মৃত্যু মাত্র কয়েক মিনিটের পথ! (পর্ব-২)

প্রকাশের সময় : 2022-04-20 11:05:30 | প্রকাশক : Administration
মৃত্যু মাত্র কয়েক মিনিটের পথ! (পর্ব-২)

সরদার মোঃ শাহীন

 

বেশি সময় লাগেনি বাড়ি পৌঁছাতে। লাগার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা থাকলেও লাগেনি। দীর্ঘপথে বড়নদী এবং বড় ফেরী পারাপারের ঝামেলা থাকলেও প্রত্যাশিত সময়ের মাঝেই গ্রামের বাড়ি পৌঁছে গেছে শোনিমের নানুকে বহনকারী এম্বুলেন্স। ঢাকা থেকে ভোর ছয়টায় রওনা দিয়ে দুপুর বারোটা নাগাদ পৌঁছেছে। যেমনি পথে কোন ঝামেলা হয়নি, তেমনি ফেরী পারাপারেও নয়। ঝামেলা যা হবার সব হয়েছে গ্রামের বাড়িতে।

আমার জানা ছিল না যে আবহমান বাংলার সেই গ্রাম এখন আর আগের রূপে নেই। আমার চেনাজানা গ্রাম কবে বদলে গেছে বুঝিনি। আমি জানতাম রাষ্ট্র চলে রাষ্ট্রীয় নীতিরীতিতে। সরকারের কথায় চলে পুরো দেশ। শহর গ্রাম সব চলে। কিন্তু কোন কোন গ্রামের গ্রামীন সমাজ যে চলে বিশেষায়িত সমাজপতিদের দ্বারা, তা জানতাম না। এসে জানলাম, তাদের কথাই রীতি, তাদের কথাই নীতি। তাদের কথায় ধর্ম, তাদের কথায় কর্ম।

আমি কম জানা মানুষ। কম মানে কি! খুবই কম জানা ধর্মভীরু মানুষ। বিশেষ করে ধর্মকর্মের ব্যাপারে জ্ঞান আমার খুবই সীমিত। কমবেশি বই পড়ে কিংবা চেনাজানা আলেম ওলামাদের কথা শুনে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলি। তাঁদের কথাকেই মাসলামাসায়েল হিসেবে ধরে নিয়ে চলি। নিয়মিত নামাজ রোজার মধ্যে থাকতে সর্বদা সচেষ্ট থাকি। কখনো সময়ের নামাজ সময় মত পড়তে না পারলে সামান্য দেরী না করে কাজা পড়ে ফেলি।

হজ্ব কিংবা ওমরায় যাওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার। আমার শোনিমকে হজ্ব করার তৌফিক আল্লাহপাক করে দিয়েছেন ওর সাড়ে সাত বছর বয়সেই। ধর্মকর্মে আমার যথেষ্ঠ আগ্রহ থাকলেও ধর্মজ্ঞান খুবই সীমিত। আমার জ্ঞান যেমনি সীমিত, তেমনি বুদ্ধিশুদ্ধিও কম। তাই কথাবার্তায়ও সতর্ক থাকি। বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে কথা। কোন্ কথা ফস্ করে আবার বেফাঁস কথা না হয় সেই ভয়েই সতর্ক থাকি।

তাই শশুরবাড়ির গ্রামে এসে কথা না বলে সব মেনে নিয়েছি। যে যা বলেছে তাই মেনে নিয়েছি। শুধু এই আশায়, আমার কথায় মরহুমার রুহের যেন কষ্ট না হয়। এদিকে বাড়িতে পৌঁছেই শুনলাম মহিলাদের মৃত্যু সংবাদ মাইকে এলান দেয়া যাবে না। এটা নাজায়েজ। মাইকে এলান দিতে চেয়েছিলাম যেন সংবাদটা কাছের দূরের সবার কাছে দ্রুত পৌঁছায়। যেন জানাজায় অধিকতর মানুষ শরীক হতে পারে। পারলাম না। এলাকার হুজুর মাসলা দিয়েছেন বলে কোন মসজিদ থেকেই মাইকে কিংবা মাইক ছাড়াও এলান দেয়া সম্ভব হলো না।

মহা মুশকিলে পড়ে গেলাম। হুজুরকে ম্যানেজ করার জন্যে কারো কারো দ্বারস্ত হয়েও ব্যর্থ হলাম। এ কেমন কথা! ঢাকাতে তো এমন কথা কখনো শুনিনি। প্রশাসনে ফোন করে কোন পরিষ্কার উত্তর পেলাম না। সবাই এ্যাঁ ও্যঁ করছে। নিরুপায় কিংবা অসহায় মানুষ সব সময় যা করে। তাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম। কিন্তু সমস্যা থেকে মুক্ত হলাম না। সমস্যা হলো সমাজের সবাইকে তড়িৎ গতিতে জানানো। সমাজের সবাইকে বাড়ি বাড়ি যেয়ে এক এক করে জানান দেয়াটা খুবই দূরহের কাজ।

আঘাত পেলাম। তবে ছোট আঘাত। বড় আঘাতটা পেলাম আবারো সেই হুজুরের কাছ থেকেই। মাইকে এলান বিষয়ক ফতোয়া দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। ফতোয়া আবারও দিলেন। তিনি জানাজা পড়াবেন না। যেহেতু ঢাকায় একবার জানাজা হয়েছে, তাই তিনি আর পড়াবেন না। মূর্দার ২য় বারের জানাজা নাজায়েজ বলে তিনি শাহী এলান জারি করেছেন। লক্ষ্য করে দেখলাম, তাঁর কথার উপরে কথা বলার কেউ নেই গ্রামে। তিনি যা বলছেন, তাই রীতি; ধর্মীয় রীতি। যা বলছেন তাই নীতি; ধর্মীয় নীতি।

এদিকে কবরের মাপ নিয়ে পড়লাম আরেক ফেতনায়। বয়স তো আর কম হলো না। কবর তো আর কম মানুষকে দেইনি এই জীবনে। অথচ জীবনেও যা শুনিনি তাই আজ প্রথম শুনলাম গ্রামে এসে। মুর্দা যেহেতু মহিলা, তাঁর কবর বেসাইজে করা যাবে না। কবর হবে মুর্দার শরীরের সাইজ অনুযায়ী। কাঁটায় কাঁটায় হতে হবে। একটু বড়ও নয়, ছোটও নয়।

কবর যারা খুঁড়বেন তারা এলেন মরহুমার শরীরের মাপ নিতে। ফ্রিজিং এম্বুলেন্সের ভিতরে ঢুকে বাঁশের ভাঙা কঞ্চি দিয়ে মাপ নিয়ে গেলেন। সঠিকভাবে নিলেন কিনা বুঝতেও পারলাম না। অবশ্য আমার বোঝার ধার তারা কেউই ধারেন না। তারা চলেন সিস্টেমে। হুজুরের সিস্টেম। অগত্যা সিস্টেম ভেঙে পাশের গ্রামের মসজিদ থেকে আরেকজন ইমাম সাহেবকে আনা হলো। তিনি বললেন, নো প্রবলেম। তিনি পড়াবেন। শুধু ২য় বার নয়,  একাধিক জানাজাও জায়েজ। বলা যায় মহা বাঁচা বাঁচলাম। আসরের পরপরই বাড়ির আঙিনা লোকে লোকারণ্য। বাঁধভাঙা ঢেউয়ের মত লোকজন আসা শুরু হলো। অবশেষে প্রায় হাজার খানেক লোকের উপস্থিতিতে বাড়ির আঙিনাতেই জানাজা হলো। শুরু হলো শবযাত্রার শেষ যাত্রা। কবরস্থান খুব বেশি দূরে নয়। কবর ঘিরে ধরেছে শতাধিক সাধারণ মানুষ। ওলামায়ে কেরামগণ নন। এইসব সাধারণ মানুষরাই দিচ্ছেন মাসলার পর মাসলা। সবাই মাসলা দিচ্ছে। কেউ বাদ যাচ্ছে না। ছোটবড় সবাই মাসলা দিয়েই যাচ্ছে।

মাসলার মূল কথা হলো বেগানা কেউ মুর্দাকে ধরতে পারবে না। শুধু ধরা নয়, ত্রিসীমানায়ও যাওয়া যাবে না। সব বেগানার দল সীমানার মাঝে এসে সীমানার বাইরে নিতে টার্গেট করেছে আমাকে। সবার টার্গেট আমি। আমি জামাই; আমাকে কেউই চেনে না। চেনার কথাও না। তাই বারবার সবার সন্দেহের তীর আমার দিকেই আসছে। আমি এবং আমার সাথের লোকেরা জেরার জবাব দিতে দিতে অস্থির। জামাই শুনে কেউ বলে, ওকে। কেউ বলে, দাঁড়ান! ঝামেলা আছে। অবশেষে আমি কেবল জামাই নই, মুর্দার বোনের ছেলে বলে কবরে নামার সুযোগ পাই।

শোনিমকে সাথে নিয়ে কবরে নেমে মাকে নামাতে যাবো। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম কবরের সাইজ মায়ের দেহের চেয়ে ইঞ্চি খানেক ছোট। আমি আর শোনিমের ছোটমামা মায়ের দেহখানি মাঝামাঝি ধরেছি। শোনিম ধরেছে মাথার দিক। বড়মামা ছিল পায়ের কাছে। নানুকে চিরনিদ্রায় মাটিতে রাখতে যেয়ে শোনিম স্তব্ধ হয়ে যায়। একদিন যে মানুষটি ওকে ভূমিষ্ট হবার শুরু থেকে মাটিতে রাখতে দেয়নি একবারের জন্যেও, আজ সেই মানুষটিকে শোনিম মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে চিরকালের জন্যে!

চিরকালের জন্যে মানুষটিকে বিদায় দিতে যেয়ে শান্তি পাইনি এতটুকুনও। এত্ত এত্ত মানুষের মনগড়া মাসলার বকবকানি, তাড়াহুড়া আর অস্থিরতায় দোয়া দুরুদও ঠিকমত পড়তে পারিনি। শুধু ভাবছিলাম, আমি বেগানা কি না এটা নিয়ে কত কথা হলো আজ। অথচ হাসপাতালে গেল তিনমাসে কেবল আমি নই, মাকে সেবা দিয়েছে, শুশ্রুষা করেছে তথাকথিত বেগানা মানুষেরাই। তখন এইসব ফতোয়াবাজরা একজনও আসেনি। একটু চোখের দেখাও দেখতে আসেনি। একটি দিনের জন্যেও এদেরকে কাছে পাইনি। না পেয়েছি দিনের ডিউটিতে; না রাতের।

কাজের সময় এরা কেউই পাশে থাকে না। কোনভাবেই থাকে না। দায়িত্ব পালনের সময় আসে না; ঘরে বসে থাকে। ঘর থেকে বের হয় মৃত্যুর পর। আসে মাসলা দিতে; রীতিনীতি শেখাতে। মা আমার লাশ হতে না হতেই সবাই হাজির। এসেছে দাফন করতে। যত তাড়াতাড়ি দাফন দেয়া যায় ততই যেন উত্তম। সবাই অস্থির মুর্দাকে দাফন কাফনে। অথচ মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে এইসব মানুষদেরকে গেল কয়টা দিন, কয়টা মাস একটিবারের জন্যেও অস্থির হতে দেখিনি।

তারা অস্থির হয়নি জরুরী চিকিৎসা দেয়ায়। অস্থির হয়নি তাঁকে উপযুক্ত সেবা দেয়ায়। ভাবটা এমন যে, অস্থির হয়ে লাভ কি! মৃত্যু তো অবধারিত। জীবন তো মূল্যহীন। তাই অপেক্ষায় থেকেছে। মৃত্যু সংবাদের অপেক্ষায়। মৃত্যুর পরপরই মৃত মানুষটিকে নিয়ে তারা অস্থির হয়ে উঠে। দায়িত্ব পালনের ঝুলি খুলে বসে। অথচ জীবিত মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখতে তাদেরকে কখনো অস্থির হতে দেখিনি। তারা অস্থির কিভাবে নিজেরা বেঁচে থাকবে সেই পেরেশানীতে।

এক অদ্ভুত পৃথিবীর অদ্ভুত মানুষ আমরা। অদ্ভুত আমাদের আচরণ। পোশাক আশাকে, লেবাস বা অবয়বে কিংবা চলনে বলনে আমরা মুসলিম হতে চেষ্টা করি। বেহেস্তে যাবার অভিপ্রায়ে সদা তটস্থ থাকি। সবাই বেহেস্তে যেতে চাই! কিন্তু রহস্যজনক হলেও সত্যি একজনও মরতে চাই না। দোজখ বেহেস্তের মাঝামাঝি কঠিন এই পৃথিবীতেই বেঁচে থাকতে চাই অনন্ত অসীম কাল!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com