প্রকাশের সময় : 2022-01-26 11:18:34 | প্রকাশক : Administration

সবাই ব্যস্ত ভিআইপির সেবায়

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

খুবই প্রচলিত একটি বচন; রথ দেখা ও কলা বেচা। মানে মেলা দেখতে যেয়ে মেলাও দেখা, আবার দেখতে দেখতে বিক্রির জন্যে সাথে থাকা কলাও বিক্রি করে ফেলা। অর্থাৎ এক কাজে দুটো কাজ একসঙ্গে করা। ডিসেম্বরের শেষদিকে ঠিক তেমনটিই হলো। ঠিক হয়েছে, শোনিমের স্কুল ছুটিতে কক্সবাজার যাবো। ভাবলাম, যাবোই যখন, কিছু অফিসিয়াল কাজও করে আসবো। সমুদ্র দেখতে দেখতে সমুদ্র পাড়ের মেগা প্রজেক্টের কাজও দেখে আসবো।

যেই ভাবা সেই কাজ। দেরি না করে মুহূর্তেই টিকিট এবং হোটেল বুকিং করে ফেললাম। কিন্তু বিড়ম্বনার শুরু এর পরপরই। খবর পেয়ে কাছে দূরের দু’চারজন শুভাকাঙ্খী যোগাযোগ শুরু করলো। আমাদের যাত্রাকে অধিকতর আরাম এবং স্বস্তিদায়ক করার জন্যে তারা গায়ে পড়ে বাড়িয়ে দিল সহযোগীতার হাত। তাদের প্রত্যেকেরই জানাশোনা কেউ না কেউ আছে বিমানবন্দরে। এদের একজনকে ধরিয়ে দিলেই কেল্লাখতম। আমার মত অতি সাধারণ মানুষও অসাধারণ ভিআইপি হয়ে যাবে। আর পেতে থাকবে সেবা। ভিআইপি সেবা।

অস্বীকার করবো না, মিথ্যেও বলবো না। জীবনে কয়েকবার এমন সেবা নিয়েছি। লোভ সামলাতে পারিনি বলেই নিয়েছি। তবে যত না সেবা পেয়েছি, বিব্রত হয়েছি তারচেয়ে ঢের বেশি। সেই সব চেনাজানা লোকজন যেভাবে মন্ত্রী মর্যাদায় আপ্যায়ন দিয়েছে আর বাকী সব লোকজনকে অসহায়ের মত দাঁড় করিয়ে রেখেছে, তা সত্যি বিব্রতকর। অসহায় মানুষগুলো ফ্যালফ্যাল করে আমায় দেখেছে আর আমি স্টুপিডের মত আমার সামাজিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি। লাইন ভেঙে সবাইকে ডিঙিয়ে যেভাবে তথাকথিত সেবা নিয়েছি, তা সভ্যতা এবং ভব্যতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

তাই ওইমুখো আর হইনি। এবারো হইনি। হবো কোন যুক্তিতে! কাকপক্ষীর যেমনি ময়ুরপঙ্খী সাজা মানায় না, অনেকটা তেমনি আমাকেও ভিআইপি সুবিধে নেয়া মানায় না। ভাবতেও মানায় না, দেখতেও না। যে সুবিধা সাধারণ মানুষের সুবিধা হরণ করে অসুবিধা সৃষ্টি করে; তা নেয়ার আগে দশবার ভাবা উচিত। এ কারণেই কাছে দূরের সবার সহযোগীতার হাতকে কোন রকমে পাশ কাটিয়ে পোটলাপাটলী গুছিয়ে রওনা দিয়েছি।

ঢাকা অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর টার্মিনালে ঢোকার সময়ই দুটো গেইট। লাগেজ, মালামাল এবং দেহতল্লাশীর জন্যে স্ক্যানার সমৃদ্ধ গেইট দুটোতে নিরাপত্তা সংস্থার লোকজনসহ সবাই দাঁড়িয়ে আছে। গেইট দুটোর একটা আমজনতার আর বাকীটা ভিআইপিদের জন্যে নির্ধারিত। মোট যাত্রী সংখ্যার ১০ শতাংশও যদি ভিআইপি হয়, তাহলে এই দাঁড়ায় যে শুধু তাদের জন্যেই একটা গেইট। আর বাকী ৯০ শতাংশ যাত্রীর জন্যেও মোটে একটা গেইট। হায়রে ভিআইপি!

ভিআইপি বিধান মেনেই সাধারণের লাইনে দাঁড়িয়েছি। ভীড় মোটামুটি মন্দ না। লক্ষ্য করছিলাম ভিআইপি গেইট দিয়ে ঢোকে কারা। মূলত প্রশাসনের লোকজনের জন্যে এই ভিআইপি গেইট। তারাই ভিআইপি। তাদেরকে বাড়তি সুবিধা দেয়ার নিমিত্তেই এই আয়োজন। তারা যেন কোনভাবেই কোথায়ও বিড়ম্বনার স্বীকার না হয় কিংবা সকল সুবিধা শুধু তাদের জন্যে যেন সহজ লভ্য হয়। কী চমৎকার আয়োজন! দায়িত্ব যাদের আমজনতার সুবিধা অসুবিধা দেখা, তারা নিজেরাই আমজনতার অসুবিধা সৃষ্টি করে নিজেদের যাবতীয় সুবিধার সুব্যবস্থা করে রেখেছেন।

কেবল তারা নয়। যাবতীয় সুবিধা পাচ্ছে তাদের পরিবার পরিজন কিংবা আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব জনও। যত না তারা নিজেরা সুবিধে নেন, তার চেয়ে ঢের বেশি নেয় তাদের পরিবার পরিজনেরা কিংবা চেনাজানারা। ভাবতে অবাক লাগে, সাধারণের জন্যে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার লোকজন কিছু তথাকথিত অসাধারণ লোকজনের সেবায় সদা সর্বত্র ব্যস্ত। সাধারণের সুবিধে অসুবিধে দেখার একটুও সময় নেই তাদের। আছে অবজ্ঞা করার তুমুল আগ্রহ।

আর আছে কথায় কথায় ছ্যানছেনানি। এবং ধমক। কথা শুনলেই মনে হয় তারা খিটখিটে মেজাজে ধমক দেয়ার জন্যেই বসে আছেন। সব সময়ই তাদের মেজাজ চড়া। ব্যাপারটা এমন যেন, তারা বসেই আছেন সাধারণকে অসহযোগীতা করে ভোগান্তিতে ফেলার জন্যে। সাধারণের কাজ করে দেয়ার জন্যে নয়। সাধারণ যাত্রী সকল অসহায়ের মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, আর তারা তটস্থ হয়ে দৌঁড়াচ্ছেন বিশেষ শ্রেণীর সামান্য কিছু মানুষকে সেবা দেয়ার কাজে। একটা রাষ্ট্রের জন্যে এর চেয়ে লজ্জার এবং বাজে কোন উদাহরণ আর হতে পারে না।

তারা ভিআইপি সেবার নামে নির্লজ্জের মত তথাকথিত ভিআইপিদের ফ্লাইট চেকইন   করান, তাদের হয়ে লাইনে দাঁড়ান। এমনকি লাগেজও টানেন। সংস্থার ট্যাগ কিংবা বাহিনীর ড্রেস গায়ে চড়িয়ে ঢেগঢেগ করে ট্রলি বয়ে চলতে তাদের একটু গায়েও লাগে না; ইগোতেও না। এমনি করে তারা যে নিজেরা ডুবছেন আর সাথে ডোবাচ্ছেন পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে, তা তাদের শেখাবে কে? আবার শেখালেও কেউ শিখবে বলেও মনে হয় না।

এয়ারপোর্টের টুকিটাকি ফরমালিটিজ সারতে সারতে ফ্লাইট ছাড়ার ডাক পড়েছে। একেবারে সঠিক সময়ে ডাক। সিট ভাগাভাগি করে এয়ারক্রাফটে গিয়ে বসেছি আমরা। বাইরের হালকা রৌদ্র ভিতরে বসে দেখতে খারাপ লাগছে না। আমাদের সিট পড়েছে ক্রাফটের ঠিক মাঝামাঝিতে। আমার ঠিক সামনের সিটে পরিবার নিয়ে বসেছেন পরিপাটি পোশাকের মাঝ বয়সী একজন। তিনি বসতে না বসতেই হুরোহুরি লেগে গেল। ফ্লাইটে থাকা দুজন এটেন্ডেন্ট দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু করে দিলেন।

তাদের সব দৌঁড়াদৌঁড়ির গন্তব্য বিশেষ এই ভদ্রলোক এবং তার পরিবার পরিজন। কী যে কেয়ারিং শুরু করলো ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট দুজন! ঠিক পেছনের সিটে বসার কারণে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তথাকথিত ভিআইপি সার্ভিসের। সুযোগ হয়েছিল তাদের সকল কথোপকথনের; স্যার, সিটটা ঠিক আছে তো? কোন সমস্যা নেই তো? এসির বাতাস কি ঠিক আছে? একটু কী বেশি শীত শীত লাগছে। এসি কি একটু কমিয়ে দেবো? একটু ড্রিংক্স দেই স্যার!

বিজনেস ক্লাস হলেও কথা ছিল। ভিআইপিরা ইকোনমির সিট নিয়ে বসেছেন। সংখ্যায় ৬ জন তারা। কথোপকথনে বুঝলাম, মূল ব্যক্তিটি বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের কোন এক পাইলটের বন্ধু। থাকেন বিদেশে। বিদেশ থেকে দলবল নিয়ে দেশ দেখতে এসেছেন। আর তাকে ভিআইপি সেবা দিচ্ছেন পাইলট মহোদয়। তার কল্যাণে সবাই ভিআইপি ট্রিট পাচ্ছে। দেখে বোঝার উপায় ছিল না, বিমানখানা সরকারি নাকি তার বাবার সম্পত্তি। নির্লজ্জের মত সব যাত্রীকে একপাশে ঠেলে শুধু পাইলটের বন্ধুকে ভিআইপি সার্ভিস দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো বিমান সংস্থা।

মধ্য আকাশে ফ্লাইট। পেট চো চো শুরু করেছে। দুপুরের ফ্লাইট হলে সব সময় যা হয়। বাসা থেকে বেরোতে হয় সকাল সকাল। এরপর আর খাওয়ার সুযোগ হয় না। ফ্লাইট ধরার ঝক্কি ঝামেলায় খাবারের কথা মনেও থাকে না। অবশেষে সব ফরমালিটিজ শেষে যেই না সিটে বসেছি অমনি পেটে চো চো শুরু হলো। কিন্তু উপায় নেই। করোনায় এক বোতল পানি ছাড়া কিচ্ছু পাবার উপায় নেই।

উপায়হীন পরিবেশে অসহায়ের মত আমি। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। চোখ গিয়ে পড়লো তরতাজা স্লাইস কেকের উপর। সামনের আসনে থাকা ভদ্রলোকদের স্লাইস কেক দেয়া শুরু হয়েছে। শুধু তাই না। সাথে কমলার জুসও। সদ্য ফ্রিজ থেকে বের করা জুস। শুকনো পিপাসিত গলায় ওসব দেখে আমি নড়েচড়ে বসলাম। পাশে থাকা সফর সঙ্গি ডঃ সঞ্জীবকে ইশারায় বললাম, আল্লাহ কবুল করেছেন। করোনা কমায় বোধ হয় নিয়ম বদলেছে। ফ্লাইটে খাবার দিচ্ছে। খুশিতে আল্লাহপাকের সমীপে শুকরিয়া পেশ করলাম।

কিন্তু আমার সমীপে ওরা আর কেক পেশ করলো না। অন্যদিকে ভিআইপিরা বেশ আছে। বেশ করে কেশ দুলিয়ে হাতের খাবার শেষ করছে। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছি আমি। শুকনো গলায় বারবার ঢোক গেলার চেষ্টা করছি। পরিস্থিতি আশাপ্রদ মনে হলো না। ইতিমধ্যে ওদেরকে পানির বোতলও দেয়া শুরু হয়েছে। পানির বোতল আমাকেও দিল। কোন রকম আমার সিটের সামনের বাস্কেটে ছোট্ট বোতলখানা রেখে ভোঁ করে চলে গেল।

যেন পানি নয়; করোনার ত্রাণ। আমি দয়ার দান এই ত্রাণ নিয়ে নাড়াচাড়া করছি আর দেখছি। ছোট্ট বোতল; তিন চুমুকেই শেষ হয়ে যাবে। তারপরও শুরু করছি না। বোতলের ছিপিটি খুলে চুমুক দিবো কি না ভাবছি। সামনের সিটে বসা ভিআইপিরা তখনও চুমুক দিয়ে কমলার জুস খেয়ে যাচ্ছেন! চুকচুক করে খাচ্ছেন!! বড় তৃপ্তির সাথে খাচ্ছেন!!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com