ছুটি

অনন্য শফিক: কাপড় ধুতে বাথরুমে গেছি। এরই মধ্যে ফোন বাজলো। তাড়াহুড়ো করে এসে কল রিসিভ করতেই দেখি বড় আপা। আপা বললো, ‘অনু, তোরা কখন আসছিস? আমরা আজ বিকেলে আসবো। কাল তোর ছোট আপা আসবে।’

আমি বললাম, ‘ওকে বলে দেখি কী বলে!’

‘কী বলে মানে? তোর বিয়ের ক'বছর হয়েছে বল তো?’

‘তিন বছর।’

‘তো তিন বছরে বাবার বাড়িতে কয়টা ঈদ করেছিস?’

‘একটিও না।’

‘তাও দিবে না? না দিয়ে দেখুক এবার! শোন, তোর শাশুড়ি কোথায় রে? উনার কাছে গিয়ে মোবাইলটা দে তো! আমি কথা বলবো।’

‘আপা, থাক। তোমার বলতে হবে না। আমি বুঝিয়ে বলবো।’

‘তুই একটা গাধা হয়েছিস! সব সময় মিনমিন করিস! এরকম মিউ হয়ে থাকলে সারা জীবনই তোকে ধরে ওরা কাপড় কাছা কাছবে!’

সে রাতেই মেহুলকে বললাম, ‘মেহুল, এবারের ঈদটা ওখানে করি গিয়ে!’

মেহুল আমার বরের নাম। সে সিগারেটের ছাই এস্ট্রেতে ঝেড়ে ফেলে বললো, ‘আমি কী বলবো? মাকে বলে দেখো। মা অনুমতি দিলে যাবে। না দিলে যাবে না। আমি তো এসবের হ্যা না কোনটিতেই নাই।’

‘আচ্ছা।’

বুকটা কেমন হো হো করে উঠলো আমার। মনে হলো আমি এই পৃথিবীর পরাধীন প্রাণীদের একটি!

আমি এখানে একটি খাঁচায় বন্দী। ইচ্ছে করলেই আমি আর কিছু করতে পারি না। মেহুল সব সময় এমনটিই করে। বিয়ে করেছে ও কিন্তু সব দায় দায়িত্ব ওর মায়ের। এমনকি আমি কোন রঙের শাড়িটা পরবো, জুতো জোড়া কেমন পরবো, কপালে টিপ পরবো কি পরবো না। মাছের কোন টুকরোটা আমার হবে। কখন খাবো আর কখন খাবো না। কখন ঘুমাবো আর কখন ঘুমাবো না। সব ওর মায়ের পছন্দে।

পরদিন শাশুড়িকে বলি, ‘মা, আপারা সবাই আমাদের বাড়িতে ঈদ করছে। আমাকেও করতে বলছে!’

আমার শাশুড়ির গলায় কিছুটা ধমক এনে বললেন, ‘তো এই বাড়িটা কার? তিন বছরেও এই বাড়িটা আপন হলো না তোমার? নিজের বাড়ি রেখে পরের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে হবে কেন? বাপের বাড়িতে যাওয়ার শখ হয়েছে যাবে। ঈদের দুদিন পর যাও।’

আমি এমনিতেই ভীতু। জনম ভীতু। শাশুড়ি মায়ের এই কথা শোনার পর একেবারে মিইয়ে গেলাম। বুকে কষ্টের পাহাড় নিয়েও চুপ করে রইলাম।

আপারা আবার ফোন করলে বলে দিলাম আমি যেতে পারবো না।

ওরাও শুনে কষ্ট পেলো।

ঈদের দিন আরো বেশি মন খারাপ হলো আমার। বারবার কেবল মনে হচ্ছিল আপাদের কথা। আপারা ওখানে একসাথে সবাই মিলে কতো আনন্দ করছে!

কতো সব গল্প করছে। আমাদের বাড়ির উঠোনের বুড়ো ডালিম গাছটার কথা খুব মনে পড়লো। ঈদের দিন বিকেলে ওই ডালিম গাছের নিচে ছোট বড় সবাই মিলে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতাম। মনে পড়লো বারান্দার অব্যবহৃত ঢেঁকিটার কথা। সারা বছর এই ঢেঁকির কোন কাজ নাই। শুধু ঈদের বেলায় মা ঢেঁকিতে আতব চাল গুঁড়ো করেন। ঢেঁকিতে গুঁড়ো করা চালের তেলের পিঠার স্বাদ নাকি ভিন্ন। পিঠা হয় মসৃণ। আমি গেলে ভাগ্নে-ভাগ্নীরা এসে ধরতো আমায়। বলতো ওদের হাতে মেহেদি দিয়ে দিতে। অর্ধেক রাত কেটে যেতো ওদের হাতে মেহেদি দিতে দিতে। ওসব ভাবতে গিয়ে আমার চোখ ভরে উঠলো জলে।

এরই মধ্যে শাশুড়ি মা বললেন, ‘পায়েসটা রান্না করো গিয়ে।’

মন খারাপ নিয়েই পায়েস রান্না করলাম। নিজে আর চেকে দেখলাম না কেমন হয়েছে। পরিবেশনের সময় মেহুল পায়েস মুখে দিয়ে থুথু ফেললো প্লেটে। রাগে চিৎকার করে বললো, ‘এটা কী পায়েস? এক কেজি লবণ দিয়ে রেখেছে।’

শাশুড়ি মা যেন একটা ছুঁতো পেলেন আমায় বকার। তিনি এসে এক চামচ মুখে দিয়েই থুউক করে ফেলে দিলেন। তারপর মুখ বেজার করে বললেন, ‘ইচ্ছে করেই এমন করেছো! বাড়িতে যাওয়ার জন্য না করেছি বলেই এমন করেছো। বাড়ির জন্য একেবারে জীবন বেরিয়ে যাচ্ছে! আমাদের বাপের বাড়ি নাই বুঝি! ঢং। তিন বছর হয়েছে বিয়ের এখনও ঢং গেল না! অত ঢং করবা তাইলে বাপ মা বিয়ে দিয়েছে কেন? ঘরের খুঁটি করে পুঁতে রেখে দিলেই তো হতো!’

আমি কোন কথা বলতে পারছি না। চোখ ফেটে জলের ফোয়ারা নামছে। কান্নায় ভেঙে আসছে মুখ।

মেহুলের দিকে একবার তাকালাম। ও কেমন ধরনের পুরুষ আমি বুঝি না। স্ত্রীর প্রতি মানুষের কতো ভালোবাসা থাকে। দরদ থাকে। তার নাই। বিন্দুমাত্রও নাই। মানুষ ভালোবাসা দিয়ে স্ত্রীর মন জয় করে। তার শরীরে শক্তি আছে। সে শক্তি দিয়ে কেবল কাম বাসনা পূরণ করে। শুনেছি স্বামীদের প্রেম ভালোবাসায় স্ত্রীর সকল দুঃখ- কষ্টের অবসান হয়। সবকিছু ভুলে যেতে পারে। কিন্তু আমার সে কপাল নেই। কষ্ট নিয়েই ঘুমিয়ে গেলাম।

ঈদের পর দিন রাতে আমার ভীষণ মন খারাপ। একটু আগেই ফোন করেছিলাম। মা- বাবা, আপা- দুলাভাই আর তাদের বাচ্চা কাচ্চারা মিলে মামাদের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছে। আর আমি এখানে। আমাকে কোথাও যেতে দেয়া হচ্ছে না। কাল মেহুলের বোনেরা আসবে। ওদের সেবা যত্ন করে খাওয়াতে, পরাতে এখানে আরো দু’ তিনদিন থাকতে হবে আমার। তারপর ওরা সন্তুষ্ট হয়ে বাড়ি ফিরলে আমার ছুটি হবে। আমার যখন ছুটি হবে তখন কী ঈদ আমার জন্য বসে থাকবে? ঈদও কী ক্লান্ত হয়ে ছুটি নিয়ে নিবে না?

রাত বাড়ছে। আমি ঘুমাতে পারছি না। বিছানায় মুখ চেপে কাঁদছি।

মেহুল একটু পর পর গায়ে হাত রাখছে। ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করছে।

আর আমি ভাবছি। কাঁদতে কাঁদতে ভাবছি।

পুরুষ মানুষ, কোনদিনও কী বুঝবে না যে নারীরাও মানুষ। তাদেরও মন আছে। ইচ্ছে আছে। শখ আহ্লাদ আছে। তাদেরও খুব মন খারাপ হয়! - সংগৃহিত

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৮৯৬০৫৭৯৯৯
Email: simecnews@gmail.com