আমিও বাবা! কিন্তু আমার বাবার মত বাবা নই!!

প্রকাশের সময় : 2022-09-15 12:05:39 | প্রকাশক : Administration
আমিও বাবা! কিন্তু আমার বাবার মত বাবা নই!!

সরদার মোঃ শাহীন

 

আজকের শিরোনামটা আমার নিজেরই পছন্দ হয়নি। পছন্দ হবার মতও নয়। একটু চেষ্টা করলে হয়ত আরো আবেগী এবং সোজা সাপ্টা একটা শিরোনাম দেয়া যেত। দেয়ার জন্যে চেষ্টাও কম করিনি। গানের কলি খুঁজে বেরিয়েছি বরাবরের মত। কিন্তু পারিনি। ঘুরে ফিরে মাথায় এই শিরোনামটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। বেশ কয়েকদিন ধরেই খাচ্ছিল। শেষমেষ নতুন কিছু না পেয়ে এটাই ঠিক করে ফেললাম।

আসলে বাবা-মাকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে কিছুটা জটিলতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। হাজারটা শিরোনাম সামনে চলে আসে। সমস্যা হয় কোনটা রেখে কোনটা বাদ দেবো। আবার শিরোনামগুলো এমনই আকর্ষণীয় হয় যে, সবগুলো শিরোনামকে এক করে একটা লেখাও মোটামুটি দাঁড় করানো যায়। কিন্তু ওসবে তো আর মন ভরে না। আবেগী মন লেখায় শুধু আবেগ খোঁজে। আবেগ বড় জটিল জিনিস।

আমার বাবারও আবেগ ছিল প্রচন্ড। এমনিতে এটা বুঝতাম না। বুঝতাম টিভি দেখতে বসে। বাসার ড্রয়িং রুমে সবাই একসাথে বসে টিভি দেখছি। শুধু বাসার সবাই নয়, পাড়া-প্রতিবেশী-শুদ্ধ বসেছি। হয়ত কোন সাপ্তাহিক নাটক, নয়ত কোন সিনেমা। আজকালকার মত রোজরোজ এত্তএত্ত নাটক চ্যানেলে হতো না তখন। আর চ্যানেলও তো ততো ছিল না। ছিল মোটে একটি। বাংলাদেশ টেলিভিশন বা সংক্ষেপে বিটিভি। ওরা যা দেখাতো তাই দেখতাম। তাই গিলতাম। গোগ্রাসে সব গিলতাম।

তবে মোটেও মন্দ ছিল না সে সব। আজকালকার চেয়ে অনেক অনেক ভাল ছিল। বিশেষ করে সাপ্তাহিক নাটক। খুব ভাল ভাল নাটক হতো তখন। এখনকার মত ছ্যাবলানো নাটক নয়। এখন তো নাটকে নায়ক নায়িকা প্রেমের নামে কথায় কথায় ছ্যাবলামো করে। আর করে ঝগড়া। মাঝেমাঝে থাবড়া থাবড়িও করে। তবে থাবড়ায় বেশি নায়িকারা। কথায় একটু ডানবাম হলেই ক্যাচাৎ করে গালে বসিয়ে দেয়। আগেরকার দিনে নায়ককেও কখনো নায়িকাকে থাবড়াতে দেখিনি। দেখেছি প্রেমের আবেগী সংলাপ। প্রচন্ড রকমের বক্তব্যধর্মী ছিল সে সব নাটক। নাটক ছিল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

সমাজ পরিবর্তনের কথা শোনায় আব্বার ভীষণ আগ্রহ ছিল। আব্বা খুব করে চাইতেন, ক্রমে ক্রমে ধ্বংসের পথে চলা সমাজটা বদলাক। সমাজের উচ্ছন্নে যাওয়া আব্বা মেনে নিতে পারতেন না। উচ্ছন্নে যাওয়া নামক সংলাপগুলোতে আব্বার চোখ জলে ছলছল করে উঠতো। পারিবারিক সেন্টিমেন্ট হলে তো কথাই নেই। সোশ্যাল কিংবা পারিবারিক সেন্টিমেন্টের নাটকগুলোতে কষ্টবেদনা কিংবা বিরহের দৃশ্য আসলেই আব্বা কেঁদে ফেলতেন। জলভরা চোখের সে কান্না। কখনো চোখের জল লুকাতে পারতেন, কখনো পারতেন না।

পাশাপাশি অন্যের কষ্টদুঃখের কথাও সব শুনতেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনতেন। মাঝেমধ্যেই বাইরে থেকে লোক ধরে নিয়ে আসতেন বাসায়। আম্মাকে বলতেন, খাবার দাও। মনে হচ্ছে লোকটা ক’দিন ধরে খাবার পায়নি। এখানেই শেষ নয়। ঘরে এনে গোসল করিয়ে নিজের লুঙ্গি এগিয়ে দিতেন। খাওয়া দাওয়া শেষে তার সাথে গল্প করতে বসতেন। লোকটি যদি তেদর মার্কা হতো, তাহলে তো কথাই নেই। অব্বার পকেট খালি না করে সে আমাদের ঘর থেকে বিদায় হতো না।

আব্বা যেমনি শুনতেন, তেমনি বলতেনও বেশ। যথেষ্ঠ নলেজএবল ছিলেন প্রায় অনেক বিষয়ে। কি ভূগোল, কী ইতিহাস; সবকিছুতেই গভীর জ্ঞান ছিল তাঁর। রাজনীতিও বাদ যেত না। রোজকার পত্রিকা নিয়মিত পড়তেন বলেই জ্ঞানের ভান্ডার এত বিশাল ছিল। আর ব্রিটিশ আমলের ছাত্র ছিলেন বলে ইংরেজিতে পন্ডিত ছিলেন। আব্বাকে আমরা বলতাম, জীবন্ত ইংলিশ ডিকশনারী। এমন কোন শব্দ নেই যা তাঁর জানার বাইরে ছিল।

হয়ত এটা তাঁর জানার বাইরে ছিল যে একদিন ছেলেমেয়েরা সব বড় হয়ে গেলে সংসারের খরচ বেড়ে যাবে। সন্তানদের পড়াশুনার জন্যে গাদা গাদা টাকা লাগবে। এর উপর চিকিৎসার খরচও যোগ হয়। যেখানে মাসের মাইনে দিয়ে সংসার চালানো যায় না, সেখানে রোগবালাইয়ের চিকিৎসার তো প্রশ্নই ওঠে না। রোগবালাই গোপনে পুষতে হয়।

এবং এক সময় হয়েছিলও তাই। আব্বা তাঁর সব অসুখের কথা গোপন করতেন। না করে উপায়ও ছিল না। আমাদের সবার পড়াশুনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় আব্বা হিমশিম খাচ্ছিলেন সংসার চালাতে। বলা যায়, বেশ বিপদেই পড়েছিলেন। টায় টায় হিসেব করে চালাতে হয়। অনেকগুলো ভাই আমরা। পড়াশুনার খরচ সামাল দিতেই ঘাম ছুটে যায়। তাই বাজারও করতেন হিসেব কষে কষে। নিত্য ভোরে নিজে বাজার করতেন। দিন শুরু করতেন বাসার সকালের বাজার করা দিয়ে। চটের ব্যাগ হাতে নিয়ে আব্বা ছুটছেন বাজারে। আমাদের সবার ঘুম থেকে জাগার আগেই আব্বার বাজার করা শেষ।

নিজের দিকে খেয়াল রাখার সময় পেতেন না। প্রয়োজনও মনে করতেন না। খেয়াল রাখতেন আমাদের দিকে। আমাদের লুঙ্গি কিংবা জুতাস্যান্ডেল ছিড়ে গেলে ইতস্তত করতেন। এবং কষ্ট হলেও টাকা হাওলাদ করে এক সময় কিনেও দিতেন। কিন্তু নিজের পায়ের জুতার অবস্থা আরো আগেই যে যা তা হয়ে আছে তা দেখতেন না। দেখতেন শুধু আমাদেরগুলো। আমরা নতুন জুতা পেলে খুশিতে লাফিয়ে ওঠতাম। কিন্তু তিনি যে আমাদেরকে নতুন জুতা দিয়ে আমাদেরই ছেড়া জুতা পায়ে চড়াতেন, সেটা দেখার সময় পেতাম না।

সেই মহান বাবার সাথে একবার একা মহা অন্যায় করে ফেললাম। আব্বার হিসেবী জীবনের কিছু টাকা চুরি করে ফেললাম। যে মানুষটা পড়াশুনার জন্যে টাকা চাইলেই যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে দিতেন, সেই মানুষটার টাকাই চুরি করলাম। চুরি করলাম বেশ ফন্দিফিকির করে। কলেজ জীবনের শুরুতে কয়েকটা বই কেনা লাগবে। বেশ কিছু টাকা লাগবে এবং বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে আব্বা টাকা ম্যানেজ করে দিলেন। বইয়ে যে দাম লেখা থাকে আব্বা তার পুরোটাই দিলেন। কিন্তু তিনি কোনদিনও জানতে পারেননি, বইয়ে উল্লেখিত মূল্যের উপর তখনকার সময়ে ৩৫% ছাড় পাওয়া যায়।

আমি ছাড় পাওয়া পুরো টাকাটাই হজম করে ফেললাম। আব্বাকে এসে কিছুই জানালাম না। পর পর কয়েকটা সিনেমা আর গুলিস্তানের বিরানী খেয়ে শেষ করে ফেললাম। বারবার মনে পড়ে সেই ভুল আর অন্যায়ের কথা। যে মানুষটা গরমের রাতে রাতভর হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে আমার একটু স্বস্তির ঘুমের ব্যবস্থা করতেন, আমি তাঁকেই অস্বস্তিতে ফেললাম। তাঁর টাকাই চুরি করলাম! অথচ আমার টাকা ম্যানেজ করতে আব্বা কতটাই না পেরেশানীতে ছিলেন। অস্থিরতায় ছিলেন।

ভারী অন্যায় করেছিলাম আমি। ক্ষমার অযোগ্য অন্যায়। আজো ভাবি, এত্ত ভাল একজন বাবার এত্ত পাজি একটা সন্তান কেমন করে হয়! এক মহানুভব বাবা আমার। কখনো ভাল বিছানায় ঘুমুতেও দেখিনি। আমাদেরকে খাটে ঘুম পাড়িয়ে নিজে ঘুমুতেন মেঝের এখানে সেখানে। আজ এ ঘরে তো কাল ও ঘরে। বাসায় মেহমান এলে তো কথাই নেই। তাদেরকে সবচেয়ে ভাল বিছানাটা দিয়ে সবচেয়ে খারাপ বিছানায় নিজে ঘুমাতেন। ঘুমুতেন ঘরের বারান্দায়।

আজ জীবনের এই মধ্যগগণে বসে ভাবছি, আমার বাবার মত আমি কেন শোনিমের বাবা হতে পারলাম না! শোনিমের জন্যে বাবা হিসেবে এতটা পরিশ্রম তো আমাকে করতে হয় না। করা লাগে না। লাগে না নিজের রোগবালাইয়ের কথা গোপন করাও। যদি করা লাগতোও তাহলে পারতাম কি! মনে হয় না পারতাম। হয়ত স্বার্থপরের মত সবার আগে নিজেরটা নিয়েই ভাবতাম। এত ত্যাগ করতে পারাটা এত সহজ না।

কিন্তু আমার বাবা সহজে পেরেছেন। আমার জন্যে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। হাতে শক্ত ব্যাগ টেনেছেন। চারটা ছোট পুড়ি কিনে তিনটাই আমাকে দিয়েছেন। নিজের ভাগে রেখেছেন মোটে একটা। আজ শোনিমের পুরির অভাব নেই। অভাব নেই আমারও। ঠিক এজন্যেই চাইলেও আমি তাঁর মত হতে পারবো না। আমার বাবার মত বাবা আমি কোনকালেও হতে পারবো না। আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা! চিরতরে চলে যাবার ২৭ বছরেও তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন!!  আজীবন ধরে রাখবেন!!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com