করোনা দিনের ডায়েরি...

প্রকাশের সময় : 2021-05-26 16:05:54 | প্রকাশক : Administration
করোনা দিনের ডায়েরি...

১৯ তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

হালকা চাপদাঁড়ির কারণে ওকে বেশ লাগে। দেখতেও যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। একমনে নিজের জগতে বিচরণ করা চুপচাপ এবং নম্র-ভদ্র টাইপের ছেলেটি ওমর ফারুক। পেশায় আর্কিটেক্ট। ক্যারিয়ারে মন্দ করছে না। দেশ থেকে উন্নত বিশ্বে এসে সবাই নিজের ক্যারিয়ারে থাকতে পারে না। ফারুক পেরেছে। কানাডায় এসে আর্কিটেকচারে উচ্চতর লেবেলে পড়াশুনা করে দিব্বি আর্কিটেক্ট হিসেবেই নিজেকে প্রকাশ করতে পেরেছে।

করোনা ক্রান্তিকালে এই আর্কিটেক্ট ছেলেটিও বদলে গেছে। বর্তমানে সে যত না আর্কিটেক্ট, তারচেয়েও ঢের বেশি একজন সমাজকর্মী। বেশভূষায় এবং ভাবসাবেও পাক্কা সমাজকর্মী। ভাবটা এমন যে, করোনায় ডরে না সে। আশেপাশের অনেককে নিয়েই ওর টেনশান। টেনশান আমাদেরকে নিয়েও। ভীষন টেনশান। নিজে মরি মরি, আঙ্কেলকে মরতে দেয়া যাবে না! ওর ধারণা, মাঝবয়সী এই আঙ্কেল ঘর থেকে বের হলেই করোনা খপ করে ধরবে।

ধরবে মানে, ছাই দিয়ে ধরবে। নাক দিয়ে ঢুকে ফুসফুস ছ্যাড়াবেড়া করে দেবে। তাই পণ করেছে। বাজারঘাট করার নামে আঙ্কেলকে কিছুতেই বাইরে যেতে দেবে না। আঙ্কেলও মহা তেদর। ভাল করে জানে, কিভাবে নিতে হয় আদর। তাই বুড়ো ভাবটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কেয়ারিং এর আতিশয্যে সারাদিন ঝিমোয় আর বিকেল হলেই অপেক্ষায় থাকে। ফারুকের অপেক্ষায়। এই বুঝি ফারুক আসছে।

ফারুক প্রায়ই আসে। কোনদিন বাজার থেকে গাদাগাদা শপিং করে নিয়ে আসে। কোনদিন রান্না করা খাবার। শাওন বাসায় বসে রেঁধে দেয় আর ফারুক নিয়ে আসে। পোটলা ভরে নিয়ে আসে। শাওন-ফারুক দম্পতির এমনি আদরমাখা সেবায় করোনাতেও মন্দ নেই। বলা যায় মহাসুখেই আছি। দিনে দুইবেলা করে খাওয়ার দিনগুলি আর নেই। পেট ভরে খেতে পারি এখন। প্রবাসের সীমিত জীবনে ভালভাবেই পার করছি বন্দিদশার ৭২ তম দিন।

বন্দিজীবন বড় অদ্ভুত। বাইরে যাবার উপায় নেই। বাইরের অবস্থা এখনো টালমাটাল। দৈনিক আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক অনেক বেশী। পাশের নিউইয়র্ক তো মেছাকার হয়ে গেছে। লাশের সারিতে ছেয়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ! সে তুলনায় বাংলাদেশ অনেক সেফ! আল্লাহ্পাক এখনো অনেক হেফাজতে রেখেছেন দেশবাসীকে। দেশের মানুষ ভালই আছে। বেশি ভাল আছে, তারা; যারা নিজেদের ভাল থাকা আর ভাল লাগা ছাড়া অন্যের ভাল থাকা নিয়ে মোটেই ভাবে না। তারা মহা ভাল আছে। পত্রপত্রিকা, রেডিও, টিভিতে জ্ঞান দিয়ে বেড়ানো এইসব মানুষেরা ফেসবুক পেজে যা লেখে, তা দেখলে তেমনি মনে হয়। দেশের দূর্দশাগ্রস্ত মানুষের সব দায়িত্ব সরকারের ঘাড়ে দিয়ে নিজেরা ব্যক্তি জীবনে আয়েশী জীবন যাপন করছে।

তেমনি একজন আয়েশী লিখেছেন, “চাইনিজ রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকার কারণে মেয়ের জন্মদিনে যেতে পারিনি। বাসাতেই চাইনিজ ফুড রান্না করেছিলাম। ফ্রায়েড রাইস, ফ্রায়েড চিকেন, ক্যাশ্যু নাট সালাদ। সবাই খুব তৃপ্তি করে খেয়েছে। ঠিক করেছি, আজ থেকে রোজই একটা করে নতুন আইটেম রান্না করব। আজ করব থাই স্যুপ আর ক্যাশ্যু নাট সালাদ। কোয়ারেন্টাইনের কারণে আর কিছু না হোক, অন্তত নতুন নতুন রান্না শিখছি, করছি। এটাও বিরাট লাভ। আর ওজন? সেটা কবেই বা কম ছিল?”

সামাজিক ওজনের পাশাপাশি এদের দেহের ওজনও কম নয়। কোনকালে কম ছিলও না। চাপা মেরে মেরে আর খেয়ে খেয়েই এমন হয়েছে। আগেও খেত, এখনো খায়। সরকার যখন জনগণের খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অস্থির, দেশের বড় একটা অংশ যখন নিজেদের খাদ্যযোগাড় নিয়ে দিশেহারা, তখনও তারা খাচ্ছে। নতুন নতুন আইটেম রাঁধছে আর জিহ্বায় চেখে খাচ্ছে। গলা পর্যন্ত খাচ্ছে।

পাশাপাশি কেবল খাওয়া নয়, নির্লজ্জের মত সে সব ছবি পোষ্ট দিচ্ছে। যা দেখে বুভুক্ষ মানুষের গা ছমছম করে উঠছে। এভাবে হাজারো ক্ষুধার্থের সেন্টিমেন্ট বিবেচনায় না নিয়ে নিজের রাজকীয় খানাপিনার ছবি দেখিয়ে প্রমাণ করছে মনুষ্য প্রজাতির সবচেয়ে নিকৃষ্ট কীট এরা। অধমেরও অধম। অসম্ভব বিকৃত রুচীর। ধিক এসব সুশীল নামধারী বিকৃতশীলদের! ধিক তাদের শতধিক!!

তবে মনে হচ্ছে করোনা নিজেও ক্ষেপেছে এদের উপর। তাই খুঁজে খুঁজে এদেরই ধরে। খানদানী ভাইরাস করোনা। খানদান বোঝে। এবং পছন্দও করে বেশ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুবেশিত, সুবাসিত মানুষদেরই পছন্দ করোনা ভাইরাসের। শহরের বড়  বড় অ্যাপার্টমেন্টে বড় বড় সব মালিক, ভাড়াটিয়া; ছোট-বড় হরেক রকম গাড়ি। যারা বস্তির বুয়াদের ঘটা করে বিদায় করেছে করোনার ভয়ে। অথচ বুয়াদের নয়, তাদেরই করোনায় ধরছে বেশি। বস্তিবাসীরা বড় নিরাপদে আছে। শহরের বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টের দুই পাশে বিশাল বড় বড় বস্তি। কাজের বুয়া, গার্মেন্টসের কর্মী, ভাসমান পতিতা, গ্যাস-লাইট-পানি মিস্ত্রী, মুচি, মেথর, ক্ষুদ্র দোকানদার, ছেঁচড়া চোর, ছিনতাইকারী, ‘কিলার-অন-পেমেন্টও আছে ওখানে। এক্কেবারে বারো ভাঁজা। খুঁজলে বাংলাদেশের সব কয়টা উপজেলার লোক পাওয়া যাবে এখানে। বিশাল জনসংখ্যা; চেঁচামেচি, মারামারি লেগেই আছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

রাতের বেলা একঘরে ৮-১০ জন গাদাগাদি করে শোয়। তার ভেতরেই বাচ্চা জন্ম হয়। বিয়ে হয়, ছাড়াছাড়ি ও তালাক হয়। ওইখানে অভাব আছে, অসুখও আছে। আনন্দ আছে, সুখ আছে। আবার প্রেম, দুঃখ, ওসবও আছে। মজার ব্যাপার, এই কয়েক হাজার মানুষের একজনও তিন মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়নি। এই সব বস্তিতে লকডাউন হয়নি আজো। হয়েছে কেবলই পাকা বাসাবাড়ী আর এপার্টমেন্টে।

কেমন যেন এলোমেলো মনে হচ্ছে সবকিছু। যেখানে যা হবার সেখানে তা হচ্ছে না। যেমনি করোনার হিসেবও মিলছে না। তেমনি রাজনীতিকদের কথাবার্তায়ও ব্যালেন্স আছে বলে মনে হচ্ছে না। বিএনপি নেতারা কথা বলেন হরহামেশা। ইদানিংও বলেন বেশ। বেশি বলেন করোনা নিয়ে। তবে রুহুল কবির রিজভীর যত ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে তার একটিতেও সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি।

সব ছবিতে অবশ্য রিজভী পিপিই এবং মাস্ক পড়ে  রয়েছেন। কিন্তু রিজভীর আশপাশের বেশিরভাগের মুখেই মাস্ক নেই। এই অবস্থা  রিজভীকে ঝুঁকিতে ফেলছে। শুধু তিনি নিজে নন। তার আশপাশের মানুষজন এমনকি ত্রাণগ্রহীতাও ঝুঁকিতে রয়েছেন। মালয়েশিয়াতে এক উপমন্ত্রী কোভিড-১৯ এর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব না মানার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে জরিমানার শিকার হয়েছেন।

অবশ্য আমাদের এখানে এমন বালাই নেই। থাকলে রিজভী সাহেবরা ত্রাণ বিতরণের নামে প্রচারণার এই কৌশল নিতে পারতেন না। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের তারাবো উপজেলার বরপা পৌরসভা এলাকায় স্থানীয় বিএনপির উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণের সময় রিজভী বলেছেন সরকার ভুল করেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে চলতে থাকা ‘লকডাউন’শিথিল করে সরকার ভুল পথে চলছে।

ফালতু কথাবার্তা। নিজে ভুল করে অন্যের ভুল ধরিয়ে দেয়া ফালতামি ছাড়া আর কী! রিজভী নিজে গাদাগাদি করে ছবি তুলেছে। এতে কি কোন ভুল নেই! তার সব কথাই তো ভুলে ভরা। তিনি বলেছেন, লকডাউন শিথিল করলে কত হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে- এটা সরকার কখনই মাথার মধ্যে নেয়নি। আচ্ছা যদি কিছুই না খুলত তাহলে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের খাবারের যোগাড়ের ব্যবস্থা কী করে হতো!

রাষ্ট্রের সামর্থ্যরে কথাও তো চিন্তা করতে হবে। নাকি তার কোন প্রয়োজনই নেই! কেবল আবোল তাবোল বললেই হবে? আল্লাহ মুখ দিয়েছেন, তাই বলে যাচ্ছেন। তবুও ভাল। তিনি অন্তত কিছু বলেন। সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী তো কথাই বলেন না। মাঝেমাঝে লাইভে এসে বিড়বিড় করেন মাত্র। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের এমনি ক্রাইসিসে সবচেয়ে দায়িত্ব নিয়ে যিনি সবচেয়ে বেশি জনসম্মুখে আসেন তিনি দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আমাদের মন্ত্রী আসেনও না, কথাও বলেন না। বললেও মিনমিন করে করে কী বলেন তিনি নিজেও জানেন না।

ক্রাইসিসের প্রথমদিন থেকেই তিনি মনভরা চেহারা নিয়ে ছিলেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমনি চেহারা সর্বস্ব তার ভিডিও দেখলে যে কেউই বুঝবে বাংলাদেশিরা ভাল নেই। দম যায় যায় করছে। মহামারীর ক্রান্তিকালে যার দায়িত্ব পুরো জাতিকে চাঙা রাখা, তিনি যদি মনমরা চেহারা নিয়ে জাতির সামনে আসেন, তাতে জাতির মনটাও মরে যায়।

এ মুহূর্তে এভাবে জাতিকে মেরে ফেলা দরকার নয়; দরকার বাঁচিয়ে রাখা। বাঁচিয়ে রাখার জন্যে পারফেক্ট লোক দরকার। আতঙ্কবাদী আর গুজব প্রিয় জাতিকে স্বস্থি দেবার জন্যে সত্যি সত্যি সঠিক লোক দরকার। খুব বেশি করে দরকার!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com