একটি ভোরের প্রতীক্ষায়

প্রকাশের সময় : 2022-11-23 14:51:12 | প্রকাশক : Administration
একটি ভোরের প্রতীক্ষায়

শাহ আলম শ্রাবণ: হঠাৎ করেই ঝোঁপের পাশ থেকে পলিথিন কাগজের খচখচানির মৃদু আওয়াজ শুনতে পেল আনিস। কিছ্ক্ষুণ পর হালকা ক্ষীণ স্বরে নবজাতকের কান্নার শব্দ ভেসে এলো তার কানে। আনিস কান খাঁড়া করে বুঝতে চেষ্টা করল সে কি সত্যিই শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পেল, না খেয়ালী মনের ভুল।

আনিস একজন চাকুরীজীবী। প্রতিদিন অফিস ছুটির পর রাত আটটা নাগাদ এই ছোট ঝোঁপের পাশ দিয়ে তাকে বাসায় ফিরতে হয়। বেতন সামান্য হওয়ায় শহর থেকে খানিকটা দূরে স্বল্প ভাড়ার একটি দুই কক্ষের বাসা ভাড়া নিয়েছে সে। ছোট পরিবার, স্ত্রী, কন্যা আর আনিস। একমাত্র আদুরে কন্যার নামটা নিজের নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছে অন্বেষা।

নীলা অবশ্য চেয়েছিলো তার নামের সাথে মিলিয়ে রাখতে, কিন্তু আনিসের সোজা উত্তর মেয়ে হলে নামটা নিজের নামের সাথে মিলিয়ে রাখবে, আর ছেলে হলে স্ত্রীর নামের সাথে। মেয়ের বয়স তিন বছর দুই মাস, স্ত্রী পুরো দস্তুর বাঙালি গৃহিণী। ঘরসংসার আর একমাত্র কন্যাকে সামলানোই তার কাজ। অবশ্য আরেকটি কাজ করে নীলা। দিন শেষে স্বামীর ঘরে ফেরার অপেক্ষা। নীলা আনিসের স্ত্রীর নাম। শিক্ষিত, শান্ত, মুখচোরা স্বভাবের মেয়ে। ভীষণ অভিমানী। আনিস অবশ্য নীলাকে চাকুরী করার কথা বলেছিল। কিন্তু নীলার একটাই কথা; সন্তানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তার কাছে নেই।

আনিস কিছুটা ভয়, কিছুটা সংশয় নিয়ে এগিয়ে গেলো ঝেঁপের দিকে। হাতের মুঠোফোনের টর্চ জ্বালিয়ে ঝোঁপের মাঝে আলো ফেলতেই কিংর্কতব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল আনিস। সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া একটি নবজাতক পড়ে আছে লতাগুল্মের মাঝে। নিঃষ্পাপ শিশুটির দিকে তাকিয়ে আনিস ভেবে উঠতে পারেনা সে এখন কি করবে। কিছু না ভেবেই আলতো করে শিশুটিকে কোলে তুলে নেয় সে।

মুঠোফোনের মৃদু আলোয় খুব স্পষ্টভাবেই আনিস বুঝতে পারে নবজাতকটি একটি কন্যাশিশু। মুর্হূতেই আনিসের চোখেমুখে ভেসে ওঠে তার প্রিয়তম কন্যা অন্বেষার ছোট্ট মুখখানি। সেই সাথে স্মৃতির মানসপটে ভেসে ওঠে হাসপাতালের বিছানায় প্রথম সন্তানের মুখ দেখার স্মৃতি। প্রথম বাবা হওয়ার অনুভূতি। এসব ভাবতেই আনিসের সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে।

আকষ্মিক ঘটনার প্রবল উত্তেজনায় হাত পা কাঁপতে থাকে দূর্বাঘাসের মতো। আনিস তবুও পরম মমতায় শিশুটিকে বুকের সাথে আগলে ধরে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে শিশুটির চোখ, নাক, মুখ, ঠোঁট, মুখাবয়ব। ঠিক যেন অবিকল তার কন্যা অন্বেষার মতো। আনিস আলতো হাতের স্পর্শ ছড়িয়ে দিতে থাকে শিশুটির সারা গাঁয়ে। মুঠোফোনের তীক্ষ্ম আলোয় আনিস খেয়াল করে শিশুটিকে জড়িয়ে থাকা অপরিষ্কার  কাপড়ের ন্যাকড়ার সাথে একটি ছোট চিরকুট। আনিস মনের অজান্তে পড়তে শুরু করে-

        “তোমার জন্ম আর আসন্ন মৃত্যু দুটোর জন্য আমিই দায়ী। আমি তোমাকে জন্ম দিলেও বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না! আমাকে ক্ষমা নয় অভিসম্পাত দিও! এই সমাজ, সংসার আমার ভালোবাসার স্বীকৃতি আর তোমার বেঁচে থাকার পরিচয় কোনটাই দেয়নি। যাকে বিশ্বাস করে ভালোবেসে সর্বস্ব দিয়ে তোমাকে নিয়ে এলাম এই ধরায় সে তোমার স্বীকৃতি দিতে অপারগ। তাই তো আমার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই, আমি বিদায় নিচ্ছি স্বার্থপর পৃথিবী থেকে!

তুমি ভালো থেকো। নিশ্চয়ই পরপারে তোমার আমার দেখা হবে! সেখানে তোমাকে নিশ্চয়ই ভালোবাসবো, আদর করব।”  

                                  

ইতি                         

তোমার হতভাগা জন্মদাত্রী

 

আনিস চিরকুট পড়া শেষ করে স্থির থাকতে পারে না। তার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। আনিস ভাবতে থাকে এ কেমন প্রেম! এ কেমন সম্পর্ক! যে প্রেম যে সম্পর্ক মানুষকে সমাজ, সংসার থেকে বিচ্যুত করে, নিষ্পাপ শিশুর পরিচয় প্রকাশ করা যায় না, মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আনিস কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে যায়। চোখে মুখে ঘোর অন্ধকার দেখতে পায় শুধু। যেন প্রকৃতির অমানিশা ঘোর আঁধার তার চারপাশে লোহার প্রাচীর হয়ে  চিরদিনের জন্য ঘিরে ধরছে তাকে।      

আনিস শিশুটিকে কোলে নিয়ে অন্ধকারে স্থির হয়ে বসে থাকে একটি ভোরের অপেক্ষায়। কখন ভোর হবে? আদৌ কি ভোর হবে! আনিস কিছুই ভাবতে পারে না! আনিস ভাবতে থাকে পৃথিবীর কোন একটি শিশুরও কোন পরিচয়ের দরকার নেই। শিশুদের একটাই পরিচয় সে মানবসন্তান; ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। আনিস শিশুটির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বুকের মাঝে চেঁপে ধরে রাখে পিতৃত্বের সবটুকু ভালোবাসা মিশিয়ে। অসীম আকাশের দিকে অর্থহীন চোখে তাকিয়ে আনিস প্রতীক্ষায় বসে থাকে। অনন্ত অসীম অন্ধকার পেরিয়ে একটি সোনালী ভোরের... - সংগৃহিত

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com