বিপ্লব ঘটিয়েছে মুঠোফোন

প্রকাশের সময় : 2022-04-06 12:23:25 | প্রকাশক : Administration
বিপ্লব ঘটিয়েছে মুঠোফোন

রহিম শেখ: বছর দুয়েক আগে কুসুম খাতুন ‘খোঁড়া’ পা নিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাজশাহী সদরের কৃষি ব্যাংকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা তুলতেন। সেই টাকা তুলে ফের ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফিরতেন নিজ বাড়িতে। কুসুম খাতুনের সেই কষ্ট লাঘব করেছে দেশের মোবাইল ব্যাংকিং। এখন নিকটের মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমেই টাকা তুলতে পারছেন কুসুম খাতুন।

কিছুদিন আগেও আলেয়া বেগম মাস শেষে যে টাকা গ্রামের পরিবারের কাছে ঝুঁকি নিয়ে পাঠাতেন, সেই ঝুঁকি শেষ হয়ে এসেছে। কারণ, এখন তিনি নিজেই টাকা পাঠিয়ে দেন মায়ের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে। মিরপুরের গার্মেন্টস শ্রমিক আলেয়া বেগমের কাছে টাকা পাঠানোর যে যন্ত্রণা ছিল, এটা শেষ হয়ে গেছে। এমনও হয়েছে, এলাকার কাউরে দিয়ে টাকা পাঠাইছি, কিন্তু পুরো টাকা মায়ের কাছে পৌঁছায়নি। আবার অনেক সময় টাকা দিতে মাসখানেক দেরি করে ফেলছে।

সময়ের টাকা সময়ে না পেলে কি হয়। এখন আর সেই চিন্তা নাই। দেশজুড়ে কুসুম খাতুন ও আলেয়া বেগমের মতো মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়েছে। ব্যাংকে না গিয়েও যে আর্থিক সেবা মিলবে, এমন আলোচনা ১০ বছর আগেও শুরু হয়নি। নব্বইয়ের দশকে যখন দেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু হয়, সেই ফোনই যে একসময় অনেক আর্থিক লেনদেনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠবে, এমন পূর্বাভাসও তখন কেউ দেয়নি।

আর এক দশক আগে যখন মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবা (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিং শুরু হয়, তখন এই সেবার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে এক দশক পর বাস্তবতা হলো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এখন প্রতি মুহূর্তের আর্থিক প্রয়োজনে অপরিহার্য অংশ। হাতের মুঠোফোনটিই এখন নগদ টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখন এসব সেবার গ্রাহক।

দেশের ব্যাংকিং লেনদেনে বিপ্লব ঘটিয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং। সমাজের সব পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এ সেবা। দেশের এমন কোন প্রান্ত নেই, যেখানে এ সেবা নেই। এখন মোবাইল ব্যাংকিং শুধু টাকা পাঠানোর মাধ্যম না। এর ব্যবহার হচ্ছে সব ধরনের ছোট ছোট লেনদেনে। বিশেষ করে পরিষেবা বিল পরিশোধ, স্কুলের বেতন, কেনাকাটা, সরকারী ভাতা, টিকেট ক্রয়, বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ ও অনুদান প্রদানের অন্যতম মাধ্যম।

আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জমা করতে এখন আর এজেন্টদের কাছেও যেতে হচ্ছে না। ব্যাংক বা কার্ড থেকে সহজেই টাকা আনা যাচ্ছে এসব হিসাবে। আবার এসব হিসাব থেকে ব্যাংকেও টাকা জমা শুরু হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড বা সঞ্চয়ী আমানতের কিস্তিও জমা দেয়া যাচ্ছে। এর ফলে একটি মুঠোফোনই যেন একেকজনের কাছে নিজের ব্যাংক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের মার্চে। বেসরকারী খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করে। পরে এটির নাম বদলে হয় রকেট। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমএফএস সেবা চালু করে বিকাশ। পরবর্তী সময়ে আরও অনেক ব্যাংক এ সেবায় এসেছে। তবে খুব সুবিধা করতে পারেনি। বর্তমানে বিকাশ, রকেটের পাশাপাশি মাই ক্যাশ, এম ক্যাশ, উপায়, শিওর ক্যাশসহ ১৩টি ব্যাংক এ সেবা দিচ্ছে।

ব্যাংক ছাড়াও মোবাইলে আর্থিক সেবার বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় ডাক বিভাগের সেবা ‘নগদ’। ২০১৯ সালের মার্চে চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির এ সেবা দুই বছরে বড় বাজার দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে তাদের নিবন্ধিত গ্রাহক চার কোটি ৪৫ লাখ। নগদে দৈনিক লেনদেন হচ্ছে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, দেশে এ সেবায় নিবন্ধিত গ্রাহক ১০ কোটি ৬৪ লাখ ৭১ হাজারের বেশি।

এর মধ্যে ৩ থেকে ৪ কোটি হিসাবে প্রতি মাসে নিয়মিত লেনদেন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি পাওয়া ব্যাংকগুলো বর্তমানে ১১ লাখ ৪২ হাজার এজেন্টের মাধ্যমে সারাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এজেন্ট হয়ে একজন আয় করতে পারেন প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। লাখ লাখ এজেন্ট এ সেবা দিয়ে ভাগ্য বদলে ফেলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকরা ৬৫ হাজার ১৪১ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন।

সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে দুই হাজার ১৭১ কোটি টাকা। ঘণ্টায় লেনদেনের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকারও বেশি। এই সেবার মাধ্যমে টাকা জমা পড়ে (ক্যাশ ইন) ১৯ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা এবং উত্তোলন (ক্যাশ আউট) হয় ১৬ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। ব্যক্তি হিসাব থেকে ব্যক্তি হিসেবে পাঠানো হয় (সেন্ড মানি) ১৯ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের তৈরি করা এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর ৭৬ শতাংশ রিক্সাওয়ালা মুঠোফোনে অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে টাকা বাড়িতে পাঠান এবং গড়ে প্রতি সপ্তাহে জনপ্রতি তাদের পাঠানো টাকার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার টাকা। শুধু তাই নয় দিনদিন এর সংখ্যা বাড়ছে।

বর্তমানে সরকারী বিভিন্ন ভাতা ও পোশাক কারখানার বেতন যাচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে। গত সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ২ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট (এসিএফডি) পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, শ্রমিকদের মাধ্যমে মাসে এক হাজার ১১ কোটি টাকা গ্রামে যায়। ৬২ শতাংশ শ্রমিক নিয়মিত গ্রামে তার পরিবারের কাছে টাকা পাঠান এবং টাকা পাঠান ৮২ শতাংশ। ৬২ শতাংশ শ্রমিক নিয়মিত গ্রামে পরিবারে টাকা পাঠান এবং এদের ৮২ শতাংশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দিনে পাঁচবারে ৩০ হাজার টাকা জমা করা যায়। মাসে ২৫ বারে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা। আর এক দিনে ২৫ হাজার টাকা উত্তোলন ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসেবে পাঠানো যায়। এখন গ্রাহকেরা ঘরে বসে এমএফএস হিসাব খুলতে পারেন। রয়েছে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা স্থানান্তরের সুবিধাও। গত সেপ্টেম্বর মাসে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা দেয়া হয়েছে ১৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।

বিকাশ শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সব নীতিমালা ও কমপ্লয়েন্স পরিপূর্ণভাবে মেনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সব শ্রেণীর মানুষের আর্থিক লেনদেন আরও সহজ ও নিরাপদ এবং তাৎক্ষণিক ও খরচ সাশ্রয়ী করে তোলে। বিকাশের বৈচিত্র্যময় ও গুণগত মানের সেবার কল্যাণে এখন টাকা পাঠানোর সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে ‘বিকাশ’।

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com