প্রকাশের সময় : 2021-12-29 11:07:55 | প্রকাশক : Administration

করোনা দিনের ডায়েরি...

৩৩ তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

তেদররা দেশেও দমে না, বিদেশেও না। তেদর তো তেদরই। তেদর সব জায়গায়ই বিদ্যমান। ছোট তেদর, বড় তেদর। হরেক রকমের ধরণ আছে বাংলাদেশী তেদরদের। এই প্রবাসেও এদের তেদরামী দেখতে দেখতে ক্লান্ত আমরা। রেস্টুরেন্টের চায়ের আড্ডায় চুপচাপ বসে বসে নিশ্চিন্ত মনে এককাপ চা খাবার জো নেই। পাশের টেবিল থেকে তেদরদের তেদরামীর আওয়াজ;

- কী অবস্থা কন দেহি!

- অবস্থা তো বেগতিক। হা হা হা।

- এতো ভেটকান ক্যা?

- ভেটকামু না, তয় কানমু মুই? মুই কি মাদার অফ করোনার দেশে থাহি? কান্দে মাদারের দেশের মাইনসে, বেডা!

- কনটন কি!

- আর কমু লোমা! দেশ আর দেশ আছে বেডা! মইরা ছাফা হইয়া যাইতে আছে। খালি লাশ আর লাশ। হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, বাড়ীঘর। খালি লাশের পাহাড়। লাখ লাখ লোক মইরা ভেটকাইয়া পড়তাছে। আর মাদারে কয়, করোনা সামাল দেতে আছে ভালভাবে। হোগার ভালো।

- অবিশ্বাস্য। বেমাক অবিশ্বাস্য। লোমার পো লোমারা একছেড় মিত্যা কয়। অবিশ্বাস্য মিত্যা।

ওদের অবিশ্বাস্য মিথ্যা আর আমার অবিশ্বাস্য ভাবনার সাথে কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে। দু’দিন হলো আমার ভেতরেও একটা অবিশ্বাস্য ভাবনা কাজ করছে। পুরো ব্যাপারটাই অবিশ্বাস্য! যখনই ভাবি, তখনই অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার প্রবাসী বন্দি জীবনের ৭ মাস হয় হয় করছে! এটা রিয়েলী অবিশ্বাস্য। যেদিন প্রবাসে আসি, সেদিন কি জানতাম এত্তদিন থাকতে হবে! জানতাম না! সাধারণত আমি টানা দেড়মাসের বেশি প্রবাসে থাকি না। এই নিয়ম চলে আসছে গেল ২১ বছর ধরে। এবার ব্যতিক্রম হলো। করোনার কারণেই ব্যতিক্রম হলো। টানা প্রায় সাত মাস সময় ধরে পড়ে থাকতে হলো প্রবাস বিভূঁইয়ে।

এটাকে প্রবাস বলে না। বলে, কারাগার। বিশাল আকাশের নীচে থাকা আধামুক্ত কারাগার। এমনই কারাগারে বন্দিত্ব হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছি। প্রথম ৩ মাস তো ঘরের ভেতর থেকেই বের হতে পারিনি। আটতলায় শোনিমের ছোট্ট বাসা থেকে লিফটে নীচতলায় নেমেছিলাম মোট দুইবার। তাও ক্ষণিকের জন্যে। এরপর এক আধটু বের হচ্ছি বটে। সেটাও খুবই শৃঙ্খলিত। খুব দূরে কোথায়ও যাই না। আশেপাশেই থাকি। সাবধানে থাকি। ঘর থেকে ঢুকতে বেরুতে হাতে স্যানিটাইজার মাখি। আর মুখে পড়ি মাস্ক।

দেখতে অদ্ভুত লাগে। মাস্ক পরায় নিজেকেই নিজের চিনতে সমস্যা হয়। আয়নার সামনে দাঁড়ালে চিনতেই পারিনা। চিনতে সমস্যা হয়। সমস্যা হয় প্রবাসের কয়েদী জীবন মানতেও। তবে খুব একটা খারাপও যাচ্ছিল না জীবন। সয়ে গিয়েছিল। সবকিছুর সাথে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছিলাম। আর করোনাও কমতে কমতে একেবারের নাই হবার পথে ছিল। ভেবেছিলাম এভাবে চললে দুসপ্তাহও লাগবে না শুণ্যের কাছাকাছি নামতে। কিন্তু বিধি বাম।

গেল দুই সপ্তাহ ধরে ঘটনা মোচর দিয়েছে। ইউটার্ন নিচ্ছে বলে মনে হয়। মানে, আবার বাড়তে শুরু করেছে। হুহু করে বাড়ছে। আক্রান্তের সংখ্যা টু ডিজিট থেকে ইতিমধ্যেই থ্রি ডিজিটে উঠে এসেছে। অগ্রিম কিছুই বলা যাচ্ছে না। করোনা নিয়ে অগ্রিম আজো কেউ কিছু বলতে পারেনি। এই কমে, এই বাড়ে। হয়ত শীত নামছে বলেই এখন আবার করোনা বাড়ছে। করোনা তো ফ্লু। আর ফ্লু সাধারণত শীতের সময়ই ডানাপানা মেলে। সামনে শীত অনেক বাড়বে। মাইনাস বিশ এ নেমে যাবে। হয়ত তাল মিলিয়ে করোনায় আক্রান্ত রুগীর সংখ্যাও বাড়বে তখন।

এসবে বড় বেকায়দায় আছি। কায়দায় থাকার শত চেষ্টার পরও বেকায়দায় আছি। একটা কঠিন সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে পড়েছি। বুঝে উঠতে পারছি না কী করবো। বা, কী করা উচিত। মন আমার আনচান করছে। একবার ডান, একবার বাম দিক করছে। সবকিছু খুব জটিল মনে হচ্ছে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটাই নিতে পারছি না। না পারছি এসবের মাঝে আমার শোনিমকে রেখে একা দেশে ফিরতে; না পারছি দেশের সবকিছু ফেলে প্রবাসের অনিশ্চিত কারাগারে থিতু হয়ে বসতে।

কারাগার তো কারাগারই। কারাগারে কি আসলেই থিতু হয়ে থাকা যায়! পরাধীনতার বেড়াজালে সারাক্ষণ আবদ্ধতা আর কত ভাল লাগে! নিকটজন তথা আপনজনদের থেকে দূরে বহুদূর। খুব কাছেরজনকেও এখন দেখতে পারি না, ছুঁতে পারি না অনেক অনেক দিন ধরে। পরিচিত মুখগুলো কেবলই ভিডিও কলের ফটোফ্রেমে বন্দি। মন চাইলে দেখা যায়। তবে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের মনিটরে। অনেকটা গালিভারের লিলিপুটের মত। মনিটরে ছোট্ট ছোট্ট মাথা বের করে ছোট্ট ছোট্ট চোখগুলো পিটপিট করে সবার। বড় অস্থির লাগে সে সব দেখতে।

অস্থিরতা প্রথমে জন্ম নেয় মনে। মন বড় বিটলা জিনিস। সবার আগে রিয়্যাক্ট করে। অস্থির হয়ে ওঠে মন। এবং আস্তে আস্তে পুরো দেহকে অস্থির করে দেয়। মানে, আস্তে আস্তে পুরো দেহে ছড়ায়। করোনার চেয়েও ভয়াবহ রকমের তড়িৎ গতিতে ছড়ায়। এবং পুরো দেহমনকে সাংঘাতিক অশান্ত করে। তবে আজ এর ব্যত্যয় ঘটেছে। অশান্ত হয়নি। কেন যেন মন আজ বড় শান্ত। তাই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে মন আমার।   

সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর কারাগারে নয়। মরি আর বাঁচি; এবার কারাগার ছাড়বো। উড়াল দেবো। পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে সাতসমুদ্র পাড়ি দেবো। আর থাকবো না এ দেশে; এবার ফিরবো। সব সিদ্ধান্তহীনতা ঝেড়ে, অস্থিরতা ফেলে আমার শোনিমকে নিয়েই ফিরবো। পলাশ ঢাকা, কোকিল ডাকা চিরচেনা আমাদের সেই দেশে! বড় শান্তিসুখের দেশ! ধানের মাঠে ঢেউ খেলানো অপরূপ রূপের সেই দেশ!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৮৯৬০৫৭৯৯৯
Email: simecnews@gmail.com