বাংলাদেশে একজনই আব্দুল গাফফার চৌধুরী

প্রকাশের সময় : 2022-06-08 16:23:53 | প্রকাশক : Administration
বাংলাদেশে একজনই আব্দুল গাফফার চৌধুরী

তাপিতা খানম: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি- অমর গানের রচয়িতা, কিংবদন্তি সাংবাদিক, গল্পকার ও ঔপনাস্যিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী বাঙালীর হৃদয়ে থাকবেন চিরদিন। ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ থানার উলানিয়া গ্রামে আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্ম।

উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসায় ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ে হাইস্কুলে ভর্তি হন গাফফার চৌধুরী। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজ থেকে পাস করেন ইন্টারমিডিয়েট। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি পান। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৪৬ সালে গ্রাম ছেড়ে বরিশাল শহরে চলে এসেছিলেন গাফফার চৌধুরীরা। তখন থেকেই লেখালেখির শুরু। ১৯৪৯ সালে তার প্রথম গল্প ছাপা হয় সওগাত পত্রিকায়। পরে দৈনিক ইনসাফ, দৈনিক সংবাদ, মাসিক সওগাত, মাসিক নকীব পত্রিকায় তিনি কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে। দুবছর পর মানিক মিয়া তার নতুন  রাজনৈতিক পত্রিকা ‘চাবুক’এর দায়িত্ব দেন আবদুল গাফফার চৌধুরীকে। সামরিক শাসন জারি হলে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক জেহাদ, সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় বিভিন্ন পদে কাজ করেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৬৪ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে ব্যবসা করার চেষ্টায় অনুপম মুদ্রণ নামে একটি ছাপাখানা খোলেন। দুবছর পর আবার সাংবাদিকতায় ফিরে ১৯৬৬ সালে বের করেন ৬ দফা আন্দোলনের মুখপত্র ‘দৈনিক আওয়াজ’।

পরে আবার দৈনিক আজাদ হয়ে ফেরেন ইত্তেফাকে। ১৯৬৯ সালে মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর অবজারভার গ্রুপের দৈনিক পূর্বদেশে যোগ দেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি কলকাতায় চলে যান স¦পরিবারে। মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলায় লিখতে শুরু করেন। কলকাতার আনন্দবাজার ও যুগান্তরেও কলাম লিখতে থাকেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দৈনিক জনপদ বের হয় গাফফার চৌধুরীর সম্পাদনায়। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ হয় তাঁর। দেশে ফেরার পর গুরুতর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতায় যান গাফফার চৌধুরী। পরে ১৯৭৪ সালে স্ত্রীকে নিয়ে পাড়ি জমান লন্ডনে। তখনই তাদের প্রবাস জীবনের শুরু।

১৯৭৬ সালে লন্ডনে বসেই ‘বাংলার ডাক’নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৮৭ সালে বের করেন ‘নতুন দিন’। এরপর ১৯৯০ সালে ‘নতুন দেশ’এবং ১৯৯১ সালে ‘পূর্বদেশ’বের করেন। এই পুরোটা সময় বাংলাদেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোতে নিয়মিত লিখে গেছেন। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ভীমরুল, তৃতীয় মত, কাছে দূরে, একুশ শতকের বটতলায়, কালের আয়নায়, দৃষ্টিকোণ শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখেছেন তিনি।

বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক বদলের সাক্ষী গাফফার চৌধুরী ছিলেন একাত্তরের মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলার নির্বাহী সম্পাদক। লন্ডনে বসবাস করলেও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে তাঁর কলম সোচ্চার ছিল বরাবর। প্রবাসে থেকেও ঢাকার পত্রিকাগুলোতে তিনি যেমন রাজনৈতিক ধারাভাষ্য আর সমকালীন বিষয় নিয়ে একের পর এক নিবন্ধ লিখে গেছেন, তেমনি লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ।

আবদুল গাফফার চৌধুরী দুর্দান্ত এক বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়ে গেলেন। নানামাত্রিক প্রতিভায় নিজেকে বিকশিত করেছিলেন তিনি। যখন যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই পেয়েছেন সাফল্য। একজন সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে অনেক বেশি সমাদৃত তিনি।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটির জন্যই অমর হয়ে রইবেন এই কীর্তিমান। গানটির পেছনের গল্প আবদুল গাফফার চৌধুরী তুলে ধরেন বাংলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যে। গল্পটি এমন- ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকার তৎকালীন প্রাদেশিক আইন পরিষদ ভবনের (বর্তমান জগন্নাথ হল) সামনে গুলিবর্ষণ করা হয়। শহীদ রফিকের লাশ পড়ে আছে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহিঃবিভাগের বারান্দায়। তার মাথার খুলি উড়ে গেছে গুলিতে।

এই খবর শুনে গাফফার চৌধুরী তার বন্ধুরা মিলে ছুটে যান হাসপাতালে। শহীদ রফিকের লাশ দেখে তাঁর মনে শোকে-আবেগে গুঞ্জরিত হয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। হাসপাতালের পাশে মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাক-হোস্টেলের সামনে তখন ছাত্র জনতার ভিড়। সেসময় গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয় তাঁর এক বন্ধু সৈয়দ আহমদ হোসেনের সঙ্গে।

তিনি জানতে চান গাফফার চৌধুরী কি মিছিলে ছিলেন? তখন তিনি বলছেন- হ্যাঁ ছিলাম। গুলি শুরু হতেই মেডিক্যাল হোস্টেলের ভিতর আশ্রয় নেই। এখন হাসপাতালের বহিঃবিভাগের মেঝেতে ১ জন শহীদের মৃতদেহ দেখে এলাম। তাকে দেখে মনে হয়েছে, আমার আপন ভাই। মনে মনে একটি কবিতার লাইনও তৈরি হয়েছে- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।

তখন কবিতার লাইনটি শুনে আহমদ হোসেন তাঁর হাত চেপে ধরে বললেন- এই কবিতাটি এখনই লিখে ফেলুন। গাফফার চৌধুরী বললেন- রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি কবিতা লেখা যায়? হোস্টেলে ফিরে গিয়ে লিখব। তখন আহমদ হোসেন বললেন, আপনি হেঁটে আরমানিটোলা পর্যন্ত যেতে যেতে কবিতাটি হারিয়ে যাবে। আপনি আমার সাইকেলটা নিন, তাড়াতাড়ি হোস্টেলে গিয়ে কবিতাটি লিখুন। গাফফার চৌধুরী তখন ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র।

এদিকে, সরকারের নির্দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ ও ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানানো হয়, রাতেই তাঁদের ছাত্রাবাস ছেড়ে যেতে হবে। গাফফার চৌধুরী কাপড়চোপড় গোছানোর জন্য দোতলায় নিজের কক্ষে যান। তখন তাঁর মনে হলো কবিতার কয়েকটি লাইন অন্তত লিখে রাখা দরকার। না হলে কবিতাটি মন থেকে হারিয়ে যাবে। টেবিলে বসে কবিতার ৫-৬ লাইন লিখে ফেললেন, বাকিটা আর তখন লেখা হয়নি তাঁর।

বেগম বাজারে ঢাকা কলেজের তখন আরেকটি ছাত্রাবাস ছিল, নাম-নুরপুর ভিলা। হোস্টেল সুপরিন্টেডেন্ট ছিলেন দর্শনের অধ্যাপক সাঈদুর রহমান। তারই ছেলে শফিক রেহমান। তিনি থাকেন হোস্টেলের গেস্ট হাউজের দোতলায়। ওই রাতে গাফফার চৌধুরী শফিক রেহমানের কাছে গিয়ে উঠলেন। সেখানেই কবিতাটির আরও কিছু অংশ লেখা হলো। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি শোক র‌্যালিতে পুলিশের লাঠিচার্জে অনেকের সঙ্গে গাফফার চৌধুরীও আহত হন, পায়ে মারাত্মক ব্যথা পান।

তাঁর সহপাঠী দাউদ খান মজলিশ তাঁকে নিয়ে যান বংশালে তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায়। সেই বাসার এক চিলে কোঠায় তিনি থাকতেন। সেখানে বসে একুশের কবিতাটি শেষ করার চেষ্টা করেন গাফফার চৌধুরী। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তা হয়ে উঠেনি। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যালে। সেখানে এসে আহমদ হোসেন জানতে চাইলেন- কবিতাটি লেখা শেষ হয়েছে? গাফফার চৌধুরী বললেন, অর্ধেকের মতো হয়েছে।

তখন আহমদ হোসেন তাঁর হাত চেপে ধরে অনুরোধ করেন কবিতাটি আজই শেষ করে দিতে। আহমদ হোসেন তাঁকে কাগজ-কলম এগিয়ে দিয়ে বললেন, কবিতাটি এখনই শেষ করে দেন। অবশেষে গাফফার চৌধুরী পুরো কবিতাটি লেখা শেষ করলেন। গানটিতে মোট ৩০ লাইন থাকলেও প্রভাত ফেরির গান হিসেবে প্রথম ৬ লাইন গাওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তাঁর ‘জীবন থেকে নেওয়া’সিনেমায় গানটি ব্যবহার করেন।

একুশের এই গান আজ আর কেবল বাংলাদেশের গান নয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কোর এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে গাওয়া হয় এই গানটি। বর্তমানে এই গানটি ইংরেজি, হিন্দি, মালয়, ফরাসি, সুইডিশ, জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়।

৮৭ বছর বয়সী বর্ষীয়ান লেখক ও সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রবীণ লেখক, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী ১৯ মে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে লন্ডনের বার্নেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ প্রগতিশীল, সৃজনশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন অগ্রপথিককে হারালো।

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com