করোনা দিনের ডায়েরি...

৩৫ তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

অবশেষে বিদেশ ছেড়ে দেশে ফেরার সুযোগ পেলাম। দেশে ফেরার গল্পকাহিনী মনে হলেই এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। মনে হয় গল্পকাহিনী নয়, সাক্ষাৎ কল্পকাহিনী। শোনিমের অনলাইন স্কুলিং কনফার্ম হবার পর আর একটুও দেরি করিনি। দেশে ফেরার জন্যে হন্যে হয়ে টিকিটের ব্যবস্থা করি। তবে ব্যবস্থা এমনি এমনি হয়নি। সাত ঘাটের পানি খাবার পরে হয়েছে। ব্যবস্থা হবার কথা শুনে ওর মা খুশি হলেও শোনিম খুশি হয়নি। খুশি হবার কথাও না। করোনায় দীর্ঘদিন ধরে স্কুলের আঙিনা এবং বন্ধুদের অবিরত মিস করার পরে মিসের সময়টা আরো দীর্ঘ হবে শুনে আমার শোনিম বিমর্ষ। বলা যায় খুবই বিমর্ষ।

ওর মার সেদিকে খেয়াল নেই। খেয়াল করার সুযোগই নেই। মহাদায়িত্ব তার উপর। স্বল্প সময়ে সবাইকে গোছগাছ করে, সবকিছু গোছগাছ করে তাকে রওনার প্রস্তুতি নিতে হবে। কাজের কি শেষ আছে! পোটলাপাটলি গোছাবার কাজ। এত্তএত্ত কাজের ফিরিস্তি। এবার কাজ আমারও আছে। করোনার আগে কাজ থাকতো না। এক রকম শুয়েবসেই কাটাতাম। টিকিট কাটা শেষ তো আমার কাজও শেষ। ঢ্যাংঢ্যাং করে ঘুরে বেড়ালেও কোন সমস্যা ছিলনা। এবার সে সুযোগ নেই।

মহা কাজের ফিরিস্তি আমার হাতে। করোনা টেস্টকেন্দ্র খোঁজা, এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া, জেনে নেওয়া লাইনে দাঁড়াতে হয় কখন, সাথে কী কী ডকুমেন্টস নিতে হবে এটা জানাও জরুরী, কনফার্ম করা যে ওরা সার্টিফিকেট দেয় কিনা। দিলে কয়দিনে দেয়, উইকএন্ডে খোলা থাকে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কাজ ঝামেলার হলেও করা যায়। কিন্তু ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে যেই না শোনে আমরা ভিজিটর, অমনি যেন ওদের মাথায় ঠাডা পড়ে। ছেৎ করে ওঠে।

ছোটবেলায় হিন্দু মন্দিরের পূরোহিত ঠাকুড় আমাদের মত মুসলিম পোলাপাইনদের মন্দিরের বারান্দায় দেখলে যেভাবে রাম, রাম করে তেড়ে উঠতো, অনেকটা সেভাবেই ভিজিটর পরিচয় জেনেই নো, নো করে ওঠে। ওই দেশে ভিজিটরদের কোন বেইল নেই। মানবাধিকার আছে; ওটা তথাকথিত মানবাধিকার। নিজেদের জন্যে। বিশেষ করে দুটো শ্রেণীর জন্যে। এক, সমাজের উপরওয়ালা; দুই, বিদেশী ক্রিমিনাল। দেশটাই ওদের জন্যে। সাধারণের জন্যে ছিটেফোঁটা মানবাধিকার থাকে। ওটাও শুধুমাত্র কাগজধারী রেসিডেন্টদের জন্য। ভিজিটরদের জন্যে নয়।

আমরা ভিজিটর বলে সমস্যার অন্ত নেই। ডাক্তার নেই, চিকিৎসা নেই। তার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে করোনা সার্টিফিকেট। বলা নেই, কওয়া নেই; ভাবনা নেই, চিন্তা নেই। হুট করে এয়ারলাইন্সগুলোর শর্তসাপেক্ষে করোনা সার্টিফিকেট চাপিয়ে দেবার বিষয়টা বিশাল এক বিপদে ফেলে দিয়েছে যাত্রীদেরকে। এটা স্রেফ হেনস্থা ছাড়া আর কিছু না। করোনা সার্টিফিকেট লাগবে এটা ঠিক আছে। এর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু ঠিক কত ঘন্টা আগের সার্টিফিকেট লাগবে ক্যাচালটা লেগেছে এই জায়গাটায়। কানাডা বলছে ৯৬ ঘন্টার মাঝের সার্টিফিকেট লাগবে; আর বাংলাদেশ ৭২। প্যাঁচটা এই জায়গায়ও লেগেছে।

এই ৭২/৯৬ ঘন্টা কি স্যাম্পল প্রদান থেকে, না ফলাফল পাওয়া থেকে? কারণ এখানেই ২৪ ঘণ্টা যোগবিয়োগ হয়ে যায়। তারপর কোন কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়ে ১দিন বিলম্ব হলে ৭২ ঘন্টার প্যাঁচে বিমানে উঠার যোগ্যতাই হয়তো পার হয়ে যাবে। অনেক সময় এরাইভ্যাল বিমানবন্দরে আবার ৭২ ঘন্টার হিসেব নিকেশ নিয়ে ঝামেলা করে। নিয়ম ঠিকমত না জানার কারণে অনেকেই ভোগান্তির শিকার হন কিংবা অদক্ষ স্টাফের ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হন।

এত্ত সব সমস্যা মাথায় নিয়ে যেদিন টেস্টের জন্যে শোনিমসহ হাসপাতালে গেলাম সেদিন মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো। সুন্দরী রমনীর মিষ্টিমুখের তিক্ততায় বাজ পড়ারই কথা। নমুনা সংগ্রহের সময় নারীডাক্তার সাফসাফ বলে দিলেন ৫ দিনের আগে রেজাল্ট পাবার সম্ভাবনা খুবই কম। মানে, নির্ঘাত ফ্লাইট মিস। গায়ে কাঁপুনি ধরে গেল। এমনিতেও সকাল সাতটায় এসে খোলা আকাশের নীচে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম একটানা ৪ঘন্টা। ঝিরঝিরে বাতাসে শরীর জমে যাবার মত অবস্থা। হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায়ও ওদের দয়ামায়া হয়নি। আমাদেরকে প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাসের মাঝেও বাইরে রেখেছে।

এমন অবস্থা বাংলাদেশে হলে দেশের আতেল সমাজের পোয়াবারো হতো। সরকারের গুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়তো। নূরু মিয়া তো সরকারের পতন ছাড়া ঘরেই ফিরবে না বলে হুংকার ছুঁড়তো। তবে ইদানীং তার হুংকারের ধাঁচ একটু কমেছে। ধর্ষণ মামলার আসামী হবার পরে একটু বেকায়দায় পড়েছে বেচারা। লম্ফঝম্ফও একটু কমেছে। তবে লম্ফঝম্ফ যাই কমুক; তথ্যউপাত্ত যা পাচ্ছি, তাতে মনে হয় না সে পার পাবে। পাতি নেতার হুরোহুরি করে জাতি নেতা হবার চেষ্টায় তাড়াহুড়াটা সে একটু বেশিই করে ফেলেছে।

তবে সব তাড়াহুড়ায় ফলাফল সব সময় খারাপ হয় না। মাঝেমাঝে ভালও হয়। ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বচিকিৎসা বিজ্ঞানী সমাজ তাড়াহুড়া করলেও ভুল করছে বলে মনে হয় না। অনেকগুলো দেশ এবং সংস্থা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম সময়ে সফলতার একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। অন্তত ৬টা ভ্যাকসিন বাজারে আসি আসি করছে। এর চেয়ে ভাল খবর যেমনি নেই, তেমনি আমজনতার পুরোপুরি মুক্তির জন্যে এই ভ্যাকসিনের বিকল্পও নেই।

রাজাবাদশাহদের মুক্তির জন্যে ভ্যাকসিনের বিকল্প আছে। তাদের ভ্যাকসিন লাগে না। লাগে অভিনয়। ভালভাবে অভিনয় করতে পারলে তাদের কিছু লাগে না। সাক্ষাত প্রমাণ পাগলা ট্রাম্প। ভ্যাকসিন ছাড়াই ফুরফুরে আছেন তিনি। জাতি হিসেবে গেল ১০ মাসে আমেরিকানরা ফুরফুরে মেজাজে না থাকলেও তিনি আছেন। তার ভাবসাব দেখলে মনেই হয় না তিনি কিছু কেয়ার করেন। করবেন কেন? স্বয়ং করোনা পর্যন্ত তাকে কেয়ার করে। তার কথায় চলে। তিনি চাইলে করোনা তাকে ধরে। আবার চাইলে ছাড়ে। যদিও গেল ১০ মাসে করোনা থেকে পুরো আমেরিকান জাতিকে ছাড়াতে পারেন নাই। আমেরিকানদের রক্ষা করতে না পারলে কী হবে! তিনি নিজে রক্ষা পেয়েছেন চটজলদি।

নিন্দুকেরা এসবকে রক্ষা নয়, নাটক বলে। করোনার মতো মহামারী নিয়েও যে নাটক করা যায়, তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেখালেন। প্রথমে বলা হলো তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেছেন। পরে হাসপাতাল থেকে ‘মহামূল্যবান’ বাণী দিলেন। সে কী বাণী! ভাবের বাণী। ভাব নিয়ে বললেন, আমি এখনই হেঁটে বাইরে চলে যেতে পারি। তারপর দু’দিন যেতে না যেতেই তিনি সত্যি সত্যি গেলেনও। একেবারে ভাল হয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরে গেলেন হেঁটে হেঁটেই।

আসলে এসবই মশকরা। পুরো বিশ্ববাসীর সাথে ঠান্ডা মাথায় করা ফুরফুরা মেজাজের মশকরা। ট্রাম্পের কিছুই হয়নি। তিনি হাসপাতালে গিয়ে করোনার সঙ্গে কিছু মশকরা করে ঘরে ফিরে এসেছেন মাত্র। মশকরা তিনি করতেই পারেন। কারণ তিনি দুনিয়ার বাদশাহ। মন যা চায় তাই করতে পারবেন। মন চাইলে একা একা নাচতেও পারেন। আবার দুনিয়াশুদ্ধ মানুষকে নাচাতেও পারেন। কেবল পারে না আমজনতা। যখন মনে যা চায় তা করতে পারে না আমজনতা। না আমেরিকান জনতা, না বাঙালী।

এ জন্যেই দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে আমাদেরকে করোনা সার্টিফিকেটের জন্যে। যাকে যেখানে পেয়েছি, ধরেছি। কিন্তু সবাই নিরুপায়। সবাই শুধু আউলা পাতাইলা আইন দেখেছে এবং দেখিয়েছে। সঠিক পথ দেখায়নি বা দেখাতে পারেনি। কিংবা দেখাবার ব্যবস্থা করেনি। ফলত পথহারা পথিকের মত এখানে সেখানে ঘুরেছি। জাস্ট নির্যাতিত হয়েছি। তথাকথিত সভ্য যুগের অসভ্যতায় ভরা চোরা নির্যাতন।

ঠিক আমাদের মতই সারাবিশ্বে প্রতিদিন এভাবে নির্যাতিত হচ্ছে হাজার হাজার বিদেশগামী। তারা অসহায়, তারা খুবই বিপদগ্রস্ত। অথচ রাতদিন পরিশ্রম করে তারাই মাস শেষে ডলার পাঠায় দেশে। এবং গেল চার মাসে ৮ বিলিয়ন পাঠিয়েছে। জীবনবাজী রেখে তারাই দেশকে দেখছে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তাদেরকে দেখবার মত একজন মানুষও নেই এই ধরায়!! না দেশে, না বিদেশে!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com