প্রকাশের সময় : 2021-09-27 16:21:09 | প্রকাশক : Administration

করোনা দিনের ডায়েরি...

২৬ তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

হুজুগপ্রিয় বাঙালী এবার নতুন হুজুগে মেতেছে। করোনার ঔষধ কেনার হুজুগ। কিনতে কিনতে বাজার খালি করে ফেলেছে। একেক সময় মিডিয়ায় একেকটি ঔষধের খবর বের হয় আর সেসব কেনার ধুম পড়ে যায়। কঠিন ধুম। চাল না কিনলেও চলবে। ঔষধ কিনতেই হবে। কিনে ঘরে মজুদ করে রাখতে হবে। কোনরূপ দ্বিধা করা চলবে না।

তবে ঔষধ কেনার পরে মানুষ দ্বিধায় পড়ছে। রামপুরার আতিকুর রহমান দ্বিধায় পড়ে গেছেন, তিনি এখন কোন ঔষধ ব্যবহার করবেন, কোনটা করবেন না। কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে যখন যে ঔষধের কথা শুনেছি, তাই সংগ্রহ করে রেখেছি বাসায়। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, এজিথ্রোমাইসিন, ফেভিপিরাভির, রেমডেসিভির, আইভারমেকটিন, ডক্সিসাইক্লিন। এমনকি কানে আসতেই ছুটে গিয়ে ডেক্সামেথাসনও আনলাম। তবে সমস্যা হচ্ছে, যদি পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়েই পড়ে তখন এই ঔষধগুলোর মধ্যে কোনটি ব্যবহার করব?’

ধানমন্ডির মোজাম্মেল হকের গরজ আরো বেশি। তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে ওগুলোর সঙ্গে বাসায় একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারও এনে রেখেছেন। বলেন, ‘বলা তো যায় না কখন প্রয়োজন হয়, তখন যদি না পাই!’ মিরপুর কাজীপাড়ার আলতাফ হোসেন বলেন, ‘বাসার কাছের ফার্মেসি থেকে শুনে শুনে কয়েকটি ঔষধ এনে রেখেছি। অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি আলোচিত হোমিওপ্যাথি আর্সেনিকা-৩০ নামের ঔষধও এনে রেখেছি।’

বিশ্বের কোন দেশ কোন ঔষধ করোনায় ব্যবহার করছে বা কোনটি গবেষণায় সফল হচ্ছে এমন খবর জানাজানি হলেই দেশের একশ্রেণির মানুষ যেমন ছোটাছুটি শুরু করে ফার্মেসিতে, তেমনি ঔষধ কোম্পানিগুলোও এমন হিড়িক দেখে মেতে ওঠে বাণিজ্যে। রাতারাতি ঔষধ তৈরি করে বাজারজাতও করে ফেলছে করোনা চিকিৎসার নামে। ফার্মেসিগুলোতেও চলছে রমরমা বেচাকেনা।

মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের লাজ ফার্মা শাখার বিক্রয়কর্মী নাম প্রকাশ না করে সর্বশেষ আলোচনায় আসা ডেক্সামেথাসন বিষয়ে বলেন, ‘দেশের বেশ কিছু কোম্পানির এই ঔষধ আমাদের কাছে আগেই ছিল। তবে হঠাৎ করে এর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমরাও বেশি করে সংগ্রহ করে রেখেছি।’ কাঁটাসুরের আরেকটি ফার্মেসির মালিক বলেন, ‘হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনে ধরা খেয়েছি। অনেক বেশি করে কিনেছিলাম। কিন্তু একপর্যায়ে এসে সেটি অচল হয়ে যায়। পরে আইভারমেকটিন নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে ঐ ঔষধও বেশি করে রেখেছি। এটি এখন বেশ চলছে। তার সঙ্গে আবার কাল থেকে হঠাৎ করে চাহিদা বেড়েছে ডেক্সামেথাসন গ্রুপের ঔষধের।’

ঔষধ কিংবা করোনার কারণে নয়। হঠাৎ করেই খুব কাছের দুটো মানুষ চলে যাবার খবর পেলাম। সাকের মাস্টার এবং শেখ মোহাম্মদের মুত্যুসংবাদ মেনে নেবার মত কোন খবর ছিল না। পুরোপুরি কলিজায় কামড় পড়ার মত ছিল। খুব কষ্ট পেয়েছি। ওরা দু’জনার কেউই করোনায় আক্রান্ত হয়নি। তবুও মৃত্যু তো মৃত্যুই। বাবার উপর নির্ভরশীল সন্তানদের রেখে ওরা চলে গেল। খুবই ট্র্যাজিক বিষয় এসব। হুট করেই চলে গেল। বলা নেই, কওয়া নেই; হঠাৎ করে ওদের হারাবার পরে কেবল একটু দম নিতে চেষ্টা করছিলাম। অমনি সালাম ভাইয়ের খবর পেলাম।

বড়ই খারাপ খবর। জটিল রকমের খারাপ। মুখটা অলরেডি বাঁকা হয়ে গেছে তাঁর। কথা বলতে পারছেন না। দেরি না করে গভীর রাতেই স্থানীয় উপজেলা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ওখান থেকে জেলা সদরে। ডাক্তার অনুমান করছেন ব্রেইনষ্ট্রোক। খবরটি শুনে ধাক্কা খেলাম। এমনিতেই হার্টব্লকের পেশেন্ট। ওপেন হার্ট সার্জারীর জন্যে হার্ট ফাউন্ডেশনে ক’বছর আগে জোর করে এডমিট করেছিলাম। অপারেশন না করে, কাউকে না বলে অনেকটা গোপনে বাসায় ফিরে যান। অপারেশনকে ভীষণ ভয় পান তিনি। এবার ব্রেইনষ্ট্রোক। এত ধকল শরীর নেবে কিভাবে!

আর্থিকভাবে একেবারেই অস্বচ্ছল সালাম ভাই এ যাত্রায় পার পেয়ে গেছেন। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছেন! শুভাকাঙ্খীদের সম্মিলিত চেষ্টায় তড়িৎ চিকিৎসার ফলে আমার চাচাতো ভাই আব্দুস সালাম চমৎকার সাড়া দিয়েছেন। তিনদিনের চিকিৎসায় তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কথা বলতে পারছেন। করোনাও হয়নি তাঁর। টেস্টে নেগেটিভ ফল এসেছে। কিছুটা স্বস্তি পেলাম। প্রথম থেকেই চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়ায় লেগে ছিলাম বলে ভাল খবরে ভালই স্বস্থি পেয়েছি। বাড়ির সবাই স্বস্তি পেয়েছে।

কিন্তু তিনদিনও স্থায়ী হয়নি এই স্বস্তি। হঠাৎ করে খুব খারাপ খবর পেলাম। মৃত্যুর খবর। আমাদের কাকীমা মারা গেছেন। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব চাচী আমার। খুব যে বয়স হয়েছিল তা নয়। তবে নানা ধরণের জটিলরোগে আক্রান্ত ছিলেন। ওসবে এতদিন রক্ষা পেলেও এবার পাননি। এবারের অসুস্থতা তাঁকে কাবু করে দিয়েছিল। বেশ ভালভাবেই কাবু করেছিল। তাই বেশীদিন পারেননি। দিন পাঁচেক যুদ্ধ করেই থেমে যান। হেরে যান। করোনার কাছেই হেরে যান।

করোনার দিনে মৃত্যুর কাছে এখন অনেকেই হেরে যাচ্ছে। যত না করোনায়, তারচেয়েও বেশি তাড়নায়। ভয়ের তাড়নায়। করোনায় যেমনি আমার চাচী হেরে গেলেন, তেমনি হেরে গেলেন সনির চাচাও। সনি জাহরা; আমাদের ব্র্যান্ডিং টিমে সদ্য যোগ দেয়া মিষ্টি মেয়ে। সদা হাসিখুশি; প্রাণবন্ত। ওর অল্পবয়সী চাচাও করোনা সিমটমে চলে গেলেন। মিষ্টি মেয়েটা কান্নায় একেবারে শেষ!

আজকের ডায়েরী লিখার সময় মেসেজ পেলাম আমাদের মনির স্যারের। তার চাচাশ্বশুর সকালে ইন্তেকাল করেছেন। সুস্থ হবার পথেই ছিলেন মানুষটি। করোনা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন; পেয়েছিলেন লাইফ সাপোর্ট থেকেও মুক্তি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেননি। আমাদের বাসার তিনটে বাসা পরেই তাঁর বাড়ি। প্রতিদিন বিকেলে বাসার সামনে তাঁকে হাঁটতে দেখতাম। গ্রাউন্ড ফ্লোরে মাগরিবের জামাত আয়োজন করতে দেখতাম।

মানুষটা আজ নাই হয়ে গেলেন! এভাবে করোনা দিনের একেকটা দিন যায়, সাথে একেকজন চেনাজানা লোকও চলে যায়। আর পারছি না! এত এত খারাপ খবর একটার পর একটা নিতে নিতে স্নায়ুতে প্রচন্ড চাপ পড়ছে। খুব দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। ভয় পাচ্ছি না মোটেও; কিন্তু কষ্ট পাচ্ছি। খুব কষ্ট পেয়েছি আমাদের নাসরিনের বাবার কথা শুনে। নাসরিন সিমেক সিস্টেমের মেয়ে; আমার কন্যাসম। একটা ভিন্নমাত্রার সর্ম্পক ওর সাথে।

দিন তিনেক আগে ওর একেবারে তরতাজা সুস্থ বাবাটা অকস্মাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করলেন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবনের সব হিসেব চুকিয়ে দিলেন। ১০টা মিনিটও সময় দিলেন না কাউকে। শুনে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম। আমার অতীব প্রিয় নাসরিনের অসহায় মুখটা খুব করে মনে পড়ছিল। ভাল করেই বুঝতেছিলাম বাবার মৃত্যুতে সবচেয়ে কনিষ্ঠ সন্তানের অসহায়ত্বের কথা। কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে বাবা হারানোর কষ্ট আমি জানি। অনেক কষ্ট। যে কষ্ট আমি পেয়েছিলাম ২৫ বছর আগে!

নাসরিনকে সাহস করে কল দিতে যাব। খুব ইতস্তত হচ্ছিল। তবুও দিলাম। কিন্তু কল রিসিভ হলো না। মেসেজ দিলাম। নাসরিন অনলাইনেও নেই। যোগাযোগের অলটারনেটিভ পথ খুঁজছি। এমন অবস্থায় খবর এলো ইশানার। এপোলোর ইমার্জেন্সিতে ভর্তি হয়েছে আমাদের আর্কিটেক্ট ইশানা। অবস্থা গুরুতর। করোনায় নয়; পেটে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে ছটফট করছে প্রতিভাময়ী মেয়েটা। 

করোনা আসলেই আমাদেরকে শেষ করে দিচ্ছে। তিলে তিলে শেষ করছে। যত না করোনা নিজে করছে, তার চেয়ে ঢের বেশি করছে করোনা সৃষ্ট মানসিক স্ট্রেস। করোনা সংশ্লিষ্ট হরেক পদের সত্যমিথ্যে গুজব, বিভিষিকাময় অনুমানীয় মরণাতঙ্ক, দীর্ঘদিনের লকডাউন, নিয়মিত বেতন না পাওয়া, চাকুরি থাকা না থাকা বিষয়গুলো মিলেমিশে মানুষের স্ট্রেস বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।

স্বাভাবিক সুস্থ মানুষও রেগুলার চেকআপে যেতে পারছে না। পর্যাপ্ত ঔষধ পাচ্ছে না। চিকিৎসা পাচ্ছে না। চিকিৎসার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। হাসপাতাল পাচ্ছে না, ডাক্তার পাচ্ছে না। এভাবে মানুষ অসহায় হচ্ছে আর অসুস্থ মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। চলেছে পরপারে যাত্রার হারও। এসব আর কত! আর তো মেনে নেয়া যায় না। এসব থেকে বের হওয়া দরকার। একটা বিহিত করা খুবই জরুরি। চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৮৯৬০৫৭৯৯৯
Email: simecnews@gmail.com