কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর

প্রকাশের সময় : 2022-03-23 09:55:17 | প্রকাশক : Administration
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর

তাপিতা খানম: ভারতীয় সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের জন্ম ১৯২৯ সালে ভারতের ইন্দোরে এক মারাঠি পরিবারে। বাবার হাত ধরে অভিনয় ও গানের জগতে এলেও মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বাবাকে হারান তিনি। ১৯৪২ সালে একটি মারাঠি ছবির গান রেকর্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু। এরপর আর পেছন ফিরতে হয়নি তাঁকে। মুম্বাই যাওয়ার পর ১৯৪৮ সালে ‘মজবুর’নামের একটি হিন্দি ছবিতে প্রথম কণ্ঠ দেন তিনি।

১৯৭৪ সালে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করার নিরিখে ‘গিনেস বুক’-এ নাম উঠেছিল লতা মঙ্গেশকরের। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করার অনন্য নজির গড়েন প্রায় ৩৬টি ভাষায় গান করা এ শিল্পী। ২০০১ সালে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৯ সালে পান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।

মৃত্যুর সামনে তিনি দাঁড়াতে পারতেন না। মায়ের মৃত্যুর দিনেও মায়ের পা জড়িয়ে ছিলেন। মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারেননি। ডাক্তারের কড়া নির্দেশ ছিল কোনও মৃতদেহের সামনে যেন তিনি না যান। তবুও গিয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর কিশোর কুমারের মৃত্যু সংবাদ শুনে তাঁর বাড়িতে। তারপর প্রেশার তিনশো বাই একশো। অত্যন্ত স্পর্শকাতর মন। সরস্বতীর আলো! মৃত্যুকে সহ্য হবে কেন তাঁর? নাহ্, শুধুই সরস্বতী নয়।

লতাকে প্রথম হেমা বলে ডাকা হত। আগের নাম হেমা থাকলেও, বাবার ‘ভাব বন্ধন’নাটকের ‘লতিকা’র চরিত্রে প্রভাবিত হয়ে হেমার নাম বদল করে রাখা হয় লতা। যে নাম পরে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। ভারতরতœ সম্মানে ভূষিত একমাত্র মানুষ তিনি, জীবিত অবস্থায় যাঁর নামে পুরস্কার দেওয়া হত। মুম্বাইয়ের পেডার রোডের বাড়িতে, তিনটে ল্যান্ডলাইনের উপর ভিত্তি করেই বিশ্বসাথে যোগ রেখে গেছেন তিনি। ভারতের সুর সম্রাজ্ঞী!

কাজটাকেই নিজের ধ্যানজ্ঞান রেখেছিলেন। যে কাজ গান গাওয়া। তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ‘মহল’-এর ‘আয়েগা আনেওয়ালার’ও তো সত্তর বছর পেরিয়ে গেল। গানের বাইরে কোনও কিছুতে জড়াননি তিনি। ছোটবেলা থেকেই জীবনযুদ্ধ। অর্থের তাগিদেই ছবিতে অভিনয় করতে হয়েছিল। ‘ফিল্মে অভিনয় তেরো বছর বয়সে। ওই মেকআপ, আলো, লোকজন, গ্ল্যামার একদম ভাল লাগতো না তাঁর! জীবনে প্রথম যখন বাবার সঙ্গে মঞ্চে উঠেছিলেন তখন বয়স মাত্র নয়। বার বার বলেছেন, ‘বহুত তকলিফ উঠায়ি হ্যয় ম্যয়নে।’

পরে জীবনের মধ্যগগনে অবশ্য বুঝেছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্ট্রাগল তাঁকে লতা মঙ্গেশকর তৈরি করেছে। মাটি থেকে উঠে আসা আর মাটির সঙ্গে লেগে থাকা তারারাই সত্যিকারের আর্টিস্ট বলে মনে করতেন তিনি। তাঁর কাছে যেমন ছিল সচিন টেন্ডুলকর বা অমিতাভ বচ্চন। আকাশ ছুঁয়েও যাঁরা মাটির কাছে থাকেন। বাবার নাটক লেখা, বাড়িতে গানের ক্লাস, লোকজন এই সব দেখতে দেখতে তৈরি হয়েছেন লতা। প্রথম দিন স্কুলে গিয়েই অন্য বাচ্চাদের গান শিখিয়েছিলেন। সেই কারণে শিক্ষকের কাছে বকা খাওয়ায়, পরের দিন থেকে স্কুল যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি।

বাবাই ছিলেন পরিবারের বটবৃক্ষ। হঠাৎ সেই বাবা চলে গেলেন। লতা মাত্র তেরো। আছে আশা, ঊষা, মিনা আর হৃদয়নাথ। পুরো পরিবারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। পয়সাও সংসারে দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ল। কাজে মনপ্রাণ বসিয়ে দিলেন লতা। নাহ্, শোক আগলে বসে থাকেননি। মাঠে নামলেন লড়াই করতে। সাহায্য পেলেন বিনায়ক দামোদর কর্নাটকির, যিনি ছিলেন ‘নবযুগ চিত্রপট’ফিল্ম কোম্পানির মালিক।

১৯৪২-এ মারাঠি ছবি ‘কিতী হসাল’-এ প্রথম গান রেকর্ড করেন লতা। ১৯৪৫-এ ‘নবযুগ চিত্রপট’মুম্বাই পাড়ি দেয়। লতাজির প্রথম উপার্জন ছিল ২৫ টাকা। প্রথম বার মঞ্চে গাওয়ার জন্য লতা ওই ২৫ টাকা পান। এ বার লতা আসছেন আরব সাগরের পাড়ে তাঁর সুরের আসন নিয়ে। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শিখতে আরম্ভ করেন উস্তাদ আমন আলি খানের কাছে। বিনায়কের মৃত্যুর পর গুলাম হায়দার লতার দায়িত্ব নেন।

হায়দারের ‘মজবুর’ছবিতে ১৯৪৮-এ গান রেকর্ড করেন লতা। এর পর আরও সুযোগ এলেও, তখনও সঙ্গে ছিল সমালোচনা। বলা হত নুরজাহানকে নকল করেন লতা। দিলীপ কুমার লতার উর্দু অ্যাকসেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন! লতা জানতেন সমালোচনা শুনতে। উর্দু শিখতে আরম্ভ করেন তিনি। অবশেষে ১৯৪৯-এ হিট হয় ‘আয়েগা আনেওয়ালা’। সেখান থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

অনিল বিশ্বাস থেকে শচীন দেববর্মণ, খৈয়াম, নৌসদ, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কল্যাণজি-আনন্দজি, রামচন্দ্রমের মতো অগুনিত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন লতা। তাঁর কণ্ঠ মাধুরীর নেশা ছড়াতে থাকে দেশময়, বিশ্বময়। শুধু হিন্দি ছবির গান নয়। গীত-গজল-ভজন-‘অ্যায় মেরে ওয়াতেন কে লোগো’-র মতো দেশাত্মবোধক গানে ভারতকে মনখারাপে ভিজিয়ে রাখেন তিনি।

ষাটের দশকে লক্ষীকান্ত প্যারেলালের ঘরানায় লতার সুরবিহার দেশ রাগ কালকে ছাপিয়ে নিজস্ব ঘরানা তৈরি করে। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সাতশো গান রেকর্ড করেন লক্ষীকান্ত প্যারেলালের সঙ্গে। শোনা যায় লতাকে বিষ দিয়ে মারার চেষ্টাও হয়েছিল। তিন মাস অসুস্থ ছিলেন তিনি। তাঁর গলার রোমান্টিকতা আজও ভারতীয় রোম্যান্সের শেষ কথা।

বাংলা ছিল তাঁর ভালবাসার জায়গা। কিশোরকুমার আর হেমন্তদা ছিলেন তাঁর রাখি ভাইয়া। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে যাবতীয় গসিপ উড়িয়ে দিয়েছিলেন সুর সম্রাজ্ঞী। হেমন্ত কন্যা রাণুকে নিজের হাতে সাধ খাইয়েছিলেন। বাংলায় বিবেকানন্দকে নিয়ে গান রেকর্ড করার প্রবল ইচ্ছে ছিল তাঁর। সরস্বতীর ইচ্ছেও বুঝি আটকে রাখে সময়! তা হলে কি পরজন্ম?

পেয়েছেন অসংখ্য স্বীকৃতি, এসেছে অসংখ্য পুরষ্কার ও উপাধি। পঞ্চাশের দশকেই গান করে ফেললেন নামিদামি সব সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে। পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে লতা গাইলেন ‘জিয়া বেকারার হ্যায়’, এই গান উতলা করে দিয়েছিলো শ্রোতামন। ১৯৫৫ সালে ‘মন দোলে মেরা তন দোলে’দুলিয়েছিলো কোটি শ্রোতার হৃদয়। ৫৭-তে ‘আজারে পরদেশি’ গেয়ে যেন ডাক দিলেন দুনিয়ার সংগীত রসিকদের।

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com