চমক দেখে ঠমক লাগে, পরাণ ভরে না!!!

প্রকাশের সময় : 2019-02-28 14:59:42 | প্রকাশক : Admin
চমক দেখে ঠমক লাগে, পরাণ ভরে না!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র হবার সুবাদে রোজ দূপুরে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হতো তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেবকে। দিনে একবার নয়; দু’বার দেখতাম। দোতলার ক্লাশরুমে বসে পরিস্কার তাঁকে দেখতে পেতাম। সর্বদা একটা নির্ধারিত সময়েই তিনি বাসায় ফিরতেন মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে। আবার ঘন্টাখানেক পরে একই পথ ধরে অফিসে ফিরতেন। রোজকার এই আসা-যাওয়াটা ছিল সাংঘাতিক রকমের রাজকীয়। সামনে পিছনে প্রটোকলের এত্ত এত্ত গাড়ী আর ঢাউস সাইজের বাইক পোঁ পোঁ করতে করতে যেত।

আমার শোনিমেরও খুব পছন্দ রাস্তায় এমনি করে চলতে। রাজাবাদশাহ্দের দেখে দেখে তারও শখ জেগেছে। কিন্তু তাতো আর হবার নয়। ওটাতো কেবলই রাজা বাদশাহ্দের ব্যাপার। আর তাদের ব্যাপার বলেই পুরো বিষয়টি খুবই দেখার মত ছিল। তবে দেখতে বেশী ভাল লাগতো স্বয়ং রাষ্ট্রপতিকে। টকটকা ফর্সা ক্লিনসেভ নিঃসন্তান রাষ্ট্রপতিকে প্রকাশ্যে দেখতে খুবই সুন্দর লাগতো। যদিও ছবিতে ওনাকে তেমনটা লাগেনি কোনদিনও। এবং এই বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে খুবই নেগেটিভ প্রভাবও ফেলেছিল। বেচারা দূর্ভাগা! বাংলাদেশের রাজনীতিতে চেহারা একটা বিরাট ফ্যাক্টর। সেটা তিনি হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেয়েছিলেন।

তবে দমে থাকার পাত্র ছিলেন না মোটেও। আটকুড়া নাম ঘুচিয়ে জনপ্রিয় হবার জন্যে সব কৌশলই অবলম্বন করলেন। এবং শুরু করলেন নানা ফন্দি ফিকির। তাবিজ কবজও নিলেন। সায়দাবাদ কিংবা ফরিদপুর; কোন জায়গাই বাদ রাখলেন না। এসবে কাজ হলো বেশ। বলা নেই, কওয়া নেই গর্ভধারণ না করেই হঠাৎ একদিন রওশন এরশাদ ছেলে সন্তানের মা হয়ে গেলেন। এরশাদ হলেন বাবা। স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হবার মতই স্বঘোষিত বাবা। জাতি খুবই চমকিত হলো। সময়টাই তখন এমন। ক’দিন পর পরই জাতি চমকিত হতো। জাতিকে চমকানো ছাড়া ক্ষমতাবানদের আর কোন কাজও ছিল না।

এরশাদ সাহেব জাতিকে চমক দেখিয়েছেন ক্ষমতার শেষ দিন পর্যন্ত। চমক দেখাতে তিনি ছিলেন কঠিন সিদ্ধহস্থ। জোর করে গদিতে বসার ক’দিন বাদেই সাইকেলে চড়ে অফিসে আসা শুরু করলেন। সামনে পিছনে প্রটোকলের গাড়ী পোঁ পোঁ করে আর মাঝখানে তার সাইকেল ক্রিং ক্রিং। চাট্টিখানি ব্যাপার! রাষ্ট্রপতি বলতে কথা! তিনি কিনা গাড়ী ছেড়ে সাইকেলে! ক’দিন চড়ে দেখালেনও। সবাই পুলিকত হলো। এরপর যথারীতি সাইকেল ছেড়ে আবার সেই গাড়ীর বহর।

সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবিদের হাত করার জন্যে বঙ্গভবনে সাহিত্য সভার আয়োজন করে নিজে কবিতা লেখাও শুরু করলেন। কবি বলতে কথা! প্রায় সন্ধ্যায়ই কবিতার আসর বসতো। তিনি থাকতেন মধ্যমণি। গানও লিখতেন। একবার জাতীয় সংগীত লেখার ইচ্ছাও হলো। কার বিশেষ সুবুদ্ধিতে যেন শেষমেষ পিছিয়ে এলেন। তবে থেমে থাকেননি। বন্যায় কোমর পানিতে নেমে ভিজে ভিজে দেশময় ঘুরে বেড়ালেন। বিদেশ থেকে ত্রাণ খুঁজে আনার চেয়ে পানিতে ভিজে দেশবাসীকে প্রাণ সমর্পণে বেশী গুরুত্ব দিলেন। লক্ষ্য একটাই সস্তা জনপ্রিয়তা।

এসবই ছিল তদানিন্তন সময়ের দেখাইন্যা রাজনীতি। মানে লোক দেখানো রাজনীতি। কথা নেই, বার্তা নেই; চেনা নেই, জানা নেই টাইপের কেউ একজন হঠাৎ করে দেশের গদিতে বসে পড়লে এমনটা করাও জরুরী ছিল। যেমন করেই হোক জনগণের নজরে পড়ে তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হওয়া লাগবে। সস্তা জনপ্রিয়তা ছাড়া টিকে থাকা যাবে না। জনতার কাতার থেকে উঠে না আসা ব্যক্তিদের এছাড়া পথও ছিল না। দেখাইন্যা রাজনীতিই ছিল একমাত্র ভরসা।

এই দেখাইন্যা রাজনীতির শুরু এবং গুরু ছিলেন ওনার পূর্বসূরী। তিনি ক্ষমতায় এসেই জাতিকে দেখানো শুরু করলেন। প্রথমেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন জাতীয় সংগীত। কী আশ্চর্য্য! জাতীয় সংগীতে বাংলাদেশ শব্দটিই নেই। যে সংগীতে দেশের নামটিই থাকে না, সেই সংগীত আবার জাতীয় সংগীত হয় কিভাবে? তাই তো, তাই তো বলে চারদিকে রব উঠে গেল। আর তৈরী হয়ে গেল নতুন গীত। সুরারোপও হলো। কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হলো না। সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে হলো।

অবশেষে শাহনাজ রহ্মতুল্লাহর গাওয়া বহুল জনপ্রিয় “প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ” সংগীতটি দলীয় সংগীত হলো। তবে তিনি থেমে থাকেননি। এবার টার্গেট করলেন বঙ্গবন্ধুকে। তাঁকে সমূলে মুছে ফেলতে হবে। কাজটি খুব কঠিন কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কোথায়! মিডিয়াসহ সব জায়গায় তাঁকে নিষিদ্ধ করা হলো। কেউ তাঁর নামটি লিখলেও খবর করে ছাড়তেন। এবার প্রতিস্থাপনের পালা। বঙ্গবন্ধুর জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাতে হলে মুজিব কোটের আদলে তাঁরও কিছু একটা চাই। তিনি বেছে নিলেন কালো চশমা আর সাদা ক্যাপ। প্যান্টের উপর টাইটফিট সাদা টিশার্ট পড়ে তিনি ঘুরতে লাগলেন সারা বাংলার হাটে, মাঠে এবং ঘাটে।

কালো চশমা আর সাদা ক্যাপে তাঁকে মানিয়েছিল বেশ। এবং এই কৌশলটি খুব কাজেও লেগেছিল। অল্পদিনেই খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। অস্বীকার করার জো নেই, মৃত্যুর ৩৮ বছর পর আজও তিনি সারা বাংলায় প্রবল জনপ্রিয়। দূর্ভাগ্য এরশাদ সাহেবের। বেঁচে থেকেও তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি। এখনও সকাল বিকেল যেভাবে পল্টি মারেন তাতে অর্জন করা সম্ভবও নয়। পল্টি মারেন সম্ভাবনার আশায়। পার্টির লোকজনকে কেবলই সম্ভাবনা দেখান; কিন্তু সম্ভাবনা জাগাতে পারেন না।। দেখাইন্যা রাজনীতি সম্ভাবনা দেখাতে পারলেও সম্ভাবনা জাগাতে পারে না।

বহু বছর পর এই দেখাইন্যা রাজনীতি দেশে আবার শুরু হয়েছিল। এবার চমকের মন্ত্রীসভা গঠনের পরপরই পলকের দেখাইন্যা রাজনীতি চারদিকে সমালোচনার জন্ম দেয়। পলক সাহেব প্রথম দিন গাড়ী ফেলে বাইকে করে অফিসে গেলেন। পারলে এরশাদ সাহেবের মত সাইকেলেই যেতেন। যাই হোক, ভাবলেন বিরাট কিছু একটা করে ফেলেছেন; মিডিয়া খাবে বিষয়টা। তাই দেরী না করে তড়িঘড়ি করে নিজেই নিজের ফেসবুকে দিয়ে দিলেন। দূর্ভাগ্য! ফল হলো উল্টো। হেলমেটবিহীন যাত্রী হয়ে বাইক চড়ে মহা সমালোচিত হলেন।

তবে দমার পাত্র তিনি নন। পরদিন আবার নতুন চমক। হেঁটে হেঁটে অফিসে গেলেন। খুবই অপ্রয়োজনীয় ভাবে এসব দেখাইন্যা রাজনীতি পাবলিক খেলো না। প্রত্যাখান করলো। অবশেষে হতাশ হয়ে তিনি রণে ভঙ্গ দিলেন। তিনি আর হাঁটেনও না, বাইকেও চড়েন না। বলা যায়, মিডিয়ার আবডালে চলে গেলেন। আর দেখা নেই তাঁর। এবার দেখা দিলেন রেলমন্ত্রী। সদলবলে ঝাড়ু হাতে রেলষ্টেশন পরিস্কারে নেমে গেলেন। মুখে মাস্ক পড়ে ঝাড়ু হাতে ছবির পোজ। দেখে বোঝার উপায় নেই, ঝাড়ু দিতে নেমেছেন; নাকি ছবির পোজ দিতে।

বাদ যাননি তথ্যমন্ত্রীও। সরকারের প্রচারমন্ত্রী হয়েই নিজের প্রচারে নামলেন। তিনি মিডিয়ার মন্ত্রী; মিডিয়া হাতছাড়া করবেন কেন? ঘটা করে মিডিয়ায় জানিয়ে দিলেন পার্টটাইম শিক্ষকতাকে ছাড়ছেন না তিনি। ধরে রাখবেন। ব্যাস! নিউজ হয়ে গেল। এবার শিক্ষক হিসেবে তাঁর ক্লাশ নেবার খবর প্রচারের পালা। ক্যামেরা, সাংবাদিক নিয়ে জাহাঙ্গীর নগর ভার্সিটিতে পড়াতে চলে গেলেন। পড়ানোর পাশাপাশি মিডিয়ার জন্যে ছবিটবিও তোলা হলো। আর যথারীতি পত্রিকায় সেসব ছাপা হলো। চমকিত দেশবাসী দেখলো জীবিকা অর্জনের জন্যে স্বয়ং মন্ত্রী বাহাদুর হাসান মাহমুদ ক্লাশ নিচ্ছেন।

চমক কাকে বলে! একের পর এক চমকের এমন ঠমক হঠাৎ যেন কারো ধমকে থেমে গেল। তাই চমক দেখানোর বিষয়টি বেশী দূর আর এগুতে পারেনি। বাকী যারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঠমক মার্কা চমক দেখানোর, তারা গুটিয়ে নিলেন নিজেদের। আর এতেই পুরোপুরি থেমে গেল চমক। সরকারের নীতিনির্ধারকদের তড়িৎ পদক্ষেপ আর ইশারাতেই থেমে গেল। নীতিনির্ধারকগণ বিষয়টি বেশ বোঝেন বলেই ইশারা দিতে দেরী করেননি।

কেননা চমক দেখানো নামক দেখাইন্যা রাজনীতি দেশটাকে ধ্বংস না করতে পারলেও দলকে ধ্বংস করে ধ্বপাশ করে। ধ্বংস করে নিজেকেও। এই পৃথিবীতে যারাই দেখাইন্যা রাজনীতি করেছেন কেউই টিকতে পারেননি। হারিয়ে গেছেন কালের গহ্বরে। কাল বড় নিষ্ঠুর; কাউকেই ক্ষমা করে না। কেবল অপেক্ষা করে আর দেখতে চায়। সময় কিংবা কাল নিজেও চমক দেখাতে চায়। সেটা দেখাইন্যা চমক নয়। হতে হবে চমকের মত চমক। দেশের জন্যে কাজ করে, দেশের উন্নয়ন করে চমকে দিতে হবে দেশ ও জাতিকে। ক্ষমতাসীনদের কাছে কেবল সময় নয়, পুরো জাতিও এমনটাই প্রত্যাশা করে।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com