সমৃদ্ধশালী দেশের শক্তি তাদের মাতৃভাষা চর্চা

প্রকাশের সময় : 2022-03-23 09:57:02 | প্রকাশক : Administration
সমৃদ্ধশালী দেশের শক্তি তাদের মাতৃভাষা চর্চা

শারফিন শাহ: মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রথম কাব্য লিখলেন ইংরেজিতে। কিন্তু এক সময় দেখলেন তার মাথা থেকে আর ইংরেজি আসছে না। তিনি বাধ্য হয়ে ফিরে এলেন বাংলায়। উচ্চারণ করলেন কেলিনু শৈবালে ভুলি কমল কানন।’ ভালোবাসার ইংরেজি ভাষা তাঁর কাছে হয়ে গেলো শৈবাল আর বাংলা কমল কানন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত প্রথম আধুনিক বাঙালি। লিখলেন ইংরেজিতে প্রথম উপন্যাস Rajmohan’s wife, এই উপন্যাস যেন ইংরেজরা পড়ে তার প্রশংসা করে। কিন্তু তার কপালে জুটলো কলঙ্কের কালি। ইংরেজরা এই উপন্যাস পড়ে হাসতে লাগলেন, কারণ তাদের মতে, এর লাইনে লাইনে ভুল ইংরেজি। বঙ্কিম বাধ্য হয়ে ফিরলেন বাংলায়।

তারপরের ইতিহাস তো সবাই জানি। এই দুই লেখকের অবস্থা দেখেই মনে হয় পরবর্তী সময় রবীন্দ্রনাথ বাংলায় লিখেছেন। ইংরেজি শিখেছেন শেষের বেলায়। নজরুল উর্দু আর ফার্সির পণ্ডিত হয়েও লিখেছেন বাংলায়। সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা ভাষাকে। পরে তো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়।

আমাদের দেশে সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা ভাষার প্রাণ প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মোহাম্মদ রফিক, আবুল মাল আবদুল মুহিত, গোলাম মুরশিদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শাহাদুজ্জামান তারা ভালো ইংরেজি জানেন, কিন্তু লিখছেন বাংলায়। বর্তমানে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ইংরেজি জানেন যিনি তাঁর নাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার। অথচ তিনি লিখছেন বাংলায়। তিনি বক্তৃতায় কোনো ইংরেজি শব্দ বলেন না।

যে বাংলার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা এতো সংগ্রাম করেছেন সেই বাংলায় আমরা খুব বেশি একটা সমৃদ্ধ হয়েছি বলে মনে হয় না। কিছুদিন পূর্বে বাংলা ভাষার একজন স্বনামধন্য লেখকের বাসায় কলিং বেল টিপলাম। দরজা খোলামাত্রই হাঁটুর সমান বয়সী এক বাচ্চা মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো Who are you? আমি বুঝলাম ভালোই চলছে লেখকের বাড়িতে বাংলা চর্চা।

আমি বলছি না ইংরেজি শেখা খারাপ, বৈশ্বিক জ্ঞান আহরণ করতে ইংরেজি শিখতেই হবে। দরকার হলে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ফরাসি, স্প্যানিশ, জার্মানও শেখা যেতে পারে। তবে তা মাতৃভাষা ছেড়ে দিয়ে নয়। চীন, জাপান যে আজ এতো সমৃদ্ধশালী, তার পেছনে রয়েছে তাদের মাতৃভাষা চর্চা। তাদের মাতৃভাষার পরও তারা একাধিক বিদেশি ভাষা শিখে থাকে ওই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বাজার দখল করতে। ভাষা এমনই গুরুত্ববহ ব্যাপার।

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় আসলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করবো।’কিন্তু কোথায় বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন? সেই মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতান বলেন, ‘যারে যেই ভাষে প্রভু করিলো সৃজন/সেই ভাষা তাহার অমূল্য রতন।’কিন্তু আমাদের অমূল্য রতন বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ কোথায় যাচ্ছে? মীর মশাররফ হোসেনের অকপট বাণী ছিলো ‘মাতৃভাষার প্রতি যাহার শ্রদ্ধা নাই সে মানুষ নহে।’ আমরা কি তাহলে মানুষ নই? সুলতানের সতীর্থ কবি আবদুল হাকিমের বাণী ছিলো: ‘যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি/দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশে ন যায়’।

সতেরো শতকের সেই আক্ষেপ এখনো কি প্রাসঙ্গিক নয়? কবি আসাদ চৌধুরীর শহীদদের প্রতি কবিতার লাইনটা মনে পড়ছে ‘তোমাদের যা বলার ছিলো বলছে কি তা বাংলাদেশ?’ হয়তোবা বলছে না। তারপরও এই ভাষা, এই দিন পুরনো হবে না কখনো। কবি শহীদ কাদরীর উচ্চারণ তাই বলে: ‘যখনই চিৎকার করি/দেখি, আমারই কণ্ঠ থেকে/অনবরত/ঝরে পড়ছে অ, আ, ক, খ’(একুশের স্বীকারোক্তি)। আজকের এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রান্তরে যারা রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় রক্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন তাদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। - গবেষক ও প্রাবন্ধিক

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com