বৈচিত্র্যতায় ভরপুর দেশঃ মালয়েশিয়া

প্রকাশের সময় : 2022-08-17 16:31:49 | প্রকাশক : Administration
বৈচিত্র্যতায় ভরপুর দেশঃ মালয়েশিয়া

জেসিউর রহমান শামীম: বৈচিত্র্যতায় ভরপুর এই দেশটিতে রয়েছে সমুদ্র, পাহাড়, দ্বীপ, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। দেশটি হলো দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া। উপদ্বীপ মালয়েশিয়ার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার সাথে সীমানা রয়েছে। আছে ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের সাথেও সমুদ্রসীমা।

মালয়েশিয়ার উৎপত্তি মালয় রাজ্যগুলি হতে। যা ১৮শ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে পরিণত হয়েছিল। ভারত স্বাধীন হওয়ার দশবছর পর ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুয়ানকু আবদুল রহমান ঘোষণা করলেন ব্রিটিশ শাসনের অবসানের। -জন্ম হয় স্বাধীন মালয়েশিয়ার । ১৯৬৩ সালে সাবা আর সারওয়াক যোগ দেয় মালয়েশিয়ার সঙ্গে। সিঙ্গাপুরও সেইসময় মালয়েশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলেও ১৯৬৫ সালে আবার আলাদা হয়ে যায়।

প্রাচীন ঐতিহ্য আর ঝকঝকে আধুনিকতা নিয়ে আজকের মালয়েশিয়া। নীল সমুদ্র, রুপোলি বালুকাবেলা, সুউচ্চ পাহাড়, ট্রপিকাল রেনফরেস্ট, রহস্যময় গুহার সারি, প্রবালদ্বীপ, নদী আর হ্রদের মেলা নিয়ে বহু বৈচিত্রের রূপকথা। ফুল, অর্কিড, নানা বন্যপ্রাণী আর পাখির রাজ্য। স্থানীয় মালয়ালিদের জনস্রোতে মিশে গিয়েছে ভারতীয়, চীনা, জাপানি ও ইউরোপীয় নানা দেশের মানুষ ও তাদের বহুবর্ণের সংস্কৃতি।

কুয়ালালামপুর রাজধানী শহর । সময়টা ১৮৫৭, ভারতে তখন সিপাহী বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। কুয়ালালামপুরও ব্রিটিশ রাজত্বেরই অধীন। একদল চিনা ভাগ্যান্বেষী ঘুরতে ঘুরতে হাজির হন এই অঞ্চলে। ব্রিটিশদের অনুমতি নিয়ে জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গ্রাম থেকে শহর কুয়ালালামপুর।

মালয়েশিয়ার আয়তন প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ২৭ লক্ষ ৩০ হাজার। প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা জাতিগতভাবে মালয়, মালয়েশিয়ান চীনা, মালয়েশিয়ান ইন্ডিয়ান এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্র প্রধান হলেন রাজা, যিনি ইয়াং ডি-পার্টুয়ান আগোং নামে পরিচিত। তিনি প্রতি পাঁচ বছরে নয়টি মালয় রাজ্যের বংশধর শাসকদের দ্বারা নির্বাচিত একজন নির্বাচিত রাজা। সরকার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশটির সরকারি ভাষা মালয়েশিয়ান, মালয় ভাষার একটি স্ট্যান্ডার্ড রূপ। ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে ব্যবহার হয়। মাতৃভাষার নাগরিকেরা মাতৃভাষা হিসাবে ১৪০ টি অতিরিক্ত ভাষায় কথা বলে। তবে বিশেষ করে ইস্ট মালয়েশিয়াতে মানুষ ইবন ও কাদজান সহ ১০০ টি স্থানীয় ভাষায় কথা বলে।

স্বাধীনতার পরে, মালয়েশিয়ার জিডিপি প্রায় ৫০ বছরে বার্ষিক গড়ে ৬.৫% বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিজ্ঞান, পর্যটন, বাণিজ্য এবং চিকিৎসা পর্যটন খাতগুলিতে প্রসারিত হচ্ছে। মালয়েশিয়া থেকে ইলেকট্রনিক্স, পেট্রোলিয়াম পণ্য, রাবার, টেক্সটাইল এবং রাসায়নিক দ্রব্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। মালয়েশিয়ায় ক্ল্যাং-গোমবাকের তীরে এই অঞ্চলের প্রথম টিন পাওয়া যায়।

মালয়েশিয়া একটি মুসলিম দেশ। জনসংখ্যার প্রায় ৬১ শতাংশ ইসলাম ধর্ম মেনে চলে। ২০১০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বৌদ্ধরা মালয়েশিয়ার জনসংখ্যার ১৯.৮ শতাংশ, খ্রিস্টান ৯ শতাংশ, হিন্দু ৬ শতাংশ, কানুফিসিয়ানতা বা তাওশিয়ার মত চীনা দর্শনের অনুসারী ১.৩ শতাংশ পাওয়া যায়।

চতুর্দশ শতকের গোড়ায় জমজমাট বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল মেলাক্কা - তার মশলার খ্যাতি পৌঁছেছিল সুদূর ইউরোপেও। এর অনেক আগে থেকেই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বিদেশি নাবিক আর ব্যবসায়ীরা আরব, শ্যামদেশ প্রভৃতি কাছে-দূরের দেশ থেকে এসে ভিড় জমিয়েছিল দক্ষিণ-চিন সমুদ্রের বুকে বন্দরনগরী মেলাক্কায়। ব্যবসার সূত্রে এসে কলোনিস্থাপনের চিরাচরিত ইতিহাসের গল্প এখানে।

মেলাক্কা নদীর দুই তীরেই ছড়িয়ে রয়েছে মেলাক্কা শহর। পাথরে বাঁধানো রাস্তা জুড়ে দুপাশে অতীতের নীরব সঙ্গী হেরিটেজ বিল্ডিংগুলি দেখতে দেখতে পৌঁছে যাওয়া যায় জমজমাট স্ট্রিট মার্কেটগুলিতে। এখানকার আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে ক্রোকোডাইল ফার্ম, মেলাক্কা জু আর রিক্রিয়েশনাল ফরেস্ট অন্যতম।

শহরের সেরা আকর্ষণ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু (১,৪৮৩ ফুট) পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার। স্টিলের তৈরি ঝকঝকে এই টাওয়ার দুটির চূড়া শহরের নানা জায়গা থেকেই দৃশ্যমান। ৮৮ তলা টাওয়ারের ৪১ ও ৪২ তলা জুড়ে স্কাইব্রিজ যুক্ত করেছে টাওয়ার। এশিয়ার উচ্চতম টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার মেনারাও রয়েছে এখানেই, বুকিট নানাস এলাকায়। টাওয়ারের উপরে ভিউয়িং ডেকে সাজানো টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে কুয়ালালামপুর শহর দেখা এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

পানতাই ককের সমুদ্রতীরে রয়েছে ঐতিহাসিক সামার প্যালেস। এখানে ‘আন্না অ্যান্ড দ্য কিং’চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছিল। সেটটি এখনো একইরকম সাজানো আছে। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় সৈকত পানতাই তানজুংরু বা ‘ক্যাসুরিনা বিচ’। ভাটার সময় সমুদ্রতটের গভীরে হেঁটে বেড়িয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় সময়। এশিয়ার বৃহত্তম অ্যাকোয়ারিয়াম - ওশানারিয়ামটিও রয়েছে লাং কাউয়িতেই - পান্তাইসেনাং-এ। প্রায় ৫,০০০ প্রজাতির সামুদ্রিক ও মিষ্টিজলের প্রাণী রয়েছে এই বৃহৎ অ্যাকোয়ারিয়ামে।

এশিয়ার দীর্ঘতম ১৩.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পেনাং ব্রিজ মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে পেনাং দ্বীপভূমিকে। মালয় ভাষায় পেনাং শব্দের অর্থ পাম। পামে ছাওয়া এই দ্বীপভূমির রাজধানী শহর জর্জটাউন। পেনাং এর মূল আকর্ষণ ক্যাবল ট্রেন। প্রাচ্যের মুক্তা হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়ার পেনাং-এর দর্শনীয় স্থান সমূহ স্থানীয়ভাবে পুলাউ পিনাং নামে পরিচিত।

মালয়েশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার সাতে - কাঠকয়লার আগুনে ঝলসানো মাংসের কাবাব এবং নাসিলেমাক - কলাপাতায় মোড়া সুগন্ধি মশলা ও নারকেলের দুধে জারানো ভাত। ‘কোপি তিয়াম’ বা চিনা কফিশপে বসে স্থানীয় কফির স্বাদ নেওয়া যায়। ওয়ানটান মি এবং কারি লাক্সার - গরমাগরম এগ নুডলসেও পেট ভরিয়ে নেওয়া যায়। নানারকম ভারতীয় খাবারও বেশ জনপ্রিয় মালয়েশিয়ায়।

মালয়েশিয়ার নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি প্রশাসনিক শহর পুত্রজায়া। স্বচ্ছ জল, সবুজ, শ্যামল, নীলাভ এখানকার প্রকৃতি। যানজটমুক্ত পরিকল্পিত ও সাজানো গোছানো একটি শহর। পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক ও শৈল্পিক-স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন এই পুত্রজায়া। আশির দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের হাতে এ শহরের গোড়াপত্তন।

শহরটিতে রয়েছে বিশ্বের একমাত্র গোলাপি মসজিদ পুত্র মসজিদ। একই সঙ্গে আছে জাদুঘর, আছে বড় একটি শপিং কমপ্লেক্স। কৃষিপ্রধান মালয়েশিয়ার কৃষি সংরক্ষণে উৎসর্গ করা হয়েছে পুত্রজায়াকে। দর্শনার্থীদের হাতে কলমে দেখানো হয় কীভাবে রাবার, কোকো ও পামের মতো ফসল রোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ফসল কেটে ঘরে তোলা হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার রোধে পুত্রজায়াতে রয়েছে বৈদ্যুতিক বাস। শহরে রয়েছে বেশ কয়েকটি ইচার্জিং স্টেশন। পুত্রজায়ার সবুজ নীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিটি ভবনে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের সুবিধা রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা।

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com