকুনের দোয়ায় গরু মরবে না ইনশাআল্লাহ্।

মানুষ সতর্কও থাকবে, কাজও করবে। জীবন এবং জীবিকার সংগ্রাম একসাথে করবে। দূর্ভিক্ষে না মরে, করোনায় মরবে। সেটা ঢের ভাল। দূর্ভিক্ষের জ্বালা অনেক বেশি। তবে সচেতনভাবে চলাফেরা করলে করোনায় মরব না, ইনশাআল্লাহ্! যদিও সবাই না, তবুও বলতে হয়; দিনে দিনে মানুষ অনেক সচেতন হচ্ছে। মানুষ এখন বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়। মাস্ক ব্যবহার করে, গ্লাভস ব্যবহার করে, সামাজিক দূরত্ব বুঝতে পারে। আমরা করোনার সাথে যুদ্ধে অনেকখানি এগিয়ে গেছি।

শুধু একটু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কোনভাবেই হেরে যাওয়া যাবে না। ভয় পেলে চলবে না। ভয় পেয়ে কি লাভ? ভয়কে বরং নাই করে ফেলা দরকার। মনস্থির করুন, দেখবেন ভয় নাই হয়ে গেছে; হাওয়া হয়ে গেছে। একটাই তো জীবন। বড় সখের জীবন। করোনা এই জীবনের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আর পেছনে যাওয়া যাবে না! এগুতে হবে। এখন কেবল এগুনোর পথ আছে; পেছানোর পথ নেই।

রাস্তার ভিখিরিও এগুচ্ছে। বেঁচে থাকার তাগিদে মাস্ক পড়ে ভিক্ষা করছে। বাকীরা কেন পারবো না। পানিতে ডুবে গেলেও মানুষ খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়। অথৈ জলে থেকেই ভাসার চেষ্টা করে। এ যে বাঁচার চেষ্টা। আমাদেরকেও বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। করোনার সাথে বাঁচা! একদিন আমরা নিশ্চিত জেনে যাবো সহাবস্থানের নীতিটা। করোনার সাথে অবস্থান।

অবস্থান তো আমাদের অনেকের সাথেই। মশার সাথে, ডেঙ্গুর সাথে। নানা ভাইরাসের সাথে। এসবে খুব কি ভয় পাই! পাই না। সামান্য তেলাপোকা ভয় পেয়ে জীবন পার করে দিলাম। তবুও তেলাপোকামুক্ত ঘর পেলাম না আজো। ধরে নিলাম করোনা মুক্ত বিশ্বও সহসা পাবো না আমরা। তাই বলে ঘরে লুকিয়ে থাকবো? বরং হাতে গ্লাভস আর মুখে মাস্ক লাগিয়ে বাইরে বের হবো। আর সামনে পেলে করোনাকে ঘুটা দিবো। হুমায়ুনের মত ঘুটা। আর দিব স্লোগান। নিজের মত করে স্লোগান, একটা একটা করোনা ধর! ধইরা ধইরা পকেটে ভর!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com