প্রকাশের সময় : 2021-11-03 12:50:02 | প্রকাশক : Administration

করোনা দিনের ডায়েরি...

২৯ তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

পাকা কাঁঠালের কোন কিছুই ফেলে দেবার মত না। না বিচি, না বাকল; সবকিছুই প্রাণিকুলের খাদ্য তালিকার অংশ। কাঁঠালের মিঠাগলা খায় মানুষে। বিচি চুষে খায়। শুধু গল্লা নয়, বিচিও খায়। আর বাকল খায় গরুতে। তবে গরু কচি কাঁঠাল খায় না। ওটা খায় মানুষে। কচি কাঁঠাল বা কাঁঠালের মুচি মানুষে ভর্তা করে খায়। মনে হলেও জিহ্বায় পানি আসে। পানি আসে কাঁঠালের বিচি ভর্তার কথাতেও। শুকনো মরিচপোড়া দিয়ে মাখা কাঁঠালবিচি ভর্তা সেই রকম মজা। কাঁঠালের বিচি মাটির চুলার আগুনে রেখে পুড়ে খাওয়ার মজাও অন্যরকম।

ছেলেবেলার বিকেলে মা যখন দুপুরের খাবারের পর একটু বিশ্রামের আশায় ঘুমিয়ে পড়তেন তখন চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকতাম। উঠোনের উল্টো পাশে থাকা মাটির চুলোর রান্না ঘরে ঢুকলে মা টের পেত না। একা ঢুকতাম না। পাশের বাড়ির রীনাদিকে নিয়ে বিড়াল পায়ে ঢুকতাম। চুলোর নিভুনিভু লাকড়ী পোড়া জ্বালে চুরি করা বিচি রেখে চমৎকার করে পুড়িয়ে দিতেন রীনাদি।

রীনাদি কেবল পুড়িয়ে দিতেন না; মায়ের হাতের মাইর কিংবা নিদেন বকুনী থেকেও রক্ষা করতেন। মা চাইতেন ওসব রেখে দেবেন। জমাবেন; যাতে করে একসাথে অনেকগুলো হলে তরকারীতে দেয়া যায়। তাই কাঁঠাল খাবার সময় গল্লাগুলো চুষেচুষে খেতাম আর সব সময় দেখতাম মা তাকিয়ে আছেন মুখের দিকে। চোষা শেষ হলেই বিচিগুলো মা আলাদা করে রাখতেন। আর শুকাতেন রৌদ্রের কিরণে চাটাই ফেলে।

এসব আমকাঁঠালের দিনের গল্প। এমনদিন আসলেই মায়ের সে সব কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মা বড় বাটি নিয়ে বসতেন। বাটিতে পাকাআমের চামড়া ছিলে গোলাতেন বেশ কয়েকটা। তারপর বাটিভর্তি করে গরম দুধ ঢেলে হাত দিয়ে মাখাতেন। ঘনদুধ আর আমের মিশ্রণে এক অদ্ভুত স্বাদের খাবার তৈরী হতো। আসন করে পাশে বসে সে সব দেখতাম আর অপেক্ষায় থাকতাম, স্বর্গীয় এমনই মজাদার খাবার মা কখন আমার মুখে তুলে দিবেন নিজ হাতে।

মা বেশি খাওয়াতেন দুধের সর। নিজগোয়ালের গরুর দুধের সর। রোজ সন্ধ্যায় খাওয়াতেন। সারা বিকেলের জ্বাল দিয়ে ঘন করা দুধের ভারী সর তুলে রাখতেন চায়ের কাপে। শুধু আমার জন্যেই রাখতেন! খেলাশেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলে ইশারায় চুপিচুপি রান্নাঘরে ডেকে নিয়ে মুখে তুলে দিতেন। আমি খেতাম; মা দেখতেন। খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত দেখতেন। গভীর মমতাভরা চোখে দেখতেন।

মমতাময়ী সেই মা আজ নেই! শ্রাবণমেঘের রাতের মধ্য প্রহর। ১৯ জুলাই শুরু। গেল তিনদিন ধরে মা আমার আইসিইউ এর লাইফ সাপোর্টে। ফুসফুস পুরোপুরি ফেইল করেছে। ডাক্তারের মুখে বিষাদের চিহ্ন। মা গুরুতর অসুস্থ হবার ৩২ মাস পরে এই প্রথম অনুভব করলাম, ক্ষমতার সীমানায় পৌঁছে গেছি আমি। এই প্রথম ক্লান্ত হলাম। ক্লান্ত দেহে অবচেতন মনে হাসপাতাল থেকে ফিরে বাসার ডাইনিং এ কেবল বসেছি। বেলে মাছের ভাজি নিয়ে বসেছি। মুখে এক লোকমা ভাত দিতে যাবো। অমনি আইসিইউ থেকেই ফোন। ভাতের লোকমা আর মুখে পুরতে পারিনি। দৌঁড়ে গেলাম।

ডাক্তারের মুখ দেখেই বুঝলাম সব শেষ। আইসিইউ বেড এ মুখে লাইফ সাপোর্টের নলপড়া মা আমার নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। চির শান্তি আর চিরনিদ্রার দাঁড়প্রান্তে! আমি বললেই নল খুলে নেবেন ডাক্তার। এ কি করে সম্ভব! মায়ের শ্বাস চিরতরে থামিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত দেবো আমি! আমার সিদ্ধান্তে মায়ের চিরবিদায় হবে! বাঁধভাঙা অশ্রু চোখে মায়ের মাথায় কম্পিতহাত বুলিয়ে ক্ষমা চাইলাম। জীবনের সকল ভুলের ক্ষমা। কপালে ঠোঁট ভিজিয়ে চুমু খেলাম। জীবিত মাকে দেয়া জীবনের শেষ চুমু!

মৃত্যুকে খুব ভয় পেতেন মা আমার। কোনভাবেই মায়াভরা দুনিয়াটা ছেড়ে যেতে চাইতেন না। আমাকেও না। চাইতেন আমার গায়ের সাথে গা লাগিয়ে থেকে যাবেন অবিনশ্বর এই পৃথিবীতে। অনন্তকাল থেকে যাবেন। আমাকে হাতছাড়া করবেন না কিছুতেই। সামান্য অজুহাতেও না। এসব করতেন তাঁর মধ্য বয়স হবার পর থেকে। বয়স যতই বাড়তো, ততই আমার উপর নির্ভরশীলতার মাত্রা বাড়াতো।

বাড়তো ঘাবড়ে যাবার মাত্রাও। ছেলেবেলায় একবার খুব করে ঘাবড়ে যেতে দেখেছি। দেশে ঝিনঝিনা রোগ এসেছে। মানুষ মারা রোগ। পায়ের নখ দিয়ে ঝিনঝিনা জীবাণু ঢোকে ১০ মিনিটের মাঝে সুস্থ মানুষ মেরে ফেলে। মহা ঘাবড়ানোর বিষয়। আতঙ্কগ্রস্ত মা আমাকে কিছুতেই বাইরে বের হতে দেবেন না। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। আজকের করোনা কালে বেঁচে থাকলে কি করতেন কে জানে।

করোনার আতঙ্ক আজ সারাবিশ্বকে গ্রাস করেছে। স্তব্দ করে দিয়েছে মানুষের জীবন। থামিয়ে দিয়েছে সবকিছু। চারিদিকে শুধু টেনশান আর টেনশান। তবে দিন বদলাচ্ছে; টেনশানে ভাটার টান পড়েছে। আশা জাগছে। সুস্থ হবার আশা। দেশে করোনার সংক্রমণে বাড়ছে সুস্থতার হার। সুস্থতার ক্ষেত্রে স্বস্তিদায়ক ভরসা তৈরি হয়েছে। ভয় দূর হচ্ছে মানুষের। আতঙ্ক অনেকটাই কমে গেছে।

হয়ত আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি; নয়ত ভাইরাসের ধরণটিও দুর্বল। কারণ যাই হোক, আজকাল বেশির ভাগের উপসর্গও বেশিদিন থাকছে না। মৃত্যু কম হচ্ছে। মনে হচ্ছে, জুনেই যৌবন হারিয়েছে করোনা। কিছুদিন আগেও করোনার নমুনা পরীক্ষার জন্য হাসপাতালগুলোতে দেখা যেত দীর্ঘ লাইন। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে।

সাথে বদলে গেছে অস্বস্তিতে থাকার চিত্রও। প্রতিদিন সুস্থতার হার বাড়া ও মৃত্যুর সংখ্যা কম থাকা স্বস্তির খবর তো বটেই। কিছুদিন ধরেই আক্রান্তের হার প্রায় একই রকম। এভাবে চলতে থাকলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, চলতি মাসের শেষ দিকে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসবে। আগষ্ট হবে টেনশান আরো কমে যাবার মাস। 

হবারই কথা। সংগত কারণেই বাঙালী জাতির টেনশান করা মানায় না। যে জাতি অন্যের মুখে চোষা কাঁঠালের বিচি ভর্তা করে খায়, সে জাতির করোনা নিয়ে টেনশান করা আসলেই মানায় না। আজ পর্যন্ত করোনা অনেক দেশেই তান্ডব চালাতে পারলেও বাংলাদেশে পারেনি। আর পারবে বলেও মনে হয় না। পারার মত মুরোদ অন্তত বাংলাদেশী করোনার নেই। চলবে.

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com