রক্ত-হলুদ সন্ধ্যা

মোঃ ঈমাম হোসাইন: ষোড়শী রাহেলা পানু আজকাল ঘুমায় কম, খাওয়াদাওয়াও কম করে। কেবল সকাল-বিকাল সাজুগুজু করে টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি, কপালে টিপ আর পায়ে পরে আলতা। পারিল গ্রামের সবুজ ধান আর উঁচু পাটখেতের আলপথ দিয়ে ঘুরে বেড়ায় নিজের আনন্দে। বাবা-মাও আদরের পানুকে বাধা দেন না, বকাঝকা করেন না। মা কেবল পানুকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বিয়ের পর বুঝবি পরের বাড়ি কেমন লাগে। চারদিক থেকে কেবল ঘটক আসছে। পানু সেসব কথা কানে নেয় না। জানেই তো, সে যাবে কেবল তার আপন মানুষের কাছে। ঘটক এলেই কি, না এলেইবা কী?

পারিল গ্রামে শীতের রাতে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে দিন গোনে রফিক। যোজন দূরে লুকিয়ে থাকা পানুকে খোঁজে সে। উদ্যমী আর ডানপিটে, প্রতিবাদীর তকমা পাওয়া রফিকের মন আর লেখাপড়ায় বসে না। দেবেন্দ্র কলেজের পাঠ চুকিয়ে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতে হবে। এমন চিন্তাই মাথায় ঘুরছে।

বাবা লতিফ সাহেবের কানেও কিছু কথা আসছে ইদানীং। অগত্যা স্ত্রী রাফিজা বিবির সঙ্গে আলোচনা করে বড় সন্তানের মনস্কামনা হাসিলের সিদ্ধান্ত নিলেন। বড় শ্যালককে উকিল বানিয়ে পাঠালেন পাশের গাঁয়ের রাহেলা পানুর বাড়িতে। রফিকের মামাও পাকা কথা নিয়ে বাড়ি এলেন। সময় বুঝে দিন-তারিখ ঠিক হবে।

সহস্র চিন্তা মাথায় নিয়ে রফিক রওনা হলো ঢাকার আলুবাজারের উদ্দেশ্যে। সেখানে রয়েছে পৈত্রিক ব্যবসা পারিল মুদ্রণালয়। গুলিস্তানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার কানে বাজল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই’। রফিকের প্রতিবাদী মন জেগে উঠল এখনি মিছিলে যোগ দিতে হবে। না, আগে বাবার কাছে যাই, তারপর মিছিলে যাওয়া যাবে। এমন সিদ্ধান্তে কিছুটা শান্ত, স্থির হলো।

লতিফ সাহেবও অজানা শঙ্কায় ভুগছেন। ভাষার দাবিতে প্রতিদিন মিছিল-মিটিং হচ্ছে। কখন কি হয়! বড় ছেলে বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে মোকামে, চা দোকানে, বন্ধুদের আড্ডায় নানা কথা বলছে।

লতিফ সাহেব রফিককে ডেকে বললেন, তোমার মামা বাড়ি গেছে তোমার বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করতে। কোনো মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়ার দরকার নেই। রফিক শোনে আর মনে মনে বলে, হ্যাঁ বাবা, তোমার কথা শুনতে আমি বসে আছি! আমাগো ভাষায় আমরা কথা বলব, তাতে পশ্চিমাদের কী? প্রতিবাদ করতেই হবে।

প্রেসের কর্মচারী সোবহান ফকির রফিককে বাসায় গিয়ে বললেন, ভাইজান, নয় ফাল্গুন আপনার বিয়ের দিন ধার্য হয়েছে। মামা দেশ থেকে খবর পাঠিয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার আগে আপনাকে বাড়ি পৌঁছতে হবে। খালু বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। আপনার জন্য দশ টাকার আটটা নোট রেখে গেছেন।

আপনার বিয়ের বাজার করার জন্য। মুহূর্তে ভেসে উঠল পানুর চেহারা লাল পেড়ে শাড়ি, আলতা, স্নো, পাউডার। 

বিশ তারিখ রাতে রেডিও নিয়ে বসে আছে রফিক। মন আর তর সয় না। হঠাৎ খবর ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে সরকার। সব ধরনের মিছিল, মিটিং, লোকসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রফিকের রক্ত মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল। আর ছেড়ে দেওয়া যাবে না পাকিস্তানি শাসকদের। কোনোভাবে সকালের প্রতীক্ষায় রাত পার করল।

সূর্যের আলো মাটিতে পড়ার সঙ্গেই কাউকে কিছু না বলে জামা পরে পায়ে হেঁটে পকেটে সেফার্ট  কলম গুঁজে রফিক রওনা হলো আমতলার উদ্দেশ্যে। পথে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে ছাত্রমিছিলে যোগ দিল। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি  চাই’এসব শোগানে রাজপথ প্রকম্পিত। হঠাৎ চারদিকে গুলির শব্দ। পাখিরা কিচিরকিচির করে উঠল। তারপর সব নিস্তব্ধ। গহিন নীরবতা। টগবগে  রফিক পড়ে আছে মেডিক্যাল হোস্টেলের ১২ নম্বর রুমের পূর্বপাশে নিথর দেহে। রক্তস্রোত বয়ে যাচ্ছে। মাথার মগজ পড়ে আছে অন্য জায়গায়। পাঁচ-ছয়জন লোক লাশ নিয়ে যাচ্ছে এনাটমি হলের পেছনে।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। পানু বিয়ের শাড়ি, আলতা, সুগন্ধি তেলের প্রতীক্ষায় বসে আছে। হলুদ বেটে সখিরা বসে আছে কলসিভরা পানি নিয়ে। শিল-পাটায় ঘষা হলুদের দলা আস্তে আস্তে লাল রং ধারণ করছে। এ যেন রক্ত-রঙের হলুদ সন্ধ্যা। অবশেষে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের অন্ধকার নামল পারিল গ্রামে। রাহেলা পানু তাকিয়ে আছে দূর আকাশের নীরব নিথর তারাগুলোর দিকে। পারিল গ্রামের রফিকও যে যোগ দিয়েছে ঐ তারাদের দলে। - সংগৃহিত

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com